সোমবার ২৫ মে ২০২৬
শ্বশুর বাড়ি
প্রকাশ: শনিবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৪, ৩:১০ পিএম   (ভিজিট : ৫০৫৯)
আমার শ্বশুর আব্বা আমাকে আমার মামাতো বোনের বিয়েতে দেখে পছন্দ করে। তারপর আমার মামার সাথে কথা বলে আমাদের বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব দেন। আমার অনার্স শেষ। তাই আব্বাও সব দেখে শুনে রাজি হলেন।
দেখাদেখি হল আমাদের দুপক্ষের। আমার স্বামী অনিক খুব ভালো মানুষ। আমাকে কথার মধ্যে এইটু বলেছিল, আমার আব্বা যাই বলবে আমি তাই করব। আব্বার পছন্দই আমার পছন্দ। আমার নিজের আলাদা কোনো পছন্দ নেই।
কথাটা ভালো লেগেছিল। এ যুগের কোনো ছেলে এ কথা কমই বলে। আমি আর কিছু জানতে চাইনি। কারণ বাবা আর বড় ভাই সব খবর নিয়ে দেখেছে।
যাই হোক আমাদের বিয়ে হল বেশ ধুমধাম করে। আমি আমার শশুর বাড়িতে সব মনমতো পেয়েছি। শুধুমাত্র আমার শাশুড়ি একটু রাগী। একটু মানে বেশ রাগী।
মাঝে মাঝে খোঁটা দিয়েও কথা বলে। আমি ছোট বউ এ বাড়িতে। আমার বড় দুই জা আছে। তারা আমার চেয়েও সুন্দরী আর বড়লোকের মেয়ে। যদিও আমার শশুর আব্বা আমাকে পছন্দ করে এনেছে। কিন্তু শাশুড়ির আম্মা পছন্দ হয়নি আমাকে। কারণ উনি ওনার বোনের মেয়েকে অনিকের বউ করে আনতে চেয়েছিলেন। আব্বা রাজি না হওয়াতে তা আর সম্ভব হয়নি।
কিন্তু আমার শ্বশুর আব্বা প্রচণ্ড ভালোবাসতেন আমাকে। অন্য দুই ভাবীর চেয়ে আমি তার প্রিয় বউ ছিলাম। আমাকে ডাকত বউমা বলে। আমার খুব ভালো লাগত। ডাকটার মধ্যে মায়া আছে।
কিন্তু আমার শাশুড়ি কথায় কথায় ভুল ধরত। আর বলত বাবা মা কিছু শেখায়নি? অনিকের কাছে একদিন বলেছিলাম আম্মা এভাবে বলে।
সে বলেছিল, এরপর বললে বলবে আপনিও মা আমার। একটু শিখিয়ে দেন। এখন তো আপনার কাছে আছি দায়িত্ব আপনার। আমি ভুল করলে বা না পারলে আপনার ছেলের কষ্ট হবে। ভেবে দেখেন কী করবেন।
আমি ওর কথা শুনে অনেক হেসেছি। আর ভালো বুদ্ধিও পেয়েছি। মনটাই ভালো হয়ে গিয়েছিল।
যেই কথা সেই কাজ। একদিন আম্মা বিরানি রান্না করতে বলল। ৮-১০ জনের জন্য হলেও পারতাম। ৩০-৩৫ জনের জন্য করতে গেলে পারব কিনা জানি না। পরে আবার কী হয়।
আমি পারব কিনা বললে আম্মা যথারীতি বলল, তোমার মা এটাও শিখায়নি? আমি তখন হেসে অনিকের শেখান কথাগুলো বললাম।
মনে মনে বললাম আল্লাহ বাঁচাও। আজ না কান ধরে বেড়ই করে দেয়। কিন্তু বড় বাঁচা বেঁচে গেলাম। আম্মা একটু নরম হলেন।
বললেন ঠিক আছে আমি দেখিয়ে দিচ্ছি শিখে নেও। আমার কাঁধেই যখন পড়েছ। কী আর করব?
