বাংলাদেশে সম্পদগত বৈষম্য ক্রমশ বাড়ছে। শুধু তাই নয়, ইতোমধ্যে ধনী-গরিবের মধ্যে পার্থক্য বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। দেশে সামাজিক বিশৃঙ্খলা, মহামারি, দুর্যোগে মানুষের চরম হাহাকার, ক্ষুধা, দারিদ্র, বৈষম্যের বিপরীতে কিছু মানুষের উচ্চাভিলাস, স্বেচ্ছাচারিতা প্রমাণ করে দেশে ধনী-গরিবের বৈষম্য কতটা প্রকট। উদাহরণ টেনে বলতে গেলে বলা যায়, এ দেশে ধনী আরো ধনী হচ্ছে, গরিব আরো গরিব হচ্ছে- এটার প্রমাণ মেলে লাখ টাকার আইসক্রিম কিনতে হোটেল সারিনা’য় ধনীদের ভিড় আর কোনোমতে খেয়ে বেঁচে থাকতে টিসিবি’র ট্রাকের সামনে গরিবদের লম্বা লাইন দেখে। কথাটা অনুমিত সিদ্ধান্তের মতো শুনালেও এর চরম বাস্তবতা ও প্রভাব আমাদের সমাজে প্রতিনিয়ত পরিলক্ষিত হচ্ছে। উচ্চাভিলাসী মানসিকতা গরিবশ্রেণিকে কীভাবে নিগৃহীত করছে, সে কথাও বলছি।
গরিবশ্রেণির মানুষ যেমন রিকশাচালক, এই রিকশাচালক যখন তার ভাড়া দশ টাকার কাছে কোনো কারণে পনেরো টাকা চেয়ে বসে, তখনই ধনীকশ্রেণি বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। কেন রিকশাচালকরা বেশি ভাড়া নেবে? কিন্তু এই ধনী ব্যক্তিটিই রিকশা থেকে নেমে নামিদামি রেস্টুরেন্ট ঢুকে কয়েক হাজার টাকার লাঞ্চ করে বের হওয়ার সময় ওয়েটারকে পাঁচশো টাকা বখশিস দিতে বাধে না। পাঁচ টাকার জন্য যে ধনী একজন খেটেখাওয়া মানুষের ওপর চড়াও হতে পারে, সে ব্যক্তি কীভাবে ওয়েটারকে পাঁচশো টাকার বখশিস দিয়ে হাসিমুখে বের হয়, এই সমীকরণ মেলানো বড়ই কঠিন। ওই যে প্রবাদে আছে ‘চোরে চোরে মাসতুতো ভাই’। হোটেল-রেস্টুরেন্টের মালিক তো আর রিকশাচালকগোছের কেউ না। নিশ্চয়ই তার কোটি কোটি টাকা আছে, যেটির প্রতি হোটেল- রেস্টুরেন্টে আসা-যাওয়া করা ধনী ব্যক্তিদের প্রেস্টিজিয়াস ইস্যু জড়িত। বরং পাঁচশো টাকা বখশিস না দিলে নিজেকে এলিট শ্রেণির মনে হবে না। আর তাই যদি মনে না হয়, তবে কীসের ধনী সে? শুধু তাই নয়, ন্যায় হোক আর অন্যায় হোক ধনী ব্যক্তি যদি, গরিবশ্রেণির সাথে চড়া গলায় কথা না বলতে পারে তারা তো আবার মাথায় উঠবে। এই হচ্ছে ধনী মানুষদের চিন্তাবোধের বহিঃপ্রকাশ।
যেসব ধনী ব্যক্তি ধনীদের তৈরি করা হোটেল-রেস্টুরেন্টে গিয়ে লাখ টাকা দামের সোনার তৈরি আইসস্ক্রিম কিনে খেতে পারে, তাদের কি সমাজের প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা নেই? ক্ষুধা, দারিদ্র নিয়ে, চিকিৎসাবঞ্চিত হয়ে দেশের বড় এক জনগোষ্ঠী বস্তিতে, ফুটপাতে দিনাতিপাত করছে, তাদের প্রতি কি ওইসব ধনীর চোখ পড়ে না? চোখ পড়ে। ওই যে বৈষম্যের চোখ। বরং খেটেখাওয়া মানুষদের ঠকাতে পারলে তাদের মাঝে ধনীত্ববোধটা প্রবল হয়ে ওঠে।
দেশে প্রতিদিন কত মানুষ না খেয়ে থাকে, তার হিসাব মনে হয় সংশ্লিষ্টদের কাছে নেই। কিন্তু আমাদের মানবিক চোখ ঠিকই দেখতে পায়, একজন ক্ষুধার্ত মা তার ছেলেকে নিয়ে ভাতের জন্য কত দ্বারে দ্বারে ঘোরে। কতটা জোরে লাথি খেয়ে রাস্তায় ছিটকে পড়ে। একজন বাবা তার ছেলের জন্য শখের জিনিস তো দূরের কথা, ভালো কোনো খাবার, পোশাক কিনে নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারে না। উৎসবের দিনগুলোতেও ভালো কিছু খাওয়ার সুযোগ মেলে না। বিপরীতে প্রতিদিন যে পরিমাণ খাবারের অপচয় ঘটায় ধনীকশ্রেণি, তা দিয়ে দেশের সকল না-খেয়ে থাকা মানুষের পেট ভরানো সম্ভব। বিবিসি বলছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর যত খাবার উৎপাদন হয়, তার একটি বড় অংশ ভাগাড়ে যায়, মানে নষ্ট হয়। জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ইউনেপ ২০২১ সালে ফুড ওয়েস্ট ইনডেক্স নামে রিপোর্ট প্রকাশ করে। যাতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বছরে এক কোটি ছয় লাখ টন খাদ্য অপচয় হয়। মাথাপিছু খাদ্য অপচয়ের হারও বাংলাদেশে বেশ বেশি।
দেশের সব মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা এখনও নিশ্চিত হয়নি। হবে বলেও মন না। যে দেশের মানুষ নিজের পেটে খাবার থাকলে অন্যকারো পেটে খাবার আছে কিনা সেটা চিন্তা করার মানসিকতা পোষণ করে না, সে দেশে কে খাবার পেল, কেন পেল না, তা নিয়ে ভাববার লোক কোথায়? বরং ভরাপেটে অভুক্ত মানুষকে লাথি দেওয়ার মধ্যে যে পৈশাচিকতা, তা উপভোগের মধ্য দিয়ে ধনীকশ্রেণি নিজেদের আধিপত্যকে আরো বিস্তার করার পথকে সুগম করছে। তারা বিশ্বাস করে, তিনবেলা আহারের মাধ্যমে প্রান্তিক শ্রেণির মানুষের শরীরে যে পরিমাণ ক্যালরির সঞ্চার হবে, তা দিয়ে ধনীদের অট্টালিকা গুড়িয়ে দিতে পারে। কিন্তু প্রান্তিকশ্রেণি কি তাই করেছে কখনো? বরং শ্রমিকশ্রেণির হাড়ভাঙা খাটুনিতে গড়ে উঠেছে বড়লোকের অট্টালিকা যেখানে তারা এসি ছেড়ে ঘুমাতে পারে।
গরিবশ্রেণি কর্মসংস্থান চায়, পুঁজি চায়। যে কর্মটা জোটে, তার স্থায়িত্ব খোঁজে, যে পরিমাণ পরিশ্রম করে, তার ন্যায্য পারিশ্রমিক খোঁজে। কিন্তু এর কোনোটাতেই তারা সুবিধা করতে পারে না। শারীরিক সক্ষমতা, দক্ষতা অনুযায়ী কাজ পায় না। কাজ পেলেও ঠিকঠাক বেতন মেলে না। পরিশ্রমের অনুপাতে যে পরিমাণ পারিশ্রমিক পায়, তা বর্তমান বাজারমূল্যে যতসামান্য এবং শ্রম আইনেরও বিরোধী। প্রতিদিনের খাবার কেনা, আনুসঙ্গিক চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে যেমন হিমসিম খায়, তেমনই সঞ্চয়ের কোনো সুযোগ করে উঠতে পারে না। রোগ-শোক হলে উচ্চ চিকিৎসা বহন করতে অর্জিত টাকা শেষ করে ফেলতে হয়। না পারলে মৃত্যুর মাধ্যমে পরিবারের আয়কর্তার শেষযাত্রা ঘটে, পরিবারের অন্য সদস্যরা পেটের ক্ষুধা নিবারণের জন্য বসতভিটে বিক্রি করে গরিব থেকে আরো গরিব হয়। সস্তায় এগুলো কিনে ধনীরা সম্পদ বৃদ্ধি করে।
দেশের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে ধনীকশ্রেণি। বড় বড় হাসপাতালেরও মালিক ধনীকশ্রেণি। সব কিছুই ধনীকশ্রেণির হাতে এখন। তাদের সুবিধার মাপকাঠিতে বাজারমূল্য নির্ধারিত হয়। সরকারের তোয়াক্কা না করেই তারা পণ্যের মূল্য অস্বাভাবিক হারে বাড়াতে পারে। একজন ধনী যদি সত্তর টাকা কেজি দরে চাল কিনতে পারে, একজন গরিব কি তা পারবে? ধনী-গরিবের আয়ের পার্থক্য বিচারে মধ্যস্ততা করে কোনো কিছুর বাজারদর নির্ধারণ করা হয় না এদেশে। ধনীর আয় বেশি বলে সে সাতশো পঞ্চাশ টাকা কেজি দরে গরুর মাংস কিনে খেতে পারে, কিন্তু গরিবের কি সেই সক্ষমতা আছে? গরিব মানুষ যে জিনিসটা খেয়ে-পরে বেঁচে থাকবে, সেই জিনিসগুলোর দামই যদি আকাশচুম্বি হয়, তাহলে কি দারিদ্রতা, পুষ্টিহীনতার হার বাড়বে না?
ধনীদের আরো ধনী হওয়ার নেশা এই সমাজে ধনী-গরিবের বৈষম্যকে প্রকট করতে দায়ী। গরিবের পিঠে পা রেখে ধনী গাড়ি-বাড়ি, ব্যাংক-ব্যালেঞ্চ করে অর্থনীতিকে যেমন নিয়ন্ত্রণ করছে, তেমনই সমাজনীতি, রাজনীতিতে তাদের অর্থের কুপ্রভাব দুঃশাসনের সুযোগ করে দিচ্ছে। যার ফলে গরিবের ক্ষুধা-পীড়িত আহাজারি ধনীকশ্রেণির কানে পৌঁছাচ্ছে না। বরং তারা মুখে বলছে, এই যে তোমরা টিকে আছো, এটা আমাদের পরম কৃপা।
আমার প্রশ্ন, সমাজে ধনীদের এইরকম প্রত্যেক্ষ ও পরোক্ষ দুঃশাসন আগামীর বাংলাদেশ বির্নিমাণে কতটা অন্তরায়, তা ভেবে দেখছেন কি? হয়ত না। কিন্তু ভেবে দেখার সময় এসেছে। অনৈতিক, অবৈধ উপায়ে, ঘুষ, লুটতরাজ, রাহাজানিসহ রাজনৈতিক অপশক্তিকে কাজে লাগিয়ে যারা রাতরাতি বড়লোক হচ্ছে, তাদের লাগাম টেনে ধরার সময় এসেছে। তাদের কারণেই দেশের অথনৈতিক বিপর্যয় ঘটছে, দেশ থেকে অর্থপাচার হচ্ছে। এভাবে দেশ চলতে থাকলে অপশাসন শুরু হবে, ক্ষমতা ও অর্থের অপব্যবহার হবে, মানুষের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধ কমে যাবে, যার টাকা আছে, সেই শুধু সম্মান পাবে। মোটকথায়, গণপ্রজাতন্ত্রী যে ধারণাকে কেন্দ্র করে এই দেশের শাসনব্যবস্থা চলে বা চলার কথা, তা হয়ে যাবে রাজতন্ত্র। যে যত বেশি টাকার পাহাড় গড়তে পারবে, সুইস ব্যাংকে যার যত টাকা থাকবে, সেই ক্রমশ রাজা হয়ে উঠবে, উঠছেও। সেইসব রাজার স্বেচ্ছাচারিতায় দেশের গণতন্ত্রের ভিত ভেঙে পড়বে।
ইতোমধ্যে দেশের অনেক নেতা, ব্যবসায়ীদের মাঝে এইরকম মনোভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে যারা কিনা স্ব স্ব এলাকায় ত্রাস হিসেবে পরিচিত। গরিবশ্রেণি তাদের দুঃশাসনে পর্যুদস্ত। এভাবে তারা সেই প্রাচীন যুগের দাস প্রথাকে আবার জাগিয়ে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছে। গরিব মানুষকে ব্যবহার করে নিজেদের আঁখের গুছিয়ে মানবতার বাণী প্রচার করছে। ধিক্কার জানাই সেইসব ধনীকে যারা কিনা গরিবের মৌলিক অধিকারকে হরণ করে শ্রেণিবৈষম্যকে প্রকট করছে। সুশীল চিন্তাধারার মানুষের প্রতি আহ্বান, মানুষের ন্যায্যতা ফিরিয়ে আনতে, বৈষম্যতা দূর করতে এগিয়ে আসুন। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার দিকে নজর দিয়ে দেশকে দারিদ্র ও ক্ষুধামুক্ত করতে হবে। সকলের চিকিৎসা, শিক্ষাসহ মৌলিক অধিকারসমূহ নিশ্চিতকরণে একযোগে কাজ করতে হবে। আমরা চাই, ধনী-গরিব বৈষম্যহীন একটি বাংলাদেশ গড়ে উঠুক।
মোহাম্মদ অংকন : কলাম লেখক ও ফ্রিল্যান্স জার্নালিস্ট।
আজকালের খবর/আরইউ