এমনও হতে পারে ওই ছোট্ট মনে ওটার ওপরই লোভ কাজ করতো। ময়দাকে ছেনে খামি তৈরি, সেটাকে কেটে কেটে খুরমার রূপ দেয়া। সেগুলোকে আবার ডুবো তেলে ভেজে নিতে হয়। তারপর অন্য কড়াইয়ে সঠিক তাপের দ্বারা চিনিকে জ্বালিয়ে শিরা তৈরি করা। পরিশেষে তেলে ভাজা খুরমাগুলোর গায়ে ওই ঘন চিনির শিরা জড়িয়ে দেওয়া। এর সব কিছুতে সবসময় গুরুদয়ালকে রাজন সহযোগিতা করেছে। তাই এই কাজটায় রাজনের স্পেশাল দক্ষতা রয়েছে বলে তার বিশ্বাস।
আজ তিন দিন হয় মায়ের ওষুধ নেই। শরীরটাও কেমন যেন ক্রমে ক্রমে অবনতির দিকে মনে হচ্ছে। হাতে একটাও পয়সা নেই। এক আকাশ দুশ্চিন্তার কালো মেঘ ক্রমান্বয়ে ঘনীভূত হয়ে ভয়াল রূপ ধারণ করছে, সদ্য কর্মহীন ছোট্ট রাজনের বুকের ভেতর। তারপরও মাকে আশ্বস্ত করে অভয় দিচ্ছে- কোন দুশ্চিন্তা কর না মা। যে করেই আজ তোমার ওষুধ আমি আনবোই মা। ছোট্ট রাজনর মায়ের সেই কষ্টমাখা মুখ মনে করে বিচার বুদ্ধিহীনভাবে সেদিন বিনয় কাকা, গুরুদয়াল কাকা, আপন শেখ এদের সকলের কাছে একে একে সকলের কাছে করুণার হাত পেতেছে। একটু ওষুধ কিনবার আশায়। কেউ দেয়নি। বলেছে করোনার সময়ে টাকা ধার নিতে এসেছিস কেন? এ রোগ তো বড় ছোঁয়াছে! এ সময়ে কেউ কারো বাড়ি যাওয়াটাও যে বড় অন্যায়। সরকার বারবার ঘোষণা দিচ্ছে জানিস না? অসহায় রাজন নির্বাক তাকিয়ে থাকে। অথচ, তার বাবা বেঁচে থাকতে এই মানুষগুলোকে কত আপন মনে হয়েছে!
বিনয় পাইক তো মুখের পরে বলেই দিল- তোর বাবাতো করোনায়ই মারা গেল। আবার তোর মায়েরও থেকে থেকে জ্বর হয়। এতো পুরোপুরিই করোনার লক্ষণ। অন্য কারো ক্ষতি করার চেষ্টা একদম করিস না বাবা। যা যা বাড়ি যা। কখন তোকে আবার এ জন্য কে কি বলে ফেলে। আমরা তোর আপনজন। আমরা না হয় কিছু না-ই বললাম। সবাই তো আর সমান না। তার চেয়ে বাড়ি চলে গিয়ে ঘরে বসে থাক। জন্মমৃত্যু বিধাতার হাত। তার সঙ্গে তো আর পাল্লা চলে না।
রাজন কী করবে খুঁজে পায় না; বুঝে পায় না। কী করবে ছোট্ট রাজন? এ মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় মানুষটি সে। গোটা পৃথিবীটাকে আজ তার বিষাক্ত মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে- পৃথিবীর সবচেয়ে রূপ বদলানো ভয়ঙ্কর আর হিংস্র প্রাণী হচ্ছে এই মানুষ।
হঠাৎ কে যেন বলে গেল- সরকার সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় লকডাউন শিথিল করেছে। তবে হ্যাঁ, মানুষের সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনায় সকাল দশটা হতে বিকাল পাঁচটা পর্যন্থ দোকান-পাঠ, হাট-বাজার খোলা থাকবে তবে সবাইকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে। রাজনের হঠাৎ মনে পড়ে গেল- সরকারি সাহায্য হিসেবে কয়েক কেজি চিনি ও তেল দিয়েছে। আর গুরুদয়াল ঘোষ তার দোকান থেকে বিদায় করার সময় একশত পঁচাত্তর টাকার পরিবর্তে পাঁচ কেজি ময়দা দিয়েছিল। কেউ যখন সাহায্য করলোই না তাহলে যে করেই হোক আজ তার কিছু একটা করতেই হবে। তাই সে নিজে নিজেই খুরমা বা গজা তৈরি করতে লেগে গেল। ভেবে নিল সকাল দশটা-এগারোটার মধ্যে বাজারে চৌরঙ্গীতে নিয়ে যদি বসতে পারে তবে নিশ্চয়ই বিক্রি হবে বৈকি। আর পাঁচটার আগেই মায়ের মুখে ওষুধ তুলে দিতে পারবে। গরম চুলার কাছে থেকে থেকে রাজনের শরীর থেকে ঘাম দড় দড় করে চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে। তবু কষ্ট নেই। তার বুক ভরা স্বপ্ন। তড়িঘড়ি কাজ শেষ করে বাজারে পৌঁছেছে। আজ তার নতুন পরিচয়, নতুন স্বপ্ন, নতুন ভয়, নতুন এক উত্তেজনা। ছোট বুকে বড় স্বপ্ন, বড় দায়িত্ব- আজ তার মায়ের ওষুধ কেনা হবে!
