ই-পেপার ফটোগ্যালারি আর্কাইভ  শুক্রবার ● ২৭ নভেম্বর ২০২০ ● ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৭
ই-পেপার  শুক্রবার ● ২৭ নভেম্বর ২০২০
শিরোনাম: ছাব্বিশ দিনে ডেঙ্গুর রেকর্ড       পেঁয়াজের রোড ম্যাপ: চারবছরে উদ্বৃত্ত        সবজিতেও বাম্পার        নতুন শিক্ষাবর্ষে ভর্তি ও টিউশন ফি বেশি নিলে এমপিও বাতিল       এক বাংলাদেশির সিঙ্গাপুরে পাচার করা বিলিয়ন ডলারের সন্ধান       বাংলাদেশ-ভারত স্বরাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠক স্থগিত       অক্সফোর্ডের করোনা টিকা ৩ কোটি ডোজ কিনবে বাংলাদেশ      
অভিজ্ঞতা অর্জনের নামে বন্ধ হোক রাষ্ট্রীয় অপচয়
প্রফেসর ড. মোহা. হাছানাত আলী
Published : Wednesday, 16 September, 2020 at 3:22 PM, Update: 16.09.2020 7:30:19 PM

খিচুড়ি খাননি বা এর রন্ধন প্রক্রিয়া কমবেশি জানেন না এমন মানুষের সংখ্যা দেশে খুবই কম। খিচুড়ি আমাদের দেশের অত্যন্ত প্রিয় একটা খাবার। শহর-গ্রাম সকল জায়গায় এর কদর প্রশ্নাতীত। বৃষ্টির দিন হলে তো কথাই নেই। খিচুড়ির সঙ্গে ইলিশ মাছ ভাজি রসনাবিলাসীদের অতিপ্রিয় খাবার। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ডাইনিংয়ে সকালের নাস্তায় খিচুড়ির সঙ্গ আলু ভর্তা খাননি এমন গ্রাজুয়েট খুঁজে পাওয়া বেশ ভার। সেই খিচুড়ি রান্না ও পরিবেশন শিখতে এবার বিদেশ যাবেন বেশকিছু সরকারি কর্মকর্তা। দেশে এসে তারা নাকি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্কুল ফিডিং কার্যক্রমকে আরো উন্নত, কার্যকর ও গতিশীল করতে অবদান রাখবেন। এমন এক অদ্ভুত প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। যা নিয়ে বর্তমানে দেশে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এমন এক গাঁজাখুড়ি প্রস্তাবনা চারিদিকে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। 
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণের বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মারফত জানা যায় যে, সারাদেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘মিড ডে মিল’ প্রকল্পের আওতায় শিক্ষার্থীদের দুপুরের খাবার হিসেবে স্বাস্থ্যসম্মত খিচুড়ি খাওয়ানো হবে। বর্তমানে দেশের ১৬টি উপজেলায় পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে প্রায় ১০০০ বিদ্যালয়ে সপ্তাহে তিন দিন দুপুরে রান্না করা খিচুড়ি শিক্ষার্থীদের খাওয়ানো হয়। চলমান প্রকল্পটি সারাদেশে চালু করতে ১৯ হাজার ২৯০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প তৈরি করে তা অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে একনেকে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ৫০০ কর্মকর্তাকে বিদেশে পাঠিয়ে খিচুড়ি রান্না ও পরিবেশন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়র কথা বলা হয়েছে। যা বিবেকবান প্রতিটি মানুষের মনকে চরম নাড়া দিয়েছে। প্রস্তাবনায় প্রাথমিকভাবে ৫০ জন করকারি কর্মকর্তাকে পার্শ্ববর্তী দেশে পাঠিয়ে খিচুড়ি রান্না ও পরিবেশন শিখতে ৫০ কোটি টাকার বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। যা রাষ্টীয় সম্পদের চরম অপচয়। বিষয়টি এখন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

এদিকে, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর প্রাথমিকভাবে ৫০ কর্মকর্তার বিদেশ যাওয়ার জন্য প্রায় পাঁচ কোটি টাকা চেয়েছে। এ ছাড়া দেশেই প্রশিক্ষণের জন্য আরো ১০ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত এই রান্না করা খাবার বিতরণ কর্মসূচির জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১৯ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা। এর আওতায় পাঁচ বছর ধরে প্রায় এক কোটি ৪৮ লাখ শিক্ষার্থীকে পুষ্টিকর বিস্কুট ও রান্না করা খিচুড়ি পরিবেশন করা হবে। ৫০৯টি উপজেলার শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই খাবার পরিবেশন করা হবে। 

