দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন কর্মকান্ডের মাধ্যমে তৈরি হয় নানাবিধ বর্জ্য পদার্থ। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ন, প্রযুক্তির বহুল ব্যবহার, ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি ইত্যাদি বর্জ্য বৃদ্ধির প্রধান কারণ । বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য পদার্থের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বিপজ্জনক বর্জ্য, যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত¦ক হুমকিস্বরূপ। রাসায়নিকভাবে সক্রিয়, দাহ্য, বিস্ফোরক, তেজস্ক্রিয় পদার্থ, ক্ষয়কারী পদার্থ সহ বিভিন্ন বিষাক্ত পদার্থ বিপজ্জনক বর্জ্যের অন্তর্ভুক্ত। উদাহরণস্বরূপ - রাসায়নিক স্যার, কীটনাশক, বিভিন্ন ওষুধ, নষ্ট ব্যাটারি, তেজস্ক্রিয় পদার্থ, এসকল কিছুই জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। বিপজ্জনক বর্জ্যের নানারকম উৎস রয়েছে। যেমন- শিল্পে উৎপাদিত বিভিন্ন পেস্টিসাইড, কীটনাশক, আগাছানাশক এবং রাসায়নিক বস্তু, ধাতব বস্তু (সিসা, আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম, পারদ ইত্যাদি) এসব থেকে বিপজ্জনক বর্জ্য তৈরি হয়। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, গৃহস্থালি কাজ, হাসপাতালের অব্যবহৃত, নষ্ট হয়ে হয়ে যাওয়া যন্ত্রপাতি, রক্ত ধৌত জল এসব পরিবেশের মারাত¦ক ক্ষতিসাধন করে। এছাড়াও রয়েছে কাগজ শিল্পের আবর্জনা, ওষুধ শিল্পের বর্জ্য, ইঞ্জিন দহন বর্জ্য, খাদ্য শিল্পের বর্জ্য, বৈদ্যুতিক বর্জ্য, কৃষি বর্জ্য, বিস্ফোরক কারখানা থেকে উৎপাদিত বর্জ্য, সামরিক বর্জ্য, চিকিৎসার অবশিষ্টাংশ ইত্যাদি। বিশ্বব্যপী, জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি(ইউএনিপি) এর মতে, প্রতি সেকেন্ডে ১৩ টন বিপজ্জনক বর্জ্য উৎপাদিত হচ্ছে। প্রতিবছর যার পরিমাণ ৪০০ মিলিয়ন টনেরও বেশি তে গিয়ে দাঁড়ায় এবং এই পরিমাণ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। একেকজন মানুষ প্রতি বছর প্রায় ৬০ কেজি বিপজ্জনক বর্জ্য ঊৎপাদন করে। বিভিন্ন শিল্পকারখানাগুলো থেকে বিপজ্জনক বর্জ্যের সিংহভাগ আসছে । শিল্পকারখানার প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে উৎপন্ন ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পবর্জ্য নানা ধরনের হয়ে থাকে। যেমন বস্ত্র, চামড়া, সার, সিমেন্ট ইত্যাদি। ন্যাশানাল কনসাল্ট ইনভেন্টরির এক রিপোর্টে দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রতি বছর টেক্সটাইল শিল্প থেকে ১১৩,৭২০ টন, হাসপাতাল থেকে ১২,২৭১ টন, ট্যানারি শিল্প থেকে ২৬,২৫০ টন , সার -কীটনাশক কারখানা থেকে ৬৩৪ টন কঠিন বর্জ্য উৎপাদন হয়। আর এসব শিল্পকারখানার অধিকাংশই তাদের বর্জ্য নদনদীতে ফেলে। শিল্পবর্জ্য নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলির চাপে তারা এসব বর্জ্য কিছতা শোধন করলেও সংশ্লিষ্ট আইন-কানুন যথাযথভাবে মেনে চলে না। ঢাকা শহরের হাজারীবাগ এলাকার প্রায় ২৫০টি চামড়া শিল্পকারখানায় কোটি কোটি টুকরা পশুর চামড়া প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এগুলিতে ব্যবহৃত বিষাক্ত রাসায়নিক বহুলাংশে অশোধিত অবস্থায় নদীতে পড়ছে। এছাড়াও পরিবেশ অধিদপ্তর এর ২০১৮ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে শুধুমাত্র ৪ লাখ টন বৈদ্যুতিক বর্জ্যই জমা হয় এবং ২০৩৫ সাল নাগাদ ৪৬ টনে দাঁড়াবে-যা যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ।
