শুক্রবার ২২ মে ২০২৬
ভয়
প্রকাশ: শনিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২২, ৩:২৩ পিএম   (ভিজিট : ১০১০)
সে বছর সম্ভবত উনিশ একাশি বা বিরাশি, একটি ভয়ঙ্কর গুজব নাকি অমীমাংসিত ঘটনা; যা সত্য কিংবা মিথ্যা জানা নেই, মানুষের মুখে মুখে প্রচারিত হয়েছিল। সেই প্রেক্ষিতে সন্ধের পর পর একটু রাত হতে হতে শহরের রাস্তা, জনাকীর্ণ মোড়, সিনেমাহলের প্রশস্ত চত্বর ইত্যাদি প্রায় জনশূন্য হয়ে যেতে থাকে। বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার বেশিরভাগ বাড়ির জানালা বন্ধ, এমনকি দরজাও। সকাল-দুপুর আর বিকালে সেইসব গল্প, আর সন্ধ্যের ছায়া নামতে নামতে বুকের মধ্যে ফিকে আতঙ্ক বা ভয় ভর করে। গোলাম মওলা এসব মোটেই বিশ্বাস করে না। তার মতো অনেকেই আছে। তারা তেমন দিনকালেও জনবিরল রাস্তায় অনেক দূরে দূরে ঠাঁয় দাঁড়ানো লাইটপোস্টের শিখরে ক্লিয়ার বালবের ম্লান আলোর মতো দোকান খুলে বসে থাকে, যদি দু-চারজন গ্রাহক এসে যায়। মওলা এইফাঁকে সারাদিনের আয়-রোজগারের হিসাব সেরে ফেলত আর আশ্চর্য এরমধ্যেও মডার্ন সিনেমা হলে রাতের শো শুরু হয়। হলের টিকিট কাউন্টারের মাথার ওপর এবং বাইরে বক্স লাউডস্পিকারে গান বাজতে বাজতে ভেতরে ট্রান্সফার হয়। ‘তুমি যে আমার কবিতা, আমারও বাঁশির রাগিণী।’ মওলা পা-দোলানি বন্ধ করে একবার বাইরে দৃষ্টি ছড়িয়ে দেখে নেয়। মানুষজন বেহুদা গুজব বা আতঙ্ক ছড়ায়। তারপরও মনের মধ্যে একটু জু-জু বুড়ির আশঙ্কা রাস্তায় নেমে বাড়ি যেতে যেতে হয় বইকি! মানুষজন ভূত বিশ্বাস করে না, তবে রাতে নির্জন-নিরিবিলি রাস্তা কিংবা বাড়িফেরার গলিতে নেমে ঝোপঝাড় দেখে সামান্য হলেও ভয় পায়।
মওলার সারা দিনের বেচা-বিক্রির হিসাব শেষ। তারপরও আর এক-আধ ঘণ্টা থাকার ইচ্ছে। এত সকাল সকাল ঘরে ফিরে যেতে মন চায় না। রাত ৯টাতে তো নয়। এখন সবে পৌনে আট। আজও রাস্তায় মানুষজন গত কয়েকদিনের মতোই, কম নয় আবার ভিড়ও না। উত্তরাঞ্চেলের প্রত্যন্ত মফস্বল শহরে আর কত মানুষজন হবে বা হতে পারে? পাশের ফার্মেসিও বন্ধ হচ্ছে প্রায়। নাকিব মিয়া টেবিলের দেরাজ টেনেটুনে লক করছে। মওলা তখন বুঝে নেয়, এই মানুষ একটু নয়, বরং বেশিই ভিতু। রাত ৯টায় দোকান বন্ধ করে, তবে আজ এখনই! মওলা একগাল নিশ্চুপ হেসে বাতাসে জিজ্ঞাসা ছুড়ে দেয়,-
‘কী নাকিব ভাই বাড়ি ফিরছেন নাকি? সেই গুজবের কি কোনো সুরাহা হলো? থানা কী বলে?’
‘বাড়ি না, হাসপাতাল যাব, শালার বউ ভর্তি হয়েছে বিকেলে। একটু খোঁজ নিয়ে আসি।’
‘সেই তো কোনো সিরিয়াস অসুখ?’
‘ডেলিভারি কেস। বিকালে নাকি পেইন উঠেছে।’
‘ও আচ্ছা, যান যান, আল্লাহ ভালোয় ভালোয় সব ঠিক করে দিক।’
‘এদিকে আবার রক্তশোষক...কি যে যন্ত্রণা! এরপর উলটো পথে বাড়ি ফেরা, রিকশাও মেলে না।’
‘ওসব বিশ্বাস করেন নাকি?’
