বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্যের দাম আবার বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইরান ও ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এল নিনোর প্রভাব। এতে খাদ্য উৎপাদন খরচ বাড়ছে এবং ফসলের ফলন কমে যাচ্ছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রধান অর্থনীতিবিদ এই সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
২০২২ সালে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ ছিল খাদ্যপণ্যের চড়া দাম। তবে চলতি বছর এখন পর্যন্ত এই বাজার তুলনামূলকভাবে শান্ত রয়েছে। এমনকি জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতি কিছু জায়গায় খাদ্যপণ্যের কম দামের কারণে সহনীয় থেকেছে। তবে এই স্বস্তি সম্ভবত সাময়িক। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সারের সরবরাহ কমে গেছে এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ডিজেলের সংকট দেখা দিয়েছে। এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চরম আবহাওয়ার প্রভাব। কিছু সময়ের ব্যবধানে এই সংকটের প্রভাব ভোক্তা পর্যায়ের দামেও পড়বে।
এফএও’র প্রধান অর্থনীতিবিদ মাক্সিমো টোরেরো রয়টার্সকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমি আশা করছি, পণ্যের দাম এখন থেকেই আরও দ্রুত বাড়তে শুরু করবে। বছরের শেষ নাগাদ খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করবে এবং আগামী বছর তা আরও বাড়বে।’ তাঁর মতে, ‘পণ্যের দাম থেকে চূড়ান্ত ভোক্তা পর্যায়ে দামের এই প্রভাব পড়তে সাধারণত তিন থেকে ছয় মাস সময় লাগে।’
গম, ভুট্টা ও চালসহ কিছু পণ্যের দাম সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাড়লেও এখনো এসব দামে গত বছরের ভালো ফলনের প্রভাবই বেশি দেখা যাচ্ছে। আগামী বছর যে সংকট আসতে চলেছে, তা এই দামে এখনো প্রতিফলিত হয়নি। টোরেরো বলেন, ‘হরমুজ প্রণালির সমস্যা কৃষিপণ্য উৎপাদনের সব উপকরণকেই প্রভাবিত করে। কারণ, ব্রেন্ট তেল পাম্পিং, প্যাকেজিং, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিবহনে ব্যবহৃত হয়। আর প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহৃত হয় সার উৎপাদনে।’ এদিকে, রাশিয়ার তেল ও গ্যাস অবকাঠামোয় ইউক্রেনের হামলার কারণে ডিজেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের রপ্তানি বাজার ছোট হয়ে আসছে।
পণ্যের দাম বৈশ্বিক হওয়ায় এর প্রভাব সবখানেই পড়ছে। ধনী দেশগুলো তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে থাকলেও কৃষকরা চাপে রয়েছেন। টোরেরো বলেন, ‘ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল ও এশিয়ায় একই কথা শোনা যাচ্ছে। মুনাফার হার কমে যাওয়ায় ফসল রোপণের সিদ্ধান্তেও প্রভাব পড়ছে।’ এমনকি নিজেদের প্রায় সব উপকরণ নিজেরাই উৎপাদন করা যুক্তরাষ্ট্রেও কৃষকরা বিপাকে পড়েছেন। মার্কিন কৃষি সংগঠন ‘আমেরিকান ফার্ম ব্যুরো ফেডারেশন’ জানিয়েছে, ফেডারেল সহায়তা না পেলে ২০২৭ সালে ৯টি প্রধান ফসল উৎপাদনকারী কৃষকদের ৩২ বিলিয়ন ডলার লোকসান হতে পারে।
ইরান যুদ্ধ শুরুর প্রথম তিন মাসেই বিশ্বজুড়ে গম ও ভুট্টার আবাদ কমে গিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু কৃষক সয়াবিন চাষে ঝুঁকেছেন, কারণ এতে সার কম প্রয়োজন হয়। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক অস্ট্রেলিয়া জানিয়েছে, চলতি শীত মৌসুমে তাদের ফসল উৎপাদন ২১ শতাংশ কমে যেতে পারে। জ্বালানি ও সারের চড়া দাম এবং উপকরণ সরবরাহে অনিশ্চয়তাই এর মূল কারণ। এছাড়া চলতি বছরের এল নিনো বেশ শক্তিশালী হতে পারে, যা বৃষ্টিপাতের ধরন উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে দেবে। এতে কোটি কোটি মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়তে পারে। ভারতে বর্ষা ইতিমধ্যে দেরিতে এসেছে এবং এই মাসে গড়ের চেয়ে কম বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে, যা ধান উৎপাদনে বড় ধাক্কা দিতে পারে।