আমি এরপর আর কখনো বকা খাইনি কাজ নিয়ে। না পারলে আম্মা দেখিয়ে দিতেন। অনিকের বুদ্ধি সত্যি কাজে দিয়েছিল। তার মাকে সে আমার চেয়ে বেশি চিনে। তাই অনেক সময় অনেক বুদ্ধি দিত। আম্মাকে খুশি করতে।
একি সংসারে থাকতে হলে একে অন্যের মনমতো হতে হয়। আর শশুর শাশুড়ি বলে কথা। অনিক বারবার বলত তারা বাবা মা তাদেরকে কষ্ট দিয়ে কথা বলে পাপের ভাগী কর না আমাকে। আমিও তোমার বাবা মাকে একি সম্মান করব।
অনিকের এই কথা সবসময়ই আমাকে নরম থাকতে বাধ্য করত। এতটা মুগ্ধ হয়েছিলাম ওর কথায়। তা ছাড়া ও সত্যি আমার বাবা মায়ের সবসময়ই খবর রাখত। যে কোনো সমস্যা হলেই ছুটে যেত। আমি সত্যি কৃতজ্ঞ ছিলাম ওর ওপর।
আমার বিয়ের এক বছর পর আমার শ^শুর মারা যান। কিন্তু তার আগে অসুস্থ অবস্থায় আমার হাত ধরে বলে গেছেন, তোমার শাশুড়ির দায়িত্ব তোমার হাতে দিয়ে গেলাম।
আমার কাছে না আশা পর্যন্ত তোমার সাথে রাখবে তাকে। উনি না বললেও অনিক তাকে কখনো একা ছাড়ত না। ছোট বলে হয়তো মায়ের প্রতি টান বেশি।
বিয়ের তিন মাস পর অনিকের সাথে আমি রংপুর থেকে ঢাকায় আসি। এখানেই মাস্টার্স ভর্তি হই। পড়ালেখা করি আর সংসার গুছাই। অসম্ভব সুন্দর সময় কাটত আমাদের। দুজন মিলে একটা স্বর্গ ছিল যেন।
আব্বা মারা যাওয়ার পর আম্মাকে অনেক জোড়াজুড়ি করেও বাড়ি থেকে ঢাকায় আনতে পারিনি। আম্মা কিছুতেই বাড়ি ছেড়ে তার সংসার ছেড়ে ঢাকায় আসবেন না। আব্বার কবর প্রতিদিন দেখে আসেন আম্মা।
ওনাকে এভাবে কিছুতেই রেখে চলে আসতে পারলাম না। অন্য সবাই যে যার বাসায় চলে গেল। আম্মা বড্ড অভিমান করে অনিককেও বলেছিল, তুইও তোর বউ নিয়েও চলে যা। সারাজীবন তো একাই থাকতে হবে। তোর আব্বা আমাকে রেখে চলে গেল। নিয়ে গেল না এক সাথে।
আম্মার কষ্ট আমার ঠিক বুঝতে পারি। এত বছরের যুগলবন্দী জীবন কার না কষ্ট লাগে? জীবনের সব থেকে প্রিয় মানুষটি আজ নেই। যার জন্য এতগুলো বছর এক বাড়িতে জীবন কাটিয়ে দিল। যার জন্য সব সখ ছিল। যার সাথে প্রতিটি মুহূর্ত স্মৃতিময়। সে আজ নেই। ভাবতেই চোখে পানি আসে।
তা ছাড়া আব্বা আমাকে যতটা ভালোবাসত তা আমি কোনোদিন ভুলব না। বিয়ের পর বাবার অভাব আব্বা পূরণ করেছে। মাঝে মাঝেই আমার পছন্দের সব খাবার এনে দেখে যেতেন বা কারো কাছে পাঠিয়ে দিতেন।
আজ তার অভাব খুব কষ্ট দেয়। সেখানে আম্মার কেমন লাগে? আমি অনিককে ছাড়া কি করে থাকব তা ভাবলেই কলিজা কেঁপে ওঠে।
