ই-পেপার ফটোগ্যালারি আর্কাইভ  বুধবার ● ২১ এপ্রিল ২০২১ ● ৮ বৈশাখ ১৪২৮
ই-পেপার   বুধবার ● ২১ এপ্রিল ২০২১
শিরোনাম: আগস্ট- সেপ্টেম্বরের আগে টিকা রপ্তানি করতে পারবে না ভারত: আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের       হেফাজতের আশার গুড়ে বালি: অসুস্থতার ভান       খালেদা জিয়ার শরীরে ব্যথা নেই, ২-৩ দিন পর ফের পরীক্ষা       বুধবার থেকে অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট চালু        রাশিয়া বাংলাদেশে করোনা টিকা উৎপাদনের প্রস্তাব দিয়েছে: মোমেন       ইন্দোনেশিয়ায় আঘাত হেনেছে শক্তিশালী ভূমিকম্প       লকডাউনে যুবকের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করা সেই এসআই ক্লোজড      
মশার উপদ্রবে নাকাল নগরবাসী
মামুন হোসেন আগুন
Published : Wednesday, 3 March, 2021 at 4:58 PM, Update: 03.03.2021 5:09:40 PM

প্রতিবারের এ সময়টাতে মশার আধিপত্য বেশি লক্ষ্য করা যায় দেশের সব জায়গায়। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় নাজেহাল অবস্থা। খালগুলোর বর্জ্য অব্যবস্থাপনা, রাস্তা এবং ড্রেন বন্ধ হয়ে ময়লা জমে থাকা ইত্যাদি কারণে ঢাকায় কিউলেক্স মশার উপদ্রব অতিমাত্রায় বেড়েছে। দিন-রাত মশার কামড়ে অতিষ্ঠ নগরবাসী।

সন্ধ্যার আগেই বাসার দরজা-জানালা বন্ধ করা হয়। তার পরও মশার কামড় থেকে রক্ষা নেই। ছেলেমেয়েরা পড়তে বসলে মশার কামড়ে হাত-পা, মুখে রক্ত বিন্দু জমে থাকে। রান্নাঘরে কাজ করতে গেলে কানের মধ্যে ভোঁ ভোঁ শব্দ করে মশা। মশা মারতে কয়েল, স্প্রে, বৈদ্যুতিক ব্যাট সবই ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু কিছুতেই এর কামড় থেকে নিস্তার পাওয়া যাচ্ছে না। 

রাজধানীবাসীদের মতে- উত্তরা, খিলক্ষেত, নিকেতন, গুলশান, বনানী, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, মহাখালী, ফার্মগেট, শাহবাগ, ধানমন্ডি, গুলিস্তান সব এলাকার মশার পরিস্থিতি প্রায় একই। শীত এলেই কিংবা মৌসুমের এ সময়টাতে বেড়ে যায় কিউলেক্স মশার প্রকোপ। এর মধ্যে রয়েছে এডিস মশার কামড়ও। মশার কামড়ে ডেঙ্গুজ্বর, চিকুনগুনিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। 

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম সূত্রে দেখা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় দুজন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন। গত বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৪০৫ জন,মারা গেছেন সাতজন। গত বছর জানুয়ারিতে আক্রান্ত হয়েছেন ১৯৯ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৪৫ জন, মার্চে ২৭ জন, এপ্রিলে ২৫ জন, মে মাসে ১০ জন, জুনে ২০ জন, জুলাইতে ২৩ জন, আগস্টে ৬৮ জন, সেপ্টেম্বরে ৪৭ জন, অক্টোবরে ১৬৪ জন, নভেম্বরে ৫৪৬ জন এবং ডিসেম্বরে আক্রান্ত হয়েছেন ২৩১ জন।

এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর আক্রমণে দেশে সর্বোচ্চ মৃত্যু ছিল ২০১৯ সালে। সেবছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১৭৯ জনের মৃত্যু হয়। পাশাপাশি চরম দুর্ভোগ আর ভোগান্তি পোহাতে হয় নগরবাসীকে। এ ঘটনায় চরম সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনকে। ফলে সংস্থাগুলো ডেঙ্গুর ভয়াবহ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে পরের বছরটিতে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। কিন্তু চলতি বছর ফের মশার লাগামহীন উপদ্রব বেড়েছে। তবে এবার এডিসের প্রবণতা না থাকলেও বেড়েছে কিউলেক্সসহ অন্যান্য মশা। আর এসব মশার আক্রমণে ডেঙ্গু রোগের আশঙ্কা না থাকলেও ঝুঁকি বাড়ছে ফাইলেরিয়াসিস, চিকনগুনিয়াসহ অন্যান্য রোগের।

কিউলেক্স মশা নির্মূলের মূল দায়িত্ব ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের। কেননা, এ মশার প্রজনন স্থান খাল ও নর্দমা পরিষ্কার করা বা সেখানে মেডিসিন প্রয়োগ করা নাগরিকদের পক্ষে সম্ভব নয়। এ কারণে কিউলেক্স মশার প্রজনন বেড়ে যাওয়া দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার ব্যর্থতা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।যদিও যে কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে সেটি মশার জন্য সহনশীল বলেই দাবি করছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এর মেয়র। পাশাপাশি আশ্বস্তও করেছেন খুব শীগ্রই সেটি পরিবর্তন করে উপর্যুপরি ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন চলতি বছরে করোনাভাইরাস মোকাবিলা এবং ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নগরবাসীর পাশে যেভাবে ছিলেন, কিউলেক্স মশা নিয়ন্ত্রণে তেমন কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। ওয়ার্ডভিত্তিক মশক নিধন শ্রমিকদের দিয়ে যেভাবে ডেঙ্গু ভাইরাস বাহিত এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ হয়েছে, এখন তেমন কোনো তৎপরতা নেই।

কীটতত্ত্ববিদরা বলছেন, কিউলেক্স মশা নিয়ন্ত্রণে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার, সেসব ক্ষেত্রে তারা দুই সিটি করপোরেশনের দুর্বলতা দেখছেন। কেননা, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা এবং ওষুধ ছিটানোর কার্যক্রম সঠিকভাবে সম্পাদন করা গেলে এই মশার উপদ্রব এত বৃদ্ধি পেত না।

সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, ঢাকা শহরের সর্বত্রই এখন কিউলেক্স মশার মাত্রাতিরিক্ত উপদ্রব। 
যার ফলে রাজধানী বাসীর জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়ছে। মশার কামড়ে শিক্ষার্থীরা ঠিকমতো পড়াশোনায় মনোনিবেশ করতে পারছে না।

মশার কামড়ে জ্বর থেকে শুরু করে অন্যান্য রোগের পরিমাণ বাড়ছে। যা শিশু এবং বয়স্কদের জন্য ভয়াবহ।  
এছাড়াও মশার প্রজনন যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, মার্চের শেষে কিংবা এপ্রিল-মে মাসে এর প্রজনন ৩-৪ গুণ বেড়ে যাবে। যা রাজধানী বাসীর জন্য ভয়াবহ ও হুমকিস্বরুপ।

২০ ফেব্রুয়ারি থেকে মশক নিধনে সপ্তাহব্যাপী বিশেষ অভিযান চালিয়েছে ডিএনসিসি। অভিযানে ২১০টি স্থাপনায় লার্ভা পাওয়া যায়। ৩০ হাজার ১২৯টি প্রজননস্থল ধ্বংস করে কীটনাশক দেওয়া হয়েছে। মশার লার্ভা ও বংশবিস্তার উপযোগী পরিবেশ পাওয়া এবং অন্যান্য অপরাধে ৮৯টি মামলায় মোট ১০ লাখ ৮২ হাজার ৩০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। কিন্তু অভিযানের পরও মশার হাত থেকে রেহাই মেলেনি নগরবাসীর।

৮ থেকে ১৬ মার্চ পর্যন্ত কিউলেক্স মশা নিধনে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চালানো হবে জানিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। এ প্রোগ্রামে উত্তর সিটির ১০টি অঞ্চলের সব নিধন কর্মী এবং যান-যন্ত্রপাতি একটি অঞ্চলে নিয়ে এক দিন করে মশক নিধন অভিযান পরিচালনা করা হবে। উত্তর সিটির মেয়র মো. আতিকুল কিউলেক্স মশা নিধনে তৎপরতার সাথে কাজ করার ঘোসণা দিয়েছেন। মশক নিধনের পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা অভিযানও পরিচালিত হবে। এ কার্যক্রমে মেয়রের পাশাপাশি প্রত্যেক কাউন্সিলরকেও মাঠে থাকার কথা বলা হয়েছে। জিআইএস ম্যাপিং করা হচ্ছে। অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এ অভিযান পরিচালিত হবে বলে জানা। এর আওতায় প্রতিদিন ভোর ৬টা থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত লার্ভিসাইডিং এবং বিকাল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত অ্যাডাল্টিসাইডিং করা হবে। এরই মধ্যে রাজধানীর বনানী লেকে ড্রোন ব্যবহার করে মশার ওষুধ ছিটানোর জন্য পরীক্ষামূলকভাবে একটি কার্যক্রম চালিয়েছে উত্তর সিটি। বিমানবন্দর এলাকায় মশক নিধনে ফগার মেশিনবাহী যানবাহন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাতেও বাগে আসছে না মশা।

মশক নিধনে ২০২০-২১ অর্থবছরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বাজেট রাখা হয়েছে ৭৭ কোটি টাকা। এর আগে ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাজেট ছিল ৪৯ কোটি ৩০ লাখ। এরও আগে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এ বরাদ্দ ছিল ২৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা। অন্যদিকে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের জন্য ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাজেট ছিল ৪৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এর আগে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এ কার্যক্রমের জন্য দক্ষিণ সিটির বাজেট ছিল ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বলেছেন, ‘অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে দক্ষিণ সিটি এলাকায় মশা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। শীত মৌসুমে যেহেতু পানিপ্রবাহ কমে যায় তাই ওই সময় কিউলেক্স মশা বৃদ্ধি পায়। আমরা নিয়মিতভাবে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম পরিচালনা করছি।’ মশার ওষুধ বা কীটনাশকের মান যেন ঠিক থাকে সে জন্য বারবার পরীক্ষা করার উদ্যোগও নিয়েছে সিটি করপোরেশন। তারা বলছেন, বেশি দিন ধরে যদি একই কীটনাশক বারবার ব্যবহৃত হয় তাহলে তা মশার জন্য সহনশীল হয়ে যায়। সে জন্য আমরা কীটনাশক পরিবর্তন করে দিচ্ছি। দুই সপ্তাহ পর নতুন কীটনাশক ব্যবহার করা হবে। আশা করছি দুই সপ্তাহ পর থেকে মশা আরও বেশি নিয়ন্ত্রণে আসবে।

স্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, গত মাসে রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিসবাহিত রোগনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আওতায় জরিপ পরিচালিত হয়েছে। সেখানে এডিস মশার ঘনত্ব অনেক কম পাওয়া গেছে। এ সময় খালে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় বদ্ধ পানিতে কিউলেক্স মশা বংশবিস্তার করে। খোলা ড্রেন নিয়মিত পরিষ্কার না করলে সেখানে মশার বংশবিস্তারের পরিবেশ তৈরি হয়। সিটি করপোরেশন এসব ময়লা পরিষ্কার করে ওষুধ স্প্রে করলে মশার বংশবিস্তার কমে আসবে।

তাই অতিদ্রুত মশা নিধনে সিটি কর্পোরেশন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থা গ্রহণ করা অতীব জরুরি। পাশাপাশি সর্বোচ্চ সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে জনসাধারণকেও।

কলামিস্ট


সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : হাউস নং ৩৯ (৫ম তলা), রোড নং ১৭/এ, ব্লক: ই, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ফোন: +৮৮-০২-৪৮৮১১৮৩১-৪, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮
ই-মেইল : বার্তা- [email protected] বিজ্ঞাপন- [email protected]
দৈনিক আজকালের খবর লিমিটেডের পক্ষে গোলাম মোস্তফা কর্তৃক বাড়ি নং-৫৯, রোড নং-২৭, ব্লক-কে, বনানী, ঢাকা-১২১৩ থেকে প্রকাশিত ও সোনালী প্রিন্টিং প্রেস, ১৬৭ ইনার সার্কুলার রোড (২/১/এ আরামবাগ), ইডেন কমপ্লেক্স, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.com, www.eajkalerkhobor.com