একসময় আর্থ্রাইটিসকে শুধু বার্ধক্যের রোগ মনে করা হলেও সেই ধারণা এখন বদলে গেছে। চিকিৎসকদের মতে, বর্তমানে তিরিশ-চল্লিশ বছর বয়সীদের মধ্যেও হাড়ের ক্ষয় ও আর্থ্রাইটিসের সমস্যা দ্রুত বাড়ছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, বয়স, বংশগত কারণ বা পুরনো আঘাতের মতো ঝুঁকিগুলো এখনও গুরুত্বপূর্ণ। তবে অতিরিক্ত ওজন হাঁটু, কোমর ও গোড়ালির মতো ওজন বহনকারী সন্ধিস্থলের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, যা তরুণাস্থি (কার্টিলেজ) দ্রুত ক্ষয় করে। এর ফলে হাড়ের সঙ্গে হাড়ের ঘর্ষণ বেড়ে ব্যথা, ফোলাভাব, জোড় শক্ত হয়ে যাওয়া এবং চলাফেরায় সমস্যা দেখা দেয়।
শুধু বাড়তি চাপই নয়, শরীরে জমে থাকা অতিরিক্ত চর্বি প্রদাহ সৃষ্টিকারী 'সাইটোকাইন' নামের রাসায়নিক নিঃসরণ করে। এসব পদার্থ দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ তৈরি করে, যা সন্ধিস্থলের ক্ষয় আরও ত্বরান্বিত করে। এ কারণে হাতের আঙুলের মতো ওজন বহন না করা সন্ধিস্থলেও আর্থ্রাইটিসের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, শিশু, কিশোর ও তরুণদের মধ্যে স্থূলতার হার বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। কৈশোর থেকেই অতিরিক্ত ওজন থাকলে দীর্ঘ সময় ধরে সন্ধিস্থলে চাপ পড়ে। ফলে আগের তুলনায় অনেক কম বয়সেই হাঁটুর ব্যথা ও আর্থ্রাইটিসের লক্ষণ দেখা দিচ্ছে। বর্তমানে অর্থোপেডিক চিকিৎসকদের কাছে ৪০ বছরের কম বয়সী রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে।
আর্থ্রাইটিসের প্রভাব শুধু সন্ধিস্থলের ব্যথায় সীমাবদ্ধ থাকে না। দীর্ঘদিন ব্যথা থাকলে অনেকেই হাঁটা, সিঁড়ি ভাঙা বা শরীরচর্চা কমিয়ে দেন। এতে পেশি দুর্বল হয়ে যায় এবং ব্যথা আরও বেড়ে যায়। ধীরে ধীরে কর্মক্ষমতা, দৈনন্দিন জীবন, ঘুম এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
তবে আশার বিষয় হলো, স্থূলতা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। গবেষণায় দেখা গেছে, শরীরের মোট ওজনের মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ কমাতে পারলেই হাঁটুর ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে, ব্যথা হ্রাস পায় এবং জয়েন্টের কার্যক্ষমতা উন্নত হয়।
অনেকের ধারণা, আর্থ্রাইটিস হলে ব্যায়াম করা উচিত নয়। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, সম্পূর্ণ বিশ্রাম বরং সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। তাই নিয়মিত হাঁটা, সাঁতার, সাইকেল চালানোর মতো কম চাপের ব্যায়াম এবং ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ অনুযায়ী পেশি শক্তিশালী করার অনুশীলন করলে উপকার পাওয়া যায়।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, কয়েক সপ্তাহ ধরে হাঁটুর ব্যথা, সকালে সন্ধিস্থল শক্ত হয়ে থাকা, ফোলাভাব বা সিঁড়ি ভাঙতে অসুবিধার মতো লক্ষণ দেখা দিলে তা অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত হলে চিকিৎসা, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত শরীরচর্চার মাধ্যমে আর্থ্রাইটিসের অগ্রগতি অনেকটাই ধীর করা সম্ভব। তাই আর্থ্রাইটিসকে আর শুধু বয়স্কদের রোগ ভেবে অবহেলা না করে, সুস্থ সন্ধিস্থল রক্ষায় স্থূলতা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।
আজকালের খবর/এমকে