কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার কালারমারছড়া থেকে শাপলাপুর পর্যন্ত ৪ দশমিক ৬৬ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক পাকাকরণের কাজ বন বিভাগের আপত্তিতে স্থবির হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের বহুদিনের প্রত্যাশিত এ সড়কটি নির্মাণে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) অর্থায়নে প্রায় ২২ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও সংরক্ষিত বন আইনের বিষয়টি সামনে এনে কাজে বাধা দিয়েছে বন বিভাগ। ফলে উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণকে ঘিরে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, কালারমারছড়া ও শাপলাপুর ইউনিয়নের মধ্যে যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম এই সড়ক। প্রতিদিন হাজারো মানুষ এ পথে চলাচল করেন। সড়কটি পাকাকরণ হলে অন্তত অর্ধলক্ষাধিক মানুষ সরাসরি এর সুফল ভোগ করবেন।
এলজিইডির উদ্যোগে দক্ষিণ চট্টগ্রাম আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রকল্প (SCRDP)-এর আওতায় জে.এম. ঘাট-কালারমারছড়া সংযোগ সড়কটি পাকাকরণের কাজ শুরু হয়েছিল। তবে বন বিভাগের দাবি, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরে এ ধরনের উন্নয়নকাজের জন্য তাদের অনুমোদন নেওয়া হয়নি।
বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ ফরিদ বন বিভাগকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়ে একটি ডিও লেটার দেন। কিন্তু লিখিত জবাবে বন বিভাগ জানিয়ে দেয়, প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন ছাড়া সংরক্ষিত বনভূমির ভেতরে কোনো পাকা সড়ক নির্মাণের সুযোগ নেই।
জেমঘাট-কালারমারছড়া সড়কের চরম দুর্দশার চিত্র তুলে ধরে পূর্ব ফকিরজুম পাড়ার ৮৩ বছর বয়সী মোহাম্মদ নবী বলেন, গত ৭০ বছর ধরে ব্যবহৃত এই আঞ্চলিক পথটি পর্যাপ্ত বরাদ্দের অভাবে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাস্তার দুই পাশ ভেঙে যাওয়ায় এখন যানবাহন চলাচল তো দূরের কথা, হেঁটে চলাচল করাও কষ্টকর হয়ে পড়েছে।
তিনি জানান, স্থানীয় ৪-৫ হাজার পরিবারসহ মাতারবাড়ি, ধলঘাটা, বদরখালী ও শাপলাপুর এলাকার হাজারো মানুষের যোগাযোগের একমাত্র ভরসা এই সড়ক। সম্প্রতি তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে খারাপ রাস্তার কারণে গাড়ি পাওয়া যায়নি। পরে প্রতিবেশীরা তাকে কোলে করে হাসপাতালে নিয়ে যান। অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যাওয়া এই প্রবীণ বাসিন্দা দ্রুত সড়কটি পাকাকরণ চান।
একই এলাকার ৭০ বছর বয়সী প্রবীণ বাসিন্দা বদন আলী বলেন, প্রায় একশো বছরের পুরোনো একটি সড়কের সংস্কারকাজকে 'পাহাড় কেটে নতুন রাস্তা নির্মাণ' হিসেবে আখ্যা দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। বহুদিনের অবহেলার পর সরকার যখন সড়কটি উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়েছে, তখন প্রশাসনিক জটিলতায় কাজ আটকে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। তিনি দ্রুত এ জটিলতার সমাধান করে নির্মাণকাজ শেষ করার আহ্বান জানান।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মহেশখালীর শাপলাপুর ইউনিয়নের জে.এম. ঘাট থেকে কালারমারছড়া পর্যন্ত সড়কের কিছু অংশে এলজিইডি নির্মাণকাজ শুরু করেছিল। তবে বন বিভাগের বাধার মুখে কাজ বন্ধ করে দেয় সংস্থাটি। ইতোমধ্যে সড়কের কিছু অংশে কংক্রিট ঢালাই এবং কয়েকটি কালভার্ট নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, সড়কটি পাকাকরণ হলে শাপলাপুর, কালারমারছড়া এবং আশপাশের কয়েকটি এলাকার মানুষের যাতায়াতে আমূল পরিবর্তন আসবে। শিক্ষা, চিকিৎসাসেবা ও কৃষিপণ্য পরিবহনে বড় ধরনের সুবিধা সৃষ্টি হবে।
শাপলাপুরের বাসিন্দা মো. নুরুল আলম বলেন, বর্ষাকালে এই রাস্তা দিয়ে চলাচল অত্যন্ত কষ্টকর। রোগী হাসপাতালে নেওয়া, শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে যাওয়া কিংবা কৃষিপণ্য বাজারে পৌঁছাতে ভোগান্তি পোহাতে হয়। রাস্তা পাকা হলে হাজারো মানুষ উপকৃত হবেন।
কালারমারছড়ার বাসিন্দা ছৈয়দুল করিম বলেন, সড়কটি নির্মাণ হলে জনদুর্ভোগ অনেক কমে যাবে। বিশেষ করে নারী, শিশু, বয়স্ক মানুষ ও গর্ভবতী নারীরা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন। বর্তমানে সরকারের দুটি বিভাগের মতপার্থক্যের কারণে কাজ বন্ধ রয়েছে। দ্রুত এ সমস্যার সমাধান হওয়া প্রয়োজন।
এদিকে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে নির্মাণকাজ বন্ধ এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবিতে গত ২ জুলাই বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) বন বিভাগ, এলজিইডিসহ সরকারের ৯টি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে চিঠি দিয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়, মহেশখালী বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি বনসমৃদ্ধ দ্বীপ এবং উপজেলার ১২ নম্বর পাহাড় মৌজা দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ সংরক্ষিত বনাঞ্চল।
বেলার তথ্যমতে, তৎকালীন কৃষি ও ত্রাণ অধিদপ্তরের গেজেট নোটিফিকেশন নং-২৫২৯ অনুযায়ী ১৯৫৪ সালে ১৮ হাজার ২৮৬ দশমিক ৪০ একর ভূমি ১০০ বছরের জন্য বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে ১৯৫৭ সালে গেজেট নোটিফিকেশন নং-১২২২-এর মাধ্যমে এলাকাটিকে সংরক্ষিত বন ঘোষণা করা হয়। বর্তমানে আরএস ও বিএস রেকর্ড অনুযায়ী পুরো বনভূমি বন বিভাগের নামে খতিয়ানভুক্ত।
চিঠিতে আরও বলা হয়, সংরক্ষিত এ বনাঞ্চলে হরিণ, বানর, অজগরসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী এবং অসংখ্য প্রজাতির পাখির আবাসস্থল রয়েছে। সম্প্রতি এলজিইডি বনাঞ্চলের ভেতরে একটি পুরোনো কালভার্ট ভাঙার কাজ শুরু করেছে, যদিও এ কাজে বন বিভাগের কোনো অনুমোদন নেওয়া হয়নি।
বন বিভাগের মতে, সড়কটি কংক্রিটে ঢালাই করা হলে বিপুলসংখ্যক গাছপালা নিধন, পাহাড় কাটা, বনভূমিতে অনুপ্রবেশ এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পাশাপাশি গাছ ও বন্যপ্রাণী পাচার এবং অবৈধ দখলের ঝুঁকিও বেড়ে যাবে।
স্থানীয় সমাজকর্মী এএম হোবাইব সজীব বলেন, এ সড়কটি দুই ইউনিয়নের প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষের দাবি। এটি শত বছরের পুরোনো একটি সড়ক। কালারমারছড়া ও শাপলাপুরের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে দুর্ভোগ নিয়ে চলাচল করছেন। জাইকার অর্থায়ন ও এলজিইডির সহযোগিতায় নেওয়া প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা জরুরি।
মহেশখালী উন্নয়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ফরিদুল আলম দেওয়ান বলেন, বান্দরবানের লামা ও আলীকদমসহ পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড় কেটে বা পাহাড়ের বুক চিরে শত শত পাকা সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। এসব সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি জনপদ গড়ে তোলা এবং মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তিনি বলেন, মহেশখালীর পাহাড়গুলোর অধিকাংশই ন্যাড়া; সেখানে ঘন বন বা প্রাচীন বৃক্ষরাজি নেই। তাই পরিকল্পিতভাবে একটি সড়ক নির্মাণ করা হলে পরিবেশের বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা কম। বরং দীর্ঘদিনের যোগাযোগ সংকট দূর করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশে এই সড়ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং দ্বীপবাসীর জীবনমান উন্নয়নে তা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) মহেশখালী শাখার সাধারণ সম্পাদক আবু বক্কর সিদ্দীক বলেন, তারা কোনোভাবেই উন্নয়নবিরোধী নন এবং এটি বহু পুরোনো একটি চলাচলের পথ। তবে যথাযথ পরিবেশগত মূল্যায়ন ও পরিকল্পনা ছাড়া সড়কটি সরাসরি পাকাকরণ করা হলে ভবিষ্যতে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে এলাকায় নির্বিচারে পাহাড় কাটার প্রবণতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে অপরিকল্পিতভাবে বাজার, বসতি ও বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে ওঠার আশঙ্কাও রয়েছে। এতে দীর্ঘমেয়াদে মহেশখালীর প্রাকৃতিক পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় বাস্তুসংস্থানের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।
মহেশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুস সুলতান বলেন, জনস্বার্থে সড়কটি প্রয়োজন। অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে অনেক সময় পুলিশিং কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হয়। সড়কটি নির্মিত হলে কালারমারছড়া থেকে শাপলাপুরে খুব অল্প সময়েই যাতায়াত সম্ভব হবে। এতে ওই এলাকার সার্বিক উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত হবে।
এলজিইডি মহেশখালী উপজেলা প্রকৌশলী বনি আমিন জনি বলেন, এটি এলজিইডির গেজেটভুক্ত সড়ক। স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সড়কটি পাকাকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বন বিভাগের আপত্তির কারণে কাজ বন্ধ রয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
তিনি বলেন, সড়কটি নির্মাণ হলে শাপলাপুর, কালারমারছড়া ও আশপাশের কয়েকটি এলাকার মানুষের যাতায়াত সহজ হবে। শিক্ষা, চিকিৎসাসেবা এবং কৃষিপণ্য পরিবহনে বড় ধরনের সুবিধা মিলবে।
চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এম এ হাসান বলেন, সংরক্ষিত বনের ভেতরে মানুষের চলাচলের জন্য আগের পথ থাকতে পারে, কিন্তু সেটিকে পাকা সড়কে রূপান্তরের সুযোগ আইন দেয় না। এতে বনভূমিতে অনুপ্রবেশ বাড়বে, গাছপালা ও বন্যপ্রাণী হুমকির মুখে পড়বে।
তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে এলজিইডিকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। কাজ বন্ধ না হলে বন আইনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংরক্ষিত বনে কোনো উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করতে হলে সরকারপ্রধানের অনুমোদন প্রয়োজন।
কালারমারছড়া থেকে শাপলাপুর সংযোগ সড়ক নির্মাণ কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন হাইকোর্ট। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) দায়ের করা এক রিট আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে বৃহস্পতিবার (০৬ আগস্ট) বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মো. আসিফ হাসানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেন। আদালত আগামী দুই মাসের জন্য এই নির্মাণ কাজের ওপর স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
আজকালের খবর/ এমকে