তবে পরিকল্পনা কমিশন এই প্রকল্পের নানাবিধ ব্যয় কমাতে বলেছে। বিদেশ সফরের জন্য দুটি দলে অল্পসংখ্যক কর্মকর্তাকে পার্শ্ববর্তী দেশে পাঠাতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া দেশেও এ ধরনের প্রশিক্ষণ গ্রহণের বিষয়ে যৌক্তিকতা আছে কি না, তা যা জানতে চাওয়া হয়েছে। 

সমালোচনার মুখে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আকরাম-আল-হোসেন জানান খিচুড়ি রান্নার প্রশিক্ষণের জন্য নয় অন্যান্য দেশ স্কুলে মিড ডে মিল দুপুরের খাবার কীভাবে বাস্তবায়ন করে সে ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা অর্জনে বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে মোট প্রকল্পের অতি অল্প অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। এই অর্থ ব্যয় কোনো অপচয় নয় বরং অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। 

বলতে দ্বিধা নেই যে, এটা দেশের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক একটি ঘটনা। এদেশে বহু বোর্ডিং স্কুল আছে। হেফজখানা আছে। এতিমখানা আছে। লিল্লাহ বোর্ডিং আছে। সেখানে তিন বেলা রান্না করে খাওয়ানো হয়। অত্যন্ত সুচারুরূপে এবং দক্ষতার সঙ্গে দীর্ঘদিন থেকে তারা এই কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এদিকে দেশের সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসিক হলের ডাইনিংসমূহে তিন বেলা রান্না করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে খাবার পরিবেশন করা হয়। প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয় না। দেশে প্রচুর পরিমাণ ছাত্রছাত্রী হোস্টেলে থেকে পড়ালেখা করে। সেখানেও রান্না করা হয়। পরিবেশনও করা হয়। প্রশিক্ষণের কোনো প্রয়োজন হয় বলে আমার জানা নেই। আমি নিজে আমার পূর্বতন বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালেয়র সর্ববৃহৎ হলের প্রভোস্ট ছিলাম। ৫০০ শতাধিক ছাত্রের জন্য ডাইনিংয়ে তিনবেলা রান্না হতো। ছাত্রদের মাঝে তা পরিবেশনও করা হতো। প্রায় প্রতিদিন সকালের নাস্তার মেন্যুতে থাকতো খিচুড়ি আর আলু ভর্তা। কই তাদের কারো জন্য তো কোটি টাকা ব্যয় করে বিদেশ থেকে প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়নি? আসলে প্রকল্পের টাকায় বিদেশ ভ্রমণ সরকারি কর্মকর্তাদের ফ্যাশনে পরিণত হয়ে গেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বারবার অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণকে নিরুৎসাহিত করার তাগিদ দিলেও প্রকল্পের টাকায় সরকারি কর্মকর্তাদের অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণকে রোধ করা যাচ্ছে না।

শুধু খিচুড়ি রান্না করতে অভিজ্ঞতা অর্জন নয় বরং এর আগেও আমরা দেখেছি, যে প্রায় অধিকংশ সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের আগেই প্রকল্পের টাকার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দিয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন বা প্রশিক্ষণের নামে সরকারি কর্মকর্তারা দলবেঁধে বিদেশ ভ্রমণ করেন। কিছুদিন আগে পুকুর খননে অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য কিছু কর্মকর্তার বিদেশে যাওয়ার একটি খবর সংবাদপত্রের মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছিল। নদীমাতৃক বাংলাদেশ পুকুর, নদী-নালা, খাল-বিলে ভরপুর। সেই দেশের মানুষ যখন পুকুর খননের অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য দলবেঁধে সরকারি টাকায় বিদেশ ভ্রমণ করতে যান তখন লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যায়। এদিকে আরেক দল সরকারি কর্মকর্তা এবার রাষ্ট্রীয় খরচে ভবন নির্মাণ দেখতে বিদেশ যাচ্ছেন। এসব দেখার কি কেউ নেই দেশে? 

এছাড়া ইদানীংকালে সরকারি প্রায় প্রতিটি প্রকল্পের কেনাকাটায় অতিমূল্য নির্ধারণ করা সরকারি অর্থ হরিলুটের এক অভিনব পন্থায় পরিণত হয়েছে।  

করোনাকালে যখন দেশের সার্বিক অর্থনীতি অনেকটা স্থবির। দেশের দীর্ঘমেয়াদি বন্যা, সুপার সাইক্লোন আম্পানের প্রভাবে গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা বেশ মন্থর। বিদেশি বিনিয়োগ অপ্রতুল। চাকরি হারিয়ে দিশেহারা বহু মানুষ। দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা অনেকটাই অচল। বিদেশি শ্রমবাজারের গতি ঋণাত্মক। সরকারের ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা যখন দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তখন কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে খিচুড়ি রান্না, পুকুর খননের অভিজ্ঞতা অর্জনের মতো বিদেশে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ গ্রহণ জনগণের ট্যাক্সের টাকার অপচয় ছাড়া কিছুই নয়।