তাই আম্মাকে একা রেখে আসলাম না। অনিককে বললাম আমি কিছু দিন এখানেই থাকি। আমার কথায় অনিক আর আম্মা সত্যি অনেক খুশি হয়। অনিক সেদিন বলেছিল আজ তুমি যতটুকু করলে আমার মনে থাকবে। ছেলে হয়ে আমাকে চলে যেতে হচ্ছে। তুমি মায়ের কষ্টটা বুঝলে।
আমি তাকে বলি, আব্বা আমার কাছে আম্মাকে দিয়ে গেছেন। আমার দায়িত্ব আছে। তা ছাড়া ফাইনাল পরীক্ষা দেরী আছে। আমি থাকি এখানে।
আমি একমাস আমার শাশুড়ির সাথে এই বাড়িতে একা ছিলাম। এই এক মাসে আমরা দুই বউ শাশুড়ি একে অপরের ভালো বন্ধু হয়ে গিয়েছিলাম।
আম্মা তার বিয়ের পর থেকে তার সারাজীবনের ছোট বড় ঘটনার কথা আমার সাথে শেয়ার করত। ওনার মনটা হালকা হত। গল্প করতে গিয়ে কখনো কাঁদত কখনো হাসত। আমার খুব ভালো লাগত।
খুব কষ্ট করে আম্মাকে রাজি করিয়ে ঢাকায় আনলাম কিছু দিন থাকতে। কিন্তু তিনি ঢাকায় থাকতে পারলেন না অসুস্থ হয়ে গেলেন। তাই বাধ্য হয়ে বাড়িতে আনতে হল। কিন্তু এত বড় বাড়িতে আম্মা একা কী করে থাকবেন?
জীবন কত অদ্ভূত! একদিন এ বাড়িটা ভরা ছিল মানুষে। সন্তানদের নিয়ে আব্বা আম্মার সুখের সংসার ছিল। আজ শুধু নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। এবারো আম্মার সাথে সপ্তাহ খানেক থেকে আমাকেও চলে যেতে হল। সামনে পরীক্ষা তাই ইচ্ছা থাকলেও থাকতে পালাম না।
পরীক্ষা শেষ হল। আম্মা খুব অসুস্থ হয়ে পড়লেন। সবাই ব্যস্ত নিজেদেরকে নিয়ে। কল করে সবাই খোঁজ নেয়। কিন্তু আম্মা সবাইকে দেখতে চায়। মায়ের মন শূন্যতা নিয়ে থাকে সন্তান ছাড়া।
অনিক একদিন আমার হাত ধরে বলে, চলো আম্মার সাথে গিয়ে থাকি। কেন যেন মনে হয় আম্মাকে বেশি দিন আর পাবো না। চাকরি তো একটা না একটা হবেই।
মা চলে গেলে একটা অপরাধ বোধ সারাজীবন কাজ করবে। আব্বাকে দেওয়া কথা রাখতে পারলাম না।
আমি জানি তুমি ঢাকায় বড় হয়েছ। সেখানে তোমার ভালো লাগবে না। তবু যদি আমার জন্য এতটুকু কর আমি সত্যি ঋণী থাকব।
আমি সেদিন অনিকের কথার মায়ায় আটকা পড়ি। তার কষ্ট উপলব্ধি করি। আজ অনিকের দায়িত্ব আমারও দায়িত্ব। অনিকের সাথে চলে আসি রংপুরে।
এখানে অনিকের চাকরি হয়। আমিও একটা স্কুলে চাকরি পেলাম। আম্মার সাথে আমাদের দিন ঠিক আগের মতো আনন্দে কাটতে লাগল।
ছুটিতে ভাইয়া ভাবিরা বাচ্চাদের নিয়ে আসে। কয়েকদিন থাকে আবার বাড়ি শূন্য করে চলে যায়। তবু একটা অদৃশ্য মায়া সবাইকে আটকে রাখে। সবাই অনেক প্রশংসা করে আমাদের। কিন্তু সব থেকে বেশি প্রশংসা করে আম্মা আমার।
সত্যি অবাক হয়ে ভাবি বিয়ের প্রথম দিনগুলোর কথা মনে হলে বিশ্বাস হয় না আম্মা আমাকে কোনোদিন ভালোবাসবে। আমার প্রশংসা করবে এটি ভাবিনি কোনোদিন।
আজ আমার দুই বাচ্চা এক ছেলে এক মেয়ে তার দাদির কোলে মানুষ হচ্ছে। কত আনন্দের স্মৃতি জমছে জীবনে। একটুও খারাপ নেই আমি। জীবনে অনেক সময় কিছু বিষয়ে ছাড় দিতেই হয়। সুখ এমনিতেই আসে না। একটা সিদ্ধান্ত কতটা সুখ এনেছে। আম্মা হয়তো একা টিকতে পারত না।
আজ দশ বছর আব্বা নেই। কিন্তু আম্মা আজও ছায়া হয়ে আছেন। আজও তার গভীর চিন্তা ভাবনা আমাদের পথ চলায় সাহায্য করে। আজও নতুন নতুন কতকিছু শিখছি প্রতিদিন।
একটা বাড়ির বউ হওয়া সহজ। কিন্তু সবর আদরের ভালোবাসার মানুষ হওয়া একটু কঠিন। কারো শান্তি চাইলে নিজের শান্তিও চলে আসে। দুজনের ভালোবাসা থাকলে সব জায়গাতেই সুখ আসে। একে অপরের সিদ্ধান্ত ও মতামতের প্রাধান্য দিতে হয়।
বিয়ে মানে শুধু দুটো মানুষের সংসার নয়। দুটো পরিবারের সম্পর্ক। একটা মেয়ে সবসময়ই চায় তার বাবা মা সহ পরিবারের সব মানুষকে তার শ্বশুর বাড়ির মানুষ ও তার স্বামী শ্রদ্ধা করুক একটা স্বামী চায় তার বাবা, মা, ভাই, বোনকে তার স্ত্রী ভালো বাসুক। কাউকে ছোট না করেও সুখ পাওয়া যায়।
আমি এ বাড়িতে এসে আমার শশুর আব্বা আর স্বামীর কাছে থেকে শিখেছি কীভাবে সবাইকে আপন করতে হয়। কীভাবে সবার মন বুঝতে হয়। বাবার বাড়ি থেকে এগুলো এত বাস্তবতা দিয়ে শিখিনি। সেখানে না চাইলেই ভালোবাসা পাওয়া যায়। কিন্তু এখানে ভালোবাসা দিয়ে ভালোবাসা নিতে হয়।
আমার স্বামী আর শ্বশুর আব্বা যে ভালোবাসা দিয়েছেন তার বীজ বুনেছিল এই মনে। আমি সেই ভালোবাসা যত্নে বড় করছি বাকি সবার জন্য। সারাজীবন শিখতে হয়। পাশে কেউ যদি হাত ধরে এগিয়ে নেয়। বহুদূর যাওয়া যায় ক্লান্তিহীন ভাবে।
একটা সংসারে নতুন বউ অনেক কিছুই জানে না। কে কেমন তা সে জানে না। এখানে স্বামীর সর্বাত্মক সমর্থন প্রয়োজন হয় স্ত্রীর। একা এ পথ এত মসৃণ ভাবে পাড়ি দেওয়া সম্ভব নয়। একে অপরের হয়ে থাকতে হয়। এটাই শ্বশুর বাড়ি।

আজকালের খবর/আরইউ









Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor@gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor@gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft