১৯২০ সালের ২১ জানুয়ারি প্যারিস শান্তি আলোচনার ফসল লিগ অব নেশনস প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা। পৃথিবীতে বৈশ্বিক শান্তি রক্ষায় সর্বপ্রথম সংস্থাটি হল সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ। সংস্থাটি প্রতিষ্ঠাকালীন চুক্তিপত্র বা নিয়মপত্র প্রাথমিক উদ্দেশ্য হল সম্মিলিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও অসামরিকীকরণের মাধ্যমে যুদ্ধ এড়ানো এবং সমঝোতা ও সালিশের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্বের নিরসন করা। অন্যান্য লক্ষ্যের মধ্যে শ্রমিক অধিকার নিশ্চিতকরণ, আদিবাসীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ, বৈশ্বিক সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণ, মাদক ও মানব পাচার রোধ, অস্ত্র কেনাবেচা রোধ এবং ইউরোপের সংখ্যালঘু ও যুদ্ধবন্দীদের অধিকার নিশ্চিতকরণ অন্যতম।৫৮ টি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে প্রায় ২৭ বছরের রাজত্বকালের পুরোটাই ছিল ব্যর্থতার গল্প। তাই আর বেশি দূর এগোতে পারেনি। অল্প কিছু সাফল্য এবং শুরুর দিকে বেশ কয়েকটি ব্যর্থতার পর অবশেষে ত্রিশের দশকে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ অক্ষশক্তির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে প্রচণ্ডভাবে ব্যর্থ হয়। জার্মানির সাথে সাথে জাপান, ইতালি, স্পেন ও অন্যান্য দেশ সংস্থাটি থেকে সরে দাঁড়ায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতেই এটা প্রমাণ হয়ে যায় যে আরেকটি বিশ্বযুদ্ধ এড়াতে জাতিপুঞ্জ সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
এবার আসা যাক মূল আলোচনায়, জাতিপুঞ্জের ব্যর্থতার ফল হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ১৯৪৫ সালের ৬ অগাস্ট সকালে মার্কিন বিমান বাহিনী জাপানের হিরোশিমা শহরের ওপর লিটল বয় নামের পরমাণু বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এর তিন দিন পর নাগাসাকি শহরের ওপর ‘ফ্যাটম্যান’ নামের আরেকটি পরমাণু বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় আমেরিকা। যাতে হিরোশিমাতে প্রায় এক লাখ চল্লিশ হাজার ও নাগাসাকিতে প্রায় চুয়াত্তর হাজার মানুষ নিহত হন।
এই ধ্বংসাত্বক পরিস্থিতি থেকে পৃথিবীর মানুষকে বাচাঁতে মরিয়া হয়ে পড়েছিলেন বিশ^ নেতারা। তাদের দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের ফল হলো জাতিসংঘ। ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত হওয়া আন্তর্জাতিক সংস্থাটির বর্তমান সদস্য দেশ ১৯৩। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী সংস্থাটির উদ্দেশ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে- ১. শান্তি ভঙের হুমকি ও আক্রমণাত্মক প্রবণতা ও কার্যকলাপ দূর করে বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ২. সব মানুষের সমান অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে বিভিন্ন জাতির মধ্যে সহযোগিতা ও বন্ধুত্ব জোরদার করা, ৩. অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে পুরো জাতির মধ্যে সহযোগিতা গড়ে তোলা, ৪. জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবার স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকারের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধবোধ গড়ে তোলা, ৫. আন্তর্জাতিক আইনের সাহায্যে আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান নিশ্চিত করা, ৬. প্রত্যেক জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের স্বীকৃতি এবং তা সমুন্নত রাখা, ৭. উদ্দেশ্যগুলো বাস্তবায়নের জন্য জাতিসংঘের কার্যধারা অনুসরণ করা।
কিন্তু সংস্থাটি উদ্দেশ্য পূরণে কতটুকু সফল তা দেখে নেয়া যাক। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনীর অভিযান শুরু হওয়ার পর মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন ৭ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। জাতিসংঘের বক্তব্য অনুযায়ী, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে এখনও ৬ লাখের বেশি রোহিঙ্গা রয়েছে, যাদের মধ্যে এক লাখের বেশি রোহিঙ্গা বিভিন্ন ক্যাম্পে আটক রয়েছেন।
২০১৭ সালের পর এখন পর্যন্ত রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘ কোনো জোরালো পদক্ষেপ গ্রহন করতে পারেনি। কারণ বিশ্বের পরাক্রমশালী কিছু রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ। তবে কেন এত কষ্ট করে জাতিসংঘ নামক একটি নাচের পুতুল বানানোর দরকার ছিল? আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় এখানে প্রশ্নবিদ্ধ জাতিসংঘ।
এবার আসা যাক ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যু। মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক স্থিতি, দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং ইসরাইল ও আমেরিকার সাথে আরববিশ্বের দ্বন্দ্বের চিরস্থায়ী অবসানের ক্ষেত্রে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সমস্যার চিরস্থায়ী একটা সমাধান হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটা বিশ্বের রাজনীতি সচেতন মানুষের অজানা থাকার কথা নয়। এই ‘ইসরায়েল বনাম ফিলিস্তিন’ ‘ইসরায়েল বনাম আরববিশ্ব’ মনোভাব বা দ্বন্দ্ব আরব ভূখন্ডের গন্ডি পেরিয়ে সময়ের সাথে ক্রমে ‘ইসরায়েল বনাম মুসলিম বিশ্ব’ মনোভাব বা দ্বন্দ্ব হিসেবে রূপ নিয়েছে।
ইহুদিবাদী ইসরায়েল জাতিসংঘ প্রদত্ত প্রস্তাব ও ম্যাপ মেনে নিলেও ফিলিস্তিনি মুসলিমরা স্বভাবতই তা প্রত্যাখ্যান করে। কেননা ৩২ শতাংশ ইহুদি জনগণকে (যাদের অধিকাংশই অভিবাসী) যেখানে ফিলিস্তিনি ভূমির ৫৬ শতাংশ প্রদান করা হয়, সেখানে ৬৮ শতাংশ মূল আদিবাসী মুসলিম আরবদেরকে প্রদান করা হয় মাত্র ৪৪ শতাংশ ভূমি। এই প্রস্তাবকে ফিলিস্তিন প্রত্যাখ্যান করবে এটাই স্বাভাবিক। কারণ কেউ চায়না নিজ দেশ পরবাসী হয়ে থাকতে।
এদিকে জাতিসংঘ নিয়ন্ত্রিত জেরুজালেমে ইহুদি ও মুসলিমদের প্রস্তাবিত সংখ্যা ছিল সমান সমান চার লক্ষ করে। জাতিসংঘ কমিটির দাবি অনুযায়ী, ইসরায়েলকে অধিক পরিমাণে ভূমি দেয়ার পেছনে যুক্তি ছিল উক্ত এলাকায় ভবিষ্যত ইহুদি অভিবাসীদের সঙ্কুলানের ব্যবস্থা রাখা। কিন্তু ভবিষ্যৎতের কথা চিন্তা করে তো বর্তমানকে ধ্বংস করা যায় না।
এছাড়া মানুষ বসবাসের জন্য প্রতিকূল, দক্ষিণের মরুভূমি ইসরায়েলকে দেয়া হয় এই উদ্দেশ্য যেন ভবিষ্যতে আগত ইহুদি অভিবাসীরা সেখানে নিজেদের প্রয়োজনে বসতি গড়ে নিতে পারে। জাতিসংঘের দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ফিলিস্তিন বিভাজনের প্রস্তাব অনুমোদন ইহুদি শিবির যতখানি আনন্দ বয়ে আনে, ঠিক ততখানিই অসন্তুষ্টি ও ক্ষোভ বয়ে আনে আরব শিবিরে। যার পরিপ্রেক্ষিতে আবারও দফায় সংঘর্ষ বাধে ফিলিস্তিনের ইহুদি ও মুসলিমদের ভেতর এবং প্রচুর হতাহতের ঘটনা ঘটে।
১৯৪৮ সালের মে মাসে ব্রিটিশ সরকারের ফিলিস্তিন ম্যান্ডেট-এর মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার আগের দিন ইসরায়েল স্বাধীনতা ঘোষণা করে। স্বাধীনতা ঘোষণার পরপরই আমেরিকা ও রেজা শাহ পাহলাভির ইরান রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দান করে ইসরায়েলকে। যা অনুসরণ করে পরবর্তী দিনগুলোতে অন্যান্য অনেক অমুসলিম দেশ ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি দান করে। তবে স্বাধীনতা ঘোষণা করার পরদিনই মিশর, লেবানন, সিরিয়া জর্ডান ও ইরাক ইসরায়েলে সামরিক হামলা চালায়।
ইউরোপীয় উপনিবেশ থেকে সম্প্রতি মুক্ত হওয়া এসব আরব দেশ ইসরায়েলকে পরাজিত করতে ব্যর্থ হয়। ১৯৪৯ সালের জুলাইতে সিরিয়ার সাথে (যুদ্ধবিরতি) চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে ইসরাইল-আরব যুদ্ধের অবসান ঘটে। তবে ইসরাইল তার সার্বভৌমত্বকে ধরে রাখতে সমর্থ হয় এবং ইতোমধ্যে ফিলিস্তিনের ভূমি দখল করে নিজেদের রাষ্ট্র সীমানা ১৯৪৭-এর জাতিসংঘের অনুমোদিত বিভাজন ম্যাপের চেয়ে ন্যূনতম আরও ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি করতে সমর্থ হয়।
আরব-ইসরাইল যুদ্ধকালীন ইসরাইল নিজস্ব ভূভাগ (জাতিসংঘের ম্যাপ অনুযায়ী) ও দখলকৃত অঞ্চল থেকে মুসলিম অধিবাসীদের ঢালাওভাবে বিতাড়ন করে এবং সেই সাথে নিপীড়ন ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে মুসলমানদের মধ্যে সৃষ্টি করে ত্রাস। নিজেদের আবাসভূমি থেকে উৎখাত হওয়া ও প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা ফিলিস্তিনি আরবরা ইসরায়েলি সীমানার বাইরে ও আশপাশের আরবদেশগুলোতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় গ্রহণ করে।
আরবদেশগুলো থেকে অন্তত আড়াই থেকে তিন লক্ষ ইহুদি ইসরায়েলে মাইগ্রেট করে ১৯৪৮ সালের ইসরাইল আরব যুদ্ধের পর।
এছাড়া ১৯৬৭ সালের ইসরায়েল-আরব যুদ্ধের পর আশপাশের প্রায় ১০ টা আরবদেশ থেকে অন্তত সাড়ে আট লক্ষ ইহুদি ইসরায়েলে মাইগ্রেট করে। এদের ভেতর ধর্মীয় ও আদর্শগত কারণে স্বেচ্ছায় যত সংখ্যক ইহুদি ইসরায়েলে মাইগ্রেট করেছে, নিজেদের বাসস্থান থেকে বিতাড়িত কিংবা অত্যাচারিত হয়ে বাধ্য হয়ে ইসরায়েলে মাইগ্রেট করেছে এমন ইহুদির সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি। তাহলে ইহুদিরা কতটুকু মানলো জাতিসংঘকে,কতটুকু দাম দিলো তাদের। এই জাতীয় নানা প্রশ্নের সম্মুখীন এখন জাতিসংঘ ।
বিশ্বশান্তি রক্ষায় প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘ এরকম অসংখ্য সংকট সমাধানে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। শুধু ইসরাইল-ফিলিস্তিন না সৌদি-ইয়েমেন, ইরাক-ইরান দ্বন্দ্ব, রোহিঙ্গা ইস্যু এমন হাজারো বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে দর্শকের ভূমিকায় জাতিসংঘ। এজন্য মহৎ উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত বৈশি^ক সংস্থাটির কাঠামো সংস্কার প্রয়োজন।
লেখক: আইন বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
আজকালের খবর/টিআর