ই-পেপার ফটোগ্যালারি আর্কাইভ  বুধবার ● ২৭ জানুয়ারি ২০২১ ● ১৪ মাঘ ১৪২৭
ই-পেপার   বুধবার ● ২৭ জানুয়ারি ২০২১
শিরোনাম: দেশে করোনার টিকাদান কর্মসূচি শুরু       করোনার টিকাদান কর্মসূচি উদ্বোধন       বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক সৈয়দ লুৎফুল হক আর নেই       চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে ভোটগ্রহণ চলছে       কিন্ডারগার্টেন খুলতে বাধা নেই ফেব্রুয়ারিতে সরকারি প্রাথমিক        চাল-পেঁয়াজের দাম বাড়ার নেপথ্যে মজুত- সিন্ডিকেট       অযোগ্য গাড়ি ও অদক্ষ চালকই সড়কে ঝুঁকি       
প্রিন্ট সংস্করণ
সবজিতেও বাম্পার
নিজস্ব প্রতিবেদক
Published : Friday, 27 November, 2020 at 1:10 AM


আউশ-আমন ও বোরো ধান উৎপাদনে অতীতের সব লক্ষমাত্রা ছাড়িয়ে এবার সবজি ফলনেও রেকর্ড। ভালো দাম পেয়ে কৃষকও খুশি।
গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় দেশের উত্তরাঞ্চল-দক্ষিণাঞ্চলে শীতকালীন সবজির আবাদ ও ফলন বেড়েছে। আর শীতের শুরুতে উৎপাদিত সবজির ভালো দাম পাওয়ায় চাষিরাও খুশি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৪৯ বছরে দেশে সবজি উৎপাদন কয়েকগুণ বেড়েছে। দেশে রীতিমতো সবজি বিপ্লব ঘটে গেছে গত এক যুগে। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার তথ্যমতে, সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে তৃতীয়। এক সময় দেশের মধ্য ও উত্তরাঞ্চল এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যশোরেই কেবল সবজির চাষ হতো। এখন দেশের প্রায় সব এলাকায় সারা বছরই সবজির চাষ হচ্ছে। এখন দেশে ৬০ ধরনের ও ২০০টি জাতের সবজি উৎপাদিত হচ্ছে। বর্তমানে এক কোটি ৬২ লাখ কৃষক পরিবার রয়েছে, এ কৃষক পরিবারগুলোর প্রায় সবাই কম-বেশি সবজি চাষ করেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে আবাদি জমি সাড়ে আট মিলিয়ন হেক্টর। এর সিংহভাগে দানাদার শস্য চাষ হয়। মোট আবাদির মাত্র নয় ভাগ জমিতে সবজি চাষ করা হচ্ছে। ২০০৬ সালে দেশে সবজি উৎপাদন হয় ২০ লাখ ৩৩ হাজার টন। সেখানে গেল ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সবজি উৎপাদন বেড়ে এক কোটি ৭২ লাখ ৪৭ হাজার টন হয়েছে। দেশের উত্তর এবং দক্ষিণাঞ্চলে সবজি চাষে সবচেয়ে বেশি সাফল্য এসেছে। হাইব্রিড বীজ ও সারের ব্যবহার বিপ্লবের কারণ। লাভও বেশি; তাই চাষিরা আগ্রহী হচ্ছে সবজিতে।
দেশীয় গবেষকরা বীজ উৎপাদনে কিছু সফলতা পেলেও সবজির হাইব্রিড বীজ এখনো আমদানিনির্ভর। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ধারবাহিকতা ধরে রাখতে গবেষণায় আরো মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে সবজি চাষে কৃষকরাও বর্তমানে সনাতনী পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এসেছে। উন্নত জাতের বীজ, সার, আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহারে কৃষকরা বছরজুড়েই উৎপাদন করছে বহু সবজি। কিছু এলাকায় ভাসমান পদ্ধতিতে সবজি চাষ শুরু হয়েছে। শহরে হচ্ছে ছাদ কৃষি, যদিও তা শৌখিন। নতুন ভাবনাও আছে কৃষি গবেষকদের। দেশে সবজি চাষ এক সময় মূলত পরিবারকেন্দ্রিক ছিল। বাড়ির কর্তা ও গৃহিণীরাই বাড়ির আঙ্গিনা ও চারপাশে বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজির লাগাত। পরিবার, প্রতিবেশীরা খেত, বাঁচলে বাজারে স্বল্পমূল্যে বিক্রি করত। আশির দশক থেকে পাল্টাতে শুরু করে সবজি চাষের চিত্র। ভাত, ডাল, মাছ-মাংসের পাশাপাশি শরীরের পুষ্টির জন্য সবজিও যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সেটার প্রয়োজনীতা বুঝতে শুরু করে শহুরে মানুষেরা। সবজির চাহিদা বাড়ে, বাড়তে শুরু করে চাষ এবং উৎপাদন। দানাদার শস্যের মতো বিগত কয়েক দশকে সবজিরও বাণিজ্যিক চাষ দেশজুড়ে শুরু হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, দেশে ৯০ রকমের সবজির বাণিজ্যিক চাষ হয়, যার ৩০ থেকে ৩৫টি প্রধান। কোনো সবজি বিলুপ্তি হয়নি বরং যেসব এক সময় খাওয়ার চিন্তা করেনি কেউ তা এখন গুরুত্ব দিয়ে চাষ হচ্ছে। আধুনিকায়নের কারণে অনেক মৌসুমি সবজি সারা বছর চাষ হচ্ছে।
আমাদের দিনাজপুর প্রতিনিধি জানান, দিনাজপুর সদরের উলিপুর, কসবা, মহব্বতপুর, পুলহাট, গৌরীপুরসহ দক্ষিণ কোতোয়ালি এলাকা সবজির জন্য বিখ্যাত। প্রতিদিন এখান থেকে উৎপাদিত সবজি জেলার চাহিদা পূরণ করে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়ে থাকে। তাই এই এলাকার মানুষ ধান কিংবা অন্য শস্য আবাদের চেয়ে শাক-সবজি আবাদকেই বেশি প্রাধান্য দেন।
কথা হয় মহব্বতপুর এলাকার আজাহার আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এবারে যেমন দাম ভালো পাওয়া যাচ্ছে, তেমনিভাবে অনেকের আবাদ নষ্টও হয়েছে। আমার এক বিঘা জমিতে ধান আবাদ হয়নি। ওই জমিতে সিম চাষ করা হয়েছিল। কিন্তু অধিক পরিমাণে বৃষ্টি হওয়ায় জমিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয় এবং সিমগাছগুলো মরে যায়। ফলে আমার প্রায় ১০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। এখন ওই জমিতে আলু চাষ করা হয়েছে। তবে আলুতেও ভালো দাম পাওয়া যাবে বলে আশা করছি। যাতে করে ওই দুই ফসলে যে ক্ষতি হয়েছে তা পুষিয়ে নেওয়া যাবে।’
উলিপুর এলাকার কৃষক ইদ্রীস আলী বলেন, ‘এবারে অধিক পরিমাণে বৃষ্টি হওয়ায় এই এলাকায় আলুর আবাদ পিছিয়েছে। অন্য বছরগুলোতে এই সময়ে আগাম আলু উঠতো। তবে এবারে সঠিক সময়ে বীজ বপন করতে না পারায় আগাম আলু এখনো বাজারে উঠাতে পারিনি। আশা করছি আগামী ১৫-২০ দিনের মধ্যে আমার ক্ষেতের আলু বাজারে উঠবে। আগাম আলুর দাম ভালো পাওয়া যায়। এই আলু কমপক্ষে ৭০-৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে পারে।’
কৃষক মোকসেদ আলী বলেন, ‘বর্তমানে আমার জমিতে উৎপাদিত বেগুন বিক্রি করছি ৪০ টাকা কেজি পাইকারি দরে। খুচরা বাজারে এই বেগুন বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকা কেজি দরে। একইভাবে ঢ্যাঁড়স বিক্রি করছি ৩৫ টাকা কেজি দরে। খুচরা বাজারে ব্যবসায়ীরা ঢ্যাঁড়স বিক্রি করছেন ৪০-৪৫ টাকা কেজি দরে। মুলাটালী জাতের সিম বিক্রি করছি ৬০ টাকা দরে যা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকা কেজি দরে। অর্থাৎ বাজারে প্রতিটি সবজিই ৫-১০ টাকা লাভে বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা।’
দিনাজপুর জেলার সবচেয়ে বড় কাঁচা সবজির বাজার বসে জেলা শহরের বাহাদুর বাজার এনএ মার্কেটে। শুধু খুচরাই নয়, বরং পাইকারি হিসেবে কৃষকরা এখানে তাদের উৎপাদিত সবজি বিক্রি করেন। সেগুলো ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়। এই বাজারে গিয়ে দেখা যায়, সিম বিক্রি হচ্ছে ৫০-৬০ টাকা কেজি দরে, বেগুন ৪০-৪৫ টাকা কেজি দরে, মুলা ২০ টাকা কেজি, পটোল ৩০ টাকা, ফুলকপি প্রতি পিছ ৩৫-৪০ টাকা, বাঁধাকপি প্রতি পিছ ২৫-৩০ টাকা, টমেটো ৯০-১০০ টাকা কেজি, কাঁচামরিচ ৮০-৯০ টাকা কেজি, শসা ৩০-৪০টাকা কেজি, ঢেরস ৩০-৩৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আর পুরাতন আলু প্রকারভেদে বিক্রি হচ্ছে ৩৮-৪৫ টাকা কেজি দরে। নতুন আলু বিক্রি হচ্ছে ৭০-৮০ টাকা কেজি দরে। তবে এই আলু দিনাজপুর জেলার নয় বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
ওই বাজারের দোকানি নাছির উদ্দিন বলেন, ‘এবারে চাহিদার চেয়ে সরবরাহ কম হওয়ায় সব শাক-সবজির দাম একটু বেশি। এই দাম কমার সম্ভাবনা থাকলেও খুবই কম। কারণ জেলার যেমন চাহিদা রয়েছে তেমনিভাবে চাহিদা রয়েছে বাইরের। বর্তমানে আলুর দামও বেশি। এখনও দিনাজপুরের আলু উঠতে শুরু করেনি। যে আলু পাওয়া যাচ্ছে তা ঠাকুরগাঁও কিংবা পঞ্চগড়ের আলু। তবে আগাম আলু উঠলেও এই দাম কমার কোনো সম্ভাবনা নাই, বরং দিনাজপুরের আগাম জাতের আলুর দাম আরো বেশি হতে পারে।’
ওই বাজারে আসা পাইকারি ব্যবসায়ী রহিম উদ্দিন বলেন, ‘আসলে কৃষক পর্যায়ের থেকে একটু বেশি দামে বিক্রি করতে হবে। এর সঙ্গে আমাদের দোকানভাড়া, গাড়িভাড়া, শ্রমের মূল্য যোগ হচ্ছে। এবারে সবজির যে দাম তাতে করে কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন এটা যেমন ঠিক, তেমনিভাবে ব্যবসায়ীরাও লাভবান হচ্ছেন। চাহিদার তুলনায় জোগান কম থাকায় দ্রব্যমূল্য একটু বেশি। তাছাড়া এখন সব জিনিসেরই দাম বেশি, ফলে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে শাক-সবজির দামও।’
দিনাজপুর সদর উপজেলার মহব্বতপুর এলাকার কৃষক ইসমাইল হোসেন। তিনি তার জমিতে মুলাটালী ও ঘিয়া জাতের সিম আবাদ করেছেন। সবেমাত্র তার ক্ষেতে সিমের উৎপাদন শুরু হয়েছে। স্থানীয় বাজারে যা বিক্রি হচ্ছে ৪০-৫০ টাকা কেজি দরে। আর তার জমির ঢ্যাঁড়স বিক্রি হচ্ছে ৩৫ টাকা কেজি দরে। তবে তার জমির ঢ্যাঁড়স প্রায় শেষের দিকে। গত তিন মাসে ১২ কাঠা জমিতে ঢ্যাঁড়স বিক্রি করেছেন প্রায় ৪০ হাজার টাকা।
