খাদ্য বস্ত্র বাসস্থান। এই তিনটি হলো মানুষের মৌলিক চাহিদা। এর মধ্যে বাস স্থানের গুরুত্ব অপরিসীম। সব মানুষ সাধ্যের মধ্যে নিজের একটি আবাস গড়তে চায়। এই চাওয়াটা সবার জন্য সহজ নয়। তবে আবাসন কোম্পানিগুলো অনেকের জন্যই আবাসনকে নাগালের মধ্যে এনে দিয়েছে।
নানাবিধ কারণে আবাসন ক্রমেই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে হলে এই খাতকে ঝুঁকি মুক্ত করতে হবে। এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত শত শত সহযোগী শিল্প। এসব শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে আবাসন খাতের সুরক্ষা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
‘আবাসন খাত বাঁচলে বাঁচবে অন্য শিল্প’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, রিয়েল এস্টেট বা আবাসন খাত কেবল কংক্রিটের কোনো অবকাঠামো তৈরি বা একক কোনো ব্যবসা নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতির বহু খাতের মূল চালিকাশক্তি।
সম্প্রতি এ খাতের বর্তমান পরিস্থিতি, ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ এবং এর বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা জোরালো হয়েছে। অর্থনীতিবিদ ও খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার এবং উৎপাদনমুখী শিল্পগুলোর চাকা সচল রাখতে আবাসন খাতের অবদান অপরিসীম।
লিংকেজ ইন্ডাস্ট্রি বা সহযোগী খাতের ওপর প্রভাব: রিয়েল এস্টেট খাতের সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছে প্রায় আড়াইশ'র বেশি সহযোগী ও উপ-শিল্প। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
নির্মাণসামগ্রী: রড, সিমেন্ট, ইট, পাথর, বালি এবং সিরামিক বা টাইলস শিল্প।
সাজসজ্জা ও ফিনিশিং: পেইন্টস বা রঙ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, গ্লাস ও অ্যালুমিনিয়াম শিল্প।ইলেকট্রিক্যাল ও স্যানিটারি: বৈদ্যুতিক তার, সুইচ-সকেট, লাইটিং, পাইপ ও স্যানিটারি ফিটিংস।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবাসন খাতে কোনো কারণে মন্দা দেখা দিলে বা ফ্ল্যাট-অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি কমে গেলে এর নেতিবাচক প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে পড়তে শুরু করে এই সহযোগী শিল্পগুলোতে। ফলস্বরূপ, কলকারখানার উৎপাদন কমে যায়, যা সামগ্রিক শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধিতে স্থবিরতা ডেকে আনতে পারে।
কর্মসংস্থান এবং জিডিপিতে অবদান
কৃষি খাতের পর দেশের অন্যতম বৃহৎ শ্রমবাজার হিসেবে কাজ করে নির্মাণ ও আবাসন খাত। প্রকৌশলী, স্থপতি, প্রজেক্ট ম্যানেজার থেকে শুরু করে রাজমিস্ত্রি, রডমিস্ত্রি, ইলেকট্রিশিয়ান এবং হাজার হাজার সাধারণ শ্রমিকের রুটি-রুজি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই খাতের ওপর নির্ভরশীল।
এই খাত থমকে গেলে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে, যা সামাজিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সংকট উত্তরণে সুনির্দিষ্ট কিছু প্রত্যাশা:
বর্তমান বাজার পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে এবং খাতের টেকসই উন্নয়নে ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা তুলে ধরেছেন—
নীতিগত সহায়তা: দীর্ঘমেয়াদী ও ব্যবসাবান্ধব নীতি প্রণয়ন করা, যাতে বিনিয়োগকারীরা স্বস্তিতে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন।
সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা: ক্রেতা এবং ডেভেলপার উভয় পক্ষের জন্যই সহজ শর্তে এবং কম সুদে গৃহঋণ (Home Loan) বা তহবিল নিশ্চিত করা।
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (PPP): আবাসন খাতে সরকারি ও বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগ আরও জোরদার করা।
নির্মাণসামগ্রীর দাম নিয়ন্ত্রণ: রড, সিমেন্টসহ মূল নির্মাণসামগ্রীর ঊর্ধ্বগতি রোধে কার্যকর বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা।
সংশ্লিষ্টদের জোরালো প্রত্যাশা, সরকার ও নীতিনির্ধারক মহল বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে আবাসন খাতের প্রসারে সময়োপযোগী ও ব্যবসাবান্ধব পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। কারণ, একটি চাঙ্গা আবাসন খাত কেবল ফ্ল্যাট বা ভবনই তৈরি করে না, এটি পুরো জাতির অর্থনৈতিক ভিত্তিকে আরও মজবুত ও গতিশীল করে তোলে।