ই-পেপার ফটোগ্যালারি আর্কাইভ  সোমবার ● ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০ ● ৬ আশ্বিন ১৪২৭
ই-পেপার  সোমবার ● ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০
শিরোনাম: ১৬ অক্টোবর থেকে সিনেমা হল খুলবে       আরো ৪০ মৃত্যু, শনাক্ত ১,৭০৫, পরীক্ষা ১৩,০৫৩       সেই গাড়িচালক ১৪ দিনের রিমান্ডে       বাংলাদেশ ও ভারতের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বহুমাত্রিক : কাদের       জোহর ও মাগরিবে মাস্ক পরে মসজিদে যাওয়ার পরামর্শ প্রধানমন্ত্রীর       ভিপি নুরের বিরুদ্ধে ঢাবি ছাত্রীর ধর্ষণ মামলা       হ্যান্ডসেট বৈধ না হলে নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন করা হবে : বিটিআরসি      
করোনাকালের গল্প
সোনার খাঁচা
ড. সুরাইয়া ইয়াসমীন হীরা
Published : Tuesday, 8 September, 2020 at 5:04 PM

বিয়ের পর তামান্নাকে তার বর বলে দিয়েছিলো চাকরি করা যাবে না। নতুন বউ চমকে উঠলেও কিছুই বলতে পারেনি। শ্বশুরবাড়ির নিয়ম-কানুন মেনে নিয়ে সংসার শুরু করলো। তামান্না গুণী মেয়ে। দেখতেও খুব সুন্দর। সবকিছু মানিয়ে-গুছিয়ে চলার চেষ্টা করলো। আর পাঁচটা মেয়ের মতো সংসারে সুখী হওয়ার সাধনায় নিজেকে নিমগ্ন করলো।

সংসারে একটি ছেলে ও একটি মেয়ে এলো। ছেলেটি দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। আর মেয়েটি সপ্তম শ্রেণির। মাঝে মাঝে মন কেমন করে উঠে, যখন দেখে বন্ধু-বান্ধব সবাই চাকরি করে।

তামান্না সুন্দরী, শিক্ষিত, ভালো পরিবারের মেয়ে। চাইলেই একটা ভালো চাকরি করতে পারতো। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে কি লাভ হলো, এখন প্রায়ই মনে হয় তার। তবুও সে সবকিছু মানিয়ে চলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেই যায়।

দেখতে দেখতেই বিয়ের অনেকগুলো বছর পার হয়ে যায়। বর চাকরি করেন একটা মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে। ভালো বেতন পান। ভালোভাবেই দিন চলে যায় তাদের। কিন্তু তামান্নার মন হু হু করে উঠে। ভরা সংসারেও যেন কোথায় এক শূন্যতা তার। মনের খোরাক মেটানোর জন্য মাঝে মাঝে বান্ধবীদের সঙ্গে কথা বললেও আসলে তেমন একটা ভালো লাগে না কারও সঙ্গেই কথা বলতে। প্রয়োজনে অনুষ্ঠানে যায়। দাওয়াতেও যায়। সবার সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ হয়। সবকিছুর মাঝেও যেন শূন্যতা তার। সবকিছু থাকার পরও যেন কিছুই তার নয়। সবার মাঝেও কেন যেন নিজেকে বড় একা মনে হয়।

তামান্নার বর তানভীর হোসেন, কাজ শেষে বাসায় ফেরেন। খান, দান, ঘুমান। আর গল্প-গুজব করেন ছেলে-মেয়ের সঙ্গে। মাসের প্রথমে তামান্নার হাতে টাকা দিয়ে দেন। তারপর বিল দেওয়া, বাজার করা, সংসার সামলানো সব কাজই করতে হয় তামান্নাকে এক হাতে।

