
জীবনানন্দ দাশ বলেছেন, ‘উপমাই কবিত্ব’। তিনি চিত্রকল্পকে উপমা হিসেবে ধরতে চেয়েছেন হয়তো। কারণ তার কবিতায় চিত্র ও চিত্রকল্পের ছড়াছড়ি। উপমাসহ বিভিন্ন অলংকারের মাধ্যমেই চিত্রকল্প নির্মাণ করা হয়। ফলে জীবনানন্দ দাশের এ মনোভাবের একটু সংশোধন করার প্রয়োজন দেখা দিল। ফলে পরবর্তী অনেক কবি বা আলোচক চিত্রকল্পকে উপমার জায়গায় প্রতিস্থাপন করলেন। শামসুর রাহমান বলেন, ‘প্রতীক-চিত্রকল্পই কবিত্ব’। তার কবিতায় এ বক্তব্যের প্রমাণ মেলে।
বাংলা কবিতায় তিরিশের কবিতা আলাদা করে চিহ্নিত হওয়ার প্রধান কারণ চিত্রকল্পের ব্যবহার। তিরিশের দশকের বা পঞ্চপাণ্ডবের সেরা ফসল হচ্ছেন জীবনানন্দ দাশ। চিত্রকল্পের জুতসই ও অপূর্ব ব্যবহার তাকে এ উপহার দিয়েছে। চিত্রকল্পের ওপর বেশি আলোচনা ও মতামত দিয়েছিলেন বুদ্ধদেব বসু। কিন্তু তিনি জীবনানন্দের মতো সফল হননি। বিভিন্ন প্রতিতুলনাজাত অলংকার ব্যবহার করে চিত্রকল্পকে হৃদয়গ্রাহী করতে চাই। প্রতিতুলনাজাত অলংকার আমরা কবিতায় বেশি ব্যবহার করিÑউপমা, উৎপ্রেক্ষা, প্রতীক, রূপক, সমাসোক্তি ও অন্যাসক্ত। কবিতা পাঠে একটি চিত্র অঙ্কন হতে হবে। কবিতাপাঠে পাঠকের মনে একটা চিত্র ভেসে ওঠে। আর এ-চিত্রের সঙ্গে যদি ভাবনা বা চৈতন্যকে প্রসারিত করে তখনই আমরা তাকে চিত্রকল্প বলে থাকি। ভালো-চিত্র চৈতন্য বা ভাবনাকে অনেকদূর পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে বা চিন্তার প্রসারণে প্রলুব্ধ করতে পারে। এ-দূরত্বর পরিমাণের ওপর কবিতার ভালোমন্দ নির্ভর করে থাকে। বিশ্বসাহিত্যে পাউন্ড ও লাওয়েলের নেতৃত্বে ‘ইমাজিস্ট’ আন্দোলন শুরু হয়। চিত্রকল্প-ই এ আন্দোলনের থিম। এলিয়টদের সমর্থন এ ধারাকে দ্রুত বিকশিত ও জনপ্রিয় করে।
তিরিশের কবিতার হাত ধরে বাংলায় বিকাশ ও পূর্ণাঙ্গতা লাভ করে। এখন আসলে চিত্রকল্পবিহীন কবিতাকে কবিতার মর্যাদা দেওয়া হয় না। জীবনচিত্রের চেয়ে চিত্রকল্পকেই কবিতায় প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। কবিতা ও চিত্রকর্মের মূল উপাদানই হচ্ছে এ গুণ। এ গুণ বাদে কবিতা কবিতা না-হয়ে কাঠামোয় পরিণত হয়। অন্যান্য গুণ থাকা সত্ত্বেও তখন সেটিকে পদ্য বলা হয়। বস্তুপ্রতিমা ও ভাবনার মিশেলে কবিরা চিত্রকল্প নির্মাণ করে থাকেন। শামসুর রাহমানও পাঠকের জন্য কবিতায় সুন্দর সুন্দর চিত্রকল্প উপহার দিয়েছেন। অনেকসময় ছোট ছোট চিত্রকল্পে সাজিয়েছেন কবিতা। এলিয়েট ছোট ছোট চিত্রকল্পে কবিতা লেখায় আমাদের পথ দেখিয়েছেন।
শামসুর রাহমান চিত্রকল্প-নির্মাণে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। প্রথমদিকে তার কবিতায় জীবনানন্দ ও ধ্বনিবিন্যাসে বুদ্ধদেব বসুর প্রভাব ছিল বলে মনে করা হয়। একটি উদাহরণ দিলে বুঝা যাবে-
‘শুধু মাথার ভেতরে/ভ্রমরের মতো ক্রমাগত/কবিতার পঙত্তিমালা তোলে গুণজরণ/অক্ষরবৃত্তের পর্ব, স্বরবৃত্তের প্রধান ঝোঁক/ভুলি না কিছুতে’ [পোড়া দাগ/বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়]