‘ভাই যা রটে তার কিছু তো বটে! গতরাতে আমার পাড়ায়, এই ধরেন রাত সাড়ে দশ কি এগারো কেউ পাশের বাড়ির ছাদে ট্যাংকির কাছে একজনকে দেখেছে। কালো পোশাক, রক্তজবার মতো চোখ, কেউ কেউ জানায়, লম্বা কালো ছায়া টর্চলাইটের মতো সরু ফোকাস ফেলে দেখছে। আচ্ছা শিশুদের রক্তই নাকি নিচ্ছে শুনলাম।’
‘কি সব গাঁজাখুরি গল্প করছেন! কুকুর-বেড়ালের চোখও রাতে জ্বলজ্বল করে। কোনো বেড়াল দেখেছে মনে হয়।’
‘না রে ভাই, এলিয়েন হতে পারে। মানুষের রক্ত নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে বোধহয়।’
‘ফ্যান্টাসি আর সায়েন্স ফিকশন পড়ে পড়ে মাথা গেছে আপনার। হা হা হা!’
‘হা হা হা! এখন শোনেন কোথায় সদর হাসপাতাল আর কোথায় রাজবাড়ি-গুঞ্জাবাড়ি। রাস্তায় অনেক কয়টা ল্যাম্পপোস্টে আলো নাই, সামনে আগাছা ঝোপঝাড়, রিকশা যেতে চায় না। ভয় লাগে। এলিয়েন আবার এসে পড়ে নাকি!’
‘আর আপনাকে যদি তুলে নেয়। হা হা হা! নাকিব ভাই আপনি আগেভাগে কাজ সেরে বাসায় যান। আমিও ফিরব একটুপর। ছবির শো শেষ হোক।’
‘আচ্ছা সেকেন্ড শো চলছে?’
‘চলছে তো।’
নাকিব মিয়া চলে গেলে মনে হয় আস্ত এক ছায়া চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মওলা প্রথমত একটু থতমত খেয়ে দৃষ্টি সরু করে তাকিয়ে দেখে, ভূষণ পাগলা দোকানের সামনে। তার পরনে যথারীতি একটুকরো ল্যাঙট, আবছায়া রাতে ফিকে সাদা চকচক করছে যেমনভাবে গায়ের গন্ধ ভুরভুর। ভূষণ কী ভেবে কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক তাকিয়ে উত্তরে দৌড় দেয়। মওলার ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে। একবার বকবক শুরু হলে থামতে চায় না পাগল। নামেই পাগল, হুঁশের নাড়ি টন-টনা-টন। কিছু না কিছু আদায় করেই ছাড়বে।
মওলা এবার পুনরায় খবরের কাগজে মনোনিবেশ করে। অতীতদিনের কোর্টকাচারির উপর ফিচার। আজ দুপুরে জেলখানায় প্রকাশ্যে এক ব্যক্তিকে চাবুকের দশটি ঘা মারা হয়েছে। অপরাধ? তেরো বছরের এক কিশোরীর শ্লীলতাহানি। একজন জল্লাদ, সেই রাজা-বাদশাহঅলা ছায়াছবির মতো দশাসই শরীর আর কিম্ভুত-নিষ্ঠুর চেহারার, সে এগিয়ে এসে তেল চপচপে শংকর মাছের লেজের চাবুক ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আঘাত করে অপরাধীকে। অপরাধী ব্যক্তিকে ইজেলের মতো কাঠামোর ফ্রেমে দু-হাত বেঁধে উপুড় করে রাখা হয়েছে। প্রায় উলঙ্গ, একটি লাল গামছা কোমরে জড়ানো মাত্র। তারপর বাতাসে চাবুকের সপাং সপাং শব্দ তুলে আঘাত আর সঙ্গে সঙ্গে আর্তনাদ। মানুষজন দেখছে, নিষ্ঠুর মজা, এক-দুই-তিন করে পাঁচটি চাবুকের পর আর্তনাদ থেমে গেল। আর কোনো আর্তনাদ কিংবা শব্দ নেই। মানুষটি বেঁচে আছে কি না মরে গেছে বোঝা মুশকিল। ডাকতার পরীক্ষা করে দেখে নেবে। তার আগে ১০টি আঘাত শেষ হতে দাও। শরিয়াহ আইন বলে কথা। এই ঘটনা অনেক অনেক আগের। সম্ভবত উনিশ শ চৌষট্টি খ্রিস্টাব্দ। এরমধ্যে অন্তত সতেরো-আঠারো বছর পেরিয়ে গেছে। তখন মওলা বাংলা স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। সে বছর আরও অদ্ভুত কিছু ঘটনার অভিজ্ঞতা হয়। মওলার চোখের সামনে স্থানীয় সাপ্তাহিকের অবয়ব-কাঠামো ঝাপসা হতে শুরু করে। সচিত্র ইতিহাস ফিচার অদৃশ্য।
উনিশ শ তেষট্টি সাল, জানুয়ারির প্রথম সোমবার। বাবা সাইেকেল বসিয়ে নিয়ে চলেন বাংলা স্কুল। গোলাম মওলা প্রাইমারির একদল হট্টগোলপ্রিয় ছেলেমেয়ের সঙ্গে পড়ায় মনোযোগ দিতে পারে না। তারপর পরিবেশও ভালো নয়। মওলার নাম সেখান থেকে কাটিয়ে ভর্তি করা হলো শহরের অন্যতম বিখ্যাত স্কুলে। সেই স্কুল আঠারো শ সাতান্ন খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত। সেই বছর সিপাহি বিদ্রোহ হয়েছিল না? অবশ্যই। সতেরো শ সাতান্ন খ্রিস্টাব্দে পলাশীর আমবাগানে বাংলার স্বাধীনতা সূর্য অস্ত যাওয়ার একশত বছর পর সেই বিদ্রোহ। বন্দুকের কার্তুজে গরুর নাকি শূকরের চামড়া বা চর্বি ব্যবহার করা হয়েছে এই সন্দেহ নিয়ে শুরু। প্রথম প্রাণ গেল মঙ্গল পান্ডের। তাকে ঝোলানো হলো। সেই ইতিহাস মনে অদ্ভুত অনুরণন তুলে যায়। মওলা শান্তশিষ্ট সুবোধ বালক। সাইকেল থেকে নেমে দৃষ্টির চকচকে ধারে চিনে নিতে থাকে বিশাল স্কুল ভবন। প্রধানশিক্ষক এম এ রাজ্জাক জিজ্ঞেস করেন, -
‘হোয়াট ইজ ইয়োর নেইম?’
