ভালোবাসা মাত্র চার অক্ষরের একটি শব্দ। যে শব্দটির সাথে জন্মের পর থেকে সকলেই পরিচিত। কেননা জন্মের পর থেকেই মানুষের বেড়ে উঠা এই ভালোবাসাকে কেন্দ্র করেই। ভালোবাসা শব্দটি খুব নীরবে এক একটি মানুষের মনের গহীনে মিশে যায়। ‘বিশ্ব ভালবাসা দিবস’ বা ‘ভ্যালেন্টাইন’স ডে’ সারা বিশ্বের কোটি কোটি প্রেমিক যুগলের জন্য পরম আকাঙ্ক্ষিত একটি দিন। প্রতি বছর ১৪ ফেব্রুয়ারি সারা বিশ্বে এই দিবসটি একযোগে পালন করা হয়। পৃথিবীতে যতগুলো বিশেষ দিবস রয়েছে তার মধ্যে তরুণ-তরুণীদের কাছে এই দিনটি অন্যতম।
ভালোবাসা দিবসে একইসঙ্গে ঋতুরাজ বসন্তের প্রথম দিন। প্রেমিক-প্রেমিকারা ভালোবাসা দিবসটিকে ঘিরে সারা বছর জুড়েই কল্পনার জগৎ সাজাতে থাকেন। সকল বাধা-বিপত্তিকে পাশ কাটিয়ে সবাই চায় এই বিশেষ দিবসের কিছুটা সময় প্রিয় মানুষের সান্নিধ্যে কাটাতে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে নানা ধরনের প্রস্তুতি ঘোরা-ফেরা করে। এই যেমন নতুন পোশাক, সাজসজ্জা, উপহারসহ আরো কত কিছু। ‘ভালোবাসা দিবস’ শুনলেই আমাদের মনে ভেসে ওঠে হাত ধরে ঘোরা ফেরা, লাল শাড়ি কিংবা নতুন পোশাক পরে সাজগোজ অথবা ফুল হাতে নিয়ে প্রিয় মানুষের জন্য অপেক্ষায় দাঁড়ানো। হঠাৎ করেই বিশ্ব ভালোবাসা দিবসটি বেশ জাঁকজমকপূর্ণ হয়ে গিয়েছে আমাদের এদেশেও।
আর এই দিনটির জন্য দু-পক্ষের মনের মাঝে সৃষ্টি হয় নতুন স্বপ্ন। ভাবনাটা থাকে বিশেষ কারো জন্য। সকলের সামনের নিশি স্বপ্ন হয়ে যায় রঙিন। আজ আমরা যে ভালোবাসা দিবস পালন করছি এর পেছনে অনেক ইতিহাস রয়েছে। ১৪ ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইন’স ডে বা বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের পটভূমির ইতিহাসের পাতায় রয়েছে হৃদয়বিদারক এক ঘটনা। জেনে নেওয়া ভালো, এই দিবসের সেই হৃদয় বিদারক ঘটনাটি; বিশ্ব ভালোবাসা দিবস বা ভ্যালেন্টাইন’স ডে কী? কীভাবে এই দিবসের জন্ম? কেনইবা এই দিনটিকে সারা বিশ্বের মানুষ ভালোবাসা দিবস হিসেবে পালন করে আসছে? বাংলাদেশে দিবসটি এলোই বা কবে থেকে?
প্রথম : ইতিহাসের এই দিনটির জন্য প্রায় সাড়ে ১৭০০ বছর আগে ২৭০ সালে রোমান একজন ধর্মযাজক সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন। ধর্মযাজক সেন্ট ভ্যালেন্টাইন ছিলেন শিশু প্রেমিক, সামাজিক ও সদালাপি এবং খ্রিস্টধর্ম প্রচারক। সেই সময় ইতালির রোম শাসন করতেন রাজা ক্লডিয়াস। আর রোম সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াস ছিলেন বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজায় বিশ্বাসী। ক্লডিয়াস সুশাসক ছিলেন না। তার রাজ্যের নানান অনিয়ম ও নিষ্ঠুরতায় প্রজারা অতিষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। ফলে রোমে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। আর এই বিশৃঙ্খল পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে আনতে ক্লডিয়াল কিছু যুবককে নিয়োগ দেন। আর রাজ্যের সব যুবকদের জন্য নির্দেশ দেন যে তারা কেউ বিয়ে করতে পারবে না। অত্যাচারী সেই রাজার বিশ্বাস ছিলো যে বিয়ে মানুষের সাহস কমিয়ে দেয় ও মনোবল দুর্বল করে ফেলে। পুরো রাজ্যে যখন বিয়ে নিষিদ্ধ তখন সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন যুবকদের কে গোপনে বিয়ে দিয়ে সাহায্য করতেন। ফলে তাকে ‘ভালোবাসার বন্ধু’ উপাধি দেওয়া হয়েছিলো। কিন্তু রাজার নির্দেশ অমান্য করার কারণে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনকে আটক করে কারাবন্দি করা হয়। কারাগারে থাকাকালীন কারারক্ষক সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনকে অনুরোধ করেন তার আধ্যাত্মিক শক্তিতে অন্ধ মেয়ের চোখ ভালো করে দিতে। সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন পরবর্তিতে সেই মেয়ের চোখ ভালো করে দেন এবং সেই সূত্রে সেই মেয়ের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনের আধ্যাত্মিক শক্তির কথা শোনার পর রাজা তাকে রাজ দরবারে ডেকে পাঠান এবং তার রাজ্যের জন্য কাজ করতে বলেন। তখন সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন অস্বীকৃতি জানান এবং যুবকদের বিয়ে বন্ধ করার বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ করেন। ফলে রাজা ক্ষেপে গিয়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আদেশ দেন। মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ঠিক আগ মূহূর্তে সেন্ট ভ্যালেন্টাইন একটি কাগজ ও কলম চেয়ে নেন এবং সেই মেয়েটিকে একটি চিঠি লেখেন। চিঠির একদম শেষে তিনি বিদায় সম্ভাষন হিসেবে লিখেন- ফ্রম ইউর ভ্যালেন্টাইন; যা সবার হৃদয় ছুঁয়ে যায়। সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার দিনটি ছিলো ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২৭০ খ্রিস্টাব্দ। সেই থেকে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের স্মরণে প্রতি বছর পালন করা হয় ‘ভ্যালেন্টাইন’স ডে’। সেই থেকেই দিনটির শুরু।
দ্বিতীয় : সেন্ট ভ্যালেন্টাইন কারারুদ্ধ হওয়ার পর প্রেমাসক্ত যুবক-যুবতীদের অনেকেই প্রতিদিন তাকে কারাগারে দেখতে আসত এবং ফুল উপহার দিত। তারা বিভিন্ন উদ্দীপনামূলক কথা বলে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনকে উদ্দীপ্ত রাখত। এক কারারক্ষীর এক অন্ধ মেয়েও ভ্যালেন্টাইনকে দেখতে যেত। অনেকক্ষণ ধরে তারা দু’জন প্রাণ খুলে কথা বলত। এভাবে এক সময় ভ্যালেন্টাইন তার প্রেমে পড়ে যায়। সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের আধ্যাত্মিক চিকিৎসায় অন্ধ মেয়েটি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পায়। ভ্যালেন্টাইনের ভালোবাসা ও তার প্রতি দেশের যুবক-যুবতীদের ভালোবাসার কথা সম্রাটের কানে গেলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে ২৬৯ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন।
তৃতীয় : খ্রিস্টিয় ইতিহাস মতে, ২৬৯ খ্রিস্টাব্দের কথা। সাম্রাজ্যবাদী, রক্তপিপাষু রোমান সম্রাট ক্লডিয়াসের দরকার এক বিশাল সৈন্যবাহিনীর। এক সময় তার সেনাবাহিনীতে সেনা সংকট দেখা দেয়। কিন্তু কেউ তার সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে রাজি নয়। সম্রাট লক্ষ্য করলেন যে, অবিবাহিত যুবকরা যুদ্ধের কঠিন মুহূর্তে অত্যাধিক ধৈর্যশীল হয়। ফলে তিনি যুবকদের বিবাহ কিংবা যুগলবন্দী হওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করেন। যাতে তারা সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে অনীহা প্রকাশ না করে। তার এ ঘোষণায় দেশের যুবক-যুবতীরা ক্ষেপে যায়। যুবক সেন্ট ভ্যালেন্টাইন নামের এক ধর্মযাজকও সম্রাটর এ নিষেধাজ্ঞা কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি। প্রথমে তিনি সেন্ট মারিয়াসকে ভালোবেসে বিয়ের মাধ্যমে রাজার আজ্ঞাকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং তার গীর্জায় গোপনে বিয়ে পড়ানোর কাজও চালাতে থাকেন। একটি রুমে বর-বধূ বসিয়ে মোমবাতির স্বল্প আলোয় ভ্যালেন্টাইন ফিস ফিস করে বিয়ের মন্ত্র পড়াতেন। কিন্তু এ বিষয়টি এক সময়ে সম্রাট ক্লডিয়াসের কানে গেলে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন। ২৭০ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি সৈন্যরা ভ্যালেন্টাইনকে হাত-পা বেঁধে টেনে-হিঁচড়ে সম্রাটের সামনে হাজির করলে তিনি তাকে হত্যার আদেশ দেন।
চতুর্থ : আরেকটি খ্রিস্টিয় ইতিহাস মতে, গোটা ইউরোপে যখন খ্রিস্টান ধর্মের জয়জয়কার, তখনও ঘটা করে পালিত হতো রোমীয় একটি রীতি। মধ্য ফেব্রুয়ারিতে গ্রামের সকল যুবকরা সমস্ত মেয়েদের নাম চিরকুটে লিখে একটি পাত্রে বা বাক্সে জমা করত। অতঃপর ওই বাক্স হতে প্রত্যেক যুবক একটি করে চিরকুট তুলত, যার হাতে যে মেয়ের নাম উঠত, সে পূর্ণবৎসর ওই মেয়ের প্রেমে মগ্ন থাকত। আর তাকে চিঠি লিখত, এ বলে ‘প্রতিমা মাতার নামে তোমার প্রতি এ পত্র প্রেরণ করছি।’ বৎসর শেষে এ সম্পর্ক নবায়ন বা পরিবর্তন করা হতো। এ রীতিটি কয়েকজন পাদ্রীর গোচরীভূত হলে তারা একে সমূলে উৎপাটন করা অসম্ভব ভেবে শুধু নাম পাল্টে দিয়ে একে খ্রিস্টান ধর্মায়ণ করে দেয় এবং ঘোষণা করে এখন থেকে এ পত্রগুলো ‘সেন্ট ভ্যালেনটাইন’-এর নামে প্রেরণ করতে হবে। কারণ এটা খ্রিস্টান নিদর্শন, যাতে এটা কালক্রমে খৃষ্টান ধর্মের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যায়।
পঞ্চম : অন্য আরেকটি মতে, প্রাচীন রোমে দেবতাদের রাণী জুনোর সম্মানে ১৪ ফেব্রুয়ারি ছুটি পালন করা হতো। রোমানরা বিশ্বাস করত যে, জুনোর ইশারা-ইঙ্গিত ছাড়া কোনো বিয়ে সফল হয় না। ছুটির পরদিন ১৫ ফেব্রুয়ারি লুপারকালিয়া ভোজ উৎসবে হাজারও তরুণের মেলায় র্যাফেল- ড্র’র মাধ্যমে সঙ্গী বাছাই প্রক্রিয়া চলত। এ উৎসবে উপস্থিত তরুণীরা তাদের নামাংকিত কাগজের সি¬প জনসম্মুখে রাখা একটি বড় পাত্রে ফেলত। সেখান থেকে যুবকের তোলা স্লিপের তরুণীকে কাছে ডেকে নিত। কখনও এ জুটি সারা বছরের জন্য স্থায়ী হত এবং ভালোবাসার সিঁড়ি বেয়ে বিয়েতে গড়াতো। ওই দিনের শোক গাঁথায় আজকের এই ভ্যালেন্টাইন’স ডে।
ষষ্ঠ : রোমের সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াস-এর আমলের ধর্মযাজক সেন্ট ভ্যালেনটাইন ছিলেন শিশু-প্রেমিক, সামাজিক ও সদালাপী এবং খ্রিস্টধর্ম প্রচারক। আর রোম সম্রাট ছিলেন বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজায় বিশ্বাসী। ওই সম্রাটের পক্ষ থেকে তাকে দেব-দেবীর পূজা করতে বলা হলে ভ্যালেন্টাইন তা অস্বীকার করায় তাকে কারারুদ্ধ করা হয়। সম্রাটের বারবার খৃষ্টধর্ম ত্যাগের আজ্ঞা প্রত্যাখ্যান করলে ২৭০ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রীয় আদেশ লঙ্ঘনের দায়ে ভ্যালেন্টাইনকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন।
বাংলাদেশে ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’ যেভাবে এসেছে : ১৯৯৩ সালের দিকে বাংলাদেশে বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের আর্বিভাব ঘটে। দৈনিক যায়যায়দিন পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন শফিক রেহমান। তিনি পড়াশোনা করেছেন লন্ডনে। পাশ্চাত্যের ছোঁয়া নিয়ে দেশে এসে লন্ডনী সংস্কৃতির প্র্যাকটিস শুরু করেন। তিনি প্রথমে যায়যায়দিন পত্রিকার মাধ্যমে বিশ্ব ভালোবাসা দিবসটি বাংলাদেশিদের কাছে তুলে ধরেন। তেজগাঁওয়ে তার পত্রিকা অফিসে কেউ চাকরি নিতে গেলে সঙ্গে করে তার গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে যেতে হতো। প্রেমের যুগলবন্ধী কপোত-কপোতীকে দেখে তিনি বেশ খুশি হতেন। বাংলাদেশে বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের প্রচলন হয় শফিক রেহমানের মাধ্যমে। এজন্য তাকে বাংলাদেশে ভালবাসা দিবসের জনক বলা হয়।
লেখক : সাংবাদিক।
আজকালের খবর/আরইউ