বিপজ্জনক বর্জ্য থেকে নানারকম রোগ সৃষ্টি হয়ে থাকে একইসাথে পরিবেশের জন্য ও ক্ষতিকর। হাসপাতালে ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে জমে থাকা বিপজ্জনক বর্জ্য দূষিত গ্যাস সৃষ্টি করে পরিবেশ দূষিত করে। বাংলাদেশে প্রতিটি করোনা ইউনিটে প্রতি জন রোগী ১.৬৩ -১.৯৯ কেজি কঠিন বায়োমেডিকেল বর্জ্য উৎপাদন করছে। বৃষ্টির জলে ধুয়ে এসকল বস্তু জলাশয়ে পড়ে এবং পানি দূষণ করে যা থেকে জলজ প্রাণী ও গৃহপালিত প্রাণীর বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন ভারী মৌল যেমন আর্সেনিক পানি দূষণ ঘটায়, আর্সেনিকদূষিত পানি পান করলে আর্সেনিকোসিস রোগ সৃষ্টি হয়, সিসা মানবদেহে ডিসলেক্সিয়া, ক্যাডমিয়াম থেকে ইটাই ইটাই, পারদ থেকে মিনামিটা রোগ হয়। এছাড়াও রয়েছে আচরণগত অস্বাভাবিকতা, ক্যান্সার, জিনগত ত্রুটি, শারীরিক ত্রুটি, জন্মত্রুটিসহ বিভিন্ন জটিল রোগ। কৃষিতে বহুল ব্যবহৃত কীটনাশক, রাসায়নিক স্যার বৃষ্টির পানির সাথে মিশে জলাশয়ে গিয়ে পরে পানিকে বিষাক্ত করে তোলে। নদীনালাসহ অন্যান্য জলাশয়ে জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের রোগ সৃষ্টি করে, বিষাক্ত এলাকাগুলোতে কোন জীব জীবনধারণ করতে পারে না ; প্রানী ও উদ্ভিদের প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস করে। কিছু কিছু বিপজ্জনক বর্জ্য যেকোনো সময় বিস্ফোরিত হতে পারে। টিএনটি, বিভিন্ন জৈবপারঅক্সাইড উৎকৃষ্ট বিস্ফোরক যাদের সঠিক উপায়ে সংরক্ষণ করা না হলে যেকোনো সময় বিস্ফোরিত হতে পারে। বাংলাদেশে ৫ টি কয়লা খনি রয়েছে । খনিগুলোতে নানা ধরনের বিস্ফোরক ব্যবহার হয়। অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট ফুয়েল অয়েল উৎকৃষ্ট বিস্ফোরক। ক্ষতিকারক বস্তুসমূহ পরিবেশে দুইভাবে বিষাক্ততা ছড়াতে সক্ষম। যখন এসব বস্তু খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে এইগুলো বিষাক্ততা ছড়াতে সক্ষম তখন একে একিউট প্রভাব বলে। অন্যদিকে কিছু কিছু পদার্থ দীর্ঘদিন পরিবেশে উন্মুক্ত থেকে ধীরে ধীরে পরিবেশে বিষাক্ততা তৈরি করে, একে ক্রোনিক বিষাক্ততা বলে। তেজক্রিয় পদার্থ সমূহ একিউট, ক্রোনিক দুইভাবেই ক্ষতিসাধন করতে পারে। কারণ এসব পদার্থসমূহ পরিবেশে বহু দিন থেকে যায় এবং ক্ষতিকারক (আলফা,বিটা,গামা) রশ্মি ছড়ায়। সর্বোপরি, বিপজ্জনক বর্জ্যসমূহ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পরিবেশের বিভিন্ন উপাদানের সাথে মিশে জনস্বা¯েহ্যর উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন ধরনের পদ্ধতি রয়েছে। তবে উৎস থেকে বর্জ্য উৎপাদন হ্রাসকরণ বা পুনরুৎপাদন পদ্ধতিগুলো সবচেয়ে উপযোগী। রিসাইকেলিং পদ্ধতিতে পুরাতন বর্জ্য সমুহকে পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন করে ব্যবহার্য বস্তুতে রুপান্তর করতে পারি। রিসাইকেলিং, রিডিউসিং পদ্ধতিগুলো শুধু পরিবেশ দূষণ কমাতেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে না এর মাধ্যমে বর্জ্যের পরিমাণ ও কমে যায় অনেকগুণ । তবে এমন কিছু বর্জ্য থেকেই যায় যাদের সংরক্ষণ কিংবা অপসারণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় পরিশোধন করা জরুরি। বর্জ্য বিশেষে রাসায়নিক, জৈবিক, ভৌতিক, তাপীয় নানা ভাবেই পরিশোধন করা যায়। তাপীয় পদ্ধতিতে ইনসিনেরেশন বা ভস্মীকরণ প্রক্রিয়ায় উচ্চতাপমাত্রায় বর্জ্যগুলোকে পুড়িয়ে ফেলা হয়। এই পদ্ধতিতে জৈব বর্জ্যকে পুরোপুরি বিষমুক্ত ও বিনষ্ট করে দেওয়া যায়। পৃথিবীর বহু দেশেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ইনসিনেরেশন পদ্ধতিটি বেশ পরিচিত।
পেট্রোলিয়াম শিল্প থেকে উৎপাদিত বর্জ্যসমূহের জৈব পরিশোধন বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আরেকটি উপায়। এই উপায়ে ল্যান্ড ফার্মিং পদ্ধতিটি বেশ কার্যকর। এই পদ্ধতিতে বর্জ্যগুলোকে সতর্কতার সাথে মাটির উপরিভাগে মেশানো হয় যাতে করে মাটির অণুজীব গুলো ক্ষতিকারক বস্তু গুলোকে মাটির সাথে পচিয়ে ফেলতে পারে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে জেনেটিক্যালি মোডিফাইড অণুজীবও ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এছাড়াও অণুজীবের দ্বারা দূষিত স্থানের বিপজ্জনক বস্তুগুলো স্থিতিশীল করা হয়ে থাকে-যা বায়োরিমিডিয়েশন পদ্ধতি নামে পরিচিত। এমন কিছু বিপজ্জনক বর্জ্য রয়েছে যাদের ক্ষতিকর প্রভাব উপরিউক্ত কোন পদ্ধতিতেই অপসারণ করা যায় না। এসব বর্জ্যের ক্ষেত্রে ল্যান্ড ডিসপোজাল (খধহফ ফরংঢ়ড়ংধষ)-ই হল চূড়ান্ত ব্যবস্থা। দুই ধরনের ডিসপোজাল পদ্ধতি রয়েছে। ১. ল্যান্ডফিলিং বা ভরাটকরণ ২. সিকিউর ল্যান্ডফিলিং । ল্যান্ডফিলিং হচ্ছে এমন একটি পদ্ধতি যাতে বিপদজনক বস্তুসমূহকে লোকালয় থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলা হয়। অপরদিকে, সিকিউর ল্যান্ডফিলিং এমন একটি প্রক্রিয়া যাতে বিপজ্জনক বর্জ্যগুলোকে সুপরিকল্পিত উপায়ে মাটির গভীরে কয়েকটি স্তরে জমা করা হয়। সরাসরি উন্মুক্ত না থাকায়, সিকিউর ল্যান্ডফিলিং পরিবেশ দূষণের ঝুঁকি অনেকাংশে হ্রাস করে।
একটি প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ পদার্থ তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের বিরূপ প্রতিক্রিয়া কেবল তেজস্ক্রিয়তা প্রশমনের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই লাঘব হতে পারে। তেজস্ক্রিয় বর্জ্য নিষ্কাশনের সাধারণ পদ্ধতি হলো তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা নিরাপদ পর্যায়ে নেমে না-আসা পর্যন্ত এসব বর্জ্য নিরাপদ স্থানে মজুত রাখা। বাংলাদেশে তেজস্ক্রিয় পদার্থের ব্যবহার কয়েকটি প্রতিষ্ঠান পরিচালিত বৈজ্ঞানিক গবেষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এসব প্রতিষ্ঠান প্রধানত ৩২ঢ় ব্যবহার করে যাবে। বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশন পরিচালিত বিভিন্ন শহরে অবস্থিত ৯টি নিউক্লিয়ার মেডিসিন কেন্দ্র থাইরয়েড গ্রন্থির অতিক্রিয়া চিকিৎসায় ১৩১ও ব্যবহার করছে । তেজস্ক্রিয় পদার্থ ব্যবহারের লাইসেন্স প্রদান, নিরাপদ ব্যবহার এবং তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের অপসারণ, পূর্ব মজুত ইত্যাদি কর্মকান্ড তদারকি করা বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশনের দায়িত্ব। তবে সার্বিকভাবে বাংলাদেশে বিপদজ্জনক বর্জ্য পরিশোধনে কার্যকর হয় নি তেমন কোন সুষ্ঠু পরিকল্পনা। ফলশ্রুতিতে, এই ধরনের বর্জ্যের উৎস, ক্ষতিকারক দিকগুলো স¤পর্কে সাধারণ জনগণের তেমন কোন ধারণাই তৈরি হয় নি। বেশিরভাগ মানুষ এখানে সেখানে ময়লা ফেলতে বেশি অভ্যস্ত, যার ফলে তৈরি হচ্ছে অনিয়ন্ত্রিত ময়লা আবর্জনার স্তুপ। বিপজ্জনক বস্তুসমূহ এই আবর্জনার স্তুপের মাঝেই মিশে যাচ্ছে ও পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের মারাত্নক ক্ষতিসাধন করছে। সর্বোপরি, পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য ঝুকিপূর্ণ এসব বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় যথাযথ কর্তৃপক্ষের সুনজর আশা করি যেন সুপরিকল্পিত ও বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে এসব বর্জ্য অপসারণ করে দূষণমুক্ত একটি পরিবেশ গড়ে তোলার দিকে অগ্রসর হতে পারি।
লেখক: শিক্ষার্থী, পরিবেশ বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।
আজকালের খবর/টিআর