‘মাই নেইম ইজ আহমেদ গোলাম মওলা।’
‘গুড।’
এম এ রাজ্জাক তারপর অন্যদিকে তাকিয়ে কাউকে ডাকেন। একজন বৃদ্ধ এসে জিজ্ঞাসু তাকান। মানুষটির প্রশস্ত কাঁধ সামনে বেশ ঝুঁকে পড়েছে। অনেক বয়স বুঝতে অসুবিধা হয় না, অথচ দৃষ্টিতে শিশুর মতো অদ্ভুত সরলতা। আপন আপন মনে হয়। মানুষের বয়স বেশি হলে শিশু হয়ে যায় কথা সত্য।
‘একে ক্লাস থ্রি-তে দিয়ে আসেন চাচা।’
‘আসো বাবু।’
মওলা সকাল সকাল স্কুল যায়। ক্লাস থ্রি-ফোর আর ফাইভের রুম উত্তর-দক্ষিণ, তার পেছনে পাওয়ার হাউসের বিশাল মেশিন সারা দিনরাত দপ দপ শব্দে চলতে থাকে। উত্তরে একটি ডোবা। সেখানে প্রায়শ হাঁটুপানি। ময়লা কুচকুচে কালো। তার পেছনে শিমুল গাছের নিচে দু-চারটি ঘর। সেখানে মেথরের বসবাস। তারা শহরের ড্রেন আর সার্ভিস ল্যাট্রিন পরিষ্কার করে। মওলা অনেক আগে স্কুলে গিয়ে সামনের বেঞ্চে বই রেখে আশপাশ ঘুরে ঘুরে এসবই দেখে নেয়। কোনোদিন বাইরে পেয়ারা কি কুল গাছে উঠে দু-একটি ফল হাতড়ায়। তারপর ক্লাসে নিশ্চুপ বসে থাকে। ক্লাসরুমের পুব-জানালার ছিটিকিনি থিরথির কাঁপে। ঝিন ঝিন শব্দ হয়। সেদিনও আগে আগে স্কুলে হাজির। সে-সময় শাহাবুদ্দিনও এসে গেছে। এটা-ওটা কথা শেষে বলে, -
‘এই স্কুলে ভূত আছে জানিস? আমি দেখেছি।’
‘যাহ্! ভূত আবার আছে নাকি? ওসব সিনেমায় দেখায়।’
‘আমি একদিন সবার আগে স্কুলে এসেছিলাম। পেয়ারা গাছে উঠে কাছের ডালটা ধরতে গেছি, দেখি মাথার ওপর দিয়ে একটা সাদা কাপড় উড়ে গেল। একপলক...বুঝলি, আর দেখতে পেলাম না; ওটা হলো পেত্নির শাড়ি। পেত্নি চিনিস? শাকচুন্নি? এরা স্ত্রী ভূত। ভূত আছে বলেই আমাদের ক্লাসের ওই জানালাদুটো কাঁপে, তুই জানিস না? বুদ্ধু কোথাকার!’
‘ওটা তো পাওয়ার হাউসের মেশিনের শব্দে কাঁপে। সারাদিন দুম-দাম শব্দ।’
‘তুই কিছু জানিস না। বুদ্ধু!’
এর দু-বছর পর সবে দুটো পিরিয়ড হয়েছে, তৃতীয় শুরু হচ্ছে বলে আর, তখনই আকস্মিক হই-হই গোলমাল। মওলা সকলের মতোই ছুটে বের হয়। ক্লাস ফোরের কে যেন অজ্ঞান হয়ে গেছে। সে নাকি কাউকে দেখেছে। একজন অদ্ভুত মানুষ। তার সারা শরীর কুচকুচে কালো। ভয়ংকর চেহারা। বড় বড় চোখ, চোয়ালের একপাশ কাটা, মাংস নেই, সেখানের সবকটি দাঁত আর মাঢ়ি দেখা যাচ্ছে। এই বীভৎস ভূত সাকিবের কাছে টিফিন খেতে চেয়েছিল। মওলা এই গল্প শুনে ভড়কে যায়। স্কুলে পরের দু-দিন আর গেল না। সে-সময় শহরে জোর গুজব নাকি কল্পগল্প কে জানে, অদ্ভুত আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। শহরের লালবাগে খুব ভোর ভোর কেউ একজন বাড়ির দরোজায় টোকা দিয়েছে। বাড়ির গৃহকর্ত্রী কেউ এসেছে ভেবে দরোজা খুলে দেখে বড় বড় চোখ ভয়ঙ্কর দর্শন একজন মানুষ সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তারও বাঁ-গালের একপাশে মাংস নেই, সবগুলো দাঁত আর রক্তাক্ত মড়ি দেখা যাচ্ছে। সে মানুষের মতো কিন্তু মানুষ নয়। মহিলা দেখে ধড়াম করে পড়ে অজ্ঞান। এই ঘটনা ছড়িয়ে গেল শহরের আরও অনেক জায়গায়। কেউ নিজে দেখেছে, কেউ অন্যের দেখা গল্প এক নিঃশ্বাসে বলে জোরে জোরে হাপায়। কারও কথায় ভূত, কেউ বলে লালবাগ গোরস্তানের কোনো লাশ কবর থেকে উঠে এসেছে; কারও মতে সব উর্বর মস্তিষ্কের কল্পনা। সেই ঘটনার কোনো সমাধান হতে না হতে এসে জুটল আরেক আতঙ্ক। কে বা কারা ঘুমন্ত মানুষের পায়ের পাতায় রং লাগিয়ে দিচ্ছে। মানুষ ঘুমের ঘোরে টের পাচ্ছে না। ঘুম থেকে জেগে দেখে, পায়ের পাতা অদ্ভুত রকম ফোলা আর অস্বস্তিকর অনুভূতি। কেউ কেউ জানাল, আলতা বা রং নয়, এ হলো রক্ত, কোনো অজানা অদৃশ্য প্রাণী মানুষের পায়ের তলা চেটে চেটে রক্ত শুষে নিচ্ছে। এরা হয়তো ভূত বা জিন কিংবা অন্য গ্রহের প্রাণী বা এলিয়েন।
আজ এই সন্ধেরাতে সেই গল্প কাহিনি মনে পড়ে যায়। শৈশবের কত আজব দিনকাল পেরিয়ে আসা হলো। সে-সময় ভোরে ঘুম থেকে জেগে পায়ের পাতা চেক করে দেখত। এই অভ্যেস ছিল অনেকদিন। পায়ের তালুতে সরষে তেল মাখানো হতো। কেউ ঘরের বাইরে দরোজায় টোকা দিলে বা ডাক দিলে গুনে নিত, কয়টি টোকা বা কতবার ডাক। ভূত-প্রেত কিংবা জিন নাকি দু-বারের বেশি ডাক দেয় না...দিতে পারে না। মওলা এখন এসব বিশ্বাস করে না, কিন্তু আজও ছোটবেলার ঘটনা-অঘটনা বিশ্বাস-অবিশ্বাস অদ্ভূত ভয়ের আছর বুকের মধ্যে ফেলে রেখেছে। কখনো সে-সব মাথাচাড়া দেয়। এরপর রয়েছে চৌরঙ্গি সিনেমাহলে বিবিধ হরর মুভি দেখার নেশা। উনিশ শ চুয়াত্তর কি পচাত্তর, কলেজে পা রেখে বুঝিবা বড় হয়ে যাওয়া স্বাধীন মানুষ, পাখির মতো খোলা আকাশে একেবারে ভেসে যায়...ভেসে যায়। সন্ধে থেকে রাত সিনেমাহলের আশপাশে ঘুরঘুর করতে করতে একসময় দৃষ্টিসীমায় লাল-নীল-হলুদ বর্ণিল ছায়াছবি। এইসব অ্যাকশন আর হরর মুভি দেখে রাতে ঘরে একাকী থাকতে পারে না। গলির শেষমাথায় পশ্চিম বাড়ির গাছে গাছে বাতাবিলেবু ফুলের সৌরভ ভেসে যায়, মওলার মনে হয় কোনো অচেনা পারিজাত আবহ। কোনো রাতে রিকশাঅলা গলির মধ্যখানে সওয়ারি নামিয়ে ফিরে যেতে যেতে সিগারেট কিংবা বিড়িতে টান দিলে বাতাসে ভেসে আসে ধূসর-নীল ধোঁয়ার গন্ধ। মওলা বেডে চমকে উঠে বসে, কেউ বুঝি শিয়রে বসেছিল, তার হাতে সিগারেট; ঘরময় ধোঁয়ার কুণ্ডলি। কখনো ঘুম থেকে আকস্মিক জেগে ওঠে। কেউ বুঝি কাছেই বসেছিল, তার হাতে নকশি পাখা। মাথায় বাতাস করছিল কি? সারারাত আর ঘুম নেই। মওলা জেগে জেগে ফ্যান্টাসি গল্প-উপন্যাস পড়ে, আর এদিকে ধীরে ধীরে রাত ভোর হতে থাকে। সবই অমূলক সবই তার অসম্ভব কল্পনার অবাস্তব জগত, তারপরও মনের মধ্যে কখনো কখনো জেগে উঠে শিরশির ভয়।
ইউনিভার্সিটি গিয়ে সেই আতঙ্ক বা ফেবিয়া আরো প্রকট রূপ ধারণ করল। হলের ইস্ট ব্লকের একেবারে দক্ষিণ কোণায় নিরিবিলি এক রুম। কুষ্টিয়ার মানুষ রুমমেট শওকত যখন-তখন বাড়ি যায়। মওলার ঘুম ঘুম চোখ হরর মুভির দৃশ্য দেখে, মনের মধ্যে অদ্ভূত আতঙ্ক। চোখের পাতা বুঝলেই মনে হয় কেউ একজন মশারির খুব কাছে এসে তাকিয়ে আছে। বীভৎস চেহারার উঁচু নাক কিম্ভুত ঢেউ তুলেছে মশারির নেটে। অতএব রাত জেগে থাকা ছাড়া আর কি করতে পারে মওলা! রুমের বাইরে উত্তর পাশে বাথরুম। সেখানে কোনো ট্যাপ লুজ। সারারাত টুপ টুপ শব্দে জল পড়ে। মওলার কানে অদ্ভূত শব্দমালা, কারও ফিসফাস ধ্বনি আর মৃদু কণ্ঠস্বর, কে বা কারা কী বলে কিংবা বলতে চায়; আর তারা কারা? মাথার ওপর অদ্ভুত শব্দ তুলে বনবন ঘোরে পুরোনো আমলের জিইসি ফ্যান। এপ্রিল-মে মাসের সেদ্ধ গরমেও হাত-পা কাঁপে মওলার। দিন কয়েক পর রুমমেট ফিরে এলে, এক-দুই কথার মধ্যে কোনফাঁকে বেরিয়ে আসে গোপন সব বিব্রতকর ইতিহাস। শওকত বলে, -
‘দূর আপনি এসব বিশ্বাস করেন? এ হলো মনের কল্পনা। মস্তিষ্কের অবচেতন স্তরের চিন্তন প্রক্রিয়া। অডিও হ্যালুসিনেশন। ভিজুয়াল তো কিছু দেখেন নাই...দেখেছেন নাকি আবার? শোনেন ভাই, এইসব হাবিজাবি গল্প-উপন্যাস পড়া বাদ দেন। সিনেমাও দেখবেন না। নামাজ পড়েন। ধর্মের বই পড়েন। পরকালের সওয়াব আর ইহকালের শান্তি।’
‘হ্যাঁ ভাই নামাজ পড়তে হবে। আগে দু-চারটা সুরা-দোয়া মুখস্থ করে নিই।’
‘আলহামদুলিল্লাহ্। আল্লাহ আপনার স্মরণশক্তি দিন। মনের শান্তি আনয়নে তওফিক দিন। আমিন।’
মওলার মাথায় আয়াতুল কুরসি পড়ে ফুঁ দেয় শওকত। মওলার ভালো লাগে। মনে হয় সকল ভয় হাজারও আতঙ্কের যবনিকা। আসলে মৃত্যুভয় হলো সকল আতঙ্কের উৎস। একদিন চলে যেতে হবে। সেজন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকা ভালো। শোনা যায়, আজরাইল নাকি প্রত্যেক বাড়িতে তিনবার ঢুঁ মেরে দেখে নেয়। লিস্টে কারও নাম আছে নাকি? সাত আসমানের উপর আয়ুর গাছ আছে, তার শাখায় শাখায় পাতায় পাতায় মানুষের নাম-পরিচয়-ঠিকানা লেখা। বসন্তে যেমন গাছের পাতা ঝরে যায়, সেই গাছের তলাতেও পাতার স্তূপ, পাতার উপর আদমজাতের নাম লেখা, যাদের আয়ু শেষ।
‘শোনেন রুমমেট, রাতে ঘুমাবার সময় আয়াতুল কুরসি পড়ে নিজের বুকে ফুঁ দেবেন। হাদিসে বলা আছে, এই দোয়া পড়লে ফেরেশতারা আপনাকে পাহারা দেবে। মাশআল্লাহ!’
কয়েকদিন পর হলের পশ্চিম ব্লকের মসজিদে নামাজ পড়তে শুরু করে মওলা। কোনো সমস্যা আর নেই। রাজশাহী শাহ মাখদুম মাযারের এক হুজুরের কাছে থেকে এক তাবিজ এনে হাতে পরেছে। ডানহাতের আঙুলে অষ্টধাতুর আংটি। রাতে ঘুমোবার সময় শিয়রের কাছে ট্যাক্সি মার্কা দেশলাই। ভূত-প্রেত-জিন আগুনকে এড়িয়ে চলে। অতএব দেশলাই থাকা চাই। তারপর শওকত দু-দিনের জন্য দেশে বাড়ি চলে গেলে সকলি গরল ভেল। সেই সমস্যা বাড়ি এসেও জেকে ধরে। 
সে-সময় কোনোদিন বিকালে গোর-এ-শহীদ ময়দানে আড্ডা জমে উঠে। আড্ডা চলে রাত আট-নয়টা পর্যন্ত। বাদামের খোসা ছাড়ানোর মতো হাজারও গল্প-গুলতাপ্পি। একদিন কীভাবে সন্ধের পরপর আচমকা জিন-ভূতের গল্প শুরু হয়। একেকজন নিজের অভিজ্ঞতা অথবা শোনা গল্প বলে জমিয়ে রাখে আসর। মওলা পিছিয়ে থাকে কেন? সেও শুরু করে বহুলশ্রুত এক গল্প। ইউনিভার্সিটি ভর্তি হয়ে দু-সপ্তাহ মেসে থেকেছিল। শের-এ-বাংলা হলের উত্তরে বিনোদপুর বাজার। সেই গল্প সেখানেই শোনা। 
শের-এ-বাংলা হলের কোনো এক ছাত্র, তার নাম জামিল বর্ষণমুখর সন্ধেয় শহরে ছায়াছবি দেখতে গিয়েছিল। সেদিন রাজশাহীর আকাশে থেকে থেকে বৃষ্টি। কখনো আবার পূর্ণিমার চাঁদ উঁকি দেয়। ছবি শেষ হতে হতে রাত দশটা। ওই সময় ভার্সিটির শেষ বাসও গ্যারেজে চলে গেছে। অতএব ফেরার জন্য রিকশা ছাড়া উপায় নেই। শহরের বর্ণালি সিনেমাহল থেকে ইউনিভার্সিটির আবাসিক হলের দূরত্ব আড়াই থেকে তিন কিলোমিটার। রিকশার ভাড়া খুব বেশি নয়। জামিল সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্র, এদিক-ওদিক দু-চারটি জার্নাল কিনতে কিনতে আরো রাত করে ফেলে। এদিকে বৃষ্টির কারণে রিকশাও তেমন নেই। তাই হেঁটে হেঁটে সাহেববাজার চলে আসে প্রায় আর নির্জন-নিরিবিলিতে একটিমাত্র রিকশা দেখতে পায় যেন তার অপেক্ষাতেই ছিল। সে কোনোরকম দরদাম না করে রিকশা যাবে কি-না জিজ্ঞেস করে উঠে বসে। তখন বৃষ্টি নেই। পূর্ণিমার চাঁদ তার রুপালি আলো ধূসর-কালো মেঘের মধ্যে অদ্ভুত মায়াজাল ছড়িয়ে দিয়েছে। জুন মাসের দিন কয়েকের প্রচণ্ড গরম শেষে বৃষ্টিভেজা বাতাস ভালো লাগে। তাই মন ফুরফুরে। সবেমাত্র দেখা ছবির কোনো গান মনের মধ্যে গুনগুনিয়ে উঠছে। চাঁদের আলোয় পত্রিকা পড়া যায় না জেনেও ছবি দেখতে দেখতে চলে আসে বেশ কিছু পথ। এরমধ্যে একসময় মনে হয়, রিকশা রাস্তার উপর নয়, যেন বাতাসে শূন্যে ভেসে ভেসে উড়ে যাচ্ছে। জামিল চমকে উঠে, এবং সব ক্লান্তি-অবসাদের ফল বিশ্বাসে উড়িয়ে দেয়। সে এবার রিকশাঅলার সঙ্গে গল্প শুরু করে। রিকশাঅলা বয়সী মানুষ। মাথায় বড় আকারের মোটা টুপি অথবা পাগড়ি, গালভরতি দাড়ি, বড় বড় দুটো চোখ এবং তার শরীর থেকে চেনা চেনা কিন্তু কিছুতেই নাম মনে পড়ে না তেমন অচেনা কোনো আতরের সুবাস ভেসে আসে।
‘আঙ্কেল এই বয়সে রিকশা চালান, ছেলেপেলে কেউ নাই?’
‘আছে বাবা, তার আলাদা সংসার। তিনটি সন্তান, ওদেরই খাবার দিতে পারে না, তাই আমাদের আলাদা করে দিছে।’
‘আহা! কেমন ছেলে আঙ্কেল, বুড়ো বাপ রিকশা চালায়, সেও এত রাতে! আপনের বাসা কোথায় আঙ্কেল? আবার তো ফিরে যেতে হবে।’
‘হ্যাঁ বাবা এই তো সামনে...তালাইমারি। বুড়াবুড়ি সেখানেই থাকি।’
‘ওহ হো! ফিরতে আধ ঘণ্টার মতো সময়। অনেকখানি রাস্তা।’
‘বাবাজি বুঝি নতুন?’
‘এই তো দু-আড়াই বছর হয়ে গেল। আর কত দূর আঙ্কেল?’
এইসব হাবিজাবি গল্প করতে করতে সময় কেটে যায়। তখন আকাশের চাঁদকে প্রগাঢ় মেঘপুঞ্জ ঘিরে নিয়েছে। পুনরায় ছায়া ছায়া অন্ধকার। রিকশা শের-এ-বাংলা হলের প্রায় কাছাকাছি এসে পড়ে। ইউনিভার্সিটিতে কী এক ভ্যাকেশন চলছে। ছাত্রদের আড্ডা-ভিড়-জটলা নেই। অবশ্য তেমন রাতে হওয়ার কথা নয়। হলের গেটে ষাট ওয়াটের ক্লিয়ার একটি বালব ফ্যাকাশে আলো ছড়িয়ে আঁধার দূরের চেষ্টায় ক্লান্ত। সেদিকে তাকিয়ে দেখতে দেখতে মনে হয় রাত বেশ গভীর। আশপাশে ঘুগড় আর উচ্চিংড়ের তারস্বর আওয়াজ। এত সময় লাগল সামান্য পথটুকু আসতে? জামিল রিকশা থেকে নেমে ওয়ালেট বের করে ভাড়া দিতে গিয়ে হাতে-পায়ে চমকে ওঠে। এ কাকে দেখছে সে? রিকশায় যখন উঠে বসেছিল, তখন তো এই লোক ছিল না। তার হাত দুটো এ রকম কেন? ঘোড়ার ক্ষুরের মতো। জামিলের হাত থেকে ১০ টাকার নোট আলগোছে ঝুলে পড়ে। সেদিকে তার কোনো লক্ষ্য নেই। সে চিৎকার করে ছুটতে ছুটতে হলের গেট পর্যন্ত গিয়ে ঢোকে। নাইটগার্ড দৌড়ে এসে জিজ্ঞেস করে, -
‘কী হলো জামিল ভাই? আপনি চিৎকার করলেন না?’
‘হ্যাঁ-হ্যাঁ, একটি রিকশাতে এলাম, লোকটার হাত কেমন জানি অদ্ভুত।’
‘কেমন-কেমন মানে? কোথায়? আচ্ছা তার হাতদুটো কি এমন?’
নাইটগার্ড হাসতে হাসতে তার দুটো হাত চোখের সামনে তুলে ধরে। চেহারায় অদ্ভুত কৌতুক। জামিল সেদিকে একপলক তাকিয়ে অজ্ঞান। কেননা সেই হাতদুটো ছিল রিকশাঅলার। ঘোড়ার পায়ের মতো চকচকে কালচে দু-পাটি ক্ষুর। এরপর বাতাসে অট্টহাসি ভেসে ভেসে ছড়িয়ে যেতে থাকে।
মওলা যেদিন এই গল্প শোনে, আর ভুলতে পারে না; তখন থেকে কখনো মনের মধ্যে জেগে ওঠে। সেদিন রাতে রুমে একা ছিল না। তাই ভয় লাগেনি, কিন্তু যখনই মনে পড়ে অদ্ভুত অনুভূতি হয়। সে যে আসলেই ভিতু প্রকৃতির মানুষ, এবং সেই ভয় অবাস্তব-অদেখা জগতের, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কেন এমন হলো? সে কি ভূত-প্রেত আর রূপকথার কল্পিত গল্প পড়ে? হরর মুভি দেখে? সে জানে না। বোধকরি নিরাপত্তাহীন জীবনের হাজারও ধাক্কা মনের সাহসকে কুণ্ডলিত করে থাকবে। গোর-এ-শহীদ ময়দানের আড্ডায় আরো একটি গল্প, গল্প নয় সত্য কাহিনি যার ব্যাখ্যা জানা নেই, বলতে গিয়েও থেমে যায়। থাক এ পর্যন্তই। সেই অভিজ্ঞতা ছিল অব্যাখ্যাত অতিপ্রাকৃত। কখনো কুলকিনারা করতে পারে না। 
হলের অডিটোরিয়ামে চব্বিশ ইঞ্চি সাদা-কালো টিভি চলছে। নাটোর উপকেন্দ্র থেকে বিটিভির অনুষ্ঠান প্রচার। কিছুক্ষণ পর শুরু হবে স্টারট্রেক, খুব টানে সায়েন্স ফিকশন ছায়াছবি; সে রিফ্রেশ হতে দ্রুত ইস্ট ব্লকের ফার্স্ট ফ্লোরের দক্ষিণ কোণার ওয়াশরুমে ঢোকে। অনেকে ডায়নিং-এ খেতে গেছে। মওলা ছবি দেখে খাবে এমনই হয়ে থাকে। সে-সময় ডায়নিং-এ ভিড়ও কম। হই-হট্টগোলের মধ্যে খেতে ভালো লাগে না। সে তড়িঘড়ি মুখ-চোখ ওয়াশ শেষে বাইরে বেরোয়। রেলিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে একবার নিচে তাকায়। এই ব্লকে হাসনাহেনার কয়েকটি ঝাড়, চমৎকার সৌরভ ছড়িয়ে দিয়েছে; এমন মুগ্ধতার মধ্যে তার শিরদাড়া বেয়ে ভয়ের হিম স্রোত নেমে যেতে থাকে। হাসনাহেনার ঝাড়ে চিকচিক করছে কী ওটা? তসবি? মওলা মনের মধ্যে সাহস এনে দোতলা থেকে দ্রুত নিচে নেমে আসে। হাসনাহেনা ঝাড় আর আশপাশে ভালো করে খুঁজে দেখে। কোথায় গেল? সেই তসবি নেই। সে একটু হতাশও হয়। নিশ্চয়ই অন্যকোনো সত্ত্বা বিশেষ ইঙ্গিত দিতে চায়। কে জানে আশ্চর্য প্রদীপ কিংবা তেলেসমাতি পাথরের মতো অসীম ক্ষমতা দেবে নাকি? তারপর অডিটোরিয়াম যেতে যেতে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে যে, সে বড় কল্পনাপ্রবণ। বেশি বেশি আজগুবি ভাবে। এখানে গ্রান্ডফ্লোরের ওয়াশরুম, কেউ হয়তো ভেতরে যেতে এখানে তসবি রেখেছিল, রাতের আলোয় জ্বলজ্বল করছিল ইরিডিয়াম, যা সে দেখেছে আর অন্যরকম ভেবে নিয়েছে, আসলে কিছু নয়; সেটির মালিক ফেরার পথে পুনরায় তুলে নিয়েছে। বস্তুত অব্যাখ্যাত ঘটনাগুলো যুক্তি দিয়ে মূল্যায়ন করে দেখলে অবাক হওয়ার যেমন কিছু থাকে না, আতঙ্ক বা ভয়েরও কিছু নেই।
মওলা সবই বোঝে, আবার সময়ে অবুঝের মতো আউলা হয়ে যায়। শহরে কয়েকদিন ধরে আশ্চর্য গুজব চলছে। রাতের আঁধারে কোনো আজব প্রাণী নাকি মানুষের রক্ত সংগ্রহ করছে। কেউ দেখেনি সেই প্রাণী, তবে আড্ডায় আসরে মুখে মুখে গল্প; সেটি নাকি ভাল্লুকের মতো, কালো-লম্বা আর লোমশ, কেউ বলে অপরাধী মানুষ। কোথাও আবার রং চড়িয়ে বলা হয়, প্রাণীটি তার রূপ বদলাতে পারে। কারও মতে শহরে এমন আতঙ্ক তৈরি করে চুরি-ছিনতাই-ডাকাতির পাঁয়তারা ইত্যাদি। প্রশাসন বা থানা থেকে কিছু বলা হয়নি...হচ্ছে না। 
প্রতিদিন ঘর থেকে বেরোবার সময় মা আর বোন সতর্ক বা সাবধান করে দেয়। বেশি রাত করার দরকার নেই। সন্ধের পর পর ঘরে ফিরতে হবে। মওলা তারপরও দোকানে বসে থাকে। সারাদিন বেচাবিক্রি তেমন হয় না। ওষুধের দোকানে রোগির আত্মীয়-স্বজন লম্বা প্রেসক্রিপশন সঙ্গে নিয়ে না এলে এই পঁচিশ-পঞ্চাশ পয়সার ট্যাবলেট কিংবা একটি-দুটি সাসপেনশন বিক্রি ছাড়া আয় নেই। সুতরাং ব্যবসারও বেশ ক্ষতি হতে শুরু করেছে। ফার্মেসি চব্বিশ ঘণ্টা খোলা রাখার নিয়ম, কিন্তু সেটি অনুসরণ করা যাচ্ছে না। এইসব ইত্যাদি ধরনের প্রভৃতি বা হাবিজাবি ভাবনার মধ্যে কখনো এই চিন্তাও আসে, আসলে এই গুজবের সত্যি সত্যি কিছু আছে নাকি সবই কোনো ষড়যন্ত্র? কার কার লাভ? সেই ভাবনার কোনো খেই মেলে না। সমাধান নেই। মানুষের জীবনে অনেক অঙ্কের সমাধান হয় না। এও যেমন সত্য আবার সেই কথা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না যে, চোখের সামনে অনেককিছুই অদৃশ্য থাকে। শ্রুতিতেও অনেক শব্দ ধরা দেয় না। The human eyes can only see between 430-770 THz. Our ears can only detect sound between 20Hz-20KHz. These ranges make up a fraction of the total sound and light frequency range. This means there is a lot going around that we cannot see or hear. এটিই কি তবে শেষ কথা অথবা অমীমাংসিত সত্য? মওলা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। রাত অন্ধকার হয়ে গেছে। সিনেমার শো শেষ হয়েছে অনেক আগেই। এবার ফিরতে হবে। সে দোকান বন্ধ করে রাস্তায় নেমে যায় আর কেবলই মনে হয় কেউ একজন যথেষ্ট দূরত্ব রেখে তার পেছন পেছন হেঁটে আসছে; নিবিড় দৃষ্টিতে লক্ষ্য করছে। কে সে? সেই রক্তশোষক অথবা অন্য কেউ...এলিয়েন? কোনো অশরীরী প্রাণ? মওলার অস্বস্তি লাগে। অদ্ভুত শিহরনে শরীর কেঁপে ওঠে। একবার পেছন ফিরে দেখবে নাকি সেই তেপান্তরের মাঠের মতো? যেখানে গল্প আছে, পেছন ফিরে তাকালেই নাকি পাথর হয়ে যায় মানুষ। তখন বাড়ি ফেরার নিরিবিলি রাস্তায় অন্ধকার ভালোমতো জেঁকে বসেছে।

আজকালের খবর/আরইউ









Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor@gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor@gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft