বৃহস্পতিবার ২৫ জুন ২০২৬
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায় বর্ষা বন্দনা
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৪ জুন, ২০২২, ২:৫৯ পিএম   (ভিজিট : ৯৪৭৬)
বাংলা সালের হিসেবে বারোমাস এবং প্রতিটি ঋতুর আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য থাকলেও বর্ষা ঋতু সবচেয়ে ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের। প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যতাই এখানে মুখ্য। সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ সম্ভবত বর্ষা নিয়ে। ঋতুচক্রে এখন বাংলায় বর্ষাকালের আগমন ঘটতে চলেছে। বইয়ের হিসেবে আষাঢ়-শ্রাবণ এই দুই মাস বর্ষাকাল। বেশ আয়োজন করেই আমাদের দেশে বর্ষা ঋতু বরণ করে নেওয়া হয়। ঠিক যেন জামাই বরণ! বর্ষা যে এদেশের মানুষের কাছে খুবই প্রিয়। টিনের চালে বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ শুনে কারো মনে দু’লাইন ছন্দ জাগে না অথবা মন আনমনা হয় না এমন মানুষ এই বাংলা মুলুকে খুব বেশি খুঁজে পাওয়া যাবে না। বর্ষা মানেই কবির কবিতা, ছন্দ। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায়, গানে তাই বারবার বর্ষা ঋতু এসেছে। কবিগুরুর ‘বর্ষার দিনে’ কবিতায় লিখেছেন- ‘এমন দিনে তারে বলা যায়,/এমন ঘনঘোর বরষিায়-/এমন মেঘস্বরে বাদল-ঝরঝরে/তপনহীন ঘন তমসায়।।/সে কথা শুনিবে না কেহ আর,/নিভৃত নির্জন চারি ধার।/দুজনে মুখোমুখি গভীর দুখে দুখি,/আকাশে জল ঝরে অনিবার-/জগতে কেহ যেন নাহি আর।।’
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত এবং পাঠ্যবইয়ে প্রচলিত সোনার তরী কবিতায়ও একেছেন বর্ষার চিত্র। সেখানে লিখেছেন-‘গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা/কুলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা।/রাশি রাশি ভারা ভারা/ধান কাটা হল সারা,/ভরা নদী ক্ষরধারা/খরপরশা-/কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা।’

যদিও কবির এ কবিতাটিতে ভিন্ন অর্থ প্রবহমান হয়েছে। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সোনার তরী কবিতাকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এ কবিতায় জীবনের কর্ম এবং ফসলের কথা বল হয়েছে। তবে বর্ষার ব্যবহার করেই তা করা হয়েছে। গগন অর্থাৎ আকাশে মেঘের ডাকাডাকি, মুষলধারে বৃষ্টি এ চিত্র বাংলার সাধারণ চিত্র। তবে ছোট বেলায় পড়া একটা কবিতায় আষাঢ় এবং বর্ষাকে আরো বেশি পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। বর্ষায় কখনো খুঁজেছেন গভীরতা, কখনো রোমান্টিকতা। কোথাও বা বর্ষার প্রকৃতির ছবি এঁকেছেন। যেমন তার আষাঢ় কবিতায়- ‘নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর/নাহি রে।/ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের/বাহিরে।/বাদলের ধারা ঝরে ঝরঝর,/আউশের ক্ষেত জলে ভরভর,/কালি মাখা মেঘে ও পারে আঁধার ঘনিছে দেখ চাহি রে।/ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে।’

বৃষ্টি মানে একটা ছন্দ, বৃষ্টি মানে কবিতার লাইন মনে মনে আবৃত্তি করা অথবা কোনো ভালো লাগা গানের লাইন। এই ঘন বর্ষায় একা থাকা, প্রতীক্ষা করা বড় কষ্টের। প্রিয়জনের অনুপস্থিতি মনে পীড়া দেয়। কবিগুরু এমন প্রতীক্ষায় থেকে বলছেন, ‘মেঘের পরে মেঘ জমেছে/আঁধার করে আসে/আমায় কেন বসিয়ে রাখ/একা দ্বারের পাশে।/কাজের দিনে নানা কাজে/থাকি নানা লোকের মাঝে,/আজ যে আমি বসে আছি/তোমারই আশ্বাসে।’ 

প্রকৃতির অপার প্রতীক্ষায় জেগে ওঠা বৃষ্টির ফোঁটায় বর্ষা ঝরে। বর্ষায় জেগে ওঠে প্রাণ। দূর হয় জঞ্জাল। বর্ষার শুরুতেই করা হয় আবাহন। বর্ষার গানে বর্ষাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। যেন এক রাজকীয় ব্যাপার। আষাঢ় পেরিয়ে শ্রাবণের অঝোর ধারায় ভেসে যাচ্ছে দেশ। মাঠের পর মাঠ বর্ষার জলে থৈ থৈ করছে। দিন পেরিয়ে গেলেও, আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও বর্ষার সে রূপ এখনো তেমনি আছে। সেই কালো মেঘে ঢেকে থাকা, অঝোর ধারায় বৃষ্টি এসব কিছুই বর্ষার বৈশিষ্ট্য। এমনই এক মেঘের দিনের বর্ণনা পাওয়া যাায় কবির ‘বর্ষাযাপন’ কবিতায়। কবি লিখেছেন, ‘দিগন্তের চারিপাশে আষাঢ় নামিয়া আসে/বর্ষা আসে হইয়া ঘোরালো,/সমস্ত আকাশ-জোড়া গরজে ইন্দ্রের ঘোড়া/চিকমিকে বিদ্যুতের আলো।’

বর্ষার নতুন জল পেয়ে বৃক্ষরাশি জেগে উঠেছে নতুন করে। যেন তারা এতদিন ধরে আকাশের কাছে প্রার্থনায় ছিল। কখন বৃষ্টি নেমে তাদের প্রাণ ফেরাবে।  নদ নদী পুকুর সব পানিতে ভরে যায় এসময়। কাগজে কলমে আমাদের ছয়টি ঋতু থাকলেও শীত, বসন্ত আর বর্ষার বাইরে অন্য সব ঋতুর উপস্থিতি যেন অনেকটা ম্রিয়মাণ হয়ে গেছে। নদী তার যৌবন ফিরে পায় এই বর্ষায়। শুধু নদী কেন বর্ষার অপেক্ষায় তাকে আরো কত সৃষ্টি। কবির ‘আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে’ কবিতায় লিখেছেন- ‘আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে-/আসে বৃষ্টির সুবাস বাতাস বেয়ে।/এই পুরাতন হৃদয় আমার আজি/পুলকে দুলিয়া উঠিছে আবার বাজি/নূতন মেঘের ঘনিমার পানে চেয়ে/আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে।’

আমাদের দেশে নাকি যে বৃষ্টি নামে তা বিশ্বে অন্য কোথাও হয় না। এই দেশের বৃষ্টি বর্ষার সাথে অন্য কোন দেশের বৃষ্টির তুলনা হয় না। এই দেশে বৃষ্টি হয়েই তা শেষ হয়ে যায় না। বৃষ্টিতে বর্ষা আসে। বৃষ্টি ছাড়া বর্ষা যেন অসম্পূর্ণ এক ঋতু। আবার বর্ষা এলে বৃষ্টি চাই ই চাই। বর্ষায় কবির কলমে কবিতা হয়, লেখকের গল্প হয় আবার গায়কের কণ্ঠে গানও হয়। এই হলো আমাদের বর্ষা। হাজার বছরের বাঙালির সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে আছে বর্ষা। কবির ‘আজি শ্রাবণ ঘন গহন মোহে’- কবিতায় লিখেছেন- ‘আজি শ্রাবণ ঘন গহন মোহে/গোপন তব চরণ ফেলে/নিশার মতো নীরব ওহে/সবার দিঠি এড়ায়ে এলে।/প্রভাত আজি মুদেছে আঁখি/বাতাস বৃথা যেতেছে ডাকি/নিলাজ নীল আকাশ ঢাকি/নিবিড় মেঘ কে দিল মেলে।’

যুগ যুগ ধরে বর্ষা আর বৃষ্টির বিলাসে গা ভাসিয়ে বাঙালি বরণ করে নিয়েছে বর্ষাকে। তপ্ত গ্রীষ্মের প্রহর শেষে ধরণী যখন উত্তপ্ত, এক ফোঁটা বৃষ্টির জলের জন্য হাহাকর করছে প্রতিটি ধূলিকণা তখন এক পশলা বৃষ্টি নামে বাংলার বুকে। সেই বৃষ্টির জলরাশি বেয়ে নাকে আসে সোদা মাটির গন্ধ। আমরা প্রাণ ভরে শ্বাস নেই। মাটিরও যে গন্ধ হয় তা তো এই বর্ষার বৃষ্টিতেই বোঝা যায়! আষাঢ়-শ্রাবণের সন্ধ্যাগুলো যেন একটু অন্যরকম। একটু আনমনা, উদাস থাকে। কবি তার ‘আষাঢ় সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো’ কবিতায় লিখেছেন, ‘আষাঢ় সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল/গেল রে দিন বয়ে/বাঁধনহারা বৃষ্টিধারা/ঝরছে রয়ে রয়ে।/একলা বসে ঘরের কোণে/কী যে ভাবি আপন-মনে,/সজল হাওয়া যূথীর বনে/কী কথা যায় কয়ে।/বাঁধন হারা বৃষ্টিধারা/ঝরছে রয়ে রয়ে।’

বর্ষা এক অনন্য সৌন্দর্যের ঋতু। এ ঋতু নিয়ে সাহিত্যজুড়েই মাতামাতি রয়েছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায় নানা রূপে বর্ষাকে পাওয়া যায়। বর্ষার রুপে মুগ্ধ হওয়া যায় বারবার। এভাবেক কবি পাঠককুলকে বর্ষার আনন্দে ভাসিয়েছেন তার সৃষ্টির মাধ্যমে।

আজকালের খবর/আরইউ









Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor$gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor$gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor$gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor$gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft