উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দ্রুত নগরায়নের পাশাপাশি জনসংখ্যা বেড়ে চললেও কমছে গাছপালা, বাড়ছে দারিদ্র্য। আবাসিক ও অনাবাসিক ভবনসহ ব্যাপক নির্মাণ কাজে শহরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আবাদি জমির সংকোচন ও গাছপালা কমে যাওয়ার ফলে বহু প্রজাতির পশু-পাখি, কীট-পতঙ্গ, গাছপালার ক্রমবিলুপ্তির কারণে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। ব্যাপক বনায়ন ও বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য উন্নত করা সম্ভব। কিন্তু শহরাঞ্চলে আবাদি জমি ও গাছপালা কমে যাওয়ায় বনায়ন ও বৃক্ষরোপণের সুযোগ নেই বললেই চলে। আমাদের নগরকে তাই পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে হবে। ছাদ ও বাড়ির আঙ্গিনা, খালি জায়গায় ব্যাপক ভিত্তিতে সবজি, ফল ও ফুল বাগান করা হলে বায়ু ও পরিবেশ দূষণ রোধ করা সম্ভব। গবেষণায় দেখা গেছে, একটি বাড়ির ২৫ শতাংশ জায়গা দখল করে থাকে ছাদ, যা মোটামুটিভাবে বলা চলে অব্যবহৃতই থেকে যায়। এক্ষেত্রে ছাদে বাগান করা হলে জায়গাটার যেমন যথোপযুক্ত ব্যবহার হয় তেমনি এর থেকে আর্থিকভাবেও যথেষ্ট লাভবান হওয়া যায়।
ছাদ বাগান এখন দেশের জনপ্রিয় একটি কৃষি পদ্ধতি। মূলত বাড়ির খালি ছাদে অথবা বেলকনিতে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে ফুল, ফল, শাক-সবজির বাগান গড়ে তোলাকে ছাদবাগান বলে। অতি প্রাচীনকাল থেকে ছাদ বাগানের ইতিহাস দৃষ্টিগোচর হয়। ছাদে বাগানের প্রথম ধারণা এসেছিল আজ থেকে প্রায় তিন হাজার বছর আগে। মেসোপটেমিয়ায় সম্রাট নেবুচাঁদনেজার তার স্ত্রীর জন্য ইউফ্রেটিস নদীর তীরে প্রথম ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান তৈরি করেন। সেই থেকেই ছাদবাগানের প্রথম ধারণা এসেছিল। এখন মানুষ নিজ বাড়ি বা দালানের কার্নিসে, বারান্দায় কিংবা ছাদে বাগান করছেন। যাদের চাষের জন্য অনেক জমি নেই কিন্তু নিজ হাতে কৃষি কাজ করা বা শাক, সবজি ও ফল চাষের শখ রয়েছে অথবা যারা আত্ম-কর্মসংস্থানের জন্য কৃষিকে বেছে নিতে চাচ্ছেন তাদের জন্য ছাদ কৃষি হতে পারে একটি উত্তম পদ্ধতি। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ নগরে বসবাস করে। ২০২৫ সালের মধ্যে শতকরা ৫০ ভাগ অর্থাৎ প্রায় সাড়ে আট কোটি মানুষ নগরে বাস করবে এবং ২০৫০ সালে এই সংখ্যা হবে ১০০ শতাংশ বা ২৭ কোটি। আর তখনই প্রধানমন্ত্রীর রূপকল্প ও নির্দেশনা ‘একটি গ্রাম একটি শহর’ বাস্তবায়িত হবে অর্থাৎ গ্রাম ও নগর মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে। বিপুল জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষি জমি হ্রাস, ক্রমাবনতিশীল কৃষিবৈচিত্র্য ইত্যাদি পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা যোগানে ছাদ ও বাড়ির আঙ্গিনা, খালি জায়গায় ব্যাপক ভিত্তিতে সবজি বাগান করে সবজি উৎপাদন বৃদ্ধি তথা জনগণের পুষ্টির চাহিদা মেটানো সম্ভব।
সাম্প্রতিক অপর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ছাদে সবজি, ফুল ও ফল বাগান করা হলে সংশ্লিষ্ট ভবনের তাপমাত্রা দুই-তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস কমে যায়। ছাদে, বাড়ির আঙ্গিনা ও খালি জায়গার বাগানে বিভন্ন প্রজাতির পাখি, কীট-পতঙ্গ ইত্যাদি গাছের ফুলে-ফলে বসে। এতে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষিত হয়, পরাগায়ন সুসম্পন্ন হয়, পরিবেশ দূষণমুক্ত থাকে। পাখি ক্ষতিকারক পোকা-মাকড়গুলো খেয়ে কীট-পতঙ্গের আক্রমণ থেকে সবজি এবং ফল- ফলাদি রক্ষা করে। অতীতে ছাদে বাগান করা অনেকের শখ থাকলেও এখন এটিকে একটি অর্থনৈতিক খাত হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অনেকেই সফলভাবে ছাদে শাক-সবজি ও ফল -ফলাদি উৎপাদন করে প্রচুর লাভবান হচ্ছেন। ব্যক্তি মালিকানাধীন বাড়ির ছাদ ছাড়াও এপার্টমেন্ট, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান, সরকারি অফিসের ছাদে বাগান করে শহরাঞ্চলে সবুজের পাশাপাশি পরিবেশ উন্নত করার চেষ্টা করতে হবে। এভাবে শহরের ক্রমবর্ধমান দূষণ ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। তাই শহরাঞ্চলের ছাদে বাগান সৃজন এখন অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে।
বিশ্বব্যাপী নগরায়ন বাড়ছে ফলে শহুরে কৃষি নামক এক নতুন শব্দ আমাদের শব্দ ভান্ডারে যুক্ত হয়েছে। এ কৃষির শুরুটা শৌখিন হলেও তার অন্তরালে লুকিয়ে আছে একটি অমিত সম্ভাবনা। ছাদ বাগানের মাধ্যমে ব্যাপক বাণিজ্যিক উৎপাদন সম্ভব না হলেও এটি পারিবারিক নিরাপদ পুষ্টি চাহিদা পূরণের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। তা ছাড়া শহরে বসবাসরত কিশোর ও বৃদ্ধদের হাল্কা পরিশ্রমের মাধ্যমে মনের খোরাক ও সময় কাটানোর জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে। সারা বিশ্বে দিন দিন ছাদ বাগানের গুরুত্ব বাড়ছে। শহরাঞ্চলে ছাদ বাগানের মাধ্যমে ফুল, ফল ও সবজির পারিবারিক বাগান এখন আর শৌখিনতার প্রতীক নয় বরং অর্থনৈতিক উৎসের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষা ও নির্মল বায়ু উৎপাদনের জীবন্ত কারখানা।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের ন্যাপট-২-এর অর্থায়নে উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের একটি প্রকল্পের (আইডি-১৫৩) আওতায় ছাদ বাগান নিয়ে গবেষণা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এতে দেখা হচ্ছে ছাদে চাষোপযোগী ফল, সবজি, ফুল ও বাহারী গাছের সবচেয়ে ভাল জাত, সবচেয়ে উপযোগী প্রোয়িং মিডিয়া, সার ব্যবস্থাপনা, আন্তঃপরিচর্যা, পোকামাকড় ও রোগ-বালাই ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করে কীভাবে একজন সাধারণ কৃষি উদ্যোক্তা এক থেকে দুই বছরেই পাবেন আশানুরূপ ফলন ও অর্থনৈতিক মুক্তি। ছাদের উপর সবজি চাষ সাধারণ সবজি চাষেরই প্রতিরূপ যা একটি সুনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে করা হয়। বিশেষ করে শহুরে লোকজন তাদের বাড়ির ছাদে টব, বালতি, ড্রাম বা ট্রেতে সীমিত আকারে সবজি চাষ করেন। বর্তমানে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে বাড়ির ছাদে বাগান করা বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। অবশ্য রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরের ছাদে যেসব বাগান দেখা যায় তার অধিকাংশই অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। পরিকল্পিতভাবে উদ্যোগ নেওয়া হলে বাড়ির ছাদে যে কোনো শাক-সবজি ফলানো সম্ভব। টমেটো, বেগুন, মরিচ, ক্যাপসিকাম, ফুলকপি, ব্রোকলি, ঢেঁড়শ, ডাটা, পুঁইশাক, লাল শাক, কলমী শাক, মুলা, শালগম, পুদিনা পাতা, বিলাতি ধনিয়া, মরিচ (সারা বছর), লাউ, করলা, শসা, ঝিঙ্গা, মিষ্টি কুমড়া, সীম, বরবটি ইত্যাদি নানা ধরনের মৌসুমী সবজি ছাড়াও কচু, সজনে, লেবু, পেঁপে ইত্যাদি অনায়াসে উৎপাদন করা যায়।
তবে ছাদে বাগান তৈরির সময় মনে রাখতে হবে বাগানের জন্য ছাদের যেন কোনোপ্রকার ক্ষতি না হয়। এজন্য রোপণকৃত গাছের পাত্রগুলো ছাদের বিম বা কলামের নিকটবর্তী স্থান বরাবর রাখতে হবে। পাত্ররাখার সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন এগুলো সরাসরি ছাদের উপর বসানো না হয়। এতে ছাদ ড্যাম বা স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে যেতে পারে। তাই রিং-এর উপর বা ইটের উপর পাত্রগুলো স্থাপন করা শ্রেয়। তাতে পাত্রের নিচ দিয়ে যথেষ্ট আলো-বাতাস চলাচল করতে পারে এবং ছাদের কোনোপ্রকার ক্ষতি হওয়ার শঙ্কা থাকে না।
বাংলাদেশে ছাদ বাগানের মাধ্যমে ব্যক্তি পর্যায়ে শহরে সবুজায়ন শুরু হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে নয় বরং একান্ত ব্যক্তিগত উদ্যোগে বাংলাদেশে ছাদ বাগানের সূচনা। তাই পরিবেশ রক্ষা ও নগরীর তাপমাত্রা কমিয়ে আনতে ব্যক্তি মালিকানাধীন বাড়ির ছাদ ছাড়াও এপার্টমেন্ট, বারান্দা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান, সরকারি অফিসের ছাদে বাগান, গাড়ি রাখার বারান্দা, ফুটপাত, পার্ক, সরকারি খাস ভূমি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রতিটি পর্যায়ে কৃষি উৎপাদন বিশেষ করে উদ্যান ফসল ও বাহারি ফুল গাছের সমন্বয়ে তৈরি করতে হবে সবুজ নগরায়ন। এতে করে পরিবেশ উন্নয়নের পাশাপাশি পারিবারিক পুষ্টি, মানসিক শান্তি ও অর্থনৈতিক আয়ের উৎস হিসেবে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে ছাদ বাগান।
ড. কবিতা আনজু-মান-আরা : সাবেক পরিচালক, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট।
আজকালের খবর/আরইউ