রবিবার ২৪ মে ২০২৬
কবিতায় স্বাধীনতা
প্রকাশ: শনিবার, ১৮ মার্চ, ২০২৩, ৩:১৮ পিএম   (ভিজিট : ৪৪০৪)
স্বাধীনতা শব্দটির অর্থ বহুমুখী। ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, সামাজিক ও ধর্মীয় স্বাধীনতা, ভাষার স্বাধীনতা এবং সর্বোপরি রাষ্ট্র হিসেবে স্বাধীনতা। তবে স্বাধীনতার অনুভূতি প্রশান্তিময়। ‘স্বাধীনতা তুমি, রবি ঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান/স্বাধীনতা তুমি/কাজী নজরুল ঝাঁকড়া চুলের বাবড়ি দোলানো/স্বাধীনতা তুমি/ মহান পুরুষ, সৃষ্টিসুখের উল্লাসে কাঁপা/স্বাধীনতা তুমি/শহীদ মিনারে অমর একুশে ফেব্রুয়ারির উজ্জ্বল সভা’। শামসুর রাহমানের ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতায় স্বাধীনতার রূপ কতভাবে যে বর্ণনা করা হয়েছে তা কবিতাটি আদ্যোপান্ত না পড়লে বোঝা যায় না। বাংলাদেশের অভ্যুদয় এবং একটি স্বাধীন সূর্যোদয়ের পেছনে মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জড়িয়ে আছে। সেই মহান সময় উঠে আসে বাঙালির সাহিত্য চর্চায়। সাহিত্যের একটি বিশাল অংশ কবিতা। কবিতার শব্দ যেভাবে মানুষের মস্তিষ্কে আঘাত করতে পারে, মেরুদণ্ডে জ্বালা ধরাতে পারে বা কণ্ঠ শাণিত করতে পারে এত ক্ষমতা আর অন্য শাখার নেই বলেই আমার মত। আর সেকারণে স্বাভাবিকভাবেই সাহিত্যের অন্যান্য অংশের চেয়ে কবিতায় স্বাধীনতার কথা এসেছে বেশি। তা ছাড়া কবিতা হলো সাহিত্যের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। সেই মাধ্যমে আজ অবধি স্বাধীনতার কথা আসছে বিভিন্নভাবে। যেমন- উপরের স্বাধীনতা তুমি কবিতাটিই পড়ি দেখা যাবে স্বাধীনতাকে যতদিক থেকে ব্যাখ্যা করা যায়, যতভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায় ততভাবেই করা হয়েছে। 

আমরা স্বাধীনতাকে বিভিন্নভাবে কল্পনা করি। তার প্রতিটি রূপেই স্বাধীনতা ধরা দিয়েছে এই কবিতার পঙ্ক্তিমালায়। অন্য কোনো কবিতায় এত বহুভাবে স্বাধীনতার কথা উঠে আসেনি। আমরা যতভাবে স্বাধীনতাকে কল্পনায় আনতে পারি তার সব রূপেই স্বাধীনতাকে পেয়েছি এই কবিতায়। ‘স্বাধীনতা কী’ এই প্রশ্নের উত্তরে যা যা মনে আসে সবই আছে এই কবিতায়। প্রতিনিয়তই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নতুন নতুন সাহিত্য সৃষ্টি হচ্ছে। সাহিত্য সাময়িকীগুলোতে চোখ বুলালেই তার সত্যতা মিলবে। তা ছাড়া লিটলম্যাগ ও ওয়েবম্যাগগুলোতে সমানতালে কবিতা লেখা চলছে মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে। অর্থাৎ কবিতার একটি বিশাল অংশেই মুক্তিযুদ্ধ রয়েছে এবং থাকবে। সাহিত্যের প্রতিটি শাখাই নতুন করে মুক্তিযুদ্ধ ও তৎকালীন পরিস্থিতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরছে। কবিতা, ছড়া, ছোটগল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধকে পাঠকদের কাছে উপস্থাপন করছেন লেখক-কবি। কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের সময়ের অবস্থা অর্থাৎ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বর্বরতা, নিষ্ঠুরতা যেমন ফুটে উঠেছে, সেভাবেই ফুটে উঠেছে অস্থির সময়ের কাহিনী, শত্রুর বুলেট অথবা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাঁথা। 

শামসুর রাহমান তার ‘অভিশাপ দিচ্ছি’ কবিতায় লিখেছেন, ‘আজ এইখানে দাড়িয়ে, এই রক্ত গোধূলিতে/অভিশাপ দিচ্ছি/আমাদের বুকের ভেতর যারা ভয়ানক/কৃষ্ণপক্ষ দিয়েছিল সেঁটে/মগজের কোষে কোষে যারা পুতেছিলো/আমাদেরই আপনজনের লাশ/দগ্ধ, রক্তাপ্লুত/যারা গণহত্য করেছে/শহরে গ্রামে টিলায় নদীতে ক্ষেত ও খামারে/আমি অভিশাপ দিচ্ছি নেকড়ের চেয়েও অধিক’। এই কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের সমকালীন পরিস্থিতির সাথে কবির তীব্র ঘৃণা প্রকাশ পেয়েছে। এই যে শব্দগুলো ‘অভিশাপ দিচ্ছি’ কবিতায় এসেছে তার এক একটি যেন রক্তে আগুন জ্বালায়, হাত মুষ্ঠিবদ্ধ করে এবং সেইসব হায়েনাদের টুটি চেপে ধরতে চায়। এই ক্ষমতা কেবল কবিতারই আছে। আর কবির আরো একটি জনপ্রিয় কবিতা ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা কবিতায় স্বাধীনতা পাওয়ার জন্য কত ধরনের আত্মত্যাগ করতে হয়েছে, কী কী ধ্বংসযজ্ঞ স্বীকার করতে হয়েছে তার বর্ণনা দিয়েছেন। এই কবিতার এক জায়গায় লিখেছেন, তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা/সাকিনা বিবির কপাল ভাঙলো/সিঁথির সিঁদুর গেল হরিদাসীর... তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা/অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিলো পিতামাতার লাশের ওপর। 

আমরা স্বাধীনতা পেতে কী কী হারিয়েছি বা কতটা আত্মত্যাগ করতে হয়েছে তার একটি ধারণা এই কবিতা থেকে ভালোভাবেই পাওয়া যায়। স্বাধীনতা শব্দটি মুখে এলেই মনে পরে রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লার ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’ কবিতার কয়েকটি লাইন। প্রতিটি লাইন যেন বারুদের কণা। 

কবিতাটির শেষ কয়েকটি লাইন হলো, ‘স্বাধীনতা, সে আমার-স্বজন, হারিয়ে পাওয়া একমাত্র স্বজন/স্বাধীনতা, আমার প্রিয় মানুষের রক্তে কেনা অমূল্য ফসল/ধর্ষিতা বোনের শাড়ী ওই আমার রক্তাত্ত জাতির পতাকা। 

আবার কবির ‘কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প’ কবিতায় লিখেছেন, ‘তাঁর চোখ বাঁধা হলো/ বুটের প্রথম লাথি রক্তাক্ত/ করলো তার মুখ/ থ্যাতলানো ঠোঁটজোড়া লালা/রক্তে একাকার হলো/জিভ নাড়তেই দুটো ভাঙা দাঁত/ঝরে পরলো কংক্রিটে। 

এই কবিতা পড়লেই চোখের সামনে ভাসে সেদিনের পাক হানাদার বাহিনীর তৈরি টর্চার সেলের নির্যাতনের ভয়াবহ দৃশ্য। স্বাধীনতা আসলে কী? যারা রক্ত দিয়ে, ইজ্জত দিয়ে আমাদের স্বাধীনতা দিয়ে গেল তাদের সেই আত্মত্যাগের মূল্য আমরা আজও দিতে পারিনি। তবু যুগ যুগ ধরে চলে স্বাধীনতার জয়গান। স্বাধীনতা এবং তার পূর্ববর্তী ঘটনাক্রমেও জড়িত থাকে বহু আন্দোলন, সংগ্রাম ও রক্তপাতের ইতিহাস। আমাদেরও আছে। যার শুরু হয়েছিল মহান ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে। এ ছাড়া ছয় দফা, গণঅভ্যুত্থানের মতো উল্লেখযোগ্য ঘটনা রয়েছে। ঊনসত্তরের ছড়া-১-এ সোনালী কাবিনের কবি হিসেবে খ্যাত আল মাহমুদ লিখেছেন, ট্রাক! ট্রাক! ট্রাক!/শুয়োরমুখে ট্রাক আসবে/দুয়োর বেঁধে রাখ।/কেন বাঁধবো দোর জানালা/তুলবো কেন খিল?/আসাদ গেছে মিছিল নিয়ে/ফিরবে সে মিছিল। মুক্তিযুদ্ধ সময়ের না হলেও এটি মুক্তিযুদ্ধ শুরুর ঘটনাক্রমের সাথে জড়িত ইহিহাস। অর্থাৎ আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাস। 