তিনি বলেন, ‘এবারে দাম ভালো আছে। এভাবে দাম থাকলে ভালোই লাভ হবে। তবে এবারে বর্ষার কারণে আগাম জাতের আলু এখনো উঠতে শুরু করেনি। আরও এক মাস পর এই আলু উঠবে। আলুতেও ভালো দামের আশা করছি।’
দুপচাঁচিয়া (বগুড়া) প্রতিনিধি জানান, বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার সফল সবজি চাষি জিল্লুর রহমান দীর্ঘ ১০ বছর ধরে সবজি (ফুলকপি) চাষ করে আসছেন। এতে করে তিনি একদিকে নিজের পরিবারের চাহিদা মিটিয়েছেন, অন্যদিকে আর্থিকভাবে লাভবানও হয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলার পূর্ব আলোহালী গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য কৃষক জিল্লুর রহমান অন্যান্য ফসল চাষের পাশাপাশি নানা ধরনের সবজি চাষ করে আসছেন। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি এক বিঘা জমিতে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে ফুলকপি সফলতার সঙ্গে চাষ করছেন এবং আর্থিকভাবে লাভবানও হয়েছেন। সাধারণত বাংলা সনের আশ্বিন মাসের মাঝামাঝি সময়ে ফুলকপির চারা রোপণ করা হয়। নিয়মিত পরিচর্যা করলে দুই মাসের মধ্যেই ফুলকপি বাজারে বিক্রির উপযোগী হয়।
কৃষক জিল্লুর রহমান বলেন, তিনি তার এক বিঘা জমিতে এবার প্রায় চার হাজার ফুলকপির চারা রোপণ করেছেন। এ জমিতে প্রয়োজনমতো জৈব ও রাসায়নিক সার দিয়েছেন। চারা রোপণ, কীটনাশক প্রয়োগ ও শ্রমিক খরচসহ তার প্রায় ৩৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। গতবার এ জমিতে এর চেয়ে কম খরচ হয়েছিল। এবার অতিবৃষ্টির কারণে খরচ কিছুটা বেড়েছে। এ সবজি ক্ষেতের বর্তমান অবস্থা খুব ভালো। ক্ষেত থেকে ফুলকপি তোলা পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে সেই সঙ্গে বাজারে দাম ভালো পাওয়া গেলে ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকার ফুলকপি বিক্রির আশা করছেন তিনি। কৃষি অফিসের পরামর্শ ছাড়াই দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিনি এ সবজি চাষ করছেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সাজেদুল আলম জানান, দুপচাঁচিয়া উপজেলা উচ্চমূল্যের ফসল হিসেবে ফুলকপি চাষের উপযোগী। সঠিকভাবে পরিচর্যা করলে স্বল্প সময়ে এ সবজি চাষ করে কৃষকরা সহজেই লাভবান হতে পারেন।                                                        এনএমএস।



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : হাউস নং ৩৯ (৫ম তলা), রোড নং ১৭/এ, ব্লক: ই, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ফোন: +৮৮-০২-৪৮৮১১৮৩১-৪, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮
ই-মেইল : বার্তা- [email protected] বিজ্ঞাপন- [email protected]
দৈনিক আজকালের খবর লিমিটেডের পক্ষে গোলাম মোস্তফা কর্তৃক বাড়ি নং-৫৯, রোড নং-২৭, ব্লক-কে, বনানী, ঢাকা-১২১৩ থেকে প্রকাশিত ও সোনালী প্রিন্টিং প্রেস, ১৬৭ ইনার সার্কুলার রোড (২/১/এ আরামবাগ), ইডেন কমপ্লেক্স, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.com, www.eajkalerkhobor.com