রবিবার ২৪ মে ২০২৬
শরৎচন্দ্রের লেখায় সমাজভাবনা
প্রকাশ: শনিবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩, ৩:০১ পিএম   (ভিজিট : ৮৩৯৯)
পল্লীর সংস্কারাচ্ছন্ন মানসিকতার আঘাতে কতটা রক্তাক্ত হতে পারে আমাদের সমাজ, তারই রূপচিত্র এঁকেছেন শরৎচন্দ্র তার রচনায়। বাংলা সাহিত্যের অপরাজেয়  কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।  কালজয়ী অনেক উপন্যাসের রচয়িতা শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৭৬ সালে হুগলি জেলার দেবানন্দপুরে জন্মগ্রহণ করেন। এন্ট্রান্স পাসের পর দারিদ্রের কারণে তার শিক্ষাজীবনের সমাপ্তি ঘটে। শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের মূল বিষয়  ছিল গ্রামের মানুষের  চালচিত্র, পল্লীর জীবন ও সমাজ। পল্লীর মানুষের আনন্দ বেদনার বাস্তব চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন তার লেখায়। সামাজিক বৈষম্য, কুসংস্কার ও শাস্ত্রীয় অনাচারের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন উচ্চকণ্ঠ। বাংলাসহ ভারতীয় বিভিন্ন ভাষায় তার অনেক উপন্যাসের চিত্রনাট্য নির্মিত হয়েছে এবং সেগুলো অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছে। সাড়া দিয়েছে মানুষের হৃদয়ে। 

শরৎচন্দ্রের নিজের ভাষায় তার মনোভাব ব্যক্ত করেছেন এভাবে- দেশের নব্বই জন যেখানে বাস করেন সেই পল্লীগ্রামেই আমার ঘর। মনের অনেক আগ্রহ, অনেক কৌতুহল দমন করতে না পেরে অনেক দিনই ছুটে গিয়ে তাদের মধ্যে পড়েছি এবং তাদের বহু দুঃখ বহু দৈন্যের আজও আমি সাক্ষী হয়ে আছি’। সেই দুঃখ-দৈন্য প্রকাশের কাজে তার গল্প-উপন্যাসে দেখা গেছে ‘একান্নবর্তী পরিবারের সমস্যা, জাতিভেদ ও কন্যাদায়ের সমস্যা, অকাল বৈধ্যবের সমস্যা, দাম্পত্য অসমন্বয়ের সমস্যা, পদস্খলিতা নারীর সমস্যা’ 

বাংলার পল্লীসমাজের সংকীর্ণ প্রথায় জর্জরিত জীবনযাত্রার অন্তরালে নির্বাসিত প্রেম কীভাবে গুমরে মরে, সংস্কার ও সতীত্বের দুমুখো অস্ত্রের আঘাতে এই সমাজে কীভাবে নারীর হৃদয়কে  হত্যা করা হয়, ন্যায়বিচারের নামে মানুষকে স্বর্গে পাঠানোর চিন্তায় উচ্চবর্ণের সমাজপতিরা যে কী প্রবল অত্যাচার করে, শরৎসাহিত্য তার জীবন্ত দলিল। শরৎ সাহিত্যের প্রধান উপজীব্য গ্রামীণ মানুষের জীবন ও জীবিকার চিত্র। নারীর মূল্য, শরীর নারীত্ব ও সামাজিক মর্যাদা তার গল্প-উপন্যাসে সর্বাধিক পরিমাণে প্রতিফলিত। তার মতো এত সুন্দরভাবে গ্রামীণ জীবনের কথা, নির্যাতিত মানুষের কথা তুলে ধরেনি কেউ। সেইদিক থেকে নারী-মন পর্যালোচনায় দেখা যায়, এখানে তার অন্তর্জগতের পরিবর্তন হয়েছে দু’দিক থেকে- একদিকে সমাজপতিদের নীতি নিয়মের প্রত্যক্ষ আঘাতে, অন্যদিকে হিন্দুনারীর অন্তর্জাত সংস্কারের অভিঘাতে। তাই তার মন সদাই দ্বিধা-বিভক্ত হয়েছে। সমাজ-বিদ্রোহিণী হয়েও সে সমাজে অবহেলিত। সেইজন্য  শরৎচন্দ্রের তার লেখায় দেখা যায়, ‘পল্লীসমাজে’ সমাজপতি বেণী ঘোষালদের ভয়ে বিধবা রমা যেমন তার প্রেম প্রকাশে কুণ্ঠিতা, তেমনি প্রত্যক্ষভাবে সমাজ-বিধানের উদ্যত দণ্ড না থাকলেও নিছক সংস্কারের বাধায় রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্তের সম্মতি সত্ত্বেও বিয়ে করতে অনিচ্ছুক। আর সেইজন্য নারীচিত্তের সচেতন ও অবচেতনের দ্বন্দ্বে ও জটিলতায় শরৎসাহিত্য হয়েছে আকর্ষণীয়, হদয়গ্রাহী। শরৎচন্দ্রের প্রথম দিকের লেখা বেশ কয়েকটি উপন্যাস প্রেমমূলক। ‘ভারতী’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘বড়দিদি’, ‘পরিণীতা’, ‘পণ্ডিতমশাই’, ‘বিরাজ বৌ’ প্রভৃতি উপন্যাসগুলোতে প্রেমের প্রকাশ ছিল কুণ্ঠিত, কিন্তু তেমন সমস্যাজটিল নয়। বরং পুরুষচরিত্রের বিচিত্র পরিচয় এখানে উপস্থিত হয়েছিল। প্রবল হৃদয়াবেগের সঙ্গে এক প্রকার নিরাসক্তি, আত্মভোলা ঔদাসীন্য তার উপন্যাসের নায়ক চরিত্রের লক্ষ্মণীয় বৈশিষ্ট্য। এই বৈশিষ্ট্য খুব সম্ভবত লেখকসত্তার স্বভাব থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে জাত। তাই ‘বড়দিদি’তে প্রেমময়ী দায়িত্বশীলা সর্বসংহা মাধবীর জীবনে সুরেন্দ্রনাথের অন্যমনস্কতা ও ঔদাসীন্য দুঃখের কারণ হয়ে ওঠে। 