আবার কবি নির্মলেন্দু গুণ লিখেছেন, ‘জননীর নাভিমূল ছিঁড়ে উলঙ্গ শিশুর মত/বেরিয়ে এসেছো পথে, স্বাধীনতা, তুমি দীর্ঘজীবি হও/তোমার পরমায়ু বৃদ্ধি পাক আমার অস্তিত্বে, স্বপ্নে/প্রাত্যহিক বাহুর পেশীতে, জীবনের রাজপথে/মিছিলে মিছিলে; তুমি বেঁচে থাকো, তুমি দীর্ঘজীবি হও। 

আবার কবির ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কিভাবে আমাদের হলো’ কবিতায় লিখেছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের কথা। যেখান থেকে বাঙালি মূলত স্বাধীনতার বীজমন্ত্র পেয়ে উদ্বিপ্ত হয়েছিল। যখন বঙ্গবন্ধু সেই অমর কথার মর্মবাণী বাঙালিকে হৃদয়ে গেঁথেছিলেন। ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম/এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।/সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের।’

স্বাধীনতা বেঁচে থাকে মানুষের চোখে, স্বাধীনতার বেঁচে থাকে মানুষের রক্তে। স্বাধীনতাকে অনুভব করতে হয়। স্বাধীনতা প্রতিটি মানুষের বহু আকাক্সিক্ষত স্বপ্ন। দৃষ্টিভঙ্গি সমস্তটা না মিললেও বস্তুত কেন্দ্র এক। স্বাধীনতা মানে পরম শান্তি, জীবনের সবথেকে বড় পাওয়া। স্বাধনীতা মানে একটি পতাকা পাওয়া। কবি হেলাল হাফিজের ‘একটি পতাকা পেলে’ কবিতায় লিখেছেন, ‘কথা ছিল একটি পতাকা পেলে/আমি আর লিখবো না বেদনার অঙ্কুরিত কষ্টের কবিতা/কথা ছিল একটি পতাকা পেলে/ভজন গায়িকা সেই সন্ন্যাসিনী সবিতা মিসেট্রস/ব্যর্থ চল্লিশে বসে বলবেন,- পেয়েছি, পেয়েছি/কথা ছিল একটি পাতাক পেলে/পাতা কুড়োনির মেয়ে শীতের সকালে ওম নেবে জাতীয় সংগীত শুনে পাতার মর্মরে।

আবার আসছি শামসুর রাহমানের কবিতায়। কবির বন্দী শিবির থেকে কবিতার কয়েকটি লাইন হলো, ‘স্বাধীনতা নামক শব্দটি/ভরাট গলায় দীপ্ত উচ্চারণ ক’রে বারবার/তৃপ্তি পেতে চাই।/শহরের আনাচে কানাচে/প্রতিটি রাস্তায়/অলিতে গলিতে/রঙিন সাইনবোর্ডে, প্রত্যেক বাড়িতে/স্বাধীনতা নামক শব্দটি/লিখে দিতে চাই/বিশাল অক্ষরে/স্বাধীনতা শব্দ এত প্রিয় যে আমার/কখনো জানি নি আগে। 

স্বাধীনতা এমনই এক চাওয়া, আকাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন নিয়ে কবিতার শব্দ রচিত হয়, সেই কবিতা হয় তেরোশত নদী। সেই নদী বয়ে চলেছে প্রত্যেক বাঙালির বুকের ভেতর যুগ যুগ ধরে। আমরাও বুক ভরে বলি, স্বাধীনতা, তুমি দীর্ঘজীবি হও শ্বাশত বাংলার বুকে।

আজকালের খবর/আরইউ









Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor@gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor@gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft