গ্রামীণ হাট-বাজারের অবকাঠামো উন্নয়ন ও স্থানীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করতে বগুড়ায় সরকারি খাস জমিতে বহুতল বিপণি ভবন নির্মাণ করছে সরকার। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও ক্ষুদ্র-মাঝারি ব্যবসার প্রসারে জেলার শাজাহানপুর, দুপচাঁচিয়া ও কাহালু উপজেলায় ছয়টি বিপণি ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রায় ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এসব ভবনের নির্মাণকাজ এখন শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, শাজাহানপুর উপজেলার আড়িয়া ইউনিয়নের জামুন্না হাট, দুপচাঁচিয়া উপজেলার গুনাহার ইউনিয়নের তালুচহাট ও সদর ইউনিয়নের ধাপের হাট এবং কাহালু পৌর হাট-বাজার, মালঞ্চা ইউনিয়নের মালঞ্চা হাট ও দুর্গাপুর ইউনিয়নের দুর্গাপুর হাটে এসব বিপণি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে বা নির্মাণকাজ চলছে। দুইতলা ভবনগুলোর নিচতলা উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। দ্বিতীয় তলায় পৃথক কক্ষবিশিষ্ট দোকান নির্মাণ করা হচ্ছে।
এরই মধ্যে কাহালু উপজেলার দুর্গাপুর হাটের বিপণি ভবন উদ্বোধন করা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের কাছে ভবনটি হস্তান্তরের পর দোকান বরাদ্দের প্রক্রিয়া চলছে। আগামী অক্টোবরের মধ্যে অন্য বিপণি ভবনগুলোও হস্তান্তরের লক্ষ্যে কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। নির্মাণকাজের অগ্রগতি বাড়াতে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল কর্মকর্তারা নিয়মিত পরিদর্শন করছেন। পাশাপাশি অনিয়ম ঠেকাতেও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
প্রকল্প সূত্র জানায়, গ্রামীণ হাট-বাজারগুলো স্থানীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। এসব বাজার একদিকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করতে দেশব্যাপী গ্রামীণ বাজার অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের (প্রথম সংশোধিত) আওতায় বহুতল বিপণি ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে।
বগুড়ায় নির্মিত এসব বিপণি ভবনের নিচতলায় মাছ, মাংস, মুরগিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উন্মুক্ত বাজার থাকবে। দ্বিতীয় তলায় পৃথক কক্ষবিশিষ্ট দোকানে হার্ডওয়্যার, কসমেটিকস, গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রির সুযোগ তৈরি হবে। এতে হাট-বাজারকেন্দ্রিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রসারের পাশাপাশি নতুন উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
জামুন্না হাটে ১৬ দোকান
শাজাহানপুর উপজেলা প্রকৌশলী মো. রাশেদ ইমরান জানান, আড়িয়া ইউনিয়নের জামুন্না হাটে দুইতলা বিপণি ভবনের নিচতলা উন্মুক্ত রাখা হয়েছে এবং দ্বিতীয় তলায় ১৬টি দোকানঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এতে ব্যয় হচ্ছে ২ কোটি ৪২ লাখ টাকা। আগামী অক্টোবরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার আশা করা হচ্ছে। ভবনটি উপজেলা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তরের পর জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে দোকান বরাদ্দ দেওয়া হবে।
দুপচাঁচিয়ায় দুটি মার্কেট
দুপচাঁচিয়া উপজেলা প্রকৌশলী আবু তালিম হোসেন জানান, গুনাহার ইউনিয়নের তালুচহাটে দুইতলা ভবনে মোট ২২টি দোকানঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে নিচতলার দুই পাশে চারটি ঘর রয়েছে। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
এ ছাড়া সদর ইউনিয়নের ধাপের হাটে ৩ কোটি ১৩ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত বিপণি ভবনের নিচতলা উন্মুক্ত রাখা হয়েছে এবং ওপরের তলায় পৃথক কক্ষবিশিষ্ট দোকান রয়েছে। নির্মাণকাজ শেষে ভবনটি হস্তান্তর ও উদ্বোধনের প্রক্রিয়া চলছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সভাপতিত্বে বরাদ্দ কমিটির সভার মাধ্যমে দোকান বরাদ্দ দেওয়া হবে।
কাহালুতে তিন বিপণি ভবন
কাহালু উপজেলা প্রকৌশলী মুক্তার হোসেন খান জানান, দুর্গাপুর হাটের বিপণি ভবন সম্প্রতি হস্তান্তর করা হয়েছে। ২ কোটি ৯৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত দুইতলা ভবনটির নিচতলা উন্মুক্ত এবং দ্বিতীয় তলায় ১৫টি দোকান রয়েছে।
তিনি জানান, কাহালু পৌর হাট-বাজারে ১ কোটি ৯২ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন বিপণি ভবনে ১৪টি দোকানঘর থাকবে। অন্যদিকে মালঞ্চা হাটে ২ কোটি ২৮ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে বিপণি ভবন। সেখানেও নিচতলা উন্মুক্ত রেখে দ্বিতীয় তলায় ১৪টি দোকানঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এসব কাজও শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
অনিয়ম ঠেকাতে নজরদারি
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) বগুড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদুজ্জামান জানান, দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। উন্নয়নকাজে দায়িত্বে অবহেলা ও অনিয়ম ঠেকাতে কড়া নজরদারি করা হচ্ছে। প্রকল্পের অগ্রগতি দেখতে কর্মকর্তারা নিয়মিত মাঠপর্যায়ে পরিদর্শন করছেন। তিন উপজেলার হাট-বাজারে নির্মাণাধীন বিপণি ভবনগুলোর কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দোকান বরাদ্দ
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হাট-বাজার (স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা) আইন ও বিধিমালার আওতায় বিপণি ভবনের দোকানঘর নির্ধারিত শ্রেণি অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া হবে। আবেদনকারীর সংখ্যা বেশি হলে প্রয়োজনে লটারির মাধ্যমে দোকান বরাদ্দ করা হবে। প্রাথমিকভাবে পাঁচ বছর মেয়াদে নির্ধারিত সালামি ও মাসিক ভাড়ার ভিত্তিতে অস্থায়ী বরাদ্দ দেওয়া হবে।
বিপণি ভবন নির্মাণের ফলে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত এবং আগে সংশ্লিষ্ট হাট-বাজারে ব্যবসা পরিচালনাকারী ব্যবসায়ী ও খুচরা বিক্রেতাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দোকান বরাদ্দ দেওয়া হবে।
বরাদ্দের ক্ষেত্রে ৪ শতাংশ দোকান মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধার পোষ্য বা জুলাই যোদ্ধাদের জন্য, ১ শতাংশ নারী উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ীর জন্য, ১ শতাংশ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য এবং ১ শতাংশ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য সংরক্ষিত থাকবে। এ ছাড়া ৮ শতাংশ দোকান জেলা প্রশাসক কর্তৃক মনোনীত শিল্প, সাহিত্য, সংগীত, সমাজসেবা, শিক্ষা, ক্রীড়া বা অন্য কোনো বিশেষ ক্ষেত্রে অবদান রাখা ব্যক্তি কিংবা তাঁদের পরিবারের সদস্যদের জন্য রাখা হবে। অবশিষ্ট ৮৫ শতাংশ দোকানের জন্য সাধারণ জনগণ আবেদন করতে পারবেন।
গেজেট অনুযায়ী, বরাদ্দের নির্ধারিত মেয়াদ শেষে প্রতি তিন বছর পর তদারকি ও ব্যবস্থাপনা কমিটি দোকানঘরের মাসিক ভাড়ার হার পুনর্নির্ধারণ করতে পারবে। বরাদ্দপ্রাপ্তরা দোকানের মালিকানা পাবেন না। খাস জমিতে নির্মিত এসব বিপণি ভবনের মালিকানা সরকারের থাকবে এবং জেলা প্রশাসকের ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হবে। বৃহত্তর জনস্বার্থে কর্তৃপক্ষ যেকোনো সময় বরাদ্দ বাতিল করতে পারবে।
এ ছাড়া বিপণি ভবনে আইনশৃঙ্খলা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ভবনের নকশায় অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, সুপেয় পানির ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ, নারী কর্নার, পার্কিং, নামাজের স্থান এবং নারী-পুরুষের জন্য পৃথক পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার, টয়লেট ও ইউরিনালের ব্যবস্থা রাখার বিধান রয়েছে।
আজকালের খবর/এমকে