ই-পেপার ফটোগ্যালারি আর্কাইভ  সোমবার ● ১৯ এপ্রিল ২০২১ ● ৬ বৈশাখ ১৪২৮
ই-পেপার  সোমবার ● ১৯ এপ্রিল ২০২১
শিরোনাম: ৪৮ ঘণ্টা জ্বর না আসলে খালেদা জিয়া শঙ্কামুক্ত: চিকিৎসক       লাইভে এসে ক্ষমা চাইলেন নুর       মামুনুলের বিরুদ্ধে ঢাকায় ১৭ মামলা       ঢাকা ছেড়েছে অভিবাসী শ্রমিক বহনকারী চার বিশেষ ফ্লাইট       দ্বিতীয় ঢেউয়ে আক্রান্তরা দ্রুত মারা যাচ্ছেন: আইইডিসিআর       হেফাজত নেতা মামুনুল হক গ্রেপ্তার       সূর্যের আলোয় বেশি থাকলে করোনায় মৃত্যুঝুঁকি কম       
বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ: বাঙালির মুক্তির সড়ক
অজিত কুমার সরকার, সাবেক সিটি এডিটর, বাসস
Published : Sunday, 7 March, 2021 at 4:03 PM, Update: 07.03.2021 4:51:16 PM

প্রথমেই গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। যার জন্ম না হলে বাংলাদেশের জন্ম হতো না; যে নেতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলেন একটি রাষ্ট্রের জন্মের ২৪ বছর আগে, ১৯৪৭ সালে লর্ড মাউন্টব্যাটনের ফর্মুলায় অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বাংলার বিভক্তি মেনে না নেওয়ার কারণে; যে নেতা একটি রাষ্ট্রের জন্মের আগেই ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত  ডিফ্যাক্টো হেড অব স্টেট (কার্যত রাষ্ট্রপ্রধান) হিসেবে পূর্ব বাংলা শাসন করছিলেন।
 
বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ যুগ সৃষ্টিকারী ভাষণ। বাঙালির মুক্তির সড়ক নির্মাণে এই ভাষণ ছিল অনন্য দূরদর্শী, যা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষ এবং মানব জাতির আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় উপাদানে পরিণত হয়েছে। ভাব, ভাষা ও শব্দ চয়নে এ এক মহাকাব্যিক ভাষণ। বিশ্বখ্যাত নিউজইকের ৫ এপ্রিল ১৯৭১ সংখ্যার একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম দেওয়া হয় ‘পোয়েট অব পলিটিকস’ বা রাজনীতির কবি। এই রাজনীতির কবি হলেন বঙ্গবন্ধু। ওই প্রতিবেদনে ৭ই মার্চের ভাষণের বর্ণনা দিতে গিয়ে পত্রিকাটি বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে লিখেছে, ‘৫ ফুট ১১ ইঞ্চি উচ্চতার আপদমস্তক বাঙালি, ধূসর ঝাঁকড়া চুল, পুরু গোঁফ ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টির অধিকারী মুজিব আবেগঘন বক্তৃতার দ্বারা ১০ লাখ মানুষকে জাদুমন্ত্রের মতো সম্মোহিত করে রাখতে পারতেন। উর্দু, বাংলা এবং ইংরেজি- এই তিন ভাষায় অনর্গল কথা বলায় পারদর্শী মুজিব একজন চিন্তাবিদ হওয়ার ভান করেননি, তিনি প্রকৌশলীও নন, তিনি রাজনীতির কবি। শৈল্পিক স্টাইলে তার বক্তৃতার মূল লক্ষ্য ছিল এ অঞ্চলের সকল শ্রেণি ও আদর্শের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করা।’
 
অনেকেই বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধুর ভাষণকে আব্রাহাম লিঙ্কনের গেটিসবার্গ অ্যাডড্রেস এর সাথে তুলনা করেন। লিঙ্কনের ভাষণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গৃহযুদ্ধের অবসান এবং ঐক্যবদ্ধ মার্কিন জাতির অভ্যুদয় ঘটায়। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বাঙালির মুক্তির সড়কের পথ-নকশা নির্মাণ করে বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশর অভ্যুদয় ঘটায়। ইতিহাসের পর্যবেক্ষক জ্যকব এফ ফিল্ড। বিশ্বে যাদের ভাষণ ইতিহাস সৃষ্টি করেছে এমন ৪১ জন দূরদর্শী ও অনলবর্ষী বক্তার বক্তব্য সংকলিত করে প্রকাশ করেছেন, ‘উই শ্যাল ফাইট অন দ্য বিচেস: দ্য স্পিচেস দ্যাট ইনসষ্পায়ার হিস্টোরি। জ্যাকব ইতিহাস সৃষ্টিকারী বক্তা হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহামানের ভাষণ এ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। আরও যাদের বক্তব্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে তাদের মধ্যে অন্যতম পেরিক্লিস, আলেকজান্ডার, হানিবল, জুলিয়াস সিজার, সালাদিন, নেপেলিয়ান, গ্যারিবল্ডি, আব্রাহাম লিঙ্কন, ভ্লাদিমির ইলিচ লেলিন, হো চি মিন।

২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা (ইউনেস্কো) বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণকে বিশ্ব  প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বৈশ্বিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ডকুমেন্টসকেই কেবল এ সংস্থা ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্ট্রারের মেমোরিতে সংরক্ষণ করে।
 
বঙ্গবন্ধু ১৯ মিনিটে ১০১টি বাক্যে এই ভাষণ শেষ করেন। এই ভাষণে শব্দ ও বাক্য প্রয়োগে ওঠে এসেছে একটি জাতির ইতিহাস, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, ২৩ বছরের শোষণ-বঞ্চনা-বৈষম্য এবং তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিবাদী আন্দোলনে বাঙালিদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হবার কথা। ভাষণে উঠে এসেছে মুক্তি ও স্বাধীনতার জন্য চূড়ান্ত সংগ্রামে অংশগ্রহণের কথা। কোন কৌশলে যুদ্ধ ও জনযুদ্ধ পরিচালিত হবে রয়েছে সে কথা। আরও রয়েছে যুদ্ধাবস্থায় সর্বস্তরের মানুষের করণীয় সম্পর্কে আগাম দিক-নির্দেশনা।
 
বঙ্গবন্ধুর ভাষণে  ‘২৩ বছরের ইতিহাস’ কথাটি দুবার এসেছে। মূল বক্তব্যে পৌঁছাবার আগে তিনি প্রেক্ষাপট বর্ণনা করেছেন কয়েকটি বাক্যে। বাঙালির রক্তে বারবার রাজপথ রঞ্জিত হবার কথা বলেছেন। ২৩ বছরের ধারাবাহিক আন্দোলনের ঘটনাপঞ্জী ছিল: ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জয়লাভের পরও প্রাদেশিক সরকার বাতিল, ১৯৫৬ সালে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি, ১৯৫৬ সালে পূর্ব বাংলার নাম বদল, ১৯৫৮ সালে সামরিক আইন জারি করে দমন-পীড়ন, ১৯৬২ সালে হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনবিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ৬-দফা আন্দোলন, ১৯৬৭ সালে রবীন্দ্রনাথ নিষিদ্ধকরণ, ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ও বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার এবং ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান। এই আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ১৯৫২, ১৯৬২, ১৯৬৬, ১৯৬৮ ও ১৯৬৯ সালে বাংলাদেশের রাজপথ রঞ্জিত হয়।

বঙ্গবন্ধু তার ভাষণের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মুক্তির কথা বলেছেন তিনবার। বলেছেন বাংলার মানুষের অধিকারের কথা। মুক্তি বলতে তিনি সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তিসহ জনগণের সার্বিক মুক্তির কথা বলেছেন। এর বিশ্লেষণ এখানে সংক্ষেপে তুলে ধরছি।
 
প্রথমত, সাংস্কৃতিক মুক্তি:
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান স্বাধীন হলেও বাঙালিরা ছিল পরাধীন। ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজিত পাকিস্তান সৃষ্টির এক বছরের মধ্যে বাঙালির সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানে। বাঙালিরা সব সময়ই ভাষাভিত্তিক সাংস্কৃতিক বন্ধনে আবদ্ধ। বাংলা ভাষার ওপর আঘাত মানে সংস্কৃতির ওপর আঘাত। পাকিস্তানে ৫৪ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষের ভাষা বাংলা। অথচ ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ মাত্র ৭ দশমিক ২ ভাগ মানুষের ভাষা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেওয়া হয়। বাংলা ভাষার ওপর আঘাত আসায় শুরু হয় ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই দাবিতে ধর্মঘট পালনকালে সচিবালয়ের সামনে থেকে বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তার হন। পাকিস্তানে এটা ছিল তার প্রথম গ্রেপ্তার।
 
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক মুক্তি:
পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনামলে বাঙালির রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। কখনও স্টিম রোলার চালিয়ে, আবার কখনও সামরিক শাসন জারি করে। বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসন থেকে বাঙালির স্বাদেশিকতার রাজনৈতিক অধিকার অর্জন বা পলিটিক্যাল ইনডিপেনডেন্স প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন।
 
তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক মুক্তি:
সাতচল্লিশে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী জনসংখ্যার দিক থেকে পূর্ব পাকিস্তান বৃহত্তর হওয়া সত্ত্বেও সরকারি বজেটের প্রায় পুরোটাই খরচ হতো পশ্চিম পাকিস্তানিদের জন্য। বৈদেশিক সাহায্যের আশি ভাগই ব্যয় হতো পশ্চিম পাকিস্তানিদের জন্য। চাল, আটা, তেলের দাম পশ্চিম পাকিস্তানের চেয়ে পূর্ব পাকিস্তানে ছিল দ্বিগুণ। এসব বৈষম্য, শোষণ-বঞ্চনা, নির্যাতন থেকে মুক্তি দিতে বঙ্গবন্ধু ১৯৬৬ সালে বাঙালির মুক্তি সনদ (ম্যগনাকার্টা) ছয় দফা ঘোষণা করেন।

বঙ্গবন্ধু সত্তরের নির্বাচনের পর ইয়াহিয়া-ভুট্টোর আঁতাতে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বঙ্গবন্ধু ভাষণে বলেন, ‘তিনি আমার কথা রাখলেন না। তিনি রাখলেন ভুট্টো সাহেবের কথা।’ ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফলাফল দেখে ভুট্টোর মাথা বিগড়ে যায়। এ নির্বাচনে আাওয়ামী লীগের ভূমিধস বিজয় অর্জিত হয়। নির্বাচনে ৩০০ আসনের গণপরিষদে জনসংখ্যা অনুপাতে পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ পায় ১৬৭টি। আর পশ্চিম পাকিস্তানের ১৩১ আসনের মধ্যে জুলফিকার আলী ভুট্টোর পিপলস পার্টি পায় ৮১টি। প্রাদেশিক পরিষদে ৩০০ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ পায় ২৮৮টি। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা ডেজিগনেটেড প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ মুজিবের পরামর্শমতো ১৫ ফ্রেব্রুয়ারি গণপরিষদের অধিবেশন না ডেকে ভুট্টোর কথামতো ৩ ফ্রেবুয়ারি অধিবেশন ডাকেন। বাড়তি সময় নেওয়ার কারণ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের জিএম সৈয়দের অনসারীগণ, বেলুচিস্তানের গাউস বক্স বেজেঞ্জো, আতাউল্লাহ খান মেঙ্গেল, খায়ের বকসমারী, সীমান্ত গান্ধী আবদুল গাফ্ফার খানের ছেলে জনাব ওয়ালী খানসহ যারা তলে তলে বঙ্গবন্ধুকে সমর্থন দিতেন তাদের ‘ম্যানেজ’ করা। যারা ৩ মার্চ আহূত অধিবেশনে যোগ দেবে তাদের পা কেটে ফেলার হুমকি দেয় ভুট্টো। হুমকি উপেক্ষা করে ৩৫ জন সদস্য ঢাকায় আসেন। অবস্থা বেগতিক দেখে প্রসিডেন্ট ইয়াহিয়া ১ মার্চ সাড়ে ১২টায় গণপরিষদের অধিবেশন স্থগিত করে দেন।
 
বঙ্গবন্ধু ছিলেন উদার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী একজন মানুষ। ৭ই মর্চের ভাষণেও এর প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই। তিনি গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করেছেন গণতান্ত্রিক ধারায়। ১৯৭১ সালের মার্চে সশস্ত্ররূপ লাভের আগ পর্যন্ত আন্দোলনকে সহিংসরূপ নিতে দেননি। ন্যায্যতার প্রতি ছিলেন অবিচল আস্থাশীল। সারাজীবন অন্যায্যতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে বলেন, ‘যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও, একজন যদিও হয় তার ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেব।’ ন্যায়ের প্রতি শ্রদ্ধা না থাকলে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া একজন নেতা সংখ্যালঘু, আবার তাও যদি একজনও হয় তা মেনে নেবার কথা বলতে পারেন?  

বঙ্গবন্ধু খুব ভালো করেই জানতেন পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষ জনগণের উপযুক্ত প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। ৭ই মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষকে চারটি শর্ত জুড়ে দেন, যা পাকিস্তানের অস্তিত্বকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দেয়। শর্তগুলো হলো: এক. সামরিক আইন মার্শাল ল’ উইথড্র করতে হবে; দুই. সামরিক বাহিনীর সমস্ত সদস্যকে ব্যারাকে ফেরত নিতে হবে; তিন. যেভাবে হত্যা করা হয়েছে তার তদন্ত করতে হবে; চার. জনগণের উপযুক্ত প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। শর্ত মানলে পাকিস্তান টিকবে অন্যথায় না।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন একজন ভালো কমিউনিকেটর ও সুবক্তা। কোথায় কোন বক্তব্য দিতে হবে তা খুব ভালো জানতেন। ৭ই মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত, অডিয়েন্স  (শ্রোতা) এবং মানুষের স্বপ্ন-আকাঙক্ষা বিবেচনায় নিয়ে শব্দ এবং বাক্যের প্রয়োগ করেছেন। যেমন ‘সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না’। আঞ্চলিক শব্দ সহযোগে আঞ্চলিক ক্রিয়াপদ ব্যবহার করেছেন। ‘দাবায়ে’ শব্দটি প্রমিত বাংলায় বললে বলতেন ‘দাবিয়ে”। কিন্তু দাবায়ে শব্দ অপ্রমিত অথচ গভীর অর্থবোধক ও শক্তিশালী শব্দ। সাধারণ মানুষের হৃদয়ে গ্রোথিত হওয়ার মতো শব্দ। ঠিক এমনিভাবে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি’। একেবারেই সাধারণ মানুষের মুখ নিসৃত কথাই যেন তাঁর মুখে উচ্চারিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর আন্ত:ব্যক্তিক যোগাযোগ ও কথা বলার ভঙ্গিমা নিয়ে চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর সাংবাদিক র‌্যালফ ব্লুমেন্টাল। পত্রিকাটির ৯ ডিসেম্বর ১৯৭০ সংখ্যায় ‘আনডিসপুটেড লিডার অব দ্য বেঙ্গলিস’ শিরোনামে একজন কূটনীতিককে উদ্ধৃত করে তিনি লিখেছেন, ‘শেখ মুজিব যদি একজন ব্যক্তির সাথেও মুখোমুখি বসে কথা বলেন মনে হবে ইয়াংকি স্টেডিয়ামে ৬০ হাজার মানুষের উদ্দেশে বক্তৃতা করছেন।’
 
বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে জাগ্রত করেছেন। ‘এই বাংলায় হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি-নন বেঙ্গলি যারা আছে, তারা আমাদের ভাই’। বঙ্গবন্ধু দীর্ঘ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জনগণকে স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করেছিলেন। এই আন্দোলন নস্যাতে বিভিন্ন সময়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সাম্প্রদায়িকতাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। তাই বঙ্গবন্ধুর ভয় ছিল পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষ অতীতের ন্যায় সাম্প্রদায়িকতাকে উসকে দিয়ে আন্দোলন বিভ্রান্ত বা বানচালের চেষ্টা করতে পারে। এ কারণেই তার সাবধানবাণী। ‘মনে রাখবেন, শত্রুবাহিনী ঢুকেছে, নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে, লুটতরাজ করবে’। এ কারণে তিনি সকল সম্প্রদায় ও গোষ্ঠীর মানুষকে নিজের ভাই মনে করে তাদের সতর্ক করেছেন।
বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের প্রতিপাদ্য শেষোক্ত বাক্যটি। তিনি ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, জয়বাংলা’ বলে বক্তব্য শেষ করেন। বঙ্গবন্ধু মুক্তি বলতে যে জনগণের সার্বিক মুক্তির কথা বলেছেন সে কথা আগেই বলেছি। বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করেছিলেন, বাঙালি জাতিকে পাকিস্তানি শাসন-শোষণের কবল থেকে মুক্ত করতে হলে একমাত্র স্বাধীনতা ছাড়া আর কোনো উপায়ে তা সম্ভব নয়। তাই তার আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতা। ৭ই মার্চে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দেন। প্রকৃতপক্ষে এটাই ছিল কার্যত স্বাধীনতার ঘোষণা (Defacto declaration of independence )। যে সময়ের মধ্যে তিনি এই ঘোষণা দেন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের ভাষায় সেই সময়কাল (১ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ, ১৯৭১) হলো ডিফ্যাক্টো রিজিম, আর মুজিব হলেন ডিফ্যাক্টো রাষ্ট্র প্রধান। ওয়াশিংটন পোস্ট ২১ মার্চ ১৯৭১ সংখ্যায় ‘মুজিবুর: ভার্চুয়াল রুলার অফ ই. পাকিস্তান’ এবং ১০ মার্চ ‘দ্য ইভনিং স্টার পত্রিকায় ‘ডিফ্যাক্টো গভর্নমেন্ট ঢাকা ডিসিডেন্ট ইন পাওয়ার’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
 
বঙ্গবন্ধু ছিলেন কৌশলী, বিচক্ষণ ও প্রজ্ঞাবান রাজনীতিক। তিনি এমনভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন যাতে তার ওপর বিছিন্নতাবাদের দায় না আসে। নিউজউইকের ‘পেয়েট অব পলিটিক্স’ শিরোনামে লিখিত প্রবন্ধে সাংবাদিক লোরেন জেনকিংকে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় বঙ্গবন্ধু বলেছেন, “There is no hope of salvaging the situation. The country as we know it is finished. We are the majority so we cannot secede. They are the Westerners, are the minority, and it is up to them to secede.”   বঙ্গবন্ধুর ভাষণে ছিল মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার সুনির্দিষ্ট দিক-নির্দেশনা। একজন সিভিলিয়ান নেতা চমৎকারভাবে গেরিলাযুদ্ধের নীতি ও কৌশল তুলে ধরেছেন। একদিকে বলেছেন  ‘যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে, অপরদিকে জনগণকে চরম আত্মত্যাগের জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন। হানাদার বাহিনীকে বাংলার মাটি থেকে চিরতরে উৎখাত করে বাংলাদেশ স্বাধীন করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। সেনাবাহিনীকে ক্যান্টনমেন্টে অবরুদ্ধ করে রাখার জন্য যা যা করা দরকার তার নির্দেশ ছিল ভাষণে। সেনাছাউনিতে সব সরবরাহ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এমনকি বাঙালি পাচকদের সেনাবাহিনীর জন্য খাবার রান্না করা নিষেধ ছিল।
 
ভাষণের শেষে বঙ্গবন্ধু বলেন ‘জয় বাংলা’। বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিল জয় বাংলা। জয় বাংলা বলে তিনি ভাষণ শেষ করেন। এই জয় বাংলা শুধু রণধ্বনি নয়, এটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র। এই জয় বাংলা ধ্বনি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমগ্র বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ করে। জয় বাংলা বলেই স্বাধীনতাযুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা আত্মাহুতি দেয়। নয় মাসের রক্তস্নাত যুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের আবির্ভাব ঘটে।


জয় বাংলা  জয় বঙ্গবন্ধু
(ঐতিহাসিক ৭ মার্চ উপলক্ষে আজ রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাব আয়োজিত সেমিনারে ‘বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ: বাঙালির মুক্তির সড়ক’ শীর্ষক লেখাটি মূল প্রবন্ধ হিসেবে উপস্থাপন করেন বাসসের সাবেক সিটি এডিটর অজিত কুমার সরকার)

আজকালেরখবর/টিআর





সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : হাউস নং ৩৯ (৫ম তলা), রোড নং ১৭/এ, ব্লক: ই, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ফোন: +৮৮-০২-৪৮৮১১৮৩১-৪, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮
ই-মেইল : বার্তা- [email protected] বিজ্ঞাপন- [email protected]
দৈনিক আজকালের খবর লিমিটেডের পক্ষে গোলাম মোস্তফা কর্তৃক বাড়ি নং-৫৯, রোড নং-২৭, ব্লক-কে, বনানী, ঢাকা-১২১৩ থেকে প্রকাশিত ও সোনালী প্রিন্টিং প্রেস, ১৬৭ ইনার সার্কুলার রোড (২/১/এ আরামবাগ), ইডেন কমপ্লেক্স, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.com, www.eajkalerkhobor.com