মালয়েশিয়া থেকে মিয়ানমারের নাগরিকদের প্রত্যাবাসন নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে প্রায় দেড় হাজার মিয়ানমারের নাগরিককে স্বেচ্ছায় দেশে ফেরানোর প্রস্তুতির মধ্যেই ‘নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ’ প্রত্যাবাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে মিয়ানমার। তবে জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন বলছে, বাস্তবে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি।
বৃহস্পতিবার মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, বিদেশে বাস্তুচ্যুত নিজ নাগরিকদের স্বেচ্ছায় ও যাচাইকৃত প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশসহ বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে তারা। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথাও বলা হয়।
এর আগে জুলাইয়ে মালয়েশিয়া জানিয়েছিল, মিয়ানমার প্রায় ৫ হাজার রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে। দুই দেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রথম ধাপে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মিয়ানমারের নাগরিককে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসন করা হবে। তবে এই দফায় কতজন রোহিঙ্গা থাকবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
২০১৭ সালে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে লাখ লাখ রোহিঙ্গা দেশ ছেড়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। ওই সহিংসতার ঘটনাকে কেন্দ্র করেই মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গণহত্যার মামলা চলছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী শরণার্থী শিবিরগুলোতে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছেন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী বসতি হিসেবে পরিচিত এসব শিবির থেকে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরানোর আলোচনা দীর্ঘদিন ধরে চললেও বাস্তবে প্রত্যাবাসনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
এদিকে মালয়েশিয়াতেও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের পাশাপাশি প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার রোহিঙ্গা বসবাস করছেন। রোহিঙ্গাদের পরিচয় ও অধিকার নিয়ে মিয়ানমারের অবস্থান নিয়েও নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবার আবারও ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি প্রত্যাখ্যান করে দাবি করেছে, এই শব্দটি মিয়ানমারে কখনো অস্তিত্ব না থাকা একটি জাতিগত পরিচয়কে ‘মিথ্যাভাবে প্রতিষ্ঠা’ করে।
সম্প্রতি বিভিন্ন দেশে রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবস পালনেরও সমালোচনা করেছে মিয়ানমার।
মালয়েশিয়ার যোগাযোগমন্ত্রী ফাহমি ফাদজিল এর আগে স্পষ্ট করে বলেছেন, কোনো মিয়ানমারের নাগরিককে এমন পরিস্থিতিতে ফেরত পাঠানো হবে না, যেখানে তার ওপর নির্যাতনের আশঙ্কা রয়েছে কিংবা জীবন হুমকির মুখে পড়তে পারে।
তবে মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের আশঙ্কা, রোহিঙ্গাদের জাতিগত পরিচয় অস্বীকার করা এমন একটি দেশে ফেরত পাঠানো হলে তারা আবারও নিপীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হতে পারেন।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি ‘বর্তমানে বিদ্যমান নেই’।
মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত মিয়ানমারের অনেক নাগরিক বর্তমানে দেশটির অভিবাসন আটককেন্দ্রে রয়েছেন। এ অবস্থায় তাদের দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত কতটা স্বাধীন ও স্বেচ্ছাপ্রসূত তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
বিশেষ করে আটক অবস্থায় থাকা ব্যক্তিদের ওপর প্রত্যাবাসনে সম্মতির জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। ফলে প্রত্যাবাসনের আগে প্রতিটি ব্যক্তির সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবে নেওয়া হয়েছে কি না, তাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা রয়েছে কি না এবং দেশে ফেরার পর তাদের অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত হবে এসব বিষয় নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।
মিয়ানমার সরকার অবশ্য বলছে, যাচাইকৃত বাস্তুচ্যুত নাগরিকদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে ফেরাতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে জাতিসংঘের সর্বশেষ মূল্যায়ন বলছে, সেই প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি।
ফলে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে মালয়েশিয়া থেকে শুরু হতে যাওয়া প্রথম দফার প্রত্যাবাসন শুধু দুই দেশের কূটনৈতিক সমঝোতার পরীক্ষা নয়, বরং মিয়ানমারে ফিরে যাওয়া ব্যক্তিদের নিরাপত্তা ও মানবাধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আজকালের খবর/ এমকে