প্রচণ্ড তাপদাহ আজ। তার মাঝে স্বপ্নের কেনাবেচা। এ বাজার তার চিরচেনা। তবুও এক চোখে নবীন সুখের নবীন বিক্রেতা; অন্য চোখে মায়ের মুখটা থেকে থেকে ভেসে ওঠে। চোখে মুখে দুশ্চিন্তা জড়ানো সুখের জড়সড় বসবাস। ঠিক নয়টা থেকে বাজার বসার সময় নির্ধারিত থাকায় লোকজনের প্রচুর আনাগোনা। বিক্রিও হচ্ছে বেশ! হঠাৎই কেন যেন মনে হচ্ছে ঈশান কোনে মেঘের ডাক শোনা যাচ্ছে। মেঘের গুমোট আবহাওয়া রাজনের মনে ভয়ের সঞ্চার করলো। চোখে মুখে দুশ্চিন্তার রেখা ক্রমে ক্রমে গাঢ় হতে লাগলো। আবার কখনো এই ভেবে হাল্কা হতে চেষ্টা করেÑ সবে তো মাত্র একটা বেজেছে। আরো তো অনেক সময়ই এখনো বাকি রয়েছে। এ সময়ের বৃষ্টি তো স্বভাবত খুব বেশি তো হয় না । শুধু একটু প্রতিক্ষা। তার বিশ্বাস প্রথম প্রথম হয়তো খানিকটা কষ্ট হয়ে থাকবে। তবে যদি কেউ তার তৈরি খুরমার স্বাদ একবার গ্রহণ করে- তাহলে কেল্লা ফতে! তাকে আবার নিশ্চিত তার কাছে আসতেই হবে। এভাবে দু’চারজন ক্রেতা পেয়ে গেলে আর সমস্যা হবার কথা নয়। গুরুদয়াল কাকা একদিন তার ময়দা ভাজানোর প্রশংসা করেছিল। সেদিন বলেছিল- তোর মতন এত সুন্দর করে তো আমি নিজেও করতে পারি নারে! রাজন আজ সেই বিশ্বাসকে পুঁজি করে বসে আছে। যদি কেউ তার থেকে একবার নেয় তাহলে সে অন্য কোনদিন অন্য কোথাও যাবেই না। তবেই আমার মায়ের চিকিৎসায় আর কোনো দুর্ভাবনাই থাকবে না। আর কারও কাছে হাত পেতে এত লাঞ্ছিত হওয়ার কষ্ট পেতে হবে না। মা সুস্থ হলে আমাকে কাজে যদি একটুও সাহায্য করতে পারে তো আমাদের দুঃখের দিন হয়তো শেষ হবে।
এমন সময় হঠাৎই কোত্থেকে যে বজ্রপাত আর ঝমঝম বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। সকলে হুড়মুড় করে এদিক ওদিক দৌড়াদৌড়ি, হুড়োহুড়ি। সকলে যার যার মতো করে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছে। রাজন তার কচি হাতে বড় গামলার ওপর রাখা একগাদা খুরমাকে রক্ষা করতে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। গামলা থেকে খুরমাগুলোকে রক্ষা করতে ছোট্ট একটুকরো পলিথিন বের করে গামলাটিকে ঢেকে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এমন সময় পাশে কেমন যেন ভয়ংকর এক শোরগোল শোনা গেল। কারা যেন পকেটমার ধরা পড়েছে বলে চেঁচামেচি করে যাচ্ছে। রাজনের মনে হল বিকট সেই শব্দ খুব দ্রুতই যেন তার দিকে ছুটে আসছে। ভীতসন্ত্রস্ত রাজন পেছন ফিরে তাকাতেই দেখতে পেল একদল উত্তেজিত মানুষ প্রবল আক্রোশে কাকে যেন কিল-ঘুষি-লাথি মেরেই চলছে।
সে এক ভয়ংকর আর উন্মত্ত রূপ। চিৎকার-চেঁচামেচির মধ্যে শুয়োরের বাচ্চা তুই কার পকেটে হাত দিয়েছিস? তোর এত বড় সাহস? আজ তোর কোন্ বাপ আছে তোকে ঠেকাবে? তোর মতো পকেটমার রাতদিন ডজন ডজন জন্ম দিই। ভয়ার্ত রাজন সেদিকে তাকাতেই কে যেন এসে রাজনের গামলার এককোণে আকস্মিক পায়ের পাড়া বসিয়ে দেয়। রাজনের ওই কচি হাত দিয়ে গামলাকে ধরে রাখতে না পেরে সমস্ত খুরমা মুুহূর্তেই অগণন পায়ের নিচে পিষ্ট হয়। একগাদা কাদায় কাদায় ঢেকে যায় এক নবীন কিশোরে হাতে গড়া স্বপ্ন; ঢেকে যায় রোগাক্রান্ত রাজনের মায়ের প্রতিক্ষিত চোখ। তুমুল হৈচৈ আর মুহুর্মুহু বজ্রপাতের নির্দয় শব্দে রাজন কোনো ফরিয়াদ বিধাতার কাছে জানিয়েছিল কিনা জানা নেই। জানা নেই বিধাতা নামক ওই অদৃশ্য নায়ক আসলে রাজনদের কোনো কথা শোনে কিনা। তীব্র বজ্র আর অঝরধারায় বৃষ্টি- তার মাঝে একলা রাজন! সেই বজ্র বৃষ্টি আর থেমেছিল কিনা কে জানে? রাজন চিৎকার করে কি যেন বলে চলছিল। অথচ বজ্রপাতের ভয়ানক শব্দে তার কিছ্ইু বোঝা গেল না। সবদিনই রাজনদের মতো মানুষদের করুণ আর্তি জানানোর মধ্যেই বজ্র পড়ে। আসলে রাজনরা চিরকালই রোদ-ঝড়-বৃষ্টি আর বজ্রপাতের সমাহার।
আজকালের খবর/আরইউ