সোমবার ১৭ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশকে কল্যাণমূলক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাই: প্রধানমন্ত্রী
প্রকাশ: রোববার, ১৬ আগস্ট, ২০২৬, ৯:২২ পিএম   (ভিজিট : ৭)
মানুষের সার্বিক জীবনমান উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী জোরদার এবং এক যুগান্তকারী অর্থনৈতিক রূপান্তরের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি পূর্ণাঙ্গ কল্যাণমূলক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। 

আজ রবিবার কিশোরগঞ্জে দিনব্যাপী একাধিক জনসমাবেশ, ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ, সামাজিক অনুদান প্রদান এবং জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই রূপরেখা তুলে ধরেন। সরকারপ্রধান জোর দিয়ে বলেন, জনগণের আস্থা ও সমর্থনের ওপর ভিত্তি করেই বর্তমান প্রশাসন পরিচালিত হচ্ছে এবং দেশ ও সাধারণ মানুষের স্বার্থের বাইরে সরকার কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করবে না। একই সাথে তিনি দেশের শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়ন অভিযাত্রাকে ব্যাহত করার লক্ষ্যে পরিচালিত যেকোনো অপপ্রচার, বিভ্রান্তি ও রাজপথের বিশৃঙ্খলা রুখে দেওয়ার জন্য দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।

 সকালে পাকুন্দিয়া উপজেলার মির্জাপুর চেয়ারম্যান বাড়ি ঘাট এলাকায় পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদে মাছের পোনা অবমুক্তকরণের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তার কিশোরগঞ্জ সফরের কর্মসূচি শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি কটিয়াদী কার্প হ্যাচারি কমপ্লেক্স পরিদর্শন করেন এবং আচমিতা জর্জ ইনস্টিটিউশন মাঠে অনুষ্ঠিত ‘জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬’-এর উদ্বোধন ও পুরস্কার বিতরণী পর্বে অংশ নেন। সফরের শেষভাগে বিকেলে কিশোরগঞ্জ পৌরসভার পুরাতন স্টেডিয়ামে আয়োজিত এক সুবিশাল সুধী সমাবেশে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ের পরিচালনা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও দুস্থদের মাঝে অনুদান বিতরণ কর্মসূচির শুভ উদ্বোধন করেন তিনি। 

কর্মসূচি সমাপান্তে তিনি ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে স্মৃতিস্বরূপ বৃক্ষরোপণ করেন।

পাকুন্দিয়ার মির্জাপুর ও কিশোরগঞ্জ পুরাতন স্টেডিয়ামের জনসভায় সমবেত বিশাল জনসমুদ্রের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বিএনপির রাজনীতির মূল চালিকাশক্তিই হচ্ছে জনগণ। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দেশের মানুষ বিএনপির ওপর যে অকৃত্রিম আস্থা অর্পণ করেছে, তা রক্ষা করতে সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষি ঋণের সুদের বোঝা মওকুফের মতো দৃশ্যমান পদক্ষেপগুলো ইতোমধ্যে বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে। 

অতীতে নির্দিষ্ট কিছু সরকারের সময় বাংলাদেশকে অন্য কোনো দেশের মডেলে রূপান্তর করার যে অপচেষ্টা দেখা গেছে, তার কঠোর সমালোচনা করে তিনি স্পষ্ট জানান, বাংলাদেশ অন্য কোনো দেশের অনুকরণে চলবে না। 

বরং এই ভূখণ্ডকে এমন একটি স্বাবলম্বী ও মর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে, যেখানে প্রতিটি নাগরিক নিজের প্রাপ্ত অধিকার ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা সমানভাবে ভোগ করতে পারবেন। দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকট প্রসঙ্গে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী পূর্ববর্তী শাসনকালের অপরিকল্পিত নীতি ও সিদ্ধান্তের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করেন। 

তিনি অভিযোগ করেন, বিগত আমলের অদূরদর্শী পরিকল্পনা ও দুর্নীতিই আজকের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের মূল কারণ। এই সংকট থেকে জাতিকে স্থায়ীভাবে মুক্ত করতে বর্তমান সরকারের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা রয়েছে জানিয়ে তিনি জানান, আগামী ২৭ আগস্ট থেকে শুরু হতে যাওয়া জাতীয় সংসদের আসন্ন অধিবেশনে আগামী ১০ বছরে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সমস্যা সমাধানের একটি মহাপরিকল্পনা আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হবে। মৎস্য সম্পদের প্রবৃদ্ধি অর্জনে তিনি ঘোষণা করেন যে, পর্যায়ক্রমে সারা দেশের নদী ও প্রাকৃতিক জলাশয়ে মাছের পোনা অবমুক্ত করা হবে, যাতে আমিষের ঘাটতি মেটানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে পুষ্টির সুযোগ পৌঁছে দেওয়া যায়।

রাজনৈতিক অঙ্গনের বর্তমান গতিপ্রকৃতি ও সংস্কার প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী তথাকথিত বিভ্রান্ত সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর উদাত্ত আহ্বান জানান। তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও রাজপথের আন্দোলনে বিএনপির নেতা-কর্মীরাই জেল-জুলুম, গুম ও স্বৈরাচারী শাসনের নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। 

অথচ অতীতে দেশের সংকটকালে এবং বিগত ১৭ বছরের রাজপথের সংগ্রামে যাদের ন্যূনতম উপস্থিতি ছিল না, তারাই আজ নতুন করে সংস্কার ও বড় বড় বুলি আওড়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। প্রধানমন্ত্রী মনে করিয়ে দেন যে, ২০২২ সালেই বিএনপি দেশের সার্বিক প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রস্তাবনা মানুষের সামনে তুলে ধরেছিল। 

এমনকি দেশের ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বেই প্রথম সংস্কারের প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা উপস্থাপিত হয়েছিল। তাই বিভ্রান্তকারীদের রাজনৈতিক ইতিহাস ও অতীতের বিতর্কিত ভূমিকা স্মরণে রেখে জনগণকে সজাগ ও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি।

দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক ভিত শক্তিশালী করার লক্ষ্যে বেশ কিছু বড় প্রকল্পের কথা উম্মোচন করেন সরকারপ্রধান। তিনি জানান, চীন সরকারের সাথে সম্প্রতি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে, যার অধীনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিল্প-কারখানা স্থাপিত হবে এবং দেশের বেকার যুবসমাজের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। 

দেশের কৃষি খাতকে বেগবান করতে এবং প্রাকৃতিক পানির প্রবাহ স্বাভাবিক রাখার লক্ষ্য নিয়ে সরকার ২০ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের বিশাল কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এছাড়াও প্রান্তিক কৃষকদের সুবিধার্থে ইতিপূর্বে অঙ্গীকার অনুযায়ী প্রথম ক্যাবিনেট বৈঠকেই ১৩ লাখ কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ সুদসহ সম্পূর্ণ মওকুফ করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে বলে তিনি জনসভাকে অবহিত করেন। 

চিকিৎসাসেবা ও শিক্ষা খাতের উন্নয়ন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, বিগত স্বৈরাচারী শাসনামলে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রায় ১ লাখ ২৩ হাজার শিক্ষকের আত্মসাৎ হওয়া অবসর ভাতার অর্থ উদ্ধার করে গতকাল থেকে পেনশনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। নারীদের শিক্ষার হার বাড়ানো ও অর্থনৈতিকভাবে আত্মনির্ভরশীল করার উদ্দেশ্যে বেগম খালেদা জিয়ার প্রবর্তিত নিখরচায় শিক্ষা নীতিকে উচ্চতর স্তর পর্যন্ত সম্প্রসারিত করার ঘোষণা দেন তিনি। এখন থেকে দেশের নারী শিক্ষার্থীদের জন্য স্নাতক (অনার্স) শ্রেণি পর্যন্ত সম্পূর্ণ বিনামূল্যে অধ্যয়নের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে এবং মেধাবী ছাত্রীদের জন্য বিশেষ সরকারি বৃত্তির ব্যবস্থা থাকবে। পাশাপাশি সারা দেশের দরিদ্র ১ লাখ ২০ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস ও ব্যাগ বিতরণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। 

স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার হিসেবে আগামী ৫ বছরের মধ্যে দেশের ৫৫৩টি উপজেলার ৫০ শয্যার সরকারি হাসপাতালগুলোকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করা হবে, যাতে সাধারণ মানুষকে চিকিৎসা নিতে জেলা সদরে দৌড়াতে না হয়। ভাষণের চূড়ান্ত পর্বে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশ ও জনগণের উন্নয়ন, অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা এবং সামাজিক অগ্রগতি বজায় রাখার পূর্বশর্ত হলো অভ্যন্তরীণ শান্তি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখা। দেশের মানুষ এখন অস্থিতিশীলতার পরিবর্তে স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন, সন্তানদের শিক্ষা এবং উন্নত স্বাস্হ্যব্যবস্থা প্রত্যাশা করে। একটি মহল রাজপথে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে সাধারণ মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্য ও দৈনন্দিন জীবিকাকে থমকে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। 

এই শ্রেণির বিশৃঙ্খলাকারীদের কঠোর হস্তে প্রতিরোধ করার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, শান্তি ভঙ্গকারীদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। ধৈর্য ধরে দেশ পুনর্গঠনের কাজে সরকারকে সহায়তা করার জন্য তিনি সর্বস্তরের জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানান।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত স্টেডিয়ামের জনসভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম, কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান, কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মাজহারুল ইসলাম এবং কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. জালাল উদ্দিন। 

সভার সমাপনীতে উপস্থিত হাজার হাজার মানুষের করতালি ও অভিনন্দনের জবাবে প্রধানমন্ত্রী একটি শান্তিময় ও কল্যাণমুখী বাংলাদেশ গঠনে দেশবাসীর কাছে দোয়া ও সহযোগিতা কামনা করেন।


আজকালের খবর/ কাওছার আল হাবীব








আরও খবর


Advertisement
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor$gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor$gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft