সোমবার ২৪ আগস্ট ২০২৬
দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে সরকারের তিন ধাপের কৌশল তুলে ধরলেন ড. তিতুমীর
প্রকাশ: সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬, ১১:১৮ এএম   (ভিজিট : ৫)
গভীর সংকট থেকে দেশের অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার, টেকসই প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরিয়ে আনা এবং দ্রুত অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো পুনর্গঠনে তিন ধাপের কৌশল তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

সরকারের সংস্কার ও উন্নয়নের পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামোর আওতায় এই তিন ধাপ হলো রিকভারি বা পুনরুদ্ধার, রেস্টোরেশন বা পুনঃস্থাপন এবং দ্রুত প্রবৃদ্ধির জন্য পুনর্গঠন বা ‘রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাকসিলারেশন’।

বাসস’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিতুমীর বলেন, এই তিন ধাপ পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের মাধ্যমে অর্থনীতিকে স্থিতিশীলতায় ফিরিয়ে এনে টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়া হবে।

প্রথম ধাপ ‘রিকভারি’ বা পুনরুদ্ধারের মূল লক্ষ্য হলো অর্থনীতির হারানো অবস্থান পুনরুদ্ধার এবং সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা।

তিনি বলেন, এ পর্যায়ে সরকারের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার দীর্ঘদিনের জমে থাকা অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করা। এর মধ্যে রয়েছে ঋণের চাপ, দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, তারল্যসংকট, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান কমে যাওয়া এবং অর্থনীতির ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনা।

এ লক্ষ্যে সরকার রাজস্ব ও মুদ্রানীতির মধ্যে সমন্বয় জোরদার, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।

তিতুমীর বলেন, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত রাজস্ব আয় ১২ শতাংশ বেড়েছে। আগের বছরের একই সময়ে এ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ২ শতাংশ। এটিকে রাজস্ব খাতে ইতিবাচক অগ্রগতির একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন তিনি।

সরকার বিদ্যমান করদাতাদের ওপর বাড়তি চাপ না দিয়ে করের আওতা সম্প্রসারণ এবং কর ফাঁকি রোধে কাজ করছে বলেও জানান তিনি।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি, টাকার মূল্যমান শক্তিশালী হওয়া, প্রবাসী আয় বাড়া এবং সুদের হার কমে আসাকেও অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের ইতিবাচক সূচক হিসেবে উল্লেখ করেন অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা।

তিন ধাপের দ্বিতীয় পর্যায় ‘রেস্টোরেশন’ বা পুনঃস্থাপনের লক্ষ্য হলো অর্থনীতিকে শুধু স্থিতিশীল করা নয়, বরং টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়া।

তিতুমীর বলেন, এ পর্যায়ে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।

বিধিনিষেধ ও অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ কমানো এবং প্রস্তাবিত ‘ট্রেস অ্যান্ড ট্র্যাক’ পদ্ধতির মাধ্যমে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশকে একটি প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

তিনি বলেন, উত্তর আমেরিকা, পশ্চিম ইউরোপ, উপসাগরীয় অঞ্চল এবং পূর্ব এশিয়া থেকে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলে এসব বিনিয়োগের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।

সরকার এমন বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দিতে চায়, যা উৎপাদন বাড়াবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং রপ্তানি সক্ষমতা শক্তিশালী করবে। বিপরীতে ঋণনির্ভর ও আমদানিনির্ভর প্রকল্পে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হবে না।

অগ্রাধিকার খাত হিসেবে কৃষি ও কৃষিপণ্য, ইলেকট্রনিকস, ওষুধশিল্প, চামড়াজাত পণ্য এবং হালকা প্রকৌশলকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

পুনঃস্থাপন পর্যায়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সামাজিক উন্নয়নকেও যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, প্রাথমিক শিক্ষায় সংস্কার এবং স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।

তৃতীয় ধাপ ‘রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাকসিলারেশন’ বা দ্রুত প্রবৃদ্ধির জন্য পুনর্গঠনের মূল লক্ষ্য হলো প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার সম্পন্ন করা এবং অর্থনীতির দ্রুত সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয় ভিত্তি তৈরি করা।

তিতুমীর বলেন, পুনরুদ্ধার ও পুনঃস্থাপন পর্যায়ে অর্জিত অগ্রগতিকে টেকসই করতে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর পুনর্গঠন অপরিহার্য।

এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতেও বড় ধরনের রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। কৌশল অনুযায়ী প্রথমে জ্বালানি খাতের তাৎক্ষণিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা হবে। এরপর অর্থনীতির চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সক্ষমতা বাড়ানো হবে।

পরবর্তী পর্যায়ে সৌরবিদ্যুৎ ও নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে জ্বালানি উৎপাদক হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

তিতুমীর বলেন, ‘দেশের মানুষ এখন আর শুধু গ্রাহক নন, তিনি একজন উৎপাদকও।’

তার মতে, এই তিন ধাপকে বিচ্ছিন্ন কোনো উদ্যোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। প্রথমে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা হবে, এরপর উৎপাদন সক্ষমতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার এবং সবশেষে 

দ্রুত অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো পুনর্গঠন করা হবে। 
বর্তমান সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের অতীত অর্থনৈতিক রূপান্তর থেকেও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন তিতুমীর।

তিনি বলেন, সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ের পর বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং প্রবাসী আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনীতিতে যে পরিবর্তন এসেছিল, তা বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। পরবর্তী সময়ে নারীর শিক্ষা ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং তৈরি পোশাক খাতের বিকাশও দেখিয়েছে, কীভাবে কৌশলগত নীতিগত সিদ্ধান্ত কাঠামোগত দুর্বলতাকে অর্থনীতির শক্তিতে রূপান্তর করতে পারে।

বর্তমান কৌশলের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক শক্তিগুলো চিহ্নিত করে বাস্তবভিত্তিক নীতিগত উদ্যোগের মাধ্যমে সেগুলোকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।

সরকারের প্রথম ১৮০ দিনকে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার প্রাথমিক পদচিহ্ন হিসেবে উল্লেখ করে তিতুমীর বলেন, চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো সংকট ব্যবস্থাপনার পর্যায় থেকে বাংলাদেশকে একটি স্থিতিশীল, উৎপাদনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির পথে নিয়ে যাওয়া।

তিনি বলেন, ‘রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাকসিলারেশন’ এই তিন ধাপের কাঠামো মূলত হারানো অবস্থান পুনরুদ্ধার, অর্থনীতির গতি ফিরিয়ে আনা এবং দ্রুত প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি গড়ে তোলার একটি রূপরেখা।

আজকালের খবর/এমকে







আরও খবর


Advertisement
Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor$gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor$gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft