ই-পেপার ফটোগ্যালারি আর্কাইভ  শুক্রবার ● ৫ মার্চ ২০২১ ● ২১ ফাল্গুন ১৪২৭
ই-পেপার  শুক্রবার ● ৫ মার্চ ২০২১
শিরোনাম: কানেকটিভিটিতে লাভ দেখছে বাংলাদেশ       ভাঙলো ঘুম: যাচাই বাছাইয়ে চটজলদি        মাদ্রাসায় জাতীয় সংগীত গাওয়া বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ       টিকা নিলেন প্রধানমন্ত্রী       এইচ টি ইমাম আর নেই       জরুরি ভিত্তিতে সাড়ে ৫ লাখ টন চাল আমদানির অনুমোদন       ভুয়া এনআইডি: ইসির ৪৪ জন বরখাস্ত      
প্রিন্ট সংস্করণ
অযোগ্য গাড়ি ও অদক্ষ চালকই সড়কে ঝুঁকি
জাকির হুসাইন
Published : Wednesday, 27 January, 2021 at 1:19 AM, Update: 27.01.2021 1:36:32 AM


মৃত্যু অনিবার্য। তবে আকস্মিক বা অনাকাঙ্খিত মৃত্যু মেনে নেওয়া কঠিন। যার খেসারত দিতে একটি বা একাধিক পরিবারকে সারাজীবনের জন্য পথে বসতে হয়। আর এই ধরনের মৃত্যু বেশি বেদনাদায়ক যখন সেটা সড়ক দুর্ঘটনায়। অথচ সড়কে প্রতিনিয়ত ঘটছে এই ট্র্যাজেডি। প্রাকৃতিক দুর্যোগও মোকাবিলা করা যায়, কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনার এই গণমৃত্যুর ফাঁদ থেকে কোনো ভাবেই বের হওয়া যাচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, অদক্ষ চালক ও ফিটনেসবিহীন (অযোগ্য) গাড়ির বেপরোয়া গতিই এই ঝুঁকির মূলে।  
গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও জানালেন একই কথা। জাতীয় সংসদকে তিনি জানান, দেশে বর্তমানে (গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত) ফিটনেসবিহীন গাড়ির সংখ্যা চার লাখ ৮১ হাজার ২৯টি। মন্ত্রী জানান, মালিকদের এসএমএসের মাধ্যমে ফিটনেস করার তাগাদা, সার্কেল অফিস থেকে নবায়নের ব্যবস্থার পাশাপাশি ফিটনেসবিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে অর্থদণ্ড, কারাদণ্ড, ডাম্পিংসহ নানা ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
রাজধানীতেও অহরহ সড়কে ঝরছে প্রাণ। ব্যস্ত এই মহানগরীতে অস্বাভাবিক গতি, পারস্পরিক প্রতিযোগিতা ও ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা, যান্ত্রিক ত্রুটিযুক্ত অননুমোদিত যান চলাচল, ফুটপাত বেদখলে থাকায় সড়ক সরু হয়ে পড়া এসব নানা কারণে প্রতিবছর হাজার হাজার তরতাজা প্রাণ অকালেই ঝরছে সড়কে। এর থেকে মুক্তি পেতে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করে সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ কঠোর ভাবে প্রয়োগ করার দাবি জানিয়েছেন তারা। এছাড়া জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশ থেকে হাট-বাজার অপসারণ করা এবং ফুটপাত বেদখল মুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তা ও সদস্যদের যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের জন্য আধুনিক ও মানসম্মত ট্রেনিং একাডেমি গড়ে তুলতে হবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের পক্ষ থেকে বারবার সতর্ক করা হলেও কোনো ভাবেই কমানো যাচ্ছে না ফিটনেসবিহীন গাড়ি। বরং প্রতিবছরই এই বহরে যোগ হচ্ছে হাজার হাজার গাড়ি।

রাজধানীর যানজট নিরসনে সরকার যত উদ্যোগ নিয়েছে তার বিস্তারিত তুলে ধরে গতকাল জাতীয় সংসদে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী  ওবায়দুল কাদের বলেন, রাজধানীর যানজট নিরসন, সড়কে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার প্রতিবিধান, নিরাপদ, ঝুঁকিমুক্ত, আরামদায়ক গণপরিবহন, বহুমাধ্যমভিত্তিক সুসমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য সরকার বদ্ধপরিকর। বিদ্যমান ব্যবস্থার সঙ্গে পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি ও ভবিষ্যত বিবেচনায় জনবান্ধব চেকসই সার্বিক যোগযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য পরিকল্পিতভাবে গৃহীত ব্যবস্থাগুলো বিভিন্ন দপ্তরের কার্যপরিধির আওতায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
ওবায়দুল কাদের বলেন, সড়ক নিরাপত্তা বিধানে সরকার জনস্বার্থে ২২টি জাতীয় মহাসড়কে থ্রি হুইলার অটোরিকশা, অটো, টেম্পো এবং সব শ্রেণির অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচল ২০১৫ সালের ১ আগস্ট থেকে নিষিদ্ধ করেছে। মহাসড়কে চলন্ত গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে যথাক্রমে দূরপাল্লার বাস ও ট্রাকের নির্ধারিত নির্ধারিত গতিবেগ সর্বোচ্চ ৮০ কিলোমিটার ও ৬০ কিলোমিটার নির্ধারণ করা হয়েছে। মোটরযানের গতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে গাড়ির স্পিড গভর্নর সিল নিশ্চিত হয়ে ফিটনেস সার্টিফিকেট দেওয়া হচ্ছে। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত ও দক্ষ গাড়িচালক তৈরির লক্ষ্যে পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়নের আগে দুইদিন মেয়াদে রিফ্রেশার প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ৪৬ হাজার ১০৮ ড্রাইভারকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৫ হাজার ছোট-বড় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। আবার সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা বিআরটিএ’র হিসাব মতে, প্রতিদিন সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান প্রায় ৩০ জন। সে হিসাবেও বছরে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১০ হাজার ৮০০ জন। আবার বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বছরে ১২ হাজার, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার রেকর্ড অনুযায়ী ২০ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। অন্যদিকে বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্স ইনস্টিটিউট (এআরআই) এবং নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতি বছর ১২ হাজার মানুষ নিহত হন।
বিভিন্ন সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যানে নিহতের সংখ্যা কিছু তারতম্য থাকলেও বছরে ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষ শুধু সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার তথ্য আমাদের পিলে চমকে দেওয়ার মতো।
পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ সালে সারা দেশে চার হাজার ১৯৮টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। এতে সড়কে মারা গেছেন তিন হাজার ৯১৮ জন এবং আহত হয়েছেন তিন হাজার ৮২৬ জন। এসব ঘটনায় দুই হাজার ৯৫৬টি মামলা হয়েছে। আর সাধারণ ডায়েরি হয়েছে এক হাজার ২৪৬টি। মামলা হয়েছে এমন দুই হাজার ৯৫৬টি দুর্ঘটনার মধ্যে তদন্ত হচ্ছে দুই হাজার ৭৮৯টির। যদিও বেসরকারি সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনা এবং হতাহতের সংখ্যা অনেক বেশি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সড়কে দুর্ঘটনার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী চালকরা। বর্তমানে যানবাহনের তুলনায় সাত লাখের বেশি চালকের অভাব রয়েছে। এছাড়া সরকার আইন শিথিল করায় হালকা (প্রাইভেট কার) যান চালানোর লাইসেন্স দিয়ে মধ্যম মানের এবং মধ্যম মানের যানবাহনের লাইসেন্স দিয়ে ভারী যান চলানোর সুযোগ দিয়েছে।
সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, নানা কারণে দুর্ঘটনার মামলার তদন্ত কার্যক্রম দীর্ঘদিন ঝুলে থাকে। অনেক পুলিশ সদস্যের সঙ্গে পরিবহণ মালিক ও শ্রমিকনেতাদের সখ্য রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সাক্ষী পাওয়া যায় না। তবে যে কারণেই হোক না কেন, দীর্ঘসূত্রতার কারণে মামলা ও বিচারের ওপর আগ্রহ হারিয়ে ফেলে দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তি বা তার পরিবার। এতে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী চালক ও তার সহযোগীরা পার পেয়ে যান।
এ বিষয়ে বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজ বলেন, বিচার ও তদন্তের দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেকের ধারণা মামলা করে কিছু হবে না। তাই দুর্ঘটনায় মানুষ মারা গেলে তার স্বজনরা স্থানীয় প্রশাসনের কাছে আবেদন করে লাশ নিয়ে যান। এছাড়া দুর্ঘটনায় যারা মারা যান, তাদের বসতবাড়ি বা সাক্ষীদের অবস্থান অন্য এলাকায় হয়ে থাকে। এটিও মামলা কম হওয়ার অন্যতম কারণ। এসব কারণে সুযোগ পেয়ে যান দুর্ঘটনার জন্য দায়ী চালক ও অন্যরা।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার মামলা তদন্তে বিলম্বের মূল কারণ হলো সাক্ষ্যপ্রমাণ না পাওয়া। কারণ, পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ না থাকায় আদালতে চার্জশিট দেওয়া যায় না। যথাযথ সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়া চার্জশিট দেওয়া হলে আসামিদের খালাস পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সড়কে দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা এবং পরিবহণ সেক্টরে শৃঙ্খলা ফেরাতে ১১১ দফা সুপারিশ নিয়ে কাজ করছে সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি টাস্কফোর্স। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সভাপতিত্বে গঠিত এ কমিটিকে ওই সুপারিশ বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। টাস্কফোর্স সদস্যরা ২০১৯ সালের ২৪ নভেম্বর প্রথম সভা করেন। এর এক বছর এক মাস পর ২০২০ সালের ২৩ ডিসেম্বর দ্বিতীয় সভা হয়। প্রথম সভায় ১১১ দফা সুপারিশ বাস্তবায়নের কর্মপরিকল্পনা তৈরিতে চারজন সচিবের নেতৃত্বে চারটি কমিটি গঠন করা হয়। দ্বিতীয় সভায় ওই চার কমিটির কর্মপরিকল্পনা অনুমোদন করা হয়। এছাড়া চালক তৈরি ও পরিবহণ শ্রমিকদের জন্য বিশ্রামাগার নির্মাণের আলাদা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, রাজনৈতিক ও ভিআইপি প্রটোকলে পুলিশ বেশি ব্যস্ত থাকে। সড়ক দুর্ঘটনার মামলায় তাদের আগ্রহ কম থাকে। তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় সঠিকভাবে এজাহার, তদন্ত ও চার্জশিট হয় না। এসব কারণে দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিরা সঠিক বিচার পান না। দুর্ঘটনায় যে পরিমাণ মামলা হয়, তার ৯৭ শতাংশ বিচার হয় না। তিনি আরো বলেন, সড়ক নিরাপত্তায় বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন করা, গণপরিবহন চালকদের প্রফেশনাল ট্রেনিং ও নৈতিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা, গাড়ির ফিটনেস ও চালদের লাইসেন্স দেওয়ার পদ্ধতি উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিকায়ন করা, দেশব্যাপী চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত মানসম্মত নতুন গণপরিবহন নামানোর উদ্যোগ নেওয়া, ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তা ও সদস্যদের প্রশিক্ষণের জন্য ট্রেনিং একাডেমি গড়ে তোলার দাবি জানান তিনি। এনএমএস।



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : হাউস নং ৩৯ (৫ম তলা), রোড নং ১৭/এ, ব্লক: ই, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ফোন: +৮৮-০২-৪৮৮১১৮৩১-৪, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮
ই-মেইল : বার্তা- [email protected] বিজ্ঞাপন- [email protected]
দৈনিক আজকালের খবর লিমিটেডের পক্ষে গোলাম মোস্তফা কর্তৃক বাড়ি নং-৫৯, রোড নং-২৭, ব্লক-কে, বনানী, ঢাকা-১২১৩ থেকে প্রকাশিত ও সোনালী প্রিন্টিং প্রেস, ১৬৭ ইনার সার্কুলার রোড (২/১/এ আরামবাগ), ইডেন কমপ্লেক্স, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.com, www.eajkalerkhobor.com