প্রতিটি সংসারই একটি শান্ত স্নিগ্ধ নদীর মতোই। বিয়ের প্রথম দিন থেকে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যে স¤পর্কটি তৈরী হয় সেটি এক অর্থে অসাধারণ কেমিস্ট্রিকে আরো বেশী গতিময়তা দিয়ে এমন কিছু তৈরী করে যাতে বংশ পরম্পরার একটি ধারা তৈরী হয়।
এখানে যেমনি আদর আছে, ভালোবাসা আছে তেমনি আছে নিজেদের প্রমাণ করবার জন্য প্রচেষ্টা, যুদ্ধের কিছু উপাদান ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করে অর্জনের একটি পথ।
প্রখর একটি অনুভবের খোলা প্রান্তরের নাম সংসার। এখানে অনেক মানুষের স¤পৃক্ততা তৈরী হয় আর একারণেই দায়বদ্ধতার জায়গাটি মানদণ্ডের প্রধান স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়।
সংসার জীবনের সবচেয়ে বড় পার্ট হল প্রতিদিনকার দিনলিপি। এখানে মানুষ একটি অদেখা ডায়েরিতে তাকে লিখে রাখতে শুরু করে। কলম-কালির সং¯পর্শে যে লেখা হয় সে লেখার সবচেয়ে বড় অভিধান হয় হল সন্তান! যারা ঘর বাঁধেন তাদের প্রয়োজনীয়তা যখন আরেকটি সৃষ্টির দাঁড়প্রান্তে যায় তখনই কেবল ধরে নেওয়া হয় এ সংসার চিরদিনের জন্য তার প্রামাণিক দলিল স্থাপন করলো। মানুষের মাঝে মানুষের প্রাপ্তি খোঁজা এবং নিজেকে সমর্পণ কেবল এই সংসার জীবনেই সবচেয়ে প্রয়োগিত অর্থে দেখা যায়। একজন সন্তানকে যদি বলা হয় তোমার মা বাবাকে নিয়ে তোমার অনুভূতি কি?
সে তার উত্তরে প্রথমেই বলবে মা বাবাইতো সব আমার জীবনে (যদি সে জ্ঞানী বা অনুভূতি প্রবণ মানুষ হয়ে থাকে)!
যদি স্মৃতি বলতে বলা হয় মা বাবাকে নিয়ে তবে? একজন শিশুকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম তোমার বাবার কাছ থেকে পাওয়া সময়ের মধ্যে তোমার কাছে কোনটি মনে হয়। ও উত্তর দিয়েছিলো বাবা আমাকে অফিস থেকে প্রতিদিন আসার সময় মাদ্রাসা থেকে নিয়ে আসে। রাস্তায় কিছুদূর আসার পর আমাকে আইসক্রিম কিনে দেয় এটি আমার কাছে অসাধারণ মনে হয়, ভালো লাগে।
মাকে ঘিরে এমন স্মৃতির অভাব নেই প্রতিটি মানুষের জীবনে। ছোটবেলায় আমি মাকে ছেড়ে কোথাও যেতাম না। একবার নাইন-টেনে পড়ার সময় স্কুলে কোচিংয়ের ব্যবস্থা করা হলো। তখন স্যাররা বলেছিলেন এখানে এসে এক মাস থাকতে হবে। আমার বুকের ভেতর বার বার মোচর দিয়ে উঠছিলো। আমি মাকে ছাড়া, বাবাকে ছাড়া থাকতে পারবো? খুব কান্না করলাম। মা আমার হেড স্যারের বাড়িতে চলে গেলেন। স্যারকে বোঝালেন কিন্তু স্যার রাজি না কোনো ভাবেই। স্যার বললেন প্রয়োজনে ও প্রতিদিন আপনাকে গিয়ে দেখে আসবে তবু ওকে আসতে হবে। একমাত্র আমিই প্রতিদিন পাঁচ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে বাড়ি এসে মাকে, বাবাকে দেখে যেতাম!
তাহলে পরিবারের জন্য আমার এ স্মৃতি অমলিন সারা জীবন। একজন বাচ্চাকে আমি চিনতাম ঢাকায়। ওর মা গার্মেন্টেসে চাকরি করতো। সম্ভবত সে সময় ঢাকা ডাইং এ। ওর মাকে নিয়ে অনুভূতির কথা শুনতে গিয়ে জানলাম যত রাতই হোক ওর মাকে ছাড়া ও ঘুমায় না। ওর একটিই কথা মা না এলে আমি ঘুমাবো না।
অনেকের বাবার জন্যও এমন অনুভূতি কাজ করে। সুতরাং একটি সংসার পুরো একটি স্বচ্ছ, সুন্দর নীরব নদীর মতো। মায়ের সঙ্গে নানা ধরনের খুনসুঁটি, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির গল্প, বাবার শাসন, বাবার কাছে চাওয়া এমন অনেক বিষয় নিয়েই একসঙ্গে থাকা। এই বন্ধন একটি প্রক্রিয়া যা পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম সাইকেল বলা যেতে পারে।
সবকিছুর পরও বিপত্তি ঘটে যেতে পারে যে কারো জীবনে। হঠাৎ যদি একটি পরিবারের স্ত্রী বা স্বামী মারা যায় তখন পরবর্তিতে সন্তানদের ওপর যে মানসিক একটা চাপ আসে সে বিষয়টি ভাববার হলেও উপেক্ষিত থেকে যায় অনেক ক্ষেত্রেই।
হঠাৎ একটি সংসারে মা মারা গেলে বা চলে গেলে সন্তানের আইনগত অভিভাবকের যেমন প্রশ্ন আসে তেমনি সন্তানের ইচ্ছার বিষয়গুলোও প্রশ্নের মধ্যে চলে আসে। বিশেষ করে মা মারা গেলে সন্তানেরা বেশি একাকীত্ব বোধ করে। এ সময় বাবারা তাদের দায়িত্ববোধের জায়গা কতটুকু পালন করেন; বা বিপরীত ক্ষেত্রে হলে মায়েরাই বা কতটুকু দায়িত্ব পালন করেন?
