মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলোর মধ্যে প্রধান হলো খাদ্য। পৃথিবীর প্রত্যেকের খাদ্য গ্রহণের অধিকার রয়েছে। খাদ্যের চাহিদা পূরণ হওয়ার পর বাকি মৌলিক চাহিদা পূরণের প্রশ্ন দেখা দেয় বা আবশ্যকতা দেখা দেয়। তাই প্রতিটি নাগরিকের ক্ষুধা নিবারণ করার চেষ্টা রাষ্ট্রের সর্বাগ্রে প্রয়োজন। পৃথিবীতে আজও অনেকে অনাহারে বা অর্ধাহারে ঘুমাতে যায়। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো সারা পৃথিবীর খাদ্য সংকটে কিন্তু কেউ অনাহারে বা অর্ধাহারে ঘুমাতে যায় না। যায় সেই পরিস্থিতিতে খাদ্য কিনতে না পারা বা না থাকার কারণে। পৃথিবীতে বিভিন্ন সময় যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং মহামারীর কারণেও খাদ্য সংকট দেখা দেয়। ইতিহাস সেটাই বলে। এই যেমন এখন চলছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এই দুটি দেশ পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি গম উৎপাদন করে। যুদ্ধের কারণে সেখান থেকে গম রপ্তানি হচ্ছে না। তা ছাড়া গত দুই বছর করোনা পরিস্থিতির ফলে সংকট আরো বেশি তীব্র হয়েছে। পরিস্থিতি এমন যে পৃথিবীকে আরো বহু বছর ক্ষুধা ও দারিদ্রতার সাথে যুদ্ধ করতে হবে। পৃথিবীর কিছু দেশে মূল্যস্ফীতির কারণে খাদ্যপণ্যের দাম এত বেশি যে তা কিনতে জনগণকে রীতিমতো সংগ্রাম করতে হচ্ছে। খাদ্য থেকেও তা যেন হাতের বাইরে। এ নিয়ে বিশে^র কাছে আপাতত কোনো আশার বাণী নেই। সহসাই পরিবর্তন হচ্ছে না এই পরিস্থিতির। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার রির্পোট মতে, ৫৩টি দেশের প্রায় ১৯৩ মিলিয়ন মানুষ ২০২১ সালে অনাহারে-আধপেটে দিনগুজরান করেছে। রিপোর্টে এর জন্য দায়ী করা হয়েছিল সংঘর্ষ, আবহাওয়ার চরম অবস্থা, করোনাভাইরাস মহামারী। এর মধ্যেই নতুন সংকট হলো ইউরোপের চলমান যুদ্ধ যা গত কয়েক শতাব্দী ইউরোপ দেখেনি। এবার আলোচনায় আসা যাক। সংঘর্ষ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কয়েক বছর ধরেই চলমান ইস্যু। যেমন-ইয়েমেনে গত কয়েক বছর ধরেই সংঘর্ষ চলছে। অবস্থা এমন যে সেখানে দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
পুষ্টিহীনতায় শিশুরা হাসপাতালের বিছানায় নিদারুণ কষ্টে আছে। আর বিশে^র আবহাওয়া তো গত কয়েক দশক ধরেই পরিবর্তনশীল যার ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে আসছে। এর ফলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং খাদ্য উৎপাদনে চাপ তৈরি হচ্ছে। জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিদিন পর্যাপ্ত খাদ্যহীন মানুষের মোট সংখ্যা গত বছর চারকোটি বেড়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা বিশ^ খাদ্য কর্মসূচি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের যৌথ উদ্যোগে তৈরি খাদ্য সংকটের বিশ^ব্যাপী এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে আফগানিস্থান, কঙ্গো, ইথিওপিয়া, নাইজেরিয়া, দক্ষিণ সুদান, সিরিয়া, ইয়েমেনসহ বেশ কয়েকটি দেশ দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের সম্মুখীন হয়েছে। প্রতিবেদনের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী খরা, খাদ্যের দাম বৃদ্ধি ও ক্রমাগত হিংসার কারণে ২০২১ সালে সোমালিয়ার পরিস্থিতি ছিল বিশে^র সব থেকে খারাপ। সামনের দিনগুলোতে দেশটির ৬০ লাখ মানুষকে তীব্র খাদ্য সংকটে পড়তে হতে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণেও একাধিক দেশে খাদ্য সংকট আরো বাড়বে। ইউক্রেন যুদ্ধ চলতে থাকলে সাব-সাহারান আফ্রিকাসহ বিশে^র চার কোটি ৭০ লাখ মানুষ তীব্র ক্ষুধার সম্মুখীন হবে। এসবের মধ্যেও কিন্তু এই পৃথিবীতে বহু খাদ্য অপচয় হয়। পৃথিবী নামক এই গ্রহটি কবে ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত হবে তা বলা যায় না। তবে একদিন নিশ্চয়ই আসবে যেদিন একজন মানুষও ক্ষুধা পেটে নিয়ে ঘুমাতে যাবে না। যুদ্ধ-বিগ্রহ, প্রতিনিয়ত ঘটা প্রাকৃতিক বিপর্যয় মানুষকে দারিদ্রতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। যা ক্ষুধার্ত মানুষ তৈরি করছে। ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি- কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের লেখা এই কবিতা থেকে ক্ষুধার যন্ত্রণা সম্পর্কে কিছুটা উপলদ্ধি করা যায়। আবার প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ বলেছেন, রুচির রহস্য ক্ষুধায়।
যেখানে ক্ষুধা নেই সেখানে রুচিও নেই। ক্ষুধা প্রাণীর স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। মানুষ বাঁচার জন্য খায় নাকি খাওয়ার জন্য বাঁচে একজন ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে সে প্রশ্ন অর্থহীন। প্রকৃতপক্ষে ক্ষুধা এমন একটি কষ্ট যা ক্ষুধার কষ্টে না থাকা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অনুভব করতে পারে না। তা সম্ভবও নয়। ব্যাথিতের বেদন কেবল একজন ব্যাথিত হৃদয়ই বুঝতে পারে। বর্তমান পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ ক্ষুধার্ত থাকে। ঠিক সেই সময়ে প্রচুর খাবার নষ্ট হয়। ভারসাম্যহীন এই অবস্থার জন্য আমাদের দায় রয়েছে। একদিকে ক্ষুধার্ত মানুষের যন্ত্রণার আওয়াজ অন্যদিকে কোটি কোটি টাকার মারণাস্ত্রের বিকট শব্দ। কত কত আধুনিক অস্ত্রের সাজে সজ্জিত এই ধরণী। এটাই সবথেকে আশ্চর্যের যে মানুষ একমাত্র প্রাণী যারা অন্য মানুষের আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য এসব অস্ত্র কিনছে। সেসব অস্ত্র বানাতেও কোটি কোটি ডলার ব্যয় করছে।
ইয়েমেন দীর্ঘদিন ধরে মানবিক সংকটে ভুগছে। এই মানবিক সংকটের অন্যতম হলো সবার জন্য খাদ্যের নিশ্চয়তা। যুদ্ধাবস্থা দীর্ঘমেয়াদে চলতে থাকলে যেকোনো দেশেই এই রকম অবস্থারই সৃষ্টি হতে পারে। যারা যুদ্ধ বোঝে না, যারা অস্ত্র বোঝে না যারা দুমুঠো খাবার চেনে। অস্ত্র সেখানে নিরর্থক। যুদ্ধ মানেই অশান্তি, খাদ্যাভাব, পীড়িত মানুষের আর্তনাদ, গৃহহীন হওয়া, আত্মীয় স্বজনের জন্য চোখের জল ফেলা। উত্তেজনার বশে ক্ষমতার মোহে করা যুদ্ধে এর থেকে বেশি পাওনা আর কি আছে। যে কোনো দেশের সরকারের প্রথম লক্ষ্য থাকে সেই দেশের মানুষের তিনবেলা খাদ্যের নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এটা সবার জন্য নিশ্চিত করা একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয়। দীর্ঘ পরিকল্পনা, কৃষির উন্নতির মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা এবং সুষ্ঠু বণ্টন। বাংলাদেশ বহু প্রচেষ্টায় খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। এটি ধরে রাখতে হবে এবং উৎপাদন বৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে হবে। কারণ দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্ধিত জনসংখ্যার সাথে সাথে কৃষিজমি কমে যাচ্ছে। এখন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কৃষিকাজ পরিচালনা করতে হবে।
বর্তমানে যেসব অঞ্চলে যুদ্ধরত অবস্থা বিরাজ করছে সেসব দেশের অবস্থা সম্পর্কে একটু খোঁজ খবর নিলেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী অবস্থা সম্পর্কে জানলেই দেখা যায়, ফেলে যাওয়া কিছু ধবংসাত্বক অবস্থা ছাড়া আর কিছুই নেই। সে অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়াতে সময় লেগেছে বহু বছর। কোটি কোটি মানুষের ক্ষুধার চিৎকার আধুনিক অস্ত্রের শব্দের কাছে বড়ই ম্লান মনে হয়। এটাই বুঝি বাস্তবতা। যেখানে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের খাদ্যের অধিকার রয়েছে। কেউ ক্ষুধার্ত থাকার কথাও না। এমনকি কোন প্রাণীরও ক্ষুধার্ত থাকার কথা না। সৃষ্টিকর্তার সৃষ্ট প্রতিটি জীবই ক্ষুধা মেটানোর অধিকার রাখে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি তাদের বাধ্য করে ক্ষুধা পেটে রাতে ঘুমাতে যেতে। ক্ষুধার্ত মানুষ কী কী করতে পারে। উত্তরটা এক কথায়। সবকিছু পারে। সে তখন নীতি-নৈতিকতার উর্ধ্বে থাকে। তাই ক্ষুধার সাথে সমাজের আইনশৃঙ্খলার একটা প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। যত ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বাড়বে প্রত্যেক সমাজে ততই বিশৃঙ্খল অবস্থা বৃদ্ধি পাবে। কারণ প্রয়োজন কোনো আইন মানে না। প্রতিটি মুখের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। প্রজাদের অভুক্ত রেখে রাজাদের মুখে মন্ডা-মিঠাই-খাজা ওঠে কী করে। সেই যে কবিতায় জন্মদিনের পার্টিতে একটি কুকুরের যে খাতির দেখিয়ে ব্যঙ্গ করা হয়েছিল তা আজো অসহায় মানুষের রূপ। দামী আ্যালসেসিয়ানকে খাওয়াতে যে টাকা খরচ হয় তার অনেক কম টাকাতেই তো অভুক্তের পেট ভরে। তবে এখন করোনাকাল চলছে। করোনা অতিমারির সময় পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশেই আর্থিক কাঠামোতে প্রভাব পরেছে। মানুষ বেকার হয়েছে আর বেকারত্ব দারিদ্রতা ডেকে এনেছে। মধ্য ও নিন্ম আয়ের মানুষের ওপর এই প্রভাব বেশি পরেছে। বিভিন্ন দেশ এ থেকে উত্তরণের জন্য একটি ভালো খাদ্য ব্যবস্থা গড়তে গ্রামাঞ্চলে উন্নত কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ক্ষুধা ও দারিদ্র নিয়ে যে কেবল আমাদের মতো উন্নয়নশীল বা দরিদ্র দেশগুলোই চিন্তিত বিষয়টা এমন নয়। বর্তমানে উন্নত বিশে^র অনেক দেশও ভুগছে মূল্যস্ফীতির কবলে। সেখানেও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের লাগামহীন দাম জনগণকে ব্যয়ের লাগাম টেনে ধরতে বাধ্য করছে। তবে খাদ্য সংকট এবং খাদ্য ক্রয়ের ক্ষমতা কমে আসা এই দুইয়ের মধ্যে একটু পার্থক্য রয়েছে। খাদ্য সকলেরই প্রয়োজন। করোনা অতিমারীর পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পৃথিবীকে নতুনভাবে সংকটে ফেলেছে। সেই সংকট যেমন খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলায় তেমনি পৃথিবী যখন ক্ষুধামুক্ত একটি গ্রহ তৈরির দিকে সফলভাবে এগিয়ে যাচ্ছিল তখনই এই যুদ্ধের দামামা। কবে এই যুদ্ধ বন্ধ হবে তা এখনই বলা যায় না। ততদিনে খাদ্য সংকটে দরিদ্র দেশগুলো মহাসংকটে পরবে। সেই পরিস্থিতি সামাল দিতে হলে বিশে^র একসাথে থাকতে হবে।
লেখক : শিক্ষক ও মুক্তগদ্য লেখক।
আজকালের খবর/আরইউ