‘খাদ্য নিরাপত্তা’ খাদ্যের সহজলভ্যতা এবং মানুষের খাদ্য ব্যবহারের অধিকারকে বোঝায়। কোনো বাসাকে তখনই ‘খাদ্য নিরাপদ’ বলে মনে করা হয়, যখন এর বাসিন্দারা ক্ষুধার্ত অবস্থায় বসবাস করেন না কিংবা খাদ্যাভাবে উপবাসের কোনো আশঙ্কা করেন না। এক সময় ছিল দেশে খাদ্যের অভাব। তখন দাবি ছিল, খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হবে। খাদ্য ঘাটতি কমে গেল। এলো পুষ্টিকর খাদ্যের ধারণা, পরে সুষম খাদ্য। আমরা খাদ্যে মোটামুটি স্বয়ংসম্পূর্ণ। খাদ্য নিয়ে নতুন ধারণার সূচনা হলো। তা হলো, ‘নিরাপদ খাদ্য’। এ নিয়ে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ শুরু হয়েছে। সরকার খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ গঠন করেছে। খাদ্য নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করেছে। ‘নিরাপদ খাদ্য’ ধারণা শুধু খাদ্যবাহিত রোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এ ধারণা আরও ব্যাপক হয়েছে। খাদ্য নিরাপদ না হলে শুধু তাৎক্ষণিক অসুস্থতা সৃষ্টি করে না, বরং আরও দীর্ঘমেয়াদি রোগের সৃষ্টি করে। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে অসংক্রামক রোগ। যেমন- ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি সমস্যা, ক্যান্সার ইত্যাদি। যা এখন বাংলাদেশে প্রায় মহামারী রূপে দেখা দিয়েছে। খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, মজুদ নিরাপদ না হলে যে কোনো মানুষ মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হতে পারে। বর্তমান সময়ে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মৃত্যুর ৬১ শতাংশ কারণ অসংক্রামক রোগ। কিন্তু অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধযোগ্য। এ রোগ জীবনযাপনের ধরন, তামাক সেবন এবং খাদ্যের অভ্যাসের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। করোনাভাইরাসে তরুণদের চেয়ে প্রবীণদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে, করোনায় মৃতদের বড় একটা অংশ প্রবীণ। ৪০ বছরের পর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়বে। জীবাণুর স্বাভাবিক ধর্ম অনুযায়ী করোনাভাইরাস তাদেরই সহজে কাবু করে। প্রবীণদের ‘ইম্যুনিটি’ বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক কম। প্রায় প্রত্যেকেই হার্টের সমস্যা, ফুসফুসের অসুখ, ডায়াবেটিস বা কিডনি ইত্যাদি অসংক্রামক রোগে ভোগেন। দেশে এসব রোগ বিস্তৃতিতে খাদ্যে ভেজাল প্রধানতম কারণ।
দেশের বাড়তি খাদ্য উৎপাদনে বড় অর্জন আনতে গিয়ে বেড়েছে রাসায়নিক সারের প্রয়োগ। মাটির ওপর নির্বিচারে রাসায়নিক প্রয়োগের ফলে খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে; কিন্তু খাদ্যের গুণগতমান নষ্ট হচ্ছে। প্রাণবৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে। বাণিজ্যিক কৃষি উৎপাদনের সময় রাসায়নিক ও কীটনাশক দ্রব্য দেওয়ায় বিভিন্ন দূষণ হয়। কোন মাটিতে ‘কী পদ্ধতিতে’ উৎপাদিত হচ্ছে, সেটা বিবেচনা করতে হবে। শস্য উৎপাদনে রাসায়নিক ব্যবহার হচ্ছে, সে পানি পুকুরে ও নদীতে মিশছে। সবটা মিশে বিষ ছড়াচ্ছে।
নোংরা পরিবেশ আর নামিদামি ব্র্যান্ডের পণ্যের লেভেল লাগিয়ে ভেজাল পণ্য বাজারজাত করা হচ্ছে। বাজার, দোকান, সুপারশপ কোথাও ভেজালমুক্ত খাদ্যপণ্য মিলছে না। মাছেও ফরমালিন, দুধেও ফরমালিন। অসময়ে পাকানো এবং দীর্ঘ সময় সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন ফলমূলেও দেওয়া হচ্ছে কার্বাইডসহ মাত্রাতিরিক্ত নানা বিষাক্ত কেমিক্যাল। খাদ্যপণ্যে ভেজাল মেশানোটা রীতিমতো অঘোষিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। ভেজালের বেপরোয়া দাপটের মধ্যে আসল পণ্য খুঁজে পাওয়াই কষ্টকর। এমন জটিল ও সূক্ষ্ম প্রক্রিয়ায় খাদ্যে ভেজাল দেওয়া হয়, যা সাধারণ ক্রেতা বা খুচরা ব্যবসায়ীদের পক্ষে অনুমান বা শনাক্ত করাও খুব কঠিন। খাদ্যে ভেজাল, খাদ্যে বিষক্রিয়ার বিষয়টি নতুন কিছু নয়। সম্প্রতি এর ব্যাপ্তি যে হারে বাড়ছে তাতে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষ। দেশি ও আন্তর্জাতিক সব গবেষণায় দেশে খাবারের বিষক্রিয়ার বিষয়টি বারবার উঠে আসছে। ফুটপাত থেকে শুরু করে অভিজাত হোটেল-রেস্টুরেন্ট বা নামিদামি ব্র্যান্ডের পণ্যও এখন ভেজালমুক্ত নয়। গবেষণা থেকে শুরু করে ভেজালবিরোধী অভিযানে এসব প্রমাণ মিলছে। ক্যান্সার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্যে ভেজালের কারণে বর্তমানে মানবদেহে ক্যান্সারের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে, যা আগে দেখা যেত না। গবেষণায় দেখা গেছে এসব ক্যান্সারের মূল কারণ খাদ্যে ভেজাল মেশানো, প্রিজারভেটিভ ও বিভিন্ন ধরনের রঙের ব্যবহার। একাধিক গবেষণায় খাবারে ভেজালের বিষয়টি উঠে এসেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দূষিত খাবারের কারণে সারা বিশ্বে প্রতি বছর ৬০ কোটি মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছে। মৃত্যু হচ্ছে ৪ লাখ ২০ হাজার জনের। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে- ভারত, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে প্রতিবছর দূষিত খাবার খেয়ে প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ মারা যায়। আর অসুস্থ হয় ১৫ কোটি মানুষ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি ১০ শিশুর তিনজনই ডায়রিয়ায় ভোগে। রোগটি এ অঞ্চলের শিশুমৃত্যুর জন্য দায়ী সবচেয়ে ভয়াবহ রোগগুলোর একটি। ক্ষতিকর ব্যাকটিরিয়া, ভাইরাস, পরজীবী, বিষাক্ত রাসায়নিক উপাদান ইত্যাদির মাধ্যমে খাবার দূষিত হয়। সেই অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে বমি বমি ভাব, ডায়রিয়ার মতো প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া হয়। আর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হিসেবে ক্যান্সার, কিডনি ও যকৃৎ বিকল হয়। মস্তিষ্ক ও স্নায়ুর বিভিন্ন অসুখ হয়। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে বলা হয়েছে, অবিলম্বে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে খাদ্যে ভেজাল, ওষুধে ভেজাল মেশালে বা ভেজাল খাদ্য ও ওষুধ বিক্রি করলে বা বিক্রির জন্য প্রদর্শন করার অপরাধ প্রমাণ হলে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন বা ১৪ বছর কারাদণ্ডের বিধান আছে। এই আইনটিতে শাস্তির নজির কম। ভেজালের বিরুদ্ধে ভোক্তা অধিকার আইন-২০০৯, নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩, ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৫, দণ্ডবিধি ও বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪ রয়েছে। এসব আইনের অধীনেই মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়ে থাকে। নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে বাজারে শৃঙ্খলা বজায় রাখার সদা চেষ্টা করা হয়। এতে কাজও হচ্ছে। তবে এসব আইনকে নিয়ে সমন্বিত একটা সময়োপযোগী আইন করা যেতে পারে। আইনে কর্তৃপক্ষকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন অপরাধের জন্য বিভিন্ন সাজার বিধান রাখা হয়েছে। শুধু বাজার ব্যবস্থা মনিটরিং করে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। উৎপাদনসহ সব বিষয় দেখতে হবে। সব জায়গায় আইন করে বা পাহারা দিয়ে রুখে দেওয়া কখনোই সম্ভব নয়! এটা এমন এক বিষয় যে, নিজে থেকে ব্যবসায়ী-মালিক সচেতন না হলে বন্ধ করা কঠিন। নৈতিকতার জায়গাটায় জাগতে হবে আমাদের! আর সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। ভেজালকারীকে সামাজিক বয়কট করতে হবে! খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধ করার জন্য শুধু সরকারের ওপর নির্ভর না করে সাধারণ জনগণকে সম্পৃক্ত করে ঐক্যবদ্ধ সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। মিডিয়া এবং সুশীল সমাজকে এক্ষেত্রে নেতৃত্ব স্থানীয় ভূমিকা পালন করতে হবে। শুধু আইন প্রণয়ন করেও এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। কারণ অনেক ব্যবসায়ী জানেই না, সে যে ভেজাল মেশাচ্ছে এর প্রতিক্রিয়া কতটা ভয়ংকর। অন্যদিকে ভোক্তারাও যে সব সময় সচেতন তাও কিন্তু নয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখা যায়, বিভিন্ন উৎসবে বা দুর্যোগে খাদ্যের ওপর লভ্যাংশ কমিয়ে ভোক্তাদের জন্য খাদ্য সহজলভ্যতা করা হয়। আর খাদ্যে ভেজাল কি তারা বোঝেন না! আমরা ঠিক উল্টো। বিভিন্ন ধর্মীয়-সামাজিক অনুষ্ঠানের সময় ও দুর্যোগকালীন কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করি। শুধু লাভের হিসাবটাই করেন বেশিরভাগ ব্যবসায়ী। করোনা দুর্যোগেও অনেকে এমন চেষ্টা করেছেন। তবে সরকারের আন্তরিক তৎপরতায় তা পেরে ওঠেননি। এমন মনোভাব থেকে পরিত্রাণ দরকার। ব্যবসায়ীদের বিবেকটা জাগ্রত করতে হবে, মানবিক বোধ জাগ্রত করতে হবে। সর্বোপরি আত্মসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
লেখক: শিক্ষার্থী, বরেন্দ্র কলেজ, রাজশাহী
আজকালেরখবর/টিআর