বুধবার ৩ জুন ২০২৬
উপকূলে লবণাক্ততা সংকট ও দূরীকরণের ব্যবস্থা
প্রকাশ: রোববার, ৯ মে, ২০২১, ৮:৩৮ পিএম  আপডেট: ০৯.০৫.২০২১ ৮:৪২ পিএম  (ভিজিট : ২৬৫৩)
বিশ্বের অন্যতম সুপেয় পানির আধার বাংলাদেশে এখন লবণাক্ততা বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততার সমস্যা দীর্ঘদিনের। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই সমস্যা আরও প্রকট হয়েছে। ফলে ওই অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে আছে। জমির উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে এবং অনেকের জীবিকা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। দেশের উপকূলীয় অঞ্চল প্রায় ২০ শতাংশ জুড়ে রয়েছে। লবণাক্ততার কারণে দেশের অন্যান্য এলাকার তুলনায় উপকূলের মানুষের মৃত্যুহারও বেশি, বিশেষ করে শিশু মৃত্যু এখানে বেশি হয়।   লবণাক্ততার কারণে প্রতিবছর বিশ্বের ১৭ কোটি মানুষের প্রয়োজনের সমপরিমাণ খাদ্য উৎপাদন কম হয়। শুধু লবণাক্ততাই নয়, বিশ্বজুড়ে পানির নতুন বিপদ হিসেবে অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার সমস্যাকে সামনে আনা হয়েছে। একই সঙ্গে রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও আর্সেনিকের কারণে পানিদূষণের বিষয়টি উঠে এসেছে। বলা হয়েছে, এসব সমস্যা বিশ্বের সুপেয় পানির উৎসগুলোকে বিষিয়ে তুলছে।
উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বন্ধে পাকিস্তান আমল থেকে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তার মধ্যে বেড়িবাঁধ উল্লেখযোগ্য। কিন্তু সিডর ও আইলার পর অনেক স্থানেই সেই বাঁধ ভেঙে গেছে। এ ছাড়া চিংড়ি চাষের জন্য স্থানীয় প্রভাবশালীরা বাঁধ কেটে ঘের এলাকায় লবণপানি উত্তেলন করেন। এতে গুটিকয়েক ঘের ব্যবসায়ী লাভবান হলেও এলাকার বেশির ভাগ বাসিন্দার জীবন-জীবিকা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। পাশাপাশি তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের জরিপ অনুযায়ী, বিশ্বের ৮০ শতাংশ সুপেয় পানি, ট্যাপের পানির ৮১ শতাংশ ও বোতলজাত পানির ৯৩ শতাংশ ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার দূষণের শিকার। বাংলাদেশেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। বাংলাদেশের ১২ শতাংশ মানুষ এখনো আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করে। আর গড়ে উপকূলের ৩ শতাংশ শিশু লবণাক্ততার কারণে মারা যায়। এই হার বরিশাল বিভাগে প্রায় ২০ শতাংশ। এসব এলাকার নারীরা প্রতিদিন গড়ে ২০ কিলোমিটার দূর থেকে মিষ্টিপানি সংগ্রহ করে। এতে তাদের নানা ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা হয়।
মানুষের শরীরে নির্দিষ্ট পরিমাণ লবণের প্রয়োজন এবং সেটি আসে খাদ্য ও পানি থেকে। কিন্তু উপকূলীয় এলাকার পানিতে লবণের পরিমাণ অনেক গুণ বেশি। এই পানি শরীরে প্রবেশ করলে স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে গর্ভবতী নারীদের জন্য তা হয়ে ওঠে আরও বেশি বিপজ্জনক। গর্ভাবস্থায় নারীরা বেশি লবণাক্ত পানি খেলে খিঁচুনি ও উচ্চ রক্তচাপ হয়। এ কারণে নারীদের গর্ভাবস্থায় সন্তান মারা যাওয়ার হারও বেশি, যা বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাকেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) এক গবেষণায় বলা হয়, লবণাক্ততার কারণে উপকূলের নারীরা শুধু অকালগর্ভপাতেরই শিকার হন না, ৩ শতাংশ শিশুও মারা যায়। এ ছাড়া বেশি লবণ খাওয়ার সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের স¤পর্ক রয়েছে। যা হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। দেশ এবং নেট আবাদযোগ্য ক্ষেত্রের ত্রিশ শতাংশেরও বেশি উপকূলীয় অঞ্চলে। এটি উপকূল থেকে ১৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত প্রসারিত হয়। উপকূলীয় ও উপকূলীয় অঞ্চলের ২.