
বর্তমান সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ‘বোকার বাক্স’ নামে পরিচিত বাংলাদেশ টেলিভিশনকে (বিটিভি) দর্শকপ্রিয় করতে সব রকম পরিকল্পনা নেওয়া হবে এমন কথা বহুবার বলেছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। তেমন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বেসরকারি টেলিভিশনে টক শো উপস্থাপনাখ্যাত ব্যক্তিত্বকে বিটিভির মহাপরিচালক নিয়োগ দিয়েছে। তিনি বিটিভির পর্দাকে বদলে দেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন। প্রাথমিকভাবে ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে সকলেই বাহবাও দেন। তবে প্রথম উদ্যোগেই বিটিভির ঐতিহ্যবাহী লোগো পরিবর্তনের চিন্তা প্রকাশ্যে আনেন। সরকারের ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে পরামর্শ বা নির্দেশনা ছাড়াই তিনি এ পরিকল্পনা করেন। ফলে বোদ্ধা ও বিটিভির দর্শকের সমালোচনার তীর আসে মহাপরিচালকের দিকে। একপর্যায় বিটিভির মহাপরিচালক হিসেবে প্রভূত ক্ষমতা খর্ব করে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সূত্র এমনটাই জানিয়েছে। এতে করে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত মহাপরিচালকের ‘উচ্চাকাঙ্খী’ ক্ষমতার রাশ টেনে ধরলো সরকার।
জানা গেছে, সম্প্রতি তথ্য মন্ত্রণালয়ের জারিকৃত এক চিঠি জারি করে আর সেখানেই উঠে আসে ক্ষমতা খর্বের বিষয়টি। যদিও লোগোকাণ্ডের কথা সেখা উল্লেখ নেই। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র জানিয়েছে, “একক ক্ষমতায় বিটিভির ঐতিহাসিক লোগোটির পরিবর্তন আনতে মহাপরিচালক হিসেবে তার উদ্যোগটিকে ‘অতি উৎসাহী’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। ইস্যুটি জাতীয় আকাঙ্খার প্রতীক, পরিবর্তনের চিন্তা অনভিপ্রেত।”
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে একাধিক গণমাধ্যম এ নিয়ে প্রতিবেদনও করেছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়- একজন সহকারী সচিবের স্বাক্ষরে বিটিভির ডিজির উদ্দেশ্যে লেখা এই চিঠি। চিঠিতে যেসব বিষয়ে মহাপরিচালককে ‘আবশ্যিকভাবে’ মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমোদন গ্রহণের বাধ্যবাধকতা জারি করা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে; সোশ্যাল মিডিয়া, অনলাইন বা যে কোনও মাধ্যমে জনসচেতনাতমূলক বার্তা বা কনটেন্ট প্রচার, জনবল ব্যবস্থাপনা, পদ সৃষ্টি, নিয়োগ, পদায়ন, বদলি, নীতিগত পরিবর্তন, বিধি সংশোধন, বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা, প্রান্তিক অনুষ্ঠানসূচি, বার্ষিক বাজেট প্রণয়ন, ক্রয়/বিনিয়োগ, রাজস্বখাত ও উন্নয়ন খাতের প্রকল্পের আওতাধীন সম্প্রচার যন্ত্রপাতি (স্টুডিও/ প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম, ট্রান্সমিটার, ওভি ভ্যান) ক্রয় ইত্যাদি।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় থেকে ২০২০ সালে জারিকৃত এক আদেশে বিটিভির মহাপরিচালককে সুনির্দিষ্টভাবে যে ১৭টি বিষয়ে এখতিয়ার দেয়া হয়েছিল, নতুন এই চিঠির মাধ্যমে সেসব এখতিয়ারেরও বেশিরভাগ খর্ব করা হয়েছে। যা অতীতে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিটিভি’র মহাপরিচালককে এ ধরণের চিঠি দেয়া হয়নি। এর ফলে মহাপরিচালকের পদটি প্রায় ক্ষমতাহীন ও কর্তৃত্বহীন হয়ে গেছে।
মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি জারি করা নিয়ে এক পক্ষের দাবি, সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত মহাপরিচালকের নেওয়া পূর্বানুমোদন ছাড়াই লোগো পরিবর্তনের চেষ্টাকে সরকারের উর্ধ্বতনরা ভালো চোখে দেখেননি; কারণ তার এমন সিদ্ধান্তে সরকার সমালোচনার মুখে পড়েছে, আর যে কারণে তার ক্ষমতা খর্ব করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
এদিকে বিটিভির সাবেক কর্মকর্তারা প্রায় সবাই গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে- লোগো পরিবর্তনকে অযৌক্তিক ও অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করছেন। তাদের মতে, বিটিভির লোগোর ঐতিহাসিক ভিত্তি আছে এবং দেশবরেণ্য শিল্পী ও টিভি ব্যক্তিত্ব মুস্তাফা মনোয়ারের পরিকল্পনা ও নকশায় সচল লোগোটির যেকোনো ধরনের পরিবর্তন কাম্য নয়। বিটিভির সাবেক পরিচালক শিল্পী আনোয়ার হোসেনের ভাষ্য—এমন সহজ, সুন্দর ও অর্থবোধক লোগো আর হয় না।
বিটিভির শিল্পনির্দেশনা শাখার সাবেক পরিচালক বয়োজ্যেষ্ঠ চিত্রশিল্পী আবদুল মান্নান বলেছেন, বিটিভির লোগো পরিবর্তন কোনো কাজের কথা নয়। কর্তৃপক্ষকে তিনি অনুষ্ঠান ও সংবাদ পরিবেশনে পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়েছেন।
সাবেক দুজন উপমহাপরিচালক খ. ম হারূন ও ফরিদুর রহমান গণমাধ্যমে তাদের প্রতিক্রিয়ায় লোগো পরিবর্তনের উদ্যোগকে অপ্রয়োজনীয় ও ইতিহাসের ধারাবাহিকতাবিরোধী বলে আখ্যায়িত করেছেন।
নাট্যকার, তথ্যচিত্র নির্মাতা, চিত্রগ্রাহক ও স্থপতি শাকুর মজিদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার প্রতিক্রিয়ায় লেখেন- ‘লোগো বদলানোর চিন্তাটা প্রথম অবিবেচনাপ্রসূত একটা চিন্তা। বিটিভিকে দর্শকবান্ধব করুক আগে। লোগো না বদলিয়েই বিটিভির খাইসলত বদলানো যাবে।’
বিটিভির সাবেক মুখ্য শিল্পনির্দেশক একুশে পদকপ্রাপ্ত অভিনেতা কেরামত মওলা বলেছেন, লোগো বদলাতে হবে না। আপনারা অর্থাৎ বিটিভি কর্তৃপক্ষ অনুষ্ঠানের মান বাড়ান, বৈচিত্র্য আনেন, সংবাদ পরিবেশনায় নিরপেক্ষতা দেখান, এতে বিটিভির দর্শক ক্রমান্বয়ে বাড়বে।
অপরদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিটিভির চলতি দায়িত্বে থাকা একাধিক কর্মকর্তা লোগো বদলানোর চিন্তাকে অবিবেচনা প্রসূত মন্তব্য করে তারা দ্রুত ঢাকা কেন্দ্রে সরকারের আস্থাভাজন জেনারেল ম্যানেজার নিয়োগের পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি অনুষ্ঠানের মানের দিকে নজর দেওয়া, শিল্পীদের বকেয়া পরিশোধ এবং সংসদ ও অনুষ্ঠান টিভিকে আলাদা করারও পরামর্শ দিয়েছেন।
আজকালের খবর/আতে