বৃহস্পতিবার ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নদী রক্ষা কমিশন কাগুজে বাঘ
ডিজিটাল কারসাজিতে বুড়িগঙ্গা-তুরাগ বিপন্ন হওয়ার শংকায়
প্রকাশ: বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:০৬ পিএম   (ভিজিট : ৬)
ফরাশগঞ্জ বেড়ীবাধ (বাকল্যান্ড) দিয়ে বুড়িগঙ্গা নদী। ছবি: শাহবাজ মাহমুদ

ফরাশগঞ্জ বেড়ীবাধ (বাকল্যান্ড) দিয়ে বুড়িগঙ্গা নদী। ছবি: শাহবাজ মাহমুদ

ডিজিটাল গ্রাসের প্রভাবে বর্তমানে মৃত বুড়িগঙ্গা অন্যদিকে বিপন্ন তুরাগ। এক দশক আগেও যেখানে সরাসরি বালু ভরাট করে নদী দখল হতো বর্তমানে নদী গ্রাসের সেই সনাতন পদ্ধতি পুরোপুরি ডিজিটাল ও প্রাতিষ্ঠানিক জালিয়াতিতে ঢাকার প্রাণস্পন্দন প্রধান দুই নদীর এখন বেহাল অবস্থা। নদী রক্ষায় নিয়োজিত নদী কমিশনকে কোনো নির্বাহী ক্ষমতা না দেওয়ায় দিন দিন এর ভয়াবহতা বেড়ে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

এক দিকে প্রযুক্তির অপব্যবহারে নদীর সীমানা বিলীন হচ্ছে, অন্যদিকে কাগজের কারসাজিতে বিষাক্ত বর্জ্য ঢেলে বুড়িগঙ্গাকে মেরে ফেলার সাথে তুরাগকে বিপন্নের পথে ঠেলে দেয়া হয়েছে।

একাধিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নদী গ্রাসের ডিজিটাল কৌশলগুলো বর্তমানে ভূমিদস্যু ও প্রভাবশালী করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো নদী দখলে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও প্রযুক্তিগত জালিয়াতির আশ্রয় নিচ্ছে। আধুনিক ডিজিটাল ল্যান্ড সার্ভেতে নদীর যে অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ লক করার নিয়ম; অসাধু কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তা মূল সার্ভারেই বদলে দেয়া হচ্ছে। ফলে স্যাটেলাইট ম্যাপে নদীর সীমানা ঠিক দেখালেও, মাঠপর্যায়ে বাস্তব সীমানা খুঁটি নদীর অনেক ভেতরে চলে যাচ্ছে।

সিএস রেকর্ড অমান্য করে, নতুন আরএস বা বিএস জরিপের সময় নদীর ভেতরের খাসজমি ও ফোরশোর (তীরভূমি) এলাকাকে জালিয়াতির মাধ্যমে করপোরেট ডকইয়ার্ড বা কারখানার নামে ডিজিটাল খতিয়ানভুক্ত করা হচ্ছে। এই ভুয়া অনলাইন ডাটাবেজ দেখিয়ে পরে আদালত থেকে স্থগিতাদেশ আনা হচ্ছে।

অন্য দিকে পরিবেশ অধিদফতরের অনলাইন ট্র্যাকিং সিস্টেমকে ফাঁকি দিতে ডাইং ও কেমিক্যাল কারখানাগুলো ডামি সফটওয়্যার ব্যবহার করছে। সরকারি মনিটরিং স্ক্রিনে ইটিপি ২৪ ঘণ্টা সচল দেখালেও, বাস্তবে পেছনের গোপন আন্ডারগ্রাউন্ড বাইপাস লাইন দিয়ে রাতের আঁধারে অপরিশোধিত বিষাক্ত কেমিক্যাল নদীতে ফেলা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নদী রক্ষায় নিয়োজিত নদী কমিশনকে কোনো নির্বাহী ক্ষমতা না দেয়ায় এবং বিআইডব্লিউটিএ ওয়াসা, রাজউক ও জেলা প্রশাসনের মধ্যে চরম সমন্বয়হীনতার কারণে এই ডিজিটাল জালিয়াতি ঠেকানো যাচ্ছে না। উচ্ছেদ অভিযান শুরু হলেই দখলদাররা তাদের ডিজিটাল জালিয়াতির কাগজপত্র ও লিজের দোহাই দিয়ে আইনি প্রক্রিয়াই থমকে দিচ্ছে। ফলে বছরের পর বছর ধরে অনিয়ন্ত্রিত শিল্পবর্জ্য, প্লাস্টিক দূষণ এবং প্রভাবশালী মহলের অবৈধ দখলের কারণে নদী দু’টি মৃতপ্রায়। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নদী দু’টিকে বাঁচাতে কিছু কঠোর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেয়া শুরু হয়েছে।

সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন জরিপে নদী দু’টির ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। একাধিক সংস্থার জরিপে দেখা গেছে বুড়িগঙ্গার পানির দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে ১.৭০ থেকে ২.৬৮ মিলিগ্রাম/লিটারে নেমে এসেছে। দূষণের প্রধান উৎস চিহ্নিত করে বলা হয়েছে, ঢাকা শহরের গৃহস্থালির পয়োবর্জ্য, হাজারীবাগ ও সাভারের ট্যানারি বর্জ্য এবং কেরানীগঞ্জের ডাইং কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য নদী দু’টিকে বিপন্ন করে তুলেছে।

অন্য দিকে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, বুড়িগঙ্গা ও তুরাগে সরাসরি বর্জ্য ফেলার ২২৪টি বড় আউটলেট বা নিষ্কাশন মুখ চিহ্নিত করা হয়েছে। সদরঘাট, কামরাঙ্গীরচর, গাবতলী ও টঙ্গী এলাকায় নদীর পাড় দখল করে অবৈধ স্থায়ী স্থাপনা, গুদাম ও ঘাট তৈরি করায় নদীর প্রস্থ প্রতিনিয়ত কমছে।

সম্প্রতি রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পরিবেশ অধিদফতরের এক মতবিনিময় সভায় বুড়িগঙ্গা দূষণ উৎসের মধ্যে ট্যানারি বর্জ্য, পয়োবর্জ্য, শিল্প ও বাজারের বর্জ্য, তেল এবং বিভিন্ন ধরনের কঠিন আবর্জনা। সেই সাথে নৌযান থেকে নির্গত তেল ও অন্যান্য দূষিত পদার্থও দূষণের জন্য দায়ী করা হয়। এ ছাড়া এতে বুড়িগঙ্গা তীরবর্তী সদরঘাট, হাজারীবাগ, কামরাঙ্গীরচর, জিঞ্জিরা, শ্যামপুরের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও শিল্পাঞ্চলগুলোকে দূষণের হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ফরাশগঞ্জ বেড়ীবাধ দিয়ে বুড়িগঙ্গা নদীর দুষণের একটি চিত্র: ছবি: শাহবাজ মাহমুদ

ফরাশগঞ্জ বেড়ীবাধ দিয়ে বুড়িগঙ্গা নদীর দুষণের একটি চিত্র: ছবি: শাহবাজ মাহমুদ

প্রতিবেদনে তুরাগ নদীর প্রধান দূষণ উৎস হিসেবে শিল্পবর্জ্য, পয়োবর্জ্য, প্লাস্টিক ও অন্যান্য কঠিন বর্জ্যকে চিহ্নিত করা হয়েছে। নদীর তীরবর্তী শিল্প ও আবাসিক এলাকার এসব বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি থাকায় দূষিত পদার্থ নদীতে প্রবেশ করছে। কোনাবাড়ী, কাশিমপুর, টঙ্গী, কামারপাড়া, আশুলিয়া ও আশপাশের বিভিন্ন শিল্প ও আবাসিক এলাকাও নদী দূষণের অন্যতম কারণ।

সরকারি ও পরিবেশবাদী সংস্থার যৌথ প্রতিবেদন এবং সাম্প্রতিক সমীক্ষায় বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদীর পানি দূষণ এবং দ্রবীভূত অক্সিজেনের এই আশঙ্কাজনক চিত্রটি তুলে ধরা হয়।

এতে পরিবেশ অধিদফতর তাদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণে শুষ্ক মৌসুমে এই দুই নদীর পানিতে বিওডি, সিওডি এবং দ্রবীভূত অক্সিজেনের মারাত্মক অবনতির চিত্র রেকর্ড করা হয়। বাংলাদেশ নৌবাহিনী সাম্প্রতিক সরেজমিন জরিপ ও ম্যাপিং প্রতিবেদনে বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদীর তলদেশের বর্জ্য এবং নদী দুটিতে সরাসরি বর্জ্য ফেলার ২২৪টি প্রধান আউটলেট (নিষ্কাশন মুখ) শনাক্তকরণের তথ্যটি দেয়া হয়।

আর পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন আন্দোলন (পরিজা) বিশেষ বৈজ্ঞানিক সমীক্ষায় ঢাকার নদীগুলোর পানির এই রাসায়নিক ও পরিবেশগত সঙ্কটের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানগুলো তুলে ধরা হয়। তাদের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় যে, অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্যরে কারণে নদীর কোনো কোনো পয়েন্টে অক্সিজেনের মাত্রা জলজ প্রাণীর জন্য প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে গেছে।

নদী দখল আর জালিয়াতির প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০০৯ সালে হাইকোর্টের নির্দেশনার পর বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ নদীর সীমানা পিলার স্থাপনের কাজ শুরু করে। কিন্তু অনেক স্থানেই ব্রিটিশ আমলের সিএস বা আরএস রেকর্ড অনুযায়ী নদীর প্রকৃত সীমানা মাপা হয়নি। শুষ্ক মৌসুমে নদী শুকিয়ে গেলে যেখানে চর জাগে, সেখানেই পিলার বসানো হয়েছে। ফলে নদীর ভেতরের বিশাল অংশ পিলারের বাইরে চলে যাওয়ায় দখলদারেরা আইনি বৈধতা পেয়ে যায়।

সবচেয়ে বড় জালিয়াতিটি করা হয় কারখানার নিচে গোপন বা বাইপাস পাইপলাইন বসিয়ে। দিনের বেলা সাধারণ বর্জ্য ইটিপি দিয়ে নামমাত্র শোধন করা হলেও, মূল বিষাক্ত রাসায়নিক মিশ্রিত পানি এই গোপন পাইপ দিয়ে সরাসরি বুড়িগঙ্গা বা তুরাগে পাঠিয়ে দেয়া হয়। বিদ্যুৎ বিল বাঁচানো এবং কেমিক্যালের খরচ কমানোর জন্য দিনের বেলা ইটিপি ড্রামগুলো বন্ধ রাখা হয়। রাত ১২টার পর বা ভোররাতে যখন চারপাশ জনশূন্য থাকে, তখন কারখানার সমস্ত অপরিশোধিত বিষাক্ত তরল বর্জ্য একযোগে নদীতে ছেড়ে দেয়া হয়।

এ বিষয়ে জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান হাওলাদার নয়া দিগন্তকে বলেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালত নদীগুলোকে ‘জীবন্ত সত্তা’ ঘোষণা করে নদী রক্ষা কমিশনকে এর আইনি অভিভাবক বানালেও, ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে আইনের বাস্তাবায়ন সম্ভব হয় না।
তুরাগ নদীর একটি ফাইল ফটো

তুরাগ নদীর একটি ফাইল ফটো

অন্য দিকে বর্তমান আইন অনুযায়ী কমিশন কোনো অবৈধ দখলদার বা দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সরাসরি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, জরিমানা বা লাইসেন্স বাতিল করতে পারে না। তারা কেবল সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা জেলা প্রশাসনকে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য ‘সুপারিশ’ করতে পারে। বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের প্রধান দখলদার ও দূষণকারীরা বড় বড় শিল্পগ্রুপ বা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। স্থানীয় প্রশাসন অনেক সময় কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে তাদের উচ্ছেদ করতে গিয়ে অদৃশ্য চাপে পিছিয়ে আসে।

এর প্রতিকারের বিষয়ে তিনি বলেন, খসড়া আইনটি দ্রুত পাস করে কমিশনকে নিজস্ব ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ, জরিমানা আদায় ও সরাসরি ফৌজদারি মামলা করার নির্বাহী ক্ষমতা দিতে হবে। নদী ব্যবস্থাপনায় যুক্ত ৫-৬টি সংস্থার সমান্তরাল ক্ষমতা বাতিল করে নদী রক্ষা কমিশনকে একক অভিভাবক বা প্রধান তদারককারী সংস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। অন্যতায় তা থেকে উত্তোরণ অসম্ভব।

আজকালের খবর/আতে







আরও খবর


Advertisement
Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor$gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor$gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft