চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের যুক্তরাষ্ট্র সফরকে ঘিরে নজিরবিহীন আয়োজন করছে হোয়াইট হাউস। চলতি সপ্তাহে ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করবেন শি জিনপিং।
বৈঠকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বাণিজ্য, শুল্ক, তাইওয়ানসহ দুই পরাশক্তির সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রায় এক দশক পর যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় সফরে যাচ্ছেন শি জিনপিং। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) অ্যান্ড্রুজ বিমানঘাঁটিতে তাকে ব্যক্তিগতভাবে স্বাগত জানানোর কথা রয়েছে ট্রাম্পের। পরদিন বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে হবে আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা অনুষ্ঠান। এতে সামরিক উড়োজাহাজের মহড়া বা ‘ফ্লাইওভার’ এবং প্রায় ৫০০ সামরিক সদস্য অংশ নেবেন।
শি জিনপিংয়ের এই সফর শুধু দীর্ঘদিন পর যুক্তরাষ্ট্রে তার রাষ্ট্রীয় সফরই নয়, ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর এটি হবে দুই নেতার তৃতীয় বৈঠক। শুক্রবার সফর শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
উচ্চপর্যায়ের এই সফরের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে গত বছর হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য সমঝোতার মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়টিও সামনে থাকবে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ায় ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের বৈঠকের সময় ওই সমঝোতা হয়েছিল।
চুক্তির আওতায় ওয়াশিংটন চীনা পণ্যের ওপর প্রস্তাবিত বড় ধরনের শুল্ক বৃদ্ধি স্থগিত করেছিল। বিনিময়ে বেইজিং উৎপাদনশিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিরল খনিজ বা ‘রেয়ার আর্থ’ রফতানিতে বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল করেছিল।
চুক্তিটির মেয়াদ নভেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। ফলে শি জিনপিংয়ের সফরের সময় এর মেয়াদ বাড়ানো বা নতুন কোনও সমঝোতার ঘোষণা আসে কি না, তা বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন বিশ্লেষকেরা।
তবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কর্মকর্তাদের মধ্যে বাণিজ্য আলোচনা হলেও তাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি বলে বিবিসিকে জানিয়েছেন একাধিক সূত্র।
হোয়াইট হাউসের অবস্থান সম্পর্কে অবহিত সূত্রগুলো জানিয়েছে, আলোচনায় শুল্কের বাইরে অন্যান্য বাণিজ্যিক বিষয় এবং কৃষিপণ্য রফতানির ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো গুরুত্ব পেয়েছে। শি জিনপিং ওয়াশিংটনে পৌঁছানোর পর বুধবারও দুই দেশের আলোচকরা বৈঠক চালিয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে।
ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে সমালোচনা করে আসছেন। সর্বশেষ মার্কিন সেনসাস ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ৯১ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
অন্যদিকে, গত বছরের বাণিজ্য সমঝোতার পরও যুক্তরাষ্ট্রে চীনের রেয়ার আর্থ রফতানি কমে গেছে। ফলে বিরল খনিজের সরবরাহ এবং বাণিজ্য সম্পর্কের ভারসাম্য দুই নেতার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
এশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের ফেলো ডেভিড স্যাকস জিনপিংকে ঘিরে ট্রাম্প প্রশাসনের পরিকল্পিত অভ্যর্থনাকে ‘সত্যিই নজিরবিহীন’ বলে বর্ণনা করেছেন।
তিনি বলেন, অ্যান্ড্রুজ বিমানঘাঁটিতে গিয়ে ট্রাম্পের শি জিনপিংকে স্বাগত জানানো এবং তার সম্মানে সামরিক উড়োজাহাজের ফ্লাইওভার আয়োজন করা- এ ধরনের আয়োজন সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের কোনও মিত্রকেও দেওয়া হয় না। চীনের মতো কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বীর ক্ষেত্রে এমন আয়োজন আরও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সফরজুড়ে থাকবে নানা আনুষ্ঠানিকতা ও জাঁকজমক। বিলাসবহুল নৈশভোজ, ব্যক্তিগত পরিদর্শন এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মতো আয়োজনও রাখা হয়েছে।
ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের আলোচনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইও গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেতে পারে। বুশ চায়না ফাউন্ডেশনের ডেভিড ফায়ারস্টেইনের মতে, শি জিনপিংয়ের সফরের আগে বিষয়টি দ্রুত দুই দেশের আলোচনার শীর্ষ অগ্রাধিকারের দিকে উঠে এসেছে।
এআই প্রযুক্তির বিকাশে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বর্তমানে তীব্র প্রতিযোগিতায় রয়েছে। এই প্রতিযোগিতাকে অনেকে ‘এআই অস্ত্র প্রতিযোগিতা’ হিসেবেও বর্ণনা করছেন।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে এআই প্রযুক্তি ঘিরে বেশ কয়েকটি উচ্চপ্রচারিত নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনার পর প্রযুক্তিটির বিকাশ নিয়ন্ত্রণ এবং এর গতি কমানোর জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়ছে।
মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স চলতি সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, মানবজাতির স্বার্থে ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের এখনই একটি চুক্তি করা উচিত, যাতে এআইয়ের উন্নয়ন সাময়িকভাবে থামানো এবং ‘সুপারইন্টেলিজেন্স’ নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া যায়।
ট্রাম্পের সাবেক হোয়াইট হাউস উপদেষ্টা স্টিভ ব্যানন এবং কংগ্রেসের কয়েকজন রিপাবলিকান সদস্যও এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন।
তবে ট্রাম্প এআইকে মার্কিন অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে দেখেন। তাই এর উন্নয়ন ধীর করার ব্যাপারে তিনি এখন পর্যন্ত অনাগ্রহী। চীনের সঙ্গে এআই প্রতিযোগিতায় জয়কে তিনি অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করেন। ট্রাম্পের ভাষায়, “যে এআইয়ে জিতবে, সে-ই জিতবে।”
ফায়ারস্টেইনের ধারণা, ট্রাম্প ও জিনপিং এআই ক্ষেত্রে সহযোগিতার সম্ভাব্য উপায় নিয়েও আলোচনা করতে পারেন।
রবিবার মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট চীনের উপপ্রধানমন্ত্রী হে লিফেংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে তিনি জানান, বাণিজ্য ও এআই নিয়ে তাদের আলোচনা ‘খুবই সফল’ হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের দীর্ঘদিনের স্পর্শকাতর বিষয় তাইওয়ানও দুই নেতার আলোচনায় থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তাইওয়ানের জন্য কয়েক বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির একটি প্রস্তাব মার্কিন কংগ্রেস অনুমোদন করেছে। এখন এতে ট্রাম্পের স্বাক্ষর প্রয়োজন। তবে চীনের সঙ্গে দর-কষাকষিতে এটিকে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাওয়ায় ট্রাম্প আপাতত অনুমোদন আটকে রেখেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্বশাসিত তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে দাবি করে চীন। বেইজিং দ্বীপটির সঙ্গে ‘পুনর্মিলনের’ কথা বলে আসছে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনাও নাকচ করেনি।
ডেভিড ফায়ারস্টেইনের মতে, শি জিনপিং সম্ভবত চাইবেন ট্রাম্প তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রির সিদ্ধান্ত আরও পিছিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিন অথবা কোনওভাবে ওই বিক্রি এড়িয়ে যান।
ট্রাম্পের মতো জিনপিংও নিজ দেশে অর্থনৈতিক চাপের মুখে রয়েছেন। ফলে যুক্তরাষ্ট্র-চীনের বাণিজ্য আরও গভীর করার বিষয়টি আলোচনায় আনতে এই সফরকে কাজে লাগাতে পারেন চীনা প্রেসিডেন্ট।
তবে এ ক্ষেত্রে ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জও রয়েছে। তার প্রশাসনের কিছু সদস্য এবং সমর্থকদের মধ্যে চীনকে ঘিরে গভীর সন্দেহ রয়েছে।
মার্কিন পরিবহনমন্ত্রী শন ডাফি সেপ্টেম্বরে গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ফোর্ডকে একটি চিঠি দেন। জাতীয় নিরাপত্তা এবং মার্কিন কর্মসংস্থান সুরক্ষার কারণ দেখিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠানটিকে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার আহ্বান জানান।
ফলে নতুন কোনও যুক্তরাষ্ট্র-চীন চুক্তি বা সমঝোতায় পৌঁছানোর পথে এখনও বেশ কিছু বাধা রয়েছে। তবু ট্রাম্প মনে করেন, শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সরাসরি ব্যক্তিগত যোগাযোগ এ প্রক্রিয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ন্যাশনাল কমিটি অন ইউএস-চায়না রিলেশনসের প্রেসিডেন্ট স্টিফেন অরলিনস বলেন, ট্রাম্প সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে কোনওভাবেই সংঘাতমুখী রাখা উচিত নয়। তার মতে, ট্রাম্প বিশ্বাস করেন, তিনি ও শি জিনপিং যত বেশি বৈঠক করবেন, দুই দেশের সম্পর্ক তত কম সংঘাতপূর্ণ হবে। সূত্র: বিবিসি
আজকালের খবর/বিএস