সোমবার ১ জুন ২০২৬
যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং একচল্লিশের বাংলাদেশ
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২২, ৫:৩১ পিএম   (ভিজিট : ১২৬০)
অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো একটি দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, উপযুক্তকরণ এবং টেকসই করা। অর্থাৎ কোনো দেশের উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা সেদেশের অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব বিস্তার করে। পিছিয়ে থাকা অঞ্চল বলতে সাধারণত সেসব অঞ্চলকে বোঝানো হয় যেসব অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো নয়। সুবিধামতো সময়ে পণ্য পরিবহন করা যায় না, শিল্প কারখানা গড়ে ওঠার অনুকূূূূূল পরিবেশ থাকে না এবং এসব কারণে বেকারত্বের হারও থাকে বেশি। এসব কারণে সেই পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলোকে দেশের অগ্রসরমান অঞ্চলের সাথে যুক্তকরণ আবশ্যক হয়। 
পণ্য উৎপাদন এবং পণ্য সরবরাহের ওপর নির্ভর করে পণ্যের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তি, পণ্যের সুষম বণ্টন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন। সুষম উন্নয়ন বলতে বোঝায় সব অঞ্চলের উন্নয়ন। আওয়ামী লীগের ক্ষমতায়নের সময়কালে যোগাযোগ ক্ষেত্রে বিপ্লব সাধিত হয়েছে। যমুনা সেতু, পদ্মা সেতু, মধুমতি সেতু, মহাসড়কের উন্নয়ন, গ্রামে-গঞ্জে পাকা রাস্তা হওয়া, বঙ্গবন্ধু টানেল টানেল, মেট্রোরেলসহ যোগাযোগ ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালীকরনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। 

২০০৮ সালের ১২ ডিসেম্বর দিনবদলের ইশতেহার তুলে ধরেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। ওই ইশতেহারে ‘রূপকল্প ২০২১’  শিরোনামে বাংলাদেশের উন্নয়নে আওয়ামী লীগের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়েছিল। দিন সত্যিই বদলেছে। বাংলাদেশের প্রতিটি কোনায় ডিজিটালাইজেশনের ছোঁয়া পৌঁছে গেছে। বঙ্গবন্ধু কন্যা তার কথা রেখেছেন। বিশে^র অর্থনৈতিক চলমান দুর্যোগের মধ্যেও বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেকটাই স্থিতিশীল রয়েছে। এখন ২০৪১ সালে আজকের বাংলাদেশকে উন্নত দেশে পরিণত করার প্রচেষ্টায় অগ্রসর হচ্ছেন। সে হিসেবেই দেশের মানুষের গড় আয় বেড়েছে। বৈশি^ক অর্থনৈতিক দুর্যোগের মধ্যেও আমরা অর্থনীতির গতি এগিয়ে নিতে পারছি। পদ্মা সেতুর মতো বৃহৎ এ নির্মাণযজ্ঞ শেষ হওয়ার সাথে সাথে বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। 

পদ্মা সেতুর প্রথম স্প্যান থেকে শুরু করে এক একটি স্প্যান বসেছে আর আমরা একটু একটু করে স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়েছি। এখন ছয় দশমিক ১৫ কিলোমিটারের দীর্ঘ এই অবকাঠামো আমাদের চোখের সামনে। একটি বিশাল প্রমত্তা নদী। প্রমত্তা এই নদীকে আয়ত্ত্বে এনে তার বুকে ছয় কিলোমিটারের বড় একটি সেতু তৈরির পরিকল্পনা একটি সাহসী পদক্ষেপ। পদ্মা সেতু নির্মাণে ছিল বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ। এই সেতু তৈরিতে এমন কিছু প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যেগুলোর ব্যবহারিক প্রয়োগ বিশে^ খুব একটা হয়নি। এই সেতু নির্মাণে নদীর তীব্র স্রোত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারী এসব কিছু মিলিয়ে দীর্ঘ এতগুলো বছর নানা বন্ধুর পথ পার হতে হয়েছে। একসময় পদ্মা সেতু নিয়ে গুজবও ছড়িয়েছিল। সেটাও মোকাবেলা করতে হয়েছে। যার একুল-ওকুল একসময় দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলাগুলোকে আলাদা করে রেখেছিল। মূলত যোগাযোগের কারণেই এ অঞ্চলের প্রতি বড় বড় বিনিযোগকারীদের আগ্রহ ছিল কম। জমির দামও কম ছিল। সেখান থেকে পণ্য ঢাকায় আনতে উৎপাদন খরচ বেশি পরে যেতো। মোটামুটি অবহেলিতের মতো একটা অবস্থা ছিল। একটি দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়া অর্থ সেই দেশে বহুমুখী খাতে উন্নয়ন ঘটা। অনেক বেকার জীবনের অবসান হওয়া। ব্যবসায়ে বৈচিত্র্য আসা।

বিশেষভাবে দক্ষিণাঞ্চলের পিছিয়ে থাকা জনপদের জীবনযাপনের ধরন পাল্টে যাওয়ার সাথে সেই অঞ্চলের সাথে যুক্ত হবে পশ্চিমাঞ্চল। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের যে দৃঢ় পদক্ষেপ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা করেছিলেন আজ দেশবাসী এবং বিশ^ তার বাস্তবায়ন দেখতে পারছে। ১৯৯৮ সালে আওয়ামী লীগের ক্ষমতাকালীন সময়েই বঙ্গবন্ধু সেতু পায় দেশবাসী। এর ফলে যেমন উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোর সাথে রাজধানীর যোগাযোগ সহজ হয়, দ্রুত হয় এবং পণ্য আনা-নেওয়ায় গতি আসে সেভাবেই পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় দেশের অর্থনীতির পালে নতুন গতির সঞ্চার হবে। একজন কৃষক তার ফসল খুব দ্রুত রাজধানীতে পৌঁছাতে পারবেন, মৎসচাষীও একই সুবিধা পাবেন, রাস্তার পাশে বড় বড় হোটেল এবং সেখানে বিপুল মানুষের কর্মসংস্থান হবে, পরিবহন সেক্টরে গতি আসবে। ব্যবস্থা-বাণিজ্য, কৃষি, শিল্প, পর্যটনসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই উন্নয়ন হওয়ার সাথে সাথে বিপুল কর্মসংস্থান হবে। সেতুর দুই পাড় ঘিরে ইতোমধ্যেই সাজ সাজ রব উঠেছে। প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে পিছিয়ে থাকা অনেক এলাকা। একসময় দূরত্ব দক্ষিণাঞ্চলে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একটি প্রতিবন্ধকতা ছিল। এখন সেই প্রতিবন্ধকতা কেটে গেছে। দক্ষিণাঞ্চলের পর্যটন স্থান সমৃদ্ধ একটি জেলা হলো বাগেরহাট। যেখানে রয়েছে বাগেরহাটের মসজিদ, সুন্দরবনসহ দেশসেরা কয়েকটি পর্যটনকেন্দ্র। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত এবং কম সময় লাগায় এখন সেসব স্থানে আরো বেশি পর্যটক আসছে। রয়েছে মোংলা বন্দর। সেখানে কয়েটি সিমেন্ট ফ্যাক্টরি চালু হয়েছে। গার্মেন্টস সহ রপ্তানিমুখি শিল্পকারখানা চালু হয়েছে। পদ্মা সেতুর শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্ত নাওডোবা ও শীবচরের কতুবপুরে একশ ২০ একর জমিতে গড়ে উঠেছে শেখ হাসিনা তাঁতপল্লী। 

যোগযোগ ব্যবস্থা অর্থনৈতিক উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু। এর গুরুত্ব অনুধাবন করেছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী। মধুমতি ও শীতলক্ষ্যায় নির্মিত সেতু উদ্বোধনকালে তিনি জানান, সমগ্র বাংলাদেশ সফর করে তিনি যে বিষয়টি অনুধাবন করেছেন তা হচ্ছে সর্বাগ্রে প্রয়োজন যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন। যা সাধ্যমত তিনি করে চলেছেন। মধুমতি নদীর উপর নির্মিত হয়েছে দেশের প্রথম ছয় লেন বিশিষ্ট মধুমতি সেতু এবং নারায়ণগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদীর ওপর বীর মুক্তিযোদ্ধা একেএম নাসিম ওসমান সেতু। যতদিন কোনো অঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিকূল থাকে ততদিন সে অঞ্চল শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে পেছনে থাকে। সেই সাথে দেশের অর্থনীতিও সেই অঞ্চল থেকে লাভবান হয় না। ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন সর্বাগ্রে প্রয়োজন। আর তার জন্য প্রয়োজন ইচ্ছাশক্তি। 

মধুমতি সেতুর উদ্বোধনের সাথে দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের ১০ জেলার মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নয়নের পাশাপাশি তাদের ভাগ্য উন্নয়নেরও সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার হবে এবং পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলো উন্নয়নের আওতায় আসবে। মধুমতি সেতু চালুর ফলে খুলনা বিভাগের ১০ জেলা অর্থাৎ খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, যশোর, নড়াইল, মাগুরা, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর, চুয়াডাঙা, কুষ্টিয়া জেলায় যাতায়াত সহজ হবে। ঢাকা যেতে সময় কমবে দুই থেকে তিন ঘন্টা। অনেক আশার মেট্রোরেল চলাচল শুরুর কাছাকাছি। ইতোমধ্যেই ভাড়ার তালিকাও প্রকাশ করা হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরেই এটা চালু হতে পারে। এটাই প্রথম বিদ্যুৎচালিত কোনো রেল চালু হতে যাচ্ছে দেশে। এটা যখন পুরোদমে চালু হবে তখন রাজধানীর যানজটের তীব্রতা অনেকাংশেই কমে আসবে। এমনটাই আশা করা হচ্ছে। এটা হলে কাজে গতি আসবে। গাড়িতে কোনো সময়ের অপচয় হবে না। কাজগুলো সঠিক সময়েই করা সম্ভব হবে। 

অর্থাৎ এখানেও অর্থনীতি লাভবান হবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল বা কর্ণফুলি টানেল চট্টগ্রাম বন্দর ও আনোয়ারা উপজেলাকে সংযুক্ত করার সাথে সাথে ঢাকা ও চট্রগ্রামের মধ্যে দূরত্ব কমাবে এবং ঢাকা ও চট্রগ্রামের মহাসড়কের সাথে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সংযোগ সৃষ্টি হবে। নদীর দক্ষিণে আনোয়ারায় রয়েছে সিইউএফএল, কাফকো, কোরিয়ান ইপিজেড, প্রস্তাবিত চায়না ইপিজেড, পারকি সমুদ্র সৈকত। কর্ণফুলী পেরিয়ে আনোয়ারা দিয়েই কক্সবাজার, বাঁশখালীও মাতারবাড়ি বিদুৎকেন্দ্র এবং মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দরে যেতে হয়। এই টানেলের কাজও প্রায় শেষ। টানেল নির্মাণকে কেন্দ্র করে কর্ণফুলীর দক্ষিণ পাড়ে গড়ে উঠছে বড় বড় শিল্প কারখানা। বাণিজ্য নগরী চট্টগাম এরপর পাল্টে যাবে আরো অনেকখানি। সেই সাথে দেশও এগিয়ে যাবে। এই টানেল বন্দর নগরীতে ব্যবসায়ের গতি বৃদ্ধি করবে। এগিয়ে যাওয়ার একটি দেশের চিত্র আমাদের সামনে। এর মূলে রয়েছে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। এই দূরদর্শী চিন্তাচেতনাই নিশ্চিতভাবে বাংলাদেশকে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করবে। 
 
অলোক আচার্য : সাহিত্যিক ও কলাম লেখক। 
আজকালের খবর/আরইউ









Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor@gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor@gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft