প্রগতিশীল চেতনার অধিকারী মার্কসবাদী চিন্তার ধারক কিশোর কবি ছিলেন সুকান্ত ভট্টাচার্য। নিবারণ ভট্টাচার্য ও সুনীতি দেবীর দ্বিতীয় সন্তান তিনি। স্বল্পায়ু এই তরুণ কবি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, মন্বন্তর, ফ্যাসিবাদ আগ্রাসন ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রভৃতি বিষয় নিয়ে মূলত লিখেছেন। কবিতায় তিনি গণমানুষের আশা-আকাক্সক্ষা ও শোষণহীন নতুন সমাজ গড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।
তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৬ সালের ১৫ আগস্ট, ৪৩, মহিম হালদার স্ট্রিট কালীঘাট, কলকাতা। তার পৈতৃক নিবাস ছিল বর্তমান গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়ার উনশিয়া গ্রাম। বেলেঘাটা দেশবন্ধু স্কুল থেকে ১৯৪৫ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে অকৃতকার্য হন। পরবর্তীতে ছাত্র আন্দোলন ও বামপন্থি রাজনীতিচ্ছতে জড়িয়ে পড়ার কারণে আর পড়াশোনা হয়নি। ছেলেবেলায় মাতৃহারা এই কবি স্নেহমমতায় লালিত-পালিত হয়েছিলেন বন্ধু অরুণাচলের মাতা সরলা বসুর মাতৃস্নেহে। তার স্বল্পায়ু জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছিলেন কলকাতার বেলেঘাটার ৩৪ হর মোহন ঘোষ লেনের বাড়িতে। অল্প বয়সে অসামান্য কবি প্রতিভার কারণে তিনি কিশোর কবি হিসেবে খ্যাত। নিপীড়িত ও সর্বহারা মানুষকে নিয়ে কাব্য রচনার জন্য তিনি গণমানুষের কবি হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। কবিতা রচনায় যার অনুপ্রেরণা সুকান্তের জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছিল তার বড় দিদি রাণু। কবিতা রচনা ছাড়াও সুকান্ত বাংলা সাহিত্যের যেসব ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রেখেছেন- গান, গল্প, নাটক এবং প্রবন্ধ। ‘বিদ্রোহের গান’ কবিতার বলেছেন- ‘দিক থেকে দিকে বিদ্রোহ ছোটে, বসে থাকবার বেলা নেই মোটে, রক্তে রক্তে লাল হয়ে, ওঠে পূর্বকোণ’।
‘ছাড়পত্র’ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ। কবির প্রথম এই কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৯৪৮ সালে। ছাড়পত্র কাব্যগ্রন্থে মোট কবিতার সংখ্যা ৩৮টি। কবি সুকান্তের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থের নাম- ‘ঘুম নেই’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৯৫০ সালে ।
তার ‘ঘুম নেই’ কাব্যগ্রন্থে মোট কবিতার সংখ্যা- ৩৬টি। সুকান্তের তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘পূর্বাভাস’ প্রকাশিত হয়েছিল- ১৯৫০ সালের মাঝামাঝি। সুকান্তের বিখ্যাত ‘হরতাল’ কাব্যগ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬২ সালে। ‘কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি, ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়। পূর্ণিমারচাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’-পঙক্তিটি সুকান্ত ভট্টাচার্যের হে মহাজীবন কবিতা থেকে নেওয়া। কবিতাটি ‘ছাড়পত্র’ কাব্যের কবিতা। লেখকের ছাড়পত্র কাব্যের কবিতাগুলোর মধ্যে রয়েছে- ‘ছাড়পত্র’, ‘আগামী’, ‘রবীন্দ্রনাথের প্রতি’, ‘একটি মোরগের কাহিনী’, ‘দুরাশায় মৃত্যু’, ’ঠিকানা’, ‘লেলিন’, ‘দেশলাই কাঠি’, ‘কৃষকের গান’, প্রভৃতি। ‘ভেজাল’, ‘বিয়ে বাড়ির মজা’, ‘মেয়েদের পদবী’, ‘পুরনো ধাঁধাঁ’, ‘সিপাহী বিদ্রোহ’, কবিতাগুলি সুকান্তের ‘মিঠেকড়া’ কাব্যগ্রন্থের। ’বিক্ষোভ’, ‘১ লা মের কবিতা’, ‘সব্যসাচী’, ‘বিদ্রোহের গান’, ‘অভিবাদন’, ‘আমার এসেছি’, ‘একুশে নভেম্বর’, ‘দিন বদলের পালা’ প্রভৃতি কবিতাগুলোর সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘ঘুম নেই’ কাব্যের। ‘জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তুপ-পিঠে চলে যেতে হবে আমাদের’ পঙক্তিটি তার ‘ছাড়পত্র’ কবিতার । ‘গীতিগুচ্ছ’ সুকান্তের সংগীতবিষয়ক কাব্যগ্রন্থ। তার বিখ্যাত প্রবন্ধের মধ্যে রয়েছে- ছন্দ ও আবৃত্তি, পত্রাবলী, পত্র-গুচ্ছ প্রভৃতি। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের অগ্রন্থিত কবিতার মধ্যে রয়েছে- ‘চৈত্রদিনের গান’, ‘মার্শাল টিটোর প্রতি’, ‘জনযুদ্ধের গান’, ‘বর্ষ-বাণী’, ‘দরদী কিশোর’, ‘দেবদারু গাছে রোদের ঝলক’ প্রভৃতি। বাংলা সাহিত্যের কিশোর কবি অত্যাধিক পরিশ্রমে ম্যালেরিয়া ও দুরারোগ্য ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন মাত্র ২১ বছর বয়সে, ১৯৪৭ সালের ১৩ মে, কলকাতার রেড এড কিওর হোমে।
আজকালের খবর/আরইউ