৮৮ মিলিয়ন হেক্টর জমির মধ্যে প্রায় ০.৮৮ মিলিয়ন হেক্টর আবাদযোগ্য জমি। যা বাংলাদেশের মোট আবাদযোগ্য জমির ৩০ শতাংশের বেশি অংশ জুড়ে। উপকূলীয় অঞ্চলের একটি অংশ সুন্দরবন প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ বন যা প্রায় ৪,৫০০ কিলোমিটার জুড়ে রয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলের অবশিষ্ট অংশ কৃষিতে ব্যবহৃত হয়। 
উপকূলীয় জেলাগুলিতে আবাদযোগ্য অঞ্চলগুলি বিভিন্ন ডিগ্রি মাটির লবণাক্ততায় প্রভাবিত হয়। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল, বঙ্গোপসাগরসহ দক্ষিণে জোয়ার, মোহনা এবং নদী প্লাবন সমভূমি অর্ন্তভুুক্ত রয়েছে। এই অঞ্চলগুলিতে কৃষিজমি ব্যবহারের অবস্থা শোচনীয়। 
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি উপকূলের মানুষ কম লবণাক্ত পানি (যেমন বৃষ্টির পানি) পান করে, তাহলে তাদের রক্তচাপ কমিয়ে আনা সম্ভব। খুলনার দাকোপ উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে সেবা নিতে আসা ১ হাজার ২০৮ জন গর্ভবতী মায়ের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শুধু নলকূপের পানি পান করা মায়েদের উচ্চ রক্তচাপ বেশি। এই স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষকে সুরক্ষা দিতে হলে সুপেয় ও মিষ্টি পানির ব্যবস্থা করতে হবে। বড় বড় পুকুর খনন করে এবং বৃষ্টির পানি ধরে রেখে সেটি করা যায়। কিন্তু ওই অঞ্চলের মানুষ এতটাই দরিদ্র যে তাদের পক্ষে পুকুর খনন বা বৃষ্টির পানি দীর্ঘদিন ধরে রাখা সম্ভব নয়। এজন্য পর্যাপ্ত জলাধারের ব্যবস্থা করতে হবে।
কিছু অঞ্চল এবং লবণাক্ত পানির আরও অনুপ্রবেশের কারণ হিসাবে লবণ প্রভাবিত অঞ্চলের সম্প্রসারণ, সাধারণ ফসলের উৎপাদন আরও সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। অতীতে দেশের লবনাক্ততা সমস্যা খুব কম মনোযোগ পেয়েছিল। কিন্তু ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার বর্ধিত চাপ আরও খাদ্যের চাহিদা দাবি করে। সুতরাং ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য এই (স্যালাইন) জমির উর্বরতা বাড়ানোর সম্ভাবনাগুলি খুঁজে বের করা ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই লবণাক্ততায় ক্ষতিগ্রস্থ ভূমি অঞ্চলগুলির বর্তমান রাষ্ট্রের মূল্যায়ন প্রয়োজন। অতএব, সরকারি উদ্যোগেই পুকুর খনন ও বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি যে ব্যবস্থাগুলো নিতে হবে ঃ 
প্রতিরক্ষামূলক বাঁধ: উপযুক্ত আকারের বাঁধ স্থাপনের মাধ্যমে লবণাক্ত জলের স্রোতে জমি রক্ষা করা যেতে পারে। প্রস্তাবিত আকার উচ্চ জোয়ার স্তর থেকে এক মিটার উঁচু হওয়া উচিত।
বেড়িবাঁধে ¯¬ুইস গেটের বিধান: অতিরিক্ত জল অপসারণ এবং উচ্চ জোয়ারের সময় লবণাক্ত পানিতে প্রবেশ রোধ করার জন্য বাঁধ ব্যবস্থায় ¯¬ুইস গেটের ব্যবস্থা করা দরকার। 
ভূমির সমতলকরণ: মাইক্রো-রিলিফের সামান্য পরিবর্তনের ফলে উত্থিত দাগগুলিতে লবণের পরিমাণ বেড়ে যায়। অগভীর ভূগর্ভস্থ জলের টেবিলগুলি সহ নিম্ন-পাত্রে জলাবদ্ধতা জমে যাওয়া রোধ করতে এবং অতিরিক্ত পানির অভিন্ন নিকাশনের সুবিধার্থে জমিটি সঠিকভাবে সমতল করা উচিত। 
সেচের জন্য অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ: খরিফ মৌসুমের প্রয়োজনীয়তা পূরণের পরে পুকুরে জমা হওয়া অতিরিক্ত পানির একটি অংশ শুকনো সময়কালে রবি ফসলের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে।
ধানের জাত নির্বাচন: উপকূলীয় অঞ্চল তুলনামূলক সমতল হলেও অঞ্চলগুলিতে উচ্চতা পার্থক্য রয়েছে, যেখানে স্থায়ী পানির গভীরতা ১৫৯৯ সেন্টিমিটার থেকে বিস্তৃত রয়েছে। ধানের জাতের নির্বাচন (বিআরআরআই ধান ২৩, ৩০, ৪০ ও ৪১), স্থায়ী জলের ভিত্তিতে এবং ক্ষেতে লবণাক্ততার পরিমাণের ভিত্তিতে দেশে পাওয়া যায় যা পরিস্থিতি অনেকাংশে কাটিয়ে উঠতে পারে।
শীতকালীন মৌসুমে ফসলের ভূমিকা: লবন সহনশীল ফসলের প্রবর্তনের সাথে সাথে যথাযথ মাটি এবং পানি ব্যবস্থাপনার পদ্ধতি গ্রহণ করে প্রায় ০.৫৯৬ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে শস্যের ঘনত্ব বাড়ানো যেতে পারে।   
শীত এবং গ্রীষ্মের মাসগুলিতে জমিটি আবৃত রাখা: ভূগর্ভস্থ পানি লবণাক্ত এবং অগভীর গভীরতায় (প্রায় ১.০ মিটার) উপস্থিত থাকে। অতিরিক্ত জমির আর্দ্রতা বা®পীভূত হওয়ার কারণে জমিগুলি পতিত হলে জমিতে লবণাক্ততা বাড়ে। তাই রবি মৌসুমে জমির পতন এড়াতে বাঞ্ছনীয়, লবণ সহনশীল ফসলগুলি বেছে নেওয়া এবং জন্মানো উচিত। এটি লবণাক্ততা কমিয়ে দেবে।
ফসলের নিষিদ্ধকরণ: যেহেতু সাধারণ জমিগুলি কম জৈব পদার্থের পরিমাণ সহ উর্বরতাশালী তাই ফসলের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য উপযুক্ত সার প্রয়োগ করা প্রয়োজন। পটাস সার মাটির লবণাক্ততার অধীনে একটি অতিরিক্ত সুবিধা রয়েছে। 
উপ-পৃষ্ঠতল নিকাশির বিধান: উপকূলীয় অঞ্চলের অনেক জায়গায় লবণাক্ততা খুব বেশি। সেই অঞ্চলগুলিতে সাফল্যের সাথে শস্য জন্মানোর জন্য, লবণের ফাঁস দিয়ে লবণাক্ততা নামিয়ে আনা দরকার। পানির টেবিলটি নীচে নামানো এবং বর্ধিত ফসলের ওপর লবণের প্রভাব রোধ করার জন্য এটির গভীরতা বজায় রাখাও প্রয়োজনীয়। লক্ষ্য অর্জনের জন্য, মাটির উপরিভাগের কমপক্ষে এক মিটার নিচে স্থলীয় পানি রাখতে একটি উপযুক্ত উপ-পৃষ্ঠতল নিকাশি স্থাপন করতে হবে। এই প্রযুক্তি কার্যকর তবে কিছুটা ব্যয়বহুল।
মাটির লবণাক্ততা বিশ্বব্যাপী সমস্যা। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশে, লবণাক্তকরণ শস্য উতপাদন ব্যাহতকারী অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক বিপদ। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল এ প্রায় ৫৩ শতাংশ লবণাক্ততার বিভিন্ন ডিগ্রী দ্বারা আক্রান্ত হয়। এই অঞ্চলগুলিতে কৃষিজমির অবস্থা খুব খারাপ। দেশে খাদ্য সুরক্ষা সমস্যা নিয়ে উদ্বেগ। এ সমস্যা অতীতে খুব কম মনোযোগ পেয়েছিল। তবুও, এর লক্ষণগুলি স্যালাইনাইজেশনের সাথে এ জাতীয় ভূমির অবক্ষয় সাম্প্রতিক বছরগুলিতে উপেক্ষা করার মতো হয়ে উঠছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার বর্ধিত চাপ আরও খাদ্যের চাহিদা করে। সুতরাং দীর্ঘমেয়াদি ভূমি ব্যবস্থাপনার কৌশল গ্রহণের মাধ্যমে দেশে খাদ্য সুরক্ষার জন্য ভূমি লবণাক্তকরণ সমস্যার মোকাবিলা করা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। 
লেখক: সহযোগী সম্পাদক, দ্য এনভায়রনমেন্ট রিভিউ 
আজকালের খবর/টিআর
  












Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor@gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor@gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft