হৃদয়ে ঢাকা ৪১৬ স্মরণীয় বরেণ্য সম্মাননা গ্রহণ করছেন কিংবদন্তী পরিচালক এহতেশামের ছেলের ঘরের নাতি।
ঢাকার চলচ্চিত্রের সূচনালগ্নের গৌরবমাখা নাম এহতেশাম-মুস্তাফিজ ভাতৃদ্বয়। যাদের হাত ধরে বাণিজ্যিক ধারার সূচনা একই সঙ্গে নবাগতদের নিয়ে নিয়ে জুটিপ্রথা গড়ে ইতিহাস হয়ে আছেন। অপরদিকে নাজির আহমেদ যার হাত ধরে এফডিসি স্টুডিওর সূচনা। বিস্মৃতির গভীরে এই গুণীজনরা। তাদের নামটি আজ যখন ভুলতে বসেছে তখন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুল সালাম নিলেন এক পরিকল্পনা। ঢাকার ৪১৬ বছর পূর্তিতে এই উদ্যোগের বাস্তবায়ন করেন।
হৃদয়ে ঢাকা ৪১৬ অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথিদের মধ্যে ছবিতে গীতিকার মনিরুজ্জামান মনির, সুজাতা, সুচন্দা, মাহমুদা চৌধুরী, রফিকুজ্জামান, মতিন রহমানকে দেখা যাচ্ছে।
গত ২২ আগস্ট রাজধানীর মধুমিতায় বসেছিলো বিস্তৃতির আড়ালে চলে যাওয়া সেইসব সোনালী দিনে অভিনয়-কুশলীদের স্মরণে বরেণ্য জন সম্মাননা। এদিন নাজির আহমেদ, এহতেশাম, মুস্তাফিজ, আফজাল চৌধুরী, এম এ সামাদ, খান জয়নুল, আব্দুল মতিনের মতো গুণীজনদের পরিবারের লোকদের হাতে তুলে দেওয়া হয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন সম্মানান ও সার্টিফিকেট।
স্মরণীয় বরেণ্য সম্মাননা গ্রহণ করছেন মুস্তাফিজের ছেলে ইশতিয়াকুর রহমান।
এদিন মোট ২৩ স্মরণীয় গুণীকে স্মরণ করা হয়। এ সময় এহতেশাম-মুস্তাফিজ পরিবারের পক্ষে ইশতিয়াকুর রহমান আপ্লুত কণ্ঠে বলেন, সত্যি বলতে যাদের হাতে বাণিজ্যিক সিনেমার প্রসার হলো তারাই ছিলো এতোদিন অন্ধকারে। আমরা ধন্যবাদ জানাই বর্তমান সরকার ও প্রশাসককে যে আমাদের তারা স্মরণ করেছেন। আমার চাচাতো বোন ফারজানাও পাকিস্তান থেকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
এহতেশাম-মুস্তাফিজ পরিবারের সঙ্গে খান জয়নুলের ছেলে, মাস্টার শাকিল, মতিন রহমান, গবেষক সোহাগ, অনুপম হায়াৎ, শেখ নিয়ামত আলীর মেয়ে, ডালিয়া কোরেশি এবং আহমেদ তেপান্তর। ছবি: মীর শামসুল আলম বাবু।
জীবন থেকে নেয়া সিনেমাসহ জহির রায়হানের প্রায় সকল সিনেমার কুশলী ক্যামেরাম্যান হিসেবে কাজ করা আফজাল চৌধুরীর পক্ষে তার নাতি সম্মাননা গ্রহণ করেন। মুঠোফোনে মিসেস আফজাল ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসককে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। পাশাপাশি আরো যারা বরেণ্য রয়েছেন তাদেরকেও স্মরণ করার অনুরোধ জানিয়েছেন।
খান জয়নুলের পক্ষে তার ছোট ছেলে রাসেল আহমেদ খান আপ্লুত কণ্ঠে বলেন, বাবা নেই আজ অনেক বছর। তার মুখটাও মনে পড়ে না। তবে আজ অনুষ্ঠানে এসে ভালো লেগেছে এ কারণে যে অনেক গুণীর সঙ্গে আমার বাবাকেও স্মরণ করা হয়েছে। এই মহতী উদ্যোগকে সাধাবাদ জানাই।