‘দত্তা’ বিজ্ঞানব্রতী নরেন্দ্রনাথের সাংসারিক জ্ঞানের অভাব ও আত্মভোলা স্বভাবের জন্য বিজয় তার সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব ঘটে। আবার কখনো বা পুরুষের এই অসাংসারিক আচরণ নারীকে উদ্যোগী করেছে তার প্রতি আপনজনের অধিকার প্রতিষ্ঠায় যেমন, ‘পরিণীতা’য় ধনী শেখরের অর্থব্যয়ে ললিতা অকুণ্ঠিতা। ‘পণ্ডিত মশাইতে’ বৃন্দাবনের প্রথম পক্ষের সম্ভানের প্রতি কুসুমের স্নেহপ্রকাশে কোন সঙ্কোচ নেই। আবার ‘বিরাজ বৌ’-এ দেখা যায়  সমাজবিধির মধ্যে থেকে প্রেমের ঘাত-প্রতিঘাত দাম্পত্য প্রেমে অভিমান জনিত আঘাত ও ভুলের বেদনাময় প্রায়শ্চিত্ত বর্ণিত।

শরৎচন্দ্রের পরিণত প্রতিভার প্রথম প্রকাশ  ‘দেবদাস’। উপন্যাসটি প্রেমমূলক। কৌলীন্য ও বিত্তের গর্বে, অভিভাবকদের অহমিকায় দেবদাস ও পার্বতীর গভীর  অনুরাগের রঙিন মুহূর্তগুলো এখানে পরিণতির পূর্বেই ব্যর্থতায় সমাপ্ত। পার্বতীকে না পেয়ে বিরহী দেবদাস হল মদ্যপ, বিপথগামী। গণিকা চন্দ্রমুখী তার প্রেমে ও সেবায় নিজেকে নিঃশেষ করেও দেবদাসকে অবক্ষয়ের বিকার থেকে বাঁচাতে পারল না। দুটি জীবন নষ্ট হয়ে যাওয়া এবং নারীর সতীত্ব রক্ষার প্রচলিত ধারণার বিপক্ষে এখানেই প্রথম সমাজ-সমালোচনার সুর শোনা যায়। এই সুর ‘চরিত্রহীন’, ‘গৃহদাহ’ এবং ‘শ্রীকান্ত’-এ আরো সোচ্চার হয়েছে প্রবলভাবে। ‘চরিত্রহীন’ সমাজনীতির পটভূমিকায় ব্যক্তিচরিত্রের জীবনবাসনা ও নীতিবোধের দ্বন্দ্বের চিত্র। মানুষের চরিত্রে আছে দুটি সত্তা-স্বাধীন, আর এক পারিপার্শ্বিক সমাজনীতির অধীন। এই দুই সত্তার সংঘর্ষ ও সমন্বয়ে গড়ে ওঠে জীবন ও চরিত্র। শরৎচন্দ্র এই উপন্যাসে মানবচরিত্রের এই দুই সত্তার দ্বন্দ্বময় স্বরূপ প্রকাশ করেছেন, দেখিয়েছেন মানবচরিত্রের আলোচনা বা বিচার আর কোনো একটি দিকের দ্বারা সম্পূর্ণ হতে পারে না। যে মানুষ এই দুই দিকের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করতে পারে সে-ই এই সংসারে যথার্থ চরিত্রবান, যে পারে না তাকেই আমরা বলি ‘চরিত্রহীন’। এই সামঞ্জস্য বিধানে ব্যর্থ ব্যতিক্রমী চরিত্রই এই উপন্যাসে কিরণময়ী। সে যেমন রূপবতী, তেমন প্রখর বুদ্ধিশালিনী। সতীশের কাছে তার সৃষ্টিতত্ত্ব ব্যাখ্যা, সনাতন ধর্মগ্রন্থ সম্পর্কে প্রশ্ন করা এবং মোহমুক্তভাবে সমাজ-সমালোচনা এই উপন্যাসের অনন্য ফলশ্রুতি। মহিম ও সুরেশের আকর্ষণে পথভ্রান্ত অচলার ভারসাম্যহীন জীবনের পরিচয় ‘গৃহদাহে’ অভিব্যক্ত। আবেগের তীব্রতা, নারীর দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, পাপপুণ্য, নীতিবোধ, সংস্কারাচ্ছন্ন চিত্তের প্রকাশে নারী-মনের সুগভীর মনস্তত্ত্ব এখানে বিবৃত।  ‘শ্রীকান্ত’ লেখকের অনন্য  জীবন-বিন্যাস ও সুগভীর চিন্তার ফসল। এখানে অন্নদাদিদি, নিরুদিদি, ইন্দ্রনাথ, নতুনদা, ভয়া ইত্যাদি বিচিত্র চরিত্রের পাশে শ্রীকান্ত-রাজলক্ষ্মী এবং কমললতার কাহিনী অসাধারণ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। একদিকে সমাজ-সমস্যা ও নীতি-দুর্নীতির উপস্থাপনায় এই উপন্যাস ‘ট্র্যাজিক’ রূপে স্বীকৃত, অন্যদিকে স্মৃতিচারণার সুরে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার প্রকাশে ‘আত্মজীবনীমূলক' উপন্যাসের  লক্ষণ সুস্পষ্ট। 

শরৎচন্দ্রে শেষ পর্যায়ের রচনাগুলো মুখ্যত বিতর্কমূলক। হৃদয়ধর্মের পরিবর্তে মননবৃত্তি বিশেষভাবে চোখে পড়ে ‘পথের দাবী’, ‘শেষ প্রশ্ন’, ‘শেষের পরিচয়’ প্রভৃতি উপন্যাসে। পথের দাবীতে সব্যসাচীর বিপ্লবী জীবনের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতায় এক সময় সারা দেশ তোলপাড় করেছিল। শেষ প্রশ্ন ও শেষের পরিচয়ে  কমলের মুখে বাচাতুর্য, ক্ষণ-আনন্দদায়ী জীবন সম্পর্কে তার মতামত একসময় বাংলাদেশে বিতর্ক ও সমালোচনার ঝড় তুলেছিল। তার বাক্শক্তির আঘাতে অক্ষয়ের হীনমন্যতা, বিলেত ফেরৎ আশুবাবু এবং ইঞ্জিনিয়ার অজিতের নতিস্বীকার দেখে অনেকেই কমলকে ‘বিদ্রোহিণী’ বা নারী-স্বাধীনতার প্রবক্তা ভেবেছিলেন। 

শরৎচন্দ্রের ‘শেষের পরিচয়’ উপন্যাসটি অসমাপ্ত। মাত্র পনেরোটি পরিচ্ছেদের তিনি রচয়িতা, বাকী ছাব্বিশ পরিচ্ছেদ লিখে তার স্নেহধন্য সুলেখিকা রাধারাণী দেবী উপন্যাসটি সমাপ্ত করেন। এই উপন্যাসেও শরৎচন্দ্র সবিতা চরিত্রের মাধ্যমে বিবাহিতা নারীর সতীত্ব-প্রেম ও দেহবাসনার দ্বন্দ্ব দেখিয়েছেন। 

শরৎচন্দ্রের  লেখার সার্থকতা ও মহত্ত্ব এইখানেই তিনি মানুষকে ভালোবাসতে পেরেছিলেন, শরৎচন্দ্রের কৃতিত্ব এইখানেই তিনি সত্যের শক্তিকে ধারণ করতে পেরেছিলেন। সত্যের শক্তিকে অসংখ্য মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের স্পৃহা জাগিয়ে তুলেছেন। সবশেষে বলতে হয়  সুভাষচন্দ্র বসুর ভাষায়, ‘একাধারে তিনি ছিলেন একজন আদর্শ লেখক, আদর্শ দেশপ্রেমিক ও সর্বোপরি আদর্শ মানব।’ মানব সমাজের বিশেষ করে পল্লী সমাজের দুঃখ বেদনা, অসঙ্গতি, কুসংস্কার শরৎচন্দ্রের মত এত সুন্দর ও সাবলীল ভাষায় প্রকাশ করা আর পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠেনি আজ অবধি।

আজকালের খবর/আরইউ









Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor@gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor@gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft