সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’-তে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানের বিষয়ে তড়িঘড়ি না করে দেশের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিভিন্ন নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞ।
সোমবার (৩১ আগস্ট) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বিডিবিএল ভবনে ‘ভয়েস ফর রিফর্ম’-এর উদ্যোগে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এ কথা বলেন।
‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান: কৌশলগত নিরাপত্তার হিসাব-নিকাশ’ শীর্ষক এ বৈঠকে চুক্তিতে যোগ দেওয়ার সম্ভাব্য সুবিধা ও ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা হয়।
ভয়েস ফর রিফর্ম-এর সহ-সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন ও বৈঠক সঞ্চালনা করেন।
তিনি বলেন, মক্কা চুক্তি নিয়ে আলোচনা এতদিন রাজনৈতিক, আমলাতান্ত্রিক ও কূটনৈতিক বৃত্তে সীমাবদ্ধ ছিল। জাতীয় নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নাগরিক সমাজের মতামতও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হওয়া উচিত।
প্রবন্ধে বলা হয়, গত ৭ আগস্ট স্বাক্ষরিত চুক্তির কেন্দ্রীয় ধারা অনুযায়ী, কোনো এক সদস্যদেশের ওপর সশস্ত্র আক্রমণকে সব সদস্যের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে। তবে চুক্তির কমান্ড কাঠামো, সৈন্য বা সামরিক সহায়তার পরিমাণ, পারস্পরিক পরামর্শের প্রক্রিয়া এবং নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তির পদ্ধতি এখনও প্রকাশ করা হয়নি।
এছাড়া ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের পরিস্থিতিতে কোনো সদস্যদেশের দায়িত্ব কী হবে, প্রকাশিত দলিলে সে বিষয়েও স্পষ্ট কিছু বলা নেই।
সম্প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিষয়টি ‘ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে’ বলে মন্তব্য করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রবন্ধে বলা হয়, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে চুক্তির শর্তাবলি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য জানা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংবিধানের ৬৩ ও ১৪৫(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী চুক্তিটি জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলা হয়।
আলোচনায় কয়েকজন বক্তা বলেন, বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রের নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী না হওয়ায় মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি একটি বড় নিরাপত্তা কবচ হতে পারে। তবে অন্যরা সতর্ক করে বলেন, চুক্তিতে যোগ দেওয়ার ফলে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন ধরনের নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সম্ভাব্য সব দিক গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর অনুষ্ঠানে বলেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশ অংশ নিলে এশিয়ার পরাশক্তি চীনের আগ্রহ ও সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র দপ্তর এ বিষয়ে এখনও পরিষ্কার অবস্থান না নিলেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তিটিকে স্বাগত জানিয়েছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ফজলে এলাহী আকবর বলেন, বাংলাদেশকে মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হলে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র—দুই পরাশক্তিরই সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ও ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের সাবেক উপ-প্রধান জন এফ. ড্যানিলোউইজ বলেন, এখন পর্যন্ত মক্কা জোটের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ইতিবাচক। তবে মিসর, জর্ডানসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ এ জোটে যোগ দেবে কি না, তা আরও কিছু বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে।
তিনি বলেন, তুরস্ক ও ইসরায়েল বর্তমানে পরস্পরবিরোধী অবস্থানে থাকায় ইসরায়েল জোটটির সম্প্রসারণ ও অতিরিক্ত ক্ষমতায়নের বিষয়ে সতর্ক থাকবে।
ড্যানিলোউইজ আরও বলেন, ন্যাটোর মতো জোটেও একটি দেশ আক্রান্ত হলে অন্য সদস্যরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামরিকভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা খুবই কম। ফলে বাংলাদেশ মক্কা জোটে যোগ দিলেও ভবিষ্যতে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে বাংলাদেশের জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা খুব কম।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. দিলারা চৌধুরীর সভাপতিত্বে বৈঠকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শাহাব এনাম খান, এফএসডিএস-এর প্রিন্সিপাল রিসার্চ ফেলো ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাফায়াত আহমেদ, নেক্সাস ডিফেন্স অ্যান্ড জাস্টিসের সভাপতি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাসান নাসির, সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী, জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন, দৈনিক ওয়া’দার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ফয়সাল মাহমুদ, মানবাধিকারকর্মী রুবি আহমতুল্লাহ এবং ভয়েস ফর রিফর্ম-এর সৈয়দ হাসিব উদ্দিন হোসেন উপস্থিত ছিলেন।
আজকালের খবর/ এমকে