দেশের উত্তরাঞ্চলে কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পতাকা উত্তোলন করেন বীরমুক্তিযোদ্ধা মরহুম আলহাজ ডা. আব্দুল ওয়াসেক আহমেদ। সমাজসেবক ডা. আব্দুল ওয়াসেক আহমেদ ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষক। তিনি ছিলেন কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী থানার বামনডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, নাগেশ্বরী বণিক সমিতির উপদেষ্টা ও নাগেশ্বরী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। এ ছাড়া দেশবন্ধু গ্রুপের প্রধান উপদেষ্টা, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের উপদেষ্টা, উপজেলা আওয়ামী লীগেরও উপদেষ্টা ছিলেন তিনি। বরেণ্য এই ব্যক্তির সাহিত্যাঙ্গনেও ছিল সরব পদচারণা। তার লিখিত অসংখ্য প্রবন্ধ বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে দেশের বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক গণমাধ্যমে। এ ছাড়া স্থানীয় মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথা নিয়ে তার দুটি বই এ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে সাহায্য করবে।
তার স্মৃতিকথার বই ‘একজন মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতিকথা’য় বীরমুক্তিযোদ্ধা মরহুম আলহাজ ডা. আব্দুল ওয়াসেক আহমেদ লিখেন, ‘২৩ মার্চ নাগেশ্বরী তথা উত্তর ধরলার রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন। দুপুর ১২টা থেকে বিভিন্ন ইউনিয়ন হতে শোভাযাত্রাসহকারে বিভিন্ন ব্যানার ও স্লোগানসহকারে স্বেচ্ছাসেবক ও জনসাধারণ, স্বেচ্ছাসেবক সম্মেলনে যোগদানের উদ্দেশে আসতে থাকেন। বামনডাঙ্গা ইউনিয়ন হতে অনুরূপ একটি শোভাযাত্রা মশাল মিছিলসহ সভায় যোগদানের উদ্দেশে আসতে থাকে। বামনডাঙ্গার নেতৃস্থানীয় কর্মীদের মধ্যে সাইব উদ্দিন ব্যাপারী, ফজলুল হক মুন্সী, নূরুল ইসলাম, মফিজ উদ্দিন, তমিজ উদ্দিন, আজাদ আলী প্রমুখ এবং আরো অনেকে ছিলেন; যাদের সকলের নাম আজ মনে নেই। আমাদের শোভাযাত্রা যখন নাগেশ্বরী পৌঁছে তখন ঈদগাহ ময়দানে আমাদের সঙ্গে তৎকালীন ন্যাপের সুব্রত কুমার ভট্টাচার্য এবং আব্দুল কাদেরসহ আরো অনেকে যোগদান করেন। মিছিলকারীদের সকলের হাতে মশাল, লাঠি, দা-কুড়াল ইত্যাদি ছিল। বঙ্গবন্ধুর ডাকে যার যা আছে তাই নিয়ে জনসাধারণ রাস্তায় নেমেছেন। এইরূপ বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে উদ্বেলিত-উত্তেজিত জনসাধারণ শ্রোতের মতো আসতে থাকেন। ফুটবল মাঠ লোকে ভরে যায়। অতঃপর সভার কাজ শুরু করা হলো। সুব্রত কুমার ভট্টাচার্যের চল্ চল্ চল্, ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল- নজরুল সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে সভা শুরু হয়। আমি সভার সভাপতি। ওই দিনের জনসভায় ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন কর্মীরাও তাদের সংগ্রামী চেতনা ও শক্তি নিয়ে আমাদের পাশে উপস্থিত হন। উপস্থিত ছাত্রলীগ নেতাদের মধ্যে মোজাম্মেল হক প্রধান, সোহরাব হোসেন, নিজাম উদ্দিন, মোজাম্মেল হক সরকার প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। ছাত্রলীগের কর্মীরা ছাড়াও আনসার, মোজাহিদ প্রমুখ সংগঠনের যুবকরাও যোগদান করেন। এই সম্মেলন স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সকলকে মুগ্ধ করে এবং তাদের মানবিক পরিবর্তনে সাহায্য করে। সভায় সুব্রত ভট্টাচার্যের গান ও বক্তাগণের জ্বালাময়ী বক্তৃতা উপস্থিত জনসাধারণকে সুসংগঠিত করতে এবং যেকোনো ত্যাগ স্বীকারে উদ্বুদ্ধ করে। সম্মেলন চলাকালীন ছাত্রলীগ নেতারা আমার কাছে এসে প্রস্তাব রাখেন, পাকিস্তানি পতাকা পুড়ে দিয়ে স্বাধীন বাংলার প্রস্তাবিত পতাকা তোলা হউক। কারণ ওই সভায় আমি সভাপতি ছিলাম। মোজাম্মেল হক প্রধান, সোহরাব হোসেন এবং আব্দুল কাদেরসহ অনেকে আমাকে বার বার বলতে থাকেন। অতঃপর সভা চলাকালীন সকলের জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু ধ্বনির মধ্যে আমি বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করলাম। নাগেশ্বরীর জনসভায় সংক্ষিপ্ত ভাষণ দিয়ে আমি বাইসাইকেলে গঙ্গারহাট রওনা দেই। গঙ্গারহাটের জনসভায় বিকাল ৫ ঘটিকায় পৌঁছে দেখি জনসমুদ্র। অধ্যাপক আব্দুস সোবহান, ডা. সোহরাব উদ্দিন, শিক্ষক আমিন সাহেব প্রমুখ ব্যক্তিগণ আমাকে অভ্যর্থনা জানান। সেখানে গঙ্গাহাটের জনসভাতেও একই দৃশ্যের অবতারণা। সকলের অনুরোধে সেখানেও আমি জাতীয় পতাকা উত্তোলন করলাম। উক্ত সভায় আমি প্রধান হওয়ায় সেদিন প্রায় ৭৫ মিনিট বক্তৃতা প্রদান করি। রাত্রি অধিক হওয়ায় সেদিন আর বাড়ি ফিরতে পারলাম না। গঙ্গাহাটে জনাব ইব্রাহিম কলমদার সাহেবের বাড়িতে রাত্রি যাপন করে পরদিন সকালে একটি কর্মিসভা করে বিকালে বাড়ি ফিরি। ২৫ মার্চ আমরা একটা ঘরোয়া কর্মিসভা করি, দেশের বিরাজমান রাজনৈতিক অবস্থা পর্যালোচনা করার পর আমরা যেকোনো পরিস্থিতির মোকাবিলা করার জন্য দৃঢ়পণ করি। অস্থিরতার মধ্যে দিনটা অতিবাহিত করে অধিক রাত্রিতে আমরা সবাই যার যার বাড়ি ফিরলাম। ২৬ মার্চ সকালবেলার রেডিও শুনে আমরা হতবাক হয়ে পড়লাম। বিভিন্ন সূত্র ও বিদেশি কেন্দ্রের সংবাদে জানতে পারলাম ২৫ তারিখ রাত্রিতে হানাদার পাকবাহিনী রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ঢাকার পিলখানা, ইপিআর হেডকোয়ার্টারসহ নিরস্ত্র জনসাধারণের উপর ট্যাংকসহ আক্রমণ চালিয়েছে। বহু নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করেছে। দুপুরবেলা আমি, শ্যামল, কাসেম, রহমান ডাক্তারসহ কয়েকজন পরামর্শ করার জন্য মজাহার হোসেন চৌধুরী সাহেবের বাড়িতে উপস্থিত হই। সেখানে আমরা রেডিও মারফত ঢাকার সংবাদ শোনার জন্য ব্যগ্রভাবে রেডিওর নব ঘুরাইতেছিলাম। কিন্তু ঢাকা ধরছিল না। বেলা ২টা ৩০ মিনিটের দিকে হঠাৎ চট্টগ্রাম কেন্দ্র থেকে চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ. হান্নান সাহেবের গলা শুনতে পেলাম। অল্প সময়ের মধ্যে তিনি বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণাটি প্রচার করলেন। বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণাটি পাঠ করে শোনালেন। সেখানেই আমরা অন্যান্য আরো কয়েকজন লোকের সাক্ষাৎ পেলাম যাদের নাম আজ আর মনে নেই। যা হোক নানারূপ জল্পনা-কল্পনা ও তর্ক-বিতর্কের মধ্যে বাকি দিনটা কেটে রাত হয়ে গেল। এরপর আমরা রাত্রিতে ঢাকা সেন্টার ধরে পাকজান্তা ইয়াহিয়া খানের ঘোষণা শুনতে পাই। সে ভাষণে তিনি বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার ও তার বিচারের কথা বলেন। তাকে দেশদ্রোহী হিসেবে বিচার করা হবে বলে ঘোষণা করলেন, সংবাদটা আমাদের হতবাক করে দিল। পরদিন পুনরায় আমরা নাগেশ্বরীতে মিলিত হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে উঠে পরলাম এবং রাত্রি ১১টায় বাড়ি ফিরলাম। রাত্রিতে বাড়ি ফিরে কোনো রকম চারটি খেয়ে শুয়ে পরলাম। কিন্তু কিছুতেই ঘুম আসছিল না। বারবার বঙ্গবন্ধুর কথা মনে পড়ছিল। যে লোকটা আমাদের এত স্নেহ করতেন, ভালোবাসতেন তিনি আজ এই সঙ্কট মুহূর্তে আমাদের মাঝে নেই। তাকে ধরে নিয়ে গেছে। তিনি কী অবস্থায় কোথায় আছেন, জানি