অনুষ্ঠানে এদিন সিনেমা শিল্পে ৫ জন বরেণ্য সাংবাদিককে সম্মাননা দেওয়অ হয়। এরা হলেন, চিন্ময় মুৎসুদ্দী, রফিকুজ্জামান, মাহমুদা চৌধুরী, অনুপম হায়াৎ এবং আবদুর রহমান।
এছাড়াও ঢাকার লায়ন, মধুমিতা এবং আজাদ সিনেমা হলকেও ধন্যবাদ সম্মাননা দেওয়া হয়।
পাশাপাশি মোহাম্মদ রফিক উজ্জামান, মনিরুজ্জামান মনির, মাস্টার শাকিল, সুজাতা, সুচন্দা, মতিন রহমান, দেলোয়ার জাহান ঝন্টু, সাইদুর রহমান সাঈদ, শেখ সাদী খান, খুরশিদ আলম, আওকাত হোসেন, আবিদা সুলতানাসহ ২৬ জনকে সম্মাননা দেওয়া হয়।
তবে আলমগীর, উজ্জল, শবনম, সোহেল রানা এবং শাবনাজ-নাঈম জুটিকে একাধিকবার আমন্ত্রন জানানো হলেও শেষপর্যন্ত তারা অনুরোধ রক্ষা করেননি।
বরেণ্য সম্মাননা গ্রহণ করছেন বিখ্যাত চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক দেলোয়ার জাহান ঝন্টু। ছবি আসাদুজ্জামান আসাদ
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন সেই পরিবর্তনের বিষয়টি সামনে এনে বলেন, নির্মাতাদের দর্শকদের রুচি ও সময়ের পরিবর্তন বিবেচনায় রেখে সিনেমা নির্মাণ করতে হবে।
তবে দর্শকের রুচির পরিবর্তনকে শুধু চলচ্চিত্রের জন্য হুমকি হিসেবে দেখলে হবে না। বরং এটিকে নতুন সম্ভাবনা হিসেবেও দেখার সুযোগ রয়েছে। ভালো গল্প, শক্তিশালী নির্মাণ, অভিনয়ের গভীরতা এবং সময়োপযোগী উপস্থাপনা থাকলে দর্শক এখনো সিনেমার প্রতি আগ্রহী—এমনটাই মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তাই প্রেক্ষাগৃহে দর্শক ফেরাতে যেমন মানসম্মত সিনেমা দরকার, তেমনি দরকার সিনেমা হলগুলোর পরিবেশ উন্নয়ন ও শিল্পীদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
জহির উদ্দিন স্বপন চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত শিল্পী ও কলাকুশলীদের জীবিকা ও পেশাগত নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন। তাঁদের ভবিষ্যৎ শুধু তাঁদের নিজেদের ওপর ছেড়ে না দিয়ে সরকারের প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও নীতিগত সহায়তা থাকা দরকার বলেও তিনি মত দেন। কারণ একটি শক্তিশালী চলচ্চিত্র শিল্প গড়ে উঠতে শুধু পরিচালক কিংবা অভিনেতা নন, এর সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেকটি মানুষই গুরুত্বপূর্ণ।
উৎসবের সভাপতির বক্তব্যে ডিএসসিসির প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম চলচ্চিত্রের সঙ্গে ঢাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গভীর সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের মতো গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় চলচ্চিত্রে উঠে এসেছে। একটি জাতির অগ্রগতির জন্য তার ভাষা, সাহিত্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে ধারণ করা জরুরি এমন বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি চলচ্চিত্রের সাংস্কৃতিক গুরুত্বও স্মরণ করিয়ে দেন।
সম্মাননা গ্রহণ করছেন দুই বরেণ্য সাংবাদিক রফিকুজ্জামান এবং গবেষক অনুপম হায়াৎ। ছবি: আসাদুজ্জামান আসাদ।
মরণোত্তর সম্মাননার তালিকাটিও সমৃদ্ধ। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের পথিকৃৎ ও কিংবদন্তি নির্মাতাদের মধ্যে আবদুল জব্বার খান, নাজির আহমেদ, খান আতাউর রহমান, জহির রায়হান, এহতেশাম, মুস্তাফিজ, আমজাদ হোসেন, সুভাষ দত্ত, দিলীপ বিশ্বাস ও চাষী নজরুল ইসলামকে সম্মান জানানো হচ্ছে। অভিনেতাদের মধ্যে আবদুল মতিন, খলিল উল্লাহ খান, নায়করাজ রাজ্জাক, রোজী আফসারী, খান জয়নুল, প্রবীর মিত্র ও বুলবুল আহমেদের অবদানও স্মরণ করা হচ্ছে।
বাবা আব্দুল জব্বার খানের পক্ষে এসেছিলেন নওশের হায়াত খানসহ তিন সন্তান।
সম্মাননা প্রদানের পাশাপাশি উৎসবের মূল আকর্ষণ পুরোনো দিনের উল্লেখযোগ্য সিনেমাগুলোর প্রদর্শনী। উদ্বোধনী দিনে দর্শক দেখেছেন বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’। ২৩ আগস্ট প্রদর্শিত হচ্ছে ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ ও ‘১৩ নং ফেকু ওস্তাগার লেন’। ২৪ আগস্ট থাকছে জহির রায়হানের কালজয়ী ‘জীবন থেকে নেয়া’ ও ‘নান্টু ঘটক’। ২৫ আগস্ট দর্শক দেখতে পারবেন ‘অশিক্ষিত’ ও ‘রংবাজ’।
উৎসবের পরের দিনগুলোতেও থাকছে বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যবাহী সিনেমা। ‘সবুজ সাথী’, ‘নাচের পুতুল’, ‘দূরদেশ’, ‘দহন’, ‘দোস্ত দুশমন’ ও ‘বধূ বিদায়’ প্রদর্শিত হবে নির্ধারিত সময়ে। এ আয়োজনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের দর্শকের সামনে পুরোনো দিনের সিনেমার গল্প, নির্মাণশৈলী ও শিল্পীদের কাজ তুলে ধরারও সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সম্মাননা গ্রহণ করছেন বিখ্যাত চলচ্চিত্র সাংবাদিক ও লেখক চিন্ময় মুৎসুদ্দী। ছবি : আসাদুজ্জামান আসাদ।
সব মিলিয়ে ‘হৃদয়ে ঢাকা ৪১৬’ কেবল একটি চলচ্চিত্র উৎসব নয়; এটি যেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অতীত গৌরবকে স্মরণ করে ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাওয়ার একটি আহ্বান। যে চলচ্চিত্র একসময় মানুষের আনন্দ-বেদনা, স্বপ্ন-সংগ্রাম ও ইতিহাসের কথা বলেছে, সেই চলচ্চিত্রকে আবারও মানুষের কাছে ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন রয়েছে। আর সেই প্রত্যাবর্তনের প্রথম শর্ত ভালো সিনেমা, দ্বিতীয় শর্ত দর্শকের আস্থা এবং তৃতীয় শর্ত প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা। মধুমিতা সিনেমা হলে পুরোনো সিনেমা দেখতে দর্শকের উপস্থিতি তাই কেবল একটি উৎসবের সাফল্য নয়; এটি চলচ্চিত্রের প্রতি মানুষের ভালোবাসারও প্রমাণ। এই ভালোবাসাকে কাজে লাগিয়ে যদি নির্মাণ, প্রদর্শন ও পৃষ্ঠপোষকতার জায়গাগুলোতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া যায়, তাহলে হয়তো ঢাকাই চলচ্চিত্রের আকাশে আবারও ফিরবে সেই কাঙ্ক্ষিত সুদিন।