
ভারতের কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকার একটি হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৯ জন নিহত হয়েছেন। আগুনের ঘটনায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া বাংলাদেশি নাগরিকরা জানিয়েছেন, ধোঁয়ায় পুরো হোটেল অন্ধকার হয়ে যাওয়ায় একপর্যায়ে তাঁদের মনে হয়েছিল, আর বাঁচা সম্ভব হবে না।
মঙ্গলবার গভীর রাতে মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি ভবনে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ওই ভবনের চারতলায় অবস্থান করছিলেন বাংলাদেশের ঢাকার বাসিন্দা মহম্মদ আসাফুল জামাল ও তাঁর ভাই। ব্যবসায়িক কাজে কলকাতায় গিয়ে শনিবার থেকে তাঁরা ওই হোটেলে অবস্থান করছিলেন।
আসাফুল জামাল জানান, রাত ২টা বাজতে তখনও কিছুটা সময় বাকি। তাঁরা ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাৎ চিৎকার-চেঁচামেচিতে ঘুম ভেঙে যায়। জানালা খুলে নিচে তাকিয়ে দেখতে পান, লোকজন চিৎকার করে বলছেন—আগুন লেগেছে।
ভাইকে নিয়ে দ্রুত বের হওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে ঘরে ঢুকে পড়ে ঘন ধোঁয়া। নিচে নামার কোনো উপায় না থাকায় শেষ পর্যন্ত ধোঁয়ার মধ্য দিয়েই অন্যদের সঙ্গে ছাদে উঠে যান তাঁরা।
আসাফুল বলেন, ‘কোনোভাবে ধোঁয়ার মধ্যে দিয়ে ওই তলার সবাই ছাদে উঠি। প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন ছিলাম। সবাই পানির ট্যাঙ্কের কাছে গিয়ে অবস্থান নিই। বুঝতে পারছিলাম না, কোন দিক থেকে আগুন আসতে পারে। আগুনের শিখা দেখলেই ট্যাঙ্কের পানি দিয়ে নেভানোর চেষ্টা করব—এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।’
একই হোটেলে ছিলেন ঢাকার আরেক বাসিন্দা মহম্মদ নাজমুল সরকার। হৃদ্রোগের চিকিৎসার জন্য কলকাতায় গিয়েছিলেন তিনি। আগুনের সময় চারতলায় অবস্থান করছিলেন নাজমুল।
ভয়াবহ সেই অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘একটা সময় মনে হয়েছিল, মরেই যাব। অক্সিজেনের অভাব ছিল। শ্বাস নিতে পারছিলাম না।’
নাজমুল জানান, আগুন লাগার পর হোটেলের কর্মীরা তাঁদের উপরে উঠে যেতে বলছিলেন। কিন্তু উপরে যাওয়ার সিঁড়িটি ছিল অত্যন্ত সরু। একজনের বেশি একসঙ্গে ওঠার সুযোগ ছিল না। লোহার সিঁড়ি দিয়ে মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে কোনোভাবে ছাদে পৌঁছান তিনি।
তিনি বলেন, ‘নিচে নামার কোনো পরিস্থিতি ছিল না। ধোঁয়ায় চারপাশ ঢেকে গিয়েছিল। এক হাত দূরের কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। গেট খোলার সঙ্গে সঙ্গে ধোঁয়া ঘরে ঢুকে পড়ে। চারপাশ অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল।’
অগ্নিকাণ্ডের পর হোটেলকর্মীদের ভূমিকা নিয়েও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন আবাসিক। তাঁদের অভিযোগ, আগুন লাগার পরও হোটেলের কর্মীদের মধ্যে যথেষ্ট তৎপরতা দেখা যায়নি। এমনকি হোটেলে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রও ছিল না বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।
বাংলাদেশ থেকে সন্তানসহ সপরিবারে কলকাতায় গিয়ে ভবনটির প্রথম তলার অন্য একটি হোটেলে উঠেছিলেন কৌসর হোসেন। তিনি জানান, প্রথমে তাঁরা আগুন লাগার বিষয়টি বুঝতেই পারেননি। ঘুমের মধ্যেই হোটেলের কর্মীরা দরজায় ধাক্কা দিয়ে তাঁদের জাগিয়ে তোলেন। পরে হুড়োহুড়ি করে হোটেল থেকে বেরিয়ে আসেন তাঁরা।
তবে বাইরে বের হওয়ার পর কৌসর হোসেনের মনে পড়ে, তাঁদের পাসপোর্ট হোটেলের ঘরেই রয়ে গেছে। পরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আবারও হোটেলের ভেতরে ঢুকে পাসপোর্ট নিয়ে বেরিয়ে আসেন তিনি।
অগ্নিকাণ্ডে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৯ জনে দাঁড়িয়েছে। ভয়াবহ এই ঘটনায় আহত ও আতঙ্কগ্রস্তদের উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আগুনের কারণ ও হোটেলের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
আজকালের খবর/এমকে