করোনাকালে যারা প্রকল্পের টাকায় অপ্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা অর্জনের নামে বিদেশ যাওয়া প্রাধান্য দিয়ে প্রস্তাবনা  প্রণয়ন করতে পারেন, তাদের দেশপ্রেম, রুচিবোধ ও বিবেকবোধ নিয়ে প্রশ্ন তোলাই যায়। খিচুড়ি রান্নার অভিজ্ঞতা অর্জনের নামে বিদেশ ভ্রমণ করার পরিকল্পনার সঙ্গে যেসব হর্তাকর্তা জড়িত তাদের বিবেকবোধ বলে কি আর কিছুই অবশিষ্ট নেই? মহামারি করোনাকালে এমন অদ্ভুত প্রস্তাবনা মানুষের বিবেককে কঠিনভাবে নাড়া দিয়েছে। খিচুড়ি বাংলাদেশের মানুষের অত্যন্ত প্রিয় এবং সুস্বাদু একটি খাবার। এটি রান্না করার জন্য তেমন বিশেষ জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা অর্জন করার কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। খিচুড়ি রান্না করার রেসিপি নিয়ে তো আশির দশকে নির্মিত বাংলা সিনেমার একটি বিখ্যাত গান সে সময় মানুষের মুখে মুখে ঘুরে ফিরতো।

যে সমস্ত কর্মকর্তা বিদেশে গিয়ে খিচুড়ি রান্না শিখবেন বা উন্নত পরিবেশন বিষয়ে জ্ঞানার্জন করবেন তারা কি দেশে ফিরে তাদের অর্জিত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে খিচুড়ি রান্না করবেন? মোটেই না। অন্যদিকে যারা বিদেশে যাবেন তারা নিশ্চয়ই কোনো না কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা কোনো না কোনো কলেজের শিক্ষার্থী। অতএব এই খিচুড়ি কীভাবে রান্না করা হয় বা কীভাবে তা বণ্টন করা হয় সেটি তাদের মোটেই অজানা নয়। কিন্তু শুধু সরকারি টাকা অপচয় করার জন্য বা নয়ছয় করার জন্য অভিজ্ঞতা অর্জনের নামে বিদেশ ভ্রমণ বিলাসিতা ছাড়া আর কিছুই নয়। যখন সরকার করোনাকালীন আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সমস্যায় নিপতিত। গ্রামীণ অর্থনীতি মন্দাকলীন সময় পার করছে। চাকরি হারিয়ে দিশাহারা নিম্নমধ্যবিত্তের মানুষ। শিল্প-কারখানায় উৎপাদনের গতি মন্থর। রেমিট্যান্সের চাকা প্রত্যাশামাফিক ততটা সচল নয়। বিদেশে কর্মসংস্থান ধীরে ধীরে কমে আসছে। এমন একটি জটিল অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এ ধরনের বিলাসী প্রস্তাবনা যারা প্রস্তুত করতে পারে তাদের শুধু ধিক্কার নয়, চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনাটা জরুরি। এ কাজে জড়িতদের বিবেকবোধ এবং জাতির প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা আজকে চরমভাবে প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে। তবে দেশে শুধু এই খিচুড়ি অভিজ্ঞতা অর্জনই নয় এরকম বহু অপ্রয়োজনীয় কাজে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। করোনা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অনেক কিছুকেই স্থবির করেছে সত্য কিন্তু স্থবির করতে পারেনি দুর্নীতিকে, স্থবির করতে পারেনি সরকারি কর্মকর্তাদের অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণের নেশাকে। 

লেখকঃ প্রফেসর ড. মোহা. হাছানাত আলী
আইবিএ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়


সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : হাউস নং ৩৯ (৫ম তলা), রোড নং ১৭/এ, ব্লক: ই, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ফোন: +৮৮-০২-৪৮৮১১৮৩১-৪, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮
ই-মেইল : বার্তা- [email protected] বিজ্ঞাপন- [email protected]
দৈনিক আজকালের খবর লিমিটেডের পক্ষে গোলাম মোস্তফা কর্তৃক বাড়ি নং-৫৯, রোড নং-২৭, ব্লক-কে, বনানী, ঢাকা-১২১৩ থেকে প্রকাশিত ও সোনালী প্রিন্টিং প্রেস, ১৬৭ ইনার সার্কুলার রোড (২/১/এ আরামবাগ), ইডেন কমপ্লেক্স, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.com, www.eajkalerkhobor.com