পরবর্তীতে শামসুর রাহমান অতি দ্রুত অন্যের প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে নিজের একটি জগৎ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি ইউরোপীয় কবিতার অভিজ্ঞতা প্রয়োগে কবিতায় বাঁকবদল করতে সক্ষম হয়েছেন। বলে রাখি, খুব অল্পসময় বাদে এজন্য তাকে অগ্রজ কবিদের গুণ ধার করতে হয়নি বা প্রভাবিত হননি। বাঁকবদলের প্রধান অনুষঙ্গ হচ্ছে-চিত্রকল্প নির্মাণ। চিত্রকল্প-নির্মাণে চিন্তাশীল-চেতনা ক্রিয়াশীল রয়েছে। রূপান্তরিত প্রক্রিয়ায় নির্মিত চিত্রকল্প ও ধ্বনির কারুকার্য কবিতাকে হৃদয়গ্রাহী করেছে। খণ্ড-খণ্ড চিত্র মিলিয়ে বিরাট একটা চিত্র হতে পারে। পঞ্চইন্দ্রিয়ের কাজ বা ব্যবহার যত করা সম্ভব সে কবিতার শিল্পগুণ ততই বেশি হতে পারে। শামসুর রাহমান স্বপ্ন ও বাস্তবতার মিশেল দিয়ে কবিতার ভাষা নির্মাণ করেছে। তার কবিতার ভাষার অনেক শক্তি। আলো আসে ক্রমাগত। ‘আমার খামার নেই, নেই কোনো শস্যকণা, আছে শুধু একটি আকাশ’, ‘দৃষ্টিতে পুষে হাঁটি মানুষের ধূসর মেলায়’ ইত্যাদির মতো চেতনা-সৃষ্টিকারী চিত্রকল্প তার কবিতায় দিয়েছে ভিন্নভাষা, ভিন্নমাত্রা। আরো কয়েকটি চিত্রল্পের নমুনা-
‘কমলা রঙের ঘোড়া কেশরের গৌরব দুলিয়ে/আমার চাদ্দিকে ঘোরে দুলকি চালে’ [কমলা রঙের ঘোড়া/ বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখে]
‘তখন স্মৃতির পরগণাতে/উড়তো শধু পাগলা ঘোড়ার খুরের ধুলি’ [মাতামহীর মধ্যাহ্ন/আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি]
সাধারণত প্রতীকবাহী বা রূপক কবিতায় চিত্র ও চিত্রকল্প সবসময়ই আকর্ষণীয় হয়। এ অনুষঙ্গ কবিতার শিল্পগুণ উন্নীত করে। বেশিরভাগক্ষেত্রে প্রতীক কবিতায় অর্থ ও বিশ্লেষণে বহুমাত্রিকতাপায়। তার কবিতায় বিপুল পরিমাণে প্রতীকবাহী চিত্রকল্প দেখা যায়। প্রতীকবাহী চিত্রকল্প পাঠককে মোহিত করে, কবিতার শিল্পগুণকে উন্নীত করে, কবিতার ভাষার বলিষ্টতা দেয় অতি সহজেই। এই গুণ কবিতার বহুমাত্রিকতার গুণ দেয়, শব্দযোজনায় বহুমাত্রিকতা গুণ আরোপ করে থাকে। আধুনিক যুগে এ গুণের কবিতার জন্য কবির মহানতা নির্ভর করে থাকে। ‘কবিতা যে রহস্যময় বা বহুমাত্রিক শাখা। বড় বড় কবিরা প্রতীক ব্যবহার বা প্রতীক চিত্রকল্প-নির্মাণে মনযোগ দেন। এতে যারা সাফল্য পান কবি হিসাবে তার দীর্ঘস্থায়ীত্বও বেশি হবে। ‘আসাদের শার্ট’ অন্যতম প্রতীকী কবিতা। রূপক ‘জন্মভূমি’ কবিতার শেষ স্তবকের দুই পঙক্তিÑযেখানে প্রেমিকা প্রতীকী বা রূপক, জন্মভূমিই মূল উদ্দেশ্য।
‘কিন্তু মেয়ে তোমাকে ভালোবেসে/হৃদয়ে চাই জন্মভূমিকেই।’
বাংলাকবিতার ক্ষেত্রে পরাবাস্তব চিত্রকল্প একটি গৌরবের বিষয়। শামসুর রাহমান ব্যাপকভাবে (তুলনামূলক) এ-অনুষঙ্গ সফল-ব্যবহার করেছেন। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’-তেই পরাবাস্তবতার লক্ষণ দেখা যায়। এ-কাব্যের ‘তার শয্যার পাশে’ কবিতায় প্রথম প্রয়োগ দেখা যায়। এরপর এই গ্রন্থেরই ‘সেই ঘোড়াটা’ কবিতায় শামসুর রাহমানের পরাবাস্তবতার সুর বেশি ¯পষ্ট হয়েছে এভাবেÑ ‘সেই বেতো-ঘোড়াটা নিমিষে তন্দ্রার ঘোর কাটিয়ে উটলো, আশ্চর্য এক ফুল হয়ে...’। আর একটি উদাহরণ দিইÑ ‘একটি অদ্ভূত ঘোড়া আমাকে পায়ের নিচে দলে চলে যায় দূরে তার কেশরদুলিয়ে...কখনো শিকার করি, হরিণ শিকার করি ঘরে (দুঃসময়ের মুখোমুখি)।’
শামসুর রাহমানের সমসাময়িক কবিদের মধ্যে তার কবিতায় ক্রিয়াশীল ও শক্তিশালী চিত্রকল্প লক্ষ্য করা যায়। আহসান হাবীব, সৈয়দ আলী আহসান প্রমুখ বাংলাকবিতায় নতুন একটি মাত্রা যোগ করতে সক্ষম হন। তারপরেই শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ কবিতার ধমনীতে নতুন রক্ত প্রয়োগ করতে সক্ষম হন। চিত্রকল্পে এই দু-কবি সফল হলেও পরাবাস্তবতার উপাদান শামসুর রাহমানের কবিতায় ধরা দেয়। চিত্রকল্পের খেলায়ও তিনি উজ্জ্বল্য বাড়াতে সক্ষম হয়েছেন এবং নিজের জাত চিনিয়ে নিজস্ব একটি জগৎ সৃষ্টি করতে পেরেছেন।
আজকালের খবর/আরইউ