না। এই অবস্থায় তার সেই জুন মাসের কথা মনে পড়ল, ডাক্তার ইউনিয়নব্যাপী সভা করবে এবং এই সভার টেম্পু ধরে রাখবে। এবং ৭ মার্চের রেসকোর্স ময়দানের বক্তৃতার শেষ অংশ আমি যদি আর হুমক দিবার না পারি, যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করবে। বুঝলাম এটা তিনি আগে থেকেই আন্দাজ করতে পেরেছিলেন। তাই তিনি মাঝে মাঝে এবং ধাপে ধাপে তার বিশ্বস্ত লোকদের কিছু কিছু কথা বলেছেন। আমি উপলব্ধি করলাম তিনি আমার অজ্ঞাতে আমাকে এই অঞ্চলে সংগঠকের দায়িত্ব দিয়ে গেছেন। মনে মনে এসব চিন্তা করতে করতে রাত শেষ হয়ে গেল। সকালে ফজরের নামাজ পড়ে নাস্তা খেয়ে রওনা দিলাম। অর্থাৎ ২৭ তারিখ সকাল ৮টায় নাগেশ্বরী পৌঁছে দেখি সকলেই আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আমরা পরামর্শের জন্য বসে গেলাম। এই সময় কুড়িগ্রাম থেকে সাইফুল আলম (দুলাল) এসে উপস্থিত। তার কাছে কুড়িগ্রামের সংবাদ শুনলাম। সে আমাকে কুড়িগ্রাম যাওয়ার জন্য বলে গেল এবং বলে গেল যে কুড়িগ্রামে বিশেষ কোনো ব্যাপার আছে, সেখানে ভোলা মিয়া এবং আমাদের জেলা প্রেসিডেন্ট আহাম্মদ আলী সরকার, চৌধুরী সাহেব, কাদের বিএসসি, আলতাফ হোসেন (দুলু), আজাদ মাস্টার প্রমুখ ব্যক্তিগণের সঙ্গে কথা বললাম। ভূরুঙ্গামারী থানার অবস্থার জানার জন্য বেলা ১টায় ভূরুঙ্গামারী গেলাম। সেখানে সামছুল চৌধুরী, ফজলা মিয়া, জব্বার মিয়া ও অন্যদের সঙ্গে দেখা করলাম। দেখলাম সবাই বজ্রাহতের মতো কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় আছেন। ওই পথে টগড়াই হাট গেলাম, সেখানে জেলা প্রেসিডেন্ট আহাম্মদ আলী সরকার সাহেবের সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি শুধু আমাকে জানালেন যে, রংপুর মাহিগঞ্জ ইপিআর হেডকোয়ার্টার থেকে কয়েকজন বাঙালি ইপিআর একজন অফিসারসহ বেড়িয়ে এসেছে, তারা তিস্তাপুল পর্যন্ত কুড়িগ্রাম জেলা ডিফেন্স করার পরিকল্পনা করেছে। যাতে করে পাক সেনা তিস্তাপুল পেরিয়ে কুড়িগ্রাম আসতে না পারে। সেখান থেকে ফিরে আবার চৌধুরী সাহেবের বাড়ি গেলাম। দেখি তিনি শান্ত মানুষ কি রকম চুপচাপ বিমূঢ় অবস্থায় বসে আছেন। তার কাছে সন্তোষজনক কোনো পরামর্শ না পেয়ে নাগেশ্বরী রওনা দিলাম। ফিরতি পথে মালভাঙ্গা নামকস্থানে রাস্তায় ছাত্রলীগ নেতা মঞ্জু এবং নানুর সঙ্গে দেখা হলো, তারা আমাকে বললো যে খালি হাতে তো আর পাকসেনাদের সঙ্গে যুদ্ধ করা যাবে না। তাই আমরা একটু বর্ডার পার হয়ে ভারতে যাব। দেখি কী হয়। তাদের এই কথায় আমার মনে একটু চিন্তা ও আশার আলো দেখা দিল। কারণ ইতোমধ্যে বঙ্গবন্ধু আমাকে বলেছেন, প্রয়োজনে আমরা আন্তর্জাতিক সাহায্য পাব, বাংলাদেশে পাক সেনাদের গণহত্যার দরুন উদ্ভূত পরিস্থিতে স্মরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য ভারত তার বর্ডার শিথিল করেছে যাতে করে অত্যাচারিত বাংলাদেশি নাগরিক বিপদে আশ্রয় পায়। রাত্রি ১২টায় বাড়ি ফিরলাম। ফিরে দেখি আমার স্ত্রী এবং বাচ্চারা সবাই উদ্বিগ্নভাবে জেগে আছে।’
প্রসঙ্গত, আলহাজ ডা. আব্দুল ওয়াসেক আহমেদ দেশবন্ধু গ্রুপের চেয়ারম্যান, বিশিষ্ট শিল্পপতি, দৈনিক আজকালের খবর পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি গোলাম মোস্তফা ও দেশবন্ধু গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম রহমানের পিতা। ২০১৫ সালের ২৮ জানুয়ারি ঢাকার বেসরকারি ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। তিনি পাঁচ ছেলে ও তিন মেয়ে, নাতি-নাতনিসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
আজকালের খবর/আরইউ