ই-পেপার ফটোগ্যালারি আর্কাইভ  শনিবার ● ৫ ডিসেম্বর ২০২০ ● ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭
ই-পেপার  শনিবার ● ৫ ডিসেম্বর ২০২০
শিরোনাম: আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিচালকদের লাগাম টানা হচ্ছে       কাতারে নিষ্ঠুর বাস্তবতা দেখলো বাংলাদেশ       সুস্থ মাটির একটি অপরিহার্য উপাদান জীববৈচিত্র্য : রাষ্ট্রপতি       রোহিঙ্গা স্থানান্তর নিয়ে‘ভুল ব্যাখ্যা’না দেওয়ার আহ্বান        কৃষিতে আমাদের ব্যাপক উন্নয়ন বিশ্বের নজর কেড়েছে : প্রধানমন্ত্রী       হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির তারিখ পরিবর্তন       ভাসানচরে সরালেও রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারেই ফিরতে হবে      
শিশু সহায়ক হই
সোহেলী চৌধুরী
Published : Friday, 20 November, 2020 at 5:16 PM, Update: 20.11.2020 7:40:13 PM

আজ যে শিশু পৃথিবীর আলোয় এসেছে আমরা তার তরে একটি সাজানো বাগান চাই। বাংলা ব্যান্ডদল রেনেসাঁর একটি গান। গানটি মনে ধরেছে। আবার গানটি আলোড়নও তোলে। আমরা কি পারছি শিশুর তরে সাজানো বাগান দিতে? প্রশ্নোত্তরের খেলা চলছে অনেক কাল ধরে। হয়তো সভ্যতার শুরু থেকেই। চলবে সভ্যতার বিনাশ পর্যন্ত।

একজন নাগরিক হিসেবে যখন আপনি দেখেন চলতি পথে একটি শিশু আচমকা আপনার পাশে; আপনার খেয়ে চলা খাবারটি সে চাচ্ছে। কী বলবেন; শিশু সাজানো বাগানে আছে?

আবার যখন আপনি গাড়ির কাচ গলে দেখবেন; নাগরিক রাস্তার কোনো ফাঁক গলে, না হয় একেবারে সরাসরি- পলিথিনের মাঝে মুখ ঢুকিয়ে শ্বাস নিচ্ছে কোনো টোকাই শিশু। শিশু সাজানো বাগানে আছে বলতে পারবেন? আপনার এসি গাড়িতে আপনার আদরের পরশেই যে শিশুটি আছে সেও এটি দেখছে; এবং ভাবছে শিশুর সুখ?

রাজধানীর কোনো বাজারে ক্রেতা আপনি। নানাকিছু কেনার মাঝখানে বিক্ষিপ্ত দৃষ্টি গেল; কোনো এক মা নবজাতক নিয়ে বাজারেই থাকেন। ধুলার মাঝেই নবজাতকের অদৃশ্য ঘর। কী বলবেন; এটি কি শিশুর সাজানো বাগান?
আপনি একটি পাবলিক যানে উঠেছেন; হঠাৎ খেয়াল করলেন একটি শিশু আপনার যানের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণে সাহায্যকারী; নাগরিক শব্দটি হবে হেলপার। আবার দেখলেন অন্য যানে সে আপনার কাছে ভাড়া নিতে আসছে। আপনি না হন একাধিক সুবিধাভোগী মানুষ তাকে অপমানসূচক কথা বলছে। সে কী ভাববে জীবনকে নিয়ে? তার জন্য পৃথিবী সাজানো বাগান নয়।

সচরাচর এমন দৃশ্যের মুখোমুখি হই আমরা। দ্রæততার সময়ে হয়তো ধরতে পারি না। ধরতে পারলেও কিছুই করার নেই আমাদের। নিজ অবস্থানে তাকে আদরমাখা আচরণ করা যেতে পারে। তা সবাই করে না। করলে শিশুর পৃথিবী সাজানোই থাকত।

আপনার চারপাশে দৃষ্টি দিন। এমন নিশ্চয় হয়েছে। কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়েছেন; আপনার সেবায় নিয়োজিত বাড়ির কাজের মানুষটি শিশু। সে হন্যে হয়ে থাকে সারাদিন। তারপরও বাড়ির গৃহকর্তা-কর্ত্রী আপনার সামনেই ছোট্ট ভুলে তাকে মারধর করেন। মারের ক্ষত মোছার আগেই আবার তাকে কাজে নেমে পড়তে হয়। হরহামেশার এ চিত্র কখনো বোঝায় না শিশুর তরে সাজানো বাগান এ পৃথিবী।

এসব থেকে উত্তরণের পথ কি? অনেক কাল ধরে গবেষণা হচ্ছে এর উত্তরের খোঁজে। অনেক কথাও হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী অনিয়ম শিশুর তরে সাজানো বাগানের প্রথম অন্তরায়; এ ব্যক্তিগত মত।

যে শিশুটি শরণার্থী হয়ে মা-বাবার কোলে করে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে এসেছে, তার জন্য শিশু কখনোই সাজানো বাগান হতে পারে না। ইয়েমেনে যে শিশুটি কঙ্কালসার হয়ে খাবার ও পথ্যের অভাবে মারা গেছে, তার জন্য পৃথিবী কোনোকালে সাজানো বাগান নয়। তার জীবনকালে সৌদি জোট খাদ্য ঢুকতে দেয় না তার দেশে। তার জন্য জীবনকালটি বড় ক্ষুদ্র ও কঠোর এবং অবশ্যই নির্মম।

আফগানিস্তান, ইরান, ফিলিস্তিনের গাজা ও এমনতর যুদ্ধ লেগে থাকা এলাকায় যখন বিরুদ্ধগোষ্ঠীর গোলা এসে পড়ে তখন একটি শিশুর সাজানো বাগান কেমন হয় বুঝতে চেষ্টা করুন। আগুনের লেলিখান শিখায় সেও জ্বলে গেছে তাই জানা হয় না সমাজের-সভ্যতার। এভাবেই যুদ্ধ অনেক শিশুর সাজানো বাগানের অস্তিত্বই কেড়ে নেয়।

এবার আসা যাক আপনি-আমি কতটুকু করতে পারি শিশুর জন্য। খুব সহজেই শিশুর জন্য ‘হ্যাঁ’ হতে পারি। এটি হওয়া মানুষের সংখ্যা ক্রমশ যত বাড়বে, শিশুর জন্য পৃথিবী তত সাজানো বাগান হতে থাকবে। আপনার চারপাশের শিশুর প্রতি সদয় হোন। শিশুর কায়িক কোনো পরিশ্রমের উপকারভোগী হবেন না। শিশুর প্রতি কোনো অবিচার করবেন না। কোনো শিশুকেই শারীরিক আক্রমণ করবেন না। এভাবে অনেক কিছু হতে পারে। শিশুর জন্য সহৃদয় মন রাখলে সাজানো বাগানই ফলবে।

এবার কিছু ভয়ের খবর; এর মাঝেও আশা আছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও’র পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ১৬ কোটি ৮০ লাখ শিশু নানাভাবে শ্রম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছে। তাদের মধ্যে প্রায় সাড়ে আট কোটি শিশু নানারকম ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০০৩ সালের এক জরিপে দেখা যায়, বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাÐে ৩৪ লাখ শিশু নিযুক্ত। নানা উদ্যোগ গ্রহণের ফলে পরের দশ বছরে শিশুশ্রমিকের সংখ্যা নেমে আসে অর্ধেকে। ভয়ের মাঝেই এ আশার কথা। ২০১৩ সালের বিবিএস জরিপে দেখা যায়, শ্রমে নিযুক্ত শিশুর সংখ্যা ১৭ লাখ। বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিযুক্ত শিশুর সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ। দেশের শিশুশ্রমে এ উন্নতি। আমরা চাই গ্রাফটি এভাবেই নিম্নমুখী হোক। শিশুর প্রতি সমগ্র পরিবেশের হ্যাঁ ভাবনা তা খুব সহজে পারে।

এবার কিছু পরিসংখ্যান বা গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য দেওয়া যাক। আন্তর্জাল ঘেঁটে এর চেয়ে বেশি কিছু জেনে নিতে পারেন সহজেই। তবু কিছু তথ্য দেওয়া হলো, ২০২১ সালের মধ্যে দেশের সব শিশুকে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের আওতা থেকে বের করে আনার লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার। এ লক্ষ্যে এবারের বাজেটেও আলাদা করে শিশু বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। লেবার ফোর্স সার্ভে ২০১৭ অনুযায়ী, ২০১৭ সালে দেশে ১৫ বছরের ঊর্ধ্বে অর্থনৈতিকভাবে কর্মক্ষম শ্রমশক্তির সংখ্যা ছিল ৬৩ দশমিক ৪ মিলিয়ন। তার মধ্যে ৬০ দশমিক শূন্য সাত মিলিয়ন শ্রমশক্তি কর্মরত। অর্থাৎ বেকারত্বের হার চার দশমিক তিন। বর্তমানে প্রায় এক দশমিক সাত মিলিয়ন শিশুশ্রমিক আছে। এর মধ্যে এক দশমিক দুই আট মিলিয়ন শিশু ৩৮টি ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত রয়েছে।

ভয়ের সব খবর কষ্ট দেয়। এবার আরো ভয় এনেছে করোনা নামের ভাইরাস। কোভিড-১৯ নামের দুর্যোগটি শিশুদের জীবনেও প্রভাব ফেলেছে। শিশুরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশটি আপাত হারিয়ে একাকী আছে। অনেকে করোনা আক্রান্ত হয়ে বেঁচে আছে। শিশুশ্রমিকরা সহজাত ভাবে জীবনের ঘানি টানছে।

তারপরও করোনা মহামারির ধাক্কা আছে। শিশুশ্রমেও তা ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। অবশ্যই ঋণাত্মক। আরো কিছু আন্তর্জালের খবর দেখে নেওয়া যেতে পারেÑ করোনা পরিস্থিতির কারণে নতুন করে কয়েক লাখ শিশু কাজে নিযুক্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। গত দুই দশকের মধ্যে শিশুশ্রমের সংখ্যা উল্লেখজনকভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হলেও এবার প্রথমবারের মতো তা বাড়তে যাচ্ছে। আগে থেকেই যেসব শিশুশ্রমে নিযুক্ত রয়েছে, তাদেরও কর্মঘণ্টা বেড়ে যেতে পারে। গত ১২ জুন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা (ইউনিসেফ) এক যৌথ বিবৃতিতে এসব আশঙ্কা জানায়। ওইদিন বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে ‘কোভিড-১৯ ও শিশুশ্রম : সংকটের সময়, পদক্ষেপের সময়’ শীর্ষক যৌথ প্রতিবেদন প্রকাশ করে আইএলও এবং ইউনিসেফ। এতে বলা হয়, ২০০০ সাল থেকে শিশু শ্রমের সংখ্যা ৯ কোটি ৪০ লাখে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। তবে কোভিড-১৯-এর কারণে সে অর্জন এখন ঝুঁকির মুখে। এ বছরেই ছয় কোটি মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে পড়তে পারে বলে এরই মধ্যে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক। ইউনিসেফ ও আইএলও বলছে, দারিদ্র্য বাড়লে শিশুশ্রমও বাড়বে। কারণ বেঁচে থাকার জন্য পরিবারগুলো সম্ভাব্য সব উপায়ে চেষ্টা করবে। বিভিন্ন দেশের গবেষণাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, দারিদ্র্য এক শতাংশ বাড়লে শিশুশ্রম অন্তত দশমি সাত শতাংশ বাড়বে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, মহামারির কারণে স্কুল বন্ধ থাকায় দেশে দেশে শিশুশ্রম বেড়ে যাওয়ার আলামত এরই মধ্যে পাওয়া গেছে। করোনার কারণে বিশ্বের ১৩০টি দেশের অন্তত ১০০ কোটি শিশুর স্কুল বন্ধ রয়েছে। স্কুল চালু হলেও কিছু পরিবার তার শিশুসন্তানের শিক্ষার খরচ মেটাতে পারবে না। আর সে কারণে তারা সন্তানদের স্কুলে পাঠানো বন্ধ করে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনা মহামারিজনিত পরিস্থিতির মধ্যে যেসব শিশু মা-বাবার একজনকে অথবা দুজনকেই হারিয়েছে, তারা সবচেয়ে বেশি শ্রমঝুঁকিতে রয়েছে। মেয়ে শিশুদের অনেকে জীবিকার তাগিদে কৃষিকাজ ও গৃহস্থালীর কাজে যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

নিরাশার পরেও আশা আছে। শিশুদের এমন দুর্যোগ থেকে প্রকৃতিই বাঁচাবে। আমি-আপনিও প্রকৃতির অংশ। আসুন শিশুর প্রতি সদয় হই। আমি-আপনি-আমার শিশুর প্রতি সহানুভ‚তিশীল হলেই বাঁচবে তারা। প্রকৃতিই বাঁচাবে; একটু বিবেকবান আমি-আপনি-আমরা হলেই পরে।

সোহেলী চৌধুরী : সাংবাদিক। জনকল্যাণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে)।


সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : হাউস নং ৩৯ (৫ম তলা), রোড নং ১৭/এ, ব্লক: ই, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ফোন: +৮৮-০২-৪৮৮১১৮৩১-৪, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮
ই-মেইল : বার্তা- [email protected] বিজ্ঞাপন- [email protected]
দৈনিক আজকালের খবর লিমিটেডের পক্ষে গোলাম মোস্তফা কর্তৃক বাড়ি নং-৫৯, রোড নং-২৭, ব্লক-কে, বনানী, ঢাকা-১২১৩ থেকে প্রকাশিত ও সোনালী প্রিন্টিং প্রেস, ১৬৭ ইনার সার্কুলার রোড (২/১/এ আরামবাগ), ইডেন কমপ্লেক্স, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.com, www.eajkalerkhobor.com