এ বিষয়ে দুধরনের উদাহরণই আছে আমার ¯পষ্ট দর্শনে। একজনকে দেখেছি সংসারে মা মারা যাওয়ার পর দ্রুত সন্তানের বাবা বিয়ে করেছেন। বাবার ক্ষেত্রে দেখলাম মা মারা যাওয়ার পর দুমাসের মধ্যেই বিয়ে স¤পন্ন করে সংসার শুরু করলেন। ছোট সন্তানকে বাড়ির বাইরে পড়াশোনার জন্য পাঠিয়ে দিয়েছেন। এখন যে সন্তান তার মাকে হারিয়েছে তার অনুভূতি কেমন বোঝাই যায়।
সেসময় বাবা যদি সন্তানকে বাইরে পাঠিয়ে দেন তখন তার মানসিক অবস্থা কেমন হচ্ছে। এ ছেলে সামাজিক অপরাধী হয়ে উঠলে কি খুব ভুল হবে? সে যা দেখেছে তাইতো শিখেছে এবং শিখবে। তার কাছে বাবার স্থানটি শুধুমাত্র নিষ্ঠুরতম একটি বাড়ির কর্তা হিসেবেই থাকবে আজীবন। তার জীবনে সে যখন সংসার করতে যাবে তখন একই কথা ভেবে সারা জীবন পথ চলবে।
আরেকটি পরিবারে দেখেছি বাবা-মা’রা যাওয়ার পর দু সন্তানের একটি বাবার বোনের কাছে মানে ফুপুর কাছে রেখেঝ মা চলে এসেছেন। ছোটটিকেই ঠিক মতো দেখা শোনা করেন না। বিয়ে করবেন বলে ছোট সন্তানকে নাকি বিক্রিও করে দিতে চান মাঝে মাঝে! এই সন্তানও যদি সামাজিক অপরাধী হয়ে ওঠে তাহলে কি এ দায় এড়াতে পারবেন এই মা?
সংসার ও সমাজের প্রয়োজন দ্বিতীয় বিয়ে প্রয়োজন হতেই পারে। আমার সামান্য বিশ্লেষনে হয়তো বুঝতে পারছেন একজন সন্তান আমাদের সিদ্ধান্তগুলোর জন্য কীভাবে প্রভাবিত হয়! এ প্রভাব বিবেচনায় বিয়ের ক্ষেত্রে অনেকগুলো চিন্তা প্রয়োজন। সন্তানের সঙ্গে আলোচনা করা বা তারা অবুঝ হলে কীভাবে তাদের মানিয়ে নিয়ে কীভাবে বিয়ে করা যায় সে ব্যপারে বোঝাপড়া প্রয়োজন। হুট করে বাবা বা মা চলে যাওয়ার অথবা মারা যাওয়ার পর এমন সিদ্ধান্ত সন্তানকে রুঢ় করে তুলতে পারে, তারা হয়ে উঠতে পারে সামাজিক অপরাধী বা সে ভাবতে পারে আমার জন্য কেউ নেই। সবগুলো বিষয়ের ফলাফলই সমাজের ওপর বর্তায়।
এ ব্যাপারে ভাষাবিদ ও সংস্কৃতজন লিয়াকত চৌধুরী বলেন, একজন মনোবিদের সারা জীবন কেটে যায় শিশু- সাইকোলজির অ্যানালিটিক্যাল দিক নিয়ে কাজ করতে করতে। এ ব্যাপারে দারুণ দারুণ সব তত্ত্ব আছে। শিশুর একটি ‘সুস্থ মন’ তৈরি হয় প্রথমেই মা এবং পরে বাবার কাছ থেকে। তবে দুর্ভাগ্য হলো, ‘অডিওপাস তত্ত্ব’র জন্ম এই শিশুর পারিবারিক পরিবেশ থেকেই। আর শিশুর মনের লুকানো আঘাত এই পরিবার থেকে শুরুতে আসে। এই লেখাটি তার সফল ইংগিত দিয়েছে।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একবার ভাবুন যে আপনার সংসারে ছিলো সে শেষ দিন পর্যন্ত আপনার সংসারকে আগলে রেখেছে। তার জন্য আপনার একটি সফট কর্নার থাকা স্বাভাবিক, তাকে আগলে বাঁচাটা জরুরি। এর বাইরে যা কিছু আছে সে চিন্তাগুলো আপনার তখনই হবে যখন আপনাদের দুজনের সম্পদ আপনার সন্তান খুব ভালোভাবে বিষয়গুলো মানিয়ে নেবে বা বুঝবে।
একজন সন্তানকে আপনি সামাজিক অপরাধী হিসেবে আপনি প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন না। রাষ্ট্র আপনাকে সে অধিকার দেয়নি। এজন্য কিছু আইনও এমনভাবে তৈরী করা প্রয়োজন যেন সন্তানের অধিকার সবার আগে সমুন্নত করে তাদের বাবা মায়েরা সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। এ বিষয়গুলো এখন জনগুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং গুরুত্ব দিয়েই তা ভাবতে হবে।
সাঈদ চৌধুরী : সাহিত্যিক ও কলাম লেখক।
আজকালের খবর/আরইউ