চাকরি করতে বাইরে যাওয়া যাবে না। কিন্তু বিনা পয়সার চাকরি করতে তামান্নাকে বাইরে বের হতেই হয়। ঘর সংসারের ব্যাপারে একটু বেশি উদাসীন তানভীর। কিন্তু বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার ব্যাপারে মোটেও উদাসীন নন।

প্রতিদিন বন্ধুদের সঙ্গে তার দেখা হওয়া লাগবেই। আড্ডা দেওয়ার জন্য বাইরে তাকে যেতেই হবে, রাতে। প্রথম প্রথম খারাপ লাগলেও এখন সব সয়ে গেছে তামান্নার। খেয়ে নেয় সময় হলেই। আগের মতো আর হা করে চেয়ে থাকে না বরের পথের দিকে। এভাবেই চলে যাচ্ছিলো তাদের দিন।

হঠাৎ সারা বিশ্বে শুরু হলো মহামারী। চীনের উহান শহরে মারা গেলো করোনা ভাইরাসে মানুষজন। বাংলাদেশও থাকলো শঙ্কায়। এতো মানুষের মধ্যে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে তা হবে ভয়াবহ। বাংলাদেশে ৮ মার্চ প্রথম করোনা রোগী পাওয়া গেলো। তামান্না চিন্তিত হলো। বরকে চাকরির জন্য বাইরে যেতেই হয়। আর এখন সরকার থেকে বলা হচ্ছে, ঘরে থাকুন, বাইরে বের হবেন না। কিন্তু কী উপায়?

চাকরির জন্য অফিসে না গেলে চাকরি থাকবে না। তার বরের তো সরকারি চাকরি না, যে না গেলেও বেতন পাবেন। আবার বাইরে বের হলে সংক্রমিত হওয়ায় ভয় ও শঙ্কা।
কাজে-কর্মে এক্সপার্ট বলে অফিসে তানভীর সাহেবের সুনাম। সবাই তার খুব প্রশংসা করে। অফিস থেকে সিদ্ধান্ত হলো সপ্তাহে দুইদিন অফিসে যেতে হবে। তাই তিনি এখন বাসায়। বাসায় থাকলেও তিনি কোনো কাজই করেন না। খান, দান, ঘুমান, টিভি দেখেন, ফেসবুকিং করেন। তামান্না সবই দেখে। কিন্তু কিছু বলেন না। খারাপ লাগে মাঝে মাঝেই। মনে হয় বুয়া নাই তাই একটু তো সাহায্য করতেই পারেন তানভীর। কিন্তু তা করেন না।

বাসায় থেকে থেকে খুব বিরক্ত হয়ে উঠেছেন তানভীর। একটুতেই রেগে যান। চিৎকার, চেঁচামেচি লেগেই থাকে বাসায়। একটুতেই মাথাগরম করেন। খুব বাজে ব্যবহার করেন তামান্নার সঙ্গে। এক রাতে খুব গরম পড়েছে। তানভীর হঠাৎই চিৎকার করে বললেন, তুমি ফ্যান বন্ধ করো তামান্না, আমার ঠান্ডা লাগছে।

-তুমি কাঁথা গায়ে দাও। এটা তো মে মাস। আর আজ খুব গরম পড়েছে। ফ্যান বন্ধ করলে কষ্ট হবে ঘুমাতে। বললো তামান্না।

-কষ্ট হলে কষ্ট করবা। তোমাকে তো আর মাথার ঘাম পায়ে ফেলে টাকা ইনকাম করতে হয় না। বসে বসে শুধু সারাদিন ফ্যানের বাতাস খাও।

- এভাবে কেন বলছো তুমি? তুমিই তো আমাকে চাকরি করতে দাওনি। আমি তো চাকরি করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তুমি কোনোদিনও রাজি হওনি।

-দেইনি বেশ করেছি। মেয়েমানুষ, ঘরে থাকবে। কীসের এতো বাইরে যাওয়া? ছেলেপুলে মানুষ করো। মন দিয়ে সংসার করো। মাস শেষে এতো বিদ্যুৎবিল দিতে আমি পারবো না। ফ্যান বন্ধ করো এখনই।

ফ্যানটা বন্ধ করে দিয়ে তামান্না শুয়ে পড়লো। কিন্তু ভীষণ গরম পড়েছে। তাই ঘুমাতে পারলো না। ছটফট করে উঠে এলো ডাইনিংরুমে। সেখানের ফ্যানটা ছেড়ে পাশের বিছানায় একটু শুয়ে পড়লো।

সারাদিন রোজা রেখে হাড়ভাঙা খাটুনি করতে হয় তাকে। করোনার কারণে বুয়া আসে না। হাঁড়ি মাজা, বাসনপত্র পরিস্কার, ঝাড়ু দেওয়া, ঘর মোছা, কাপড় ধোঁয়া সব কাজই তাকেই করতে হয়। শুনেছে অনেকের বর নাকি সাহায্য করছে এই লকডাউনে। কিন্তু তার কপালে সেই সুখ নেই। তানভীর কোনো কাজই কওে না সারাদিন বাসায় থাকলেও। এর থেকে অফিসের চাকরি ঢের ভালো। কাজ করলে পয়সা পাওয়া যেতো। আর তিনবেলা কেউ খাওয়ার খোঁটা তো দিতো না। বাবা-মা কোনোদিনও খাওয়ার খোঁটা দেননি। কিন্তু বর সুযোগ পেলেই মনে করিয়ে দেন, তার পয়সায় খায় ও পরে। অথচ বিয়ের সময় মেয়ের ভরণপোষণ এর দায়িত্ব ছেলের, সেকথা মাথায় রেখেই বিয়ে করে ছেলেরা। বিয়ের পর খাওয়ার খোঁটা দিতে কি একটুও বিবেকে বাঁধে না? একটুও লজ্জা করে না?

ঘুমে চোখ লেগে আসতেই তামান্নার মনে হলো ডাইনিং রুমের বিছানায় ঘুমিয়ে পড়লে তানভীর মাইন্ড করবে। ভাববে তামান্না আলাদা বিছানায় কেন ঘুমিয়েছে? সাতপাঁচ ভেবে তামান্না উঠে এসে তানভীর এর পাশে এসে আবার শুয়ে পড়লো।কিন্তু এতো গরম পড়েছে তামান্না আর ঘুমাতেই পারলো না।

তানভীর নাক ডেকে কেমন করে ঘুমাচ্ছেন? আহা কি সুখী মানুষ! কি শান্তিতে ঘুমাচ্ছেন! ঈৃথিবীর সব সুখ-শান্তি যেন তানভীর এর। কেমন করে একজন পুরুষ এতো শান্তিতে ঘুমাতে পারে?

অবাক হয়ে তামান্না ভাবে। আর তাকিয়ে থাকে জানালার আকাশের দিকে। এতো মানুষ রোজ মারা যাচ্ছে করোনা ভাইরাসে। এতো মৃত্যু, এতো কষ্ট, এতো অনিশ্চিত জীবনে এতো শান্তিতে ঘুমুনো যায়? তাহলে তামান্না কেন পারছে না? কেন তার শুধু কষ্ট হয়? কেন ঘুম এসেও আসে না? কেন চোখের জলে বিছানার বালিশ ভিজে ভিজে যায়... কেন কেউ তার কথা বুঝতে পাওে না? কেউ তার কথা মনে কওে না? কেন আকাশের তারাগুলো গুনতে গুনতে রাত পার হয়ে যায়?

রমজান মাস। তাই সেহেরির সময় হতেই বিছানা থেকে উঠে পড়লো তামান্না। ছেলে-মেয়েকে ডেকে দিলো। তারপর টেবিলে খাবার দেওয়া শুরু করলো। সেহেরির পর ফজরের আযান দিলে নামাজ পড়ে বিছানায় গেলো একটু ঘুমাতে। সকালে উঠে আবার কাজ আর কাজ। সব কাজ শেষ করে, গোসল করে, যোহরের নামাজ পড়ে, কুরআন পড়ে তারপর একটু বসলো টিভিতে দুপুরের খবর শুনতে। আজকে বাংলাদেশে ৬৬৭ জন নতুন করোনা পজিটিভ হয়েছে আর মারা গেছে ৫ জন। মনটা খারাপ হয়ে গেলো তামান্নার। এতো মানুষের মৃত্যু! সত্যি সত্যি সারা বিশ্বে কী শুরু হলো!

বিকালে ইফতারের আয়োজন করার সময় দেখে তানভীর খুব জোরে জোরে টিভিতে গান শুনছেন। তামান্না বললো, এতো জোরে সাউন্ড দিয়েছ, কানে লাগছে। একটু পরইতো ইফতারির সময় হয়ে যাবে, আযান দেবে, টিভিটা না হয় বন্ধ করে দাও। পরে আবার দিও। তামান্নার কথা শুনে তানভীর রেগে আগুন হয়ে গেলো। তোমারা বাসায় থাকো, সারাদিন টিভি দেখো যখন কিছু হয় না তখন? আমি টিভি দিয়েছি তাতেই সমস্যা? কেন কী হয়েছে?

-কেন এভাবে বলছো? আমিতো বলেছি জোরে সাউন্ড না দিতে। মাগরিবের আযান দেবে এখন।

-আমার টিভি, আমার টাকা দিয়ে কেনা, আমি যা খুশী করবো। তোমরা সারাদিন বকবক করলে সমস্যা নেই। আর আমি টিভি দিলেই সমস্যা? বাহ্! রে!
-কেন জটিল করছো সামান্য বিষয় নিয়ে?
-আমি জটিল করছি? কী? আমি জটিল? কুটিল?
- আমি তোমার সাথে ঝগড়া করতে চাই না। রমজান মাসে রোজা রেখে এতো ঝগড়াঝাঁটি করা উচিত নয়।এতে রোজা নষ্ট হয়ে যাবে।

ছেলে মেয়ে দুজনেই বললো, বাবা রোজা রেখে ঝগড়া করলে আল্লাহ্ নারাজ হবে। একথা শুনে তানভীর আরও রেগে গেলেন। এতো বড় সাহস তার মুখে মুখে কথা? রাগে এসে ঠাস করে ছেলে মেয়ে দুজনের গালে চড় দিয়ে দিলো। একবারও মনে করলোনা ছেলেটা বড় হয়েছে। এটা ঠিক না।আর মেয়েটাও বড় হচ্ছে। অকারণে তাদের গায়ে হাত তুললো শুধু তামান্নার উপর রাগ দেখিয়ে। ছেলে মেয়ে দুটোর চোখের পানি দেখে তামান্না এক দৌড়ে এসে ওদের জড়িয়ে ধরলো। করোনা ভাইরাস এসে একি হলো? সংসারের সুখ শান্তি সব শেষ হয়ে গেলো? সব অপমান সহ্য করে টেবিলে ইফতার সাজালো। সবাইকে ডেকে আল্লাহ্ র কাছে দোয়া করলো। ‘হে আল্লাহ্, তুমি করোনা ভাইরাস দূর করে দাও।তুমি আমাদের ক্ষমা করে দাও।তুমি সবাইকে মাফ করো। তুমি মহান ও মেহেরবান।’

ইফতার শেষ করে মাগরিব এর নামাজ পড়ে সাতটার নিউজ শোনার জন্য টিভির সামনে একটু বসলো তামান্না। তানভীর তখন ফেসবুকে তার বন্ধুকে কল দিয়ে জোরে জোরে কথা বলা শুরু করলো। তামান্না বললো, শুনছো একটু আস্তে কথা বলো না?

না হলে পাশের ঘরে গিয়ে কথা বলো প্লিজ। খবরটা একটু শুনি সারা পৃথিবীর কি যে অবস্থা। কতো মানুষ যে মারা যাচ্ছে! সমস্যা না হলে একটু পাশের ঘরে গিয়ে কথা বলো। জরুরি কথা হলে মনে হয় পাশের ঘরে গিয়ে কথা বললে তোমার জন্যও ভালোই হবে।
-কেন? আমি কেন পাশের ঘরে যাবো?

-খবরটা একটু শুনি, বিশ্ব মহামারীর কি পরিস্থিতি?
-আমি যখন টিভি দেখছিলাম তখন তুমি টিভি বন্ধ করতে বললে, আর এখন আবার মোবাইলে কথা বলতে নিষেধ? কেন? আমার জরুরী কথা আছে।
-না, নিষেধ নয়। শুধু অনুরোধ, পাশের ঘরে গিয়ে কথা বলতে যদি তাহলে আমি নিউজটা শুনতাম।
-তোমার যা ইচ্ছে তাই করতে হবে আমাকে?
-না, তা কেন? আমিতো শুধু বললাম।
-তুমি বললেই আমাকে শুনতে হবে?
-অকারণে আজ তুমি রাগ করছো। ছেলে মেয়েদুটোর গায়ে হাত তুললে। কেন এমন রাগ করলে? ওরা কি ভুল কিছু বলেছে? কেন মারলে ওদেরকে?
-আমার মুখে মুখে কথা? এতো বড় সাহস! ওরা কি আমার ছেলে মেয়ে? সন্দেহ আছে।
-কি বললে? মানে? সন্দেহ আছে মানে কী?
- মানে ওদের ডিএনএ টেস্ট করতে হবে।
-কী? এতো বড় কথা তুমি বলতে পারলে? তুমি জানো যে, তুমি ছাড়া কারো সাথেই আমার কোনো সম্পর্ক নেই। তারপরও আমাকে অপমান করার জন্য এতো বড় কথাটা তুমি ছেলে-মেয়েদের সামনে বলতে পারলে? কেমন করে পারো তোমরা পুরুষরা নারীদেরকে এতো ছোট করতে?
ঠিক আছে, তবে তাই হোক। ডিএনএ টেস্ট করা হোক। টেস্টের রেজাল্ট এ যদি দেখো ছেলে মেয়েদুটো তোমার, তবে তারপর থেকে আমাদের দু’জনের পথ হবে আলাদা। এতো ছোট বিষয় নিয়ে যে এতো বড় অভিযোগ করতে পারে, তার সঙ্গে আমি আর থাকতে চাই না।

তানভীর আজ কয়েকদিন হলো বাসায়। তাই তার দম নাকি বন্ধ হয়ে আসছে। বাসায় থাকতে তার আর ভালো লাগছে না। বাইরে বের হয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে মন চাচ্ছে। এভাবে কি সারাদিন ঘরের মধ্যে বন্দী থাকা যায়? তাই তামান্নার সঙ্গে এতোটা অশান্তি করছে। বাচ্চাদের উপর রাগারাগি চেঁচামেচি করছে।কয়েকটা দিন বাসায় থাকতেই যেন হাঁপিয়ে ওঠেছে। যেইভাবেই হোক বাইরে বের হতে হবেই যেন।

রাতে টেবিলে খেতে দিয়ে ওদেরকে তামান্না তার ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লো। মনটা খুবই খারাপ লাগছে। একটা মেয়ে সারাটা দিন এতোটা পরিশ্রম করেও মর্যাদা পায়না তার কাজের। তানভীর এর কথা শুনে আর খেতে ইচ্ছে করছে না। খাবার রুচি নষ্ট হয়ে গেছে। কি করে পারে এতো বাজে কথা বলতে?বিয়ের আগে বা পরে কোনদিন কারো সাথেই তামান্নার এরকম সম্পর্ক ছিলো না। তামান্না এতোটাই সচেতন যে তানভীর কোথাও গেলে অফিসের কাজে ফিরে আসা অবধি কাউকে কিছু বুঝতে দিতো না যে বাসায় তানভীর নেই। মেয়েদের একটু বুদ্ধি করে চলতে হয়। তামান্না তার বুদ্ধিকে সবসময় ভালো কাজে লাগিয়েছে। যখন তানভীর এর উপর তার অনেক রাগ, দুঃখ ও অভিমান হয়, সে মনে করতে চেষ্টা করে তানভীর এর কি কি ভালো গুণ আছে। তামান্না ও বাচচারা যেন ভালো থাকে, ভালো খেতে পারে, ভালোভাবে সমাজে বাঁচতে পারে সেজন্য সে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে টাকা উপার্জন করে। সে তো এরকম মানুষ না যে বউকে মার ধর করবে। কিন্তু রাগ উঠলে সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। আর করোনা এসে যেন আরও বদরাগী ও বদমেজাজী হয়ে গেছে তানভীর। তা না হলে এতো সামান্য বিষয় নিয়ে কেন এতো ঝগড়াঝাঁটি করবে? মেজাজ দেখিয়ে সে রাতে অন্যঘরে আলাদা বিছানায় ঘুমাতে চলে গেলো।

তামান্নাকে অপমান করার জন্য ইচ্ছে করেই সে এটা করলো, একবার ভাবলো না বাচ্চারা কি ভাবছে, ওরা এখন বড় হচ্ছে...

ছেলে মেয়েরা দেখলো। কিন্তু কিছু বলার সাহস পেলো না। ছেলেটা বড় হয়েছে, সে মায়ের কাছে এসে বললো- আম্মু, এতো অপমান সহ্য করে তুমি থাকো কেন একসাথে? চলে যেতে ইচ্ছে কওে না?
-নিজের সংসারে এতো মান অপমান কি সোনা?
-ডিএনএ টেস্ট এর মানে কিন্তু আমি জানি আম্মু
-তুমি বড় হয়েছো, টেস্ট করলে জানা যাবে তোমরা তোমার আব্বুরই সন্তান। কিন্তু আমি তোমার মা হয়ে বলছি সেটাই কি যথেষ্ট নয় তোমার আব্বুর জন্য?
-তোমার এতো অসম্মান আমি সহ্য করতে পারছি না
- আমিও পারছি না। আর সহ্য করতে। রাগ উঠলেই কি মানুষ যা মনে আসবে তাই বলে অপমান করবে?
- আব্বু এতো খারাপ ব্যবহার করে তবুও তুমি চুপ?
- কথা বললে এখন অশান্তি আরও বাড়বে। রমজান মাস সংযমের মাস,ধৈর্য্যের মাস।তুমি শুয়ে পড়ো বাবা,সেহেরির সময় আবারতো উঠতে হবে।

রাত ১২ টা পার হয়েছে। ঘুম আসছে না তামান্নার। আজ ৫ মে ২০২০ সাল। সংবাদমাধ্যমে পরিবেশিত তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে কোভিড-১৯ মহামারীতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫০ হাজার ১৩৪ জন। বিশ্বে এই সংক্রমণের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৫ লাখ ৭১ হাজার। আর সুস্থ হয়ে উঠেছেন ১১ লাখ ৪৪ হাজার।আজ বাংলাদেশে নতুনভাবে সংক্রমণের ৭৮৬। মোট সংক্রমণ ১০৯২৯ জন। মোট মৃত্যু ১৮৩ জন। এই হিসাবগুলোর বাইরেও আসলে অনেক মানুষ বিশ্বে মারা যাচ্ছে যার কোনো হিসেব নেই। সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ছে এই মহামারী। এসব তথ্য জেনে মন খারাপের সাথে সাথে তামান্নার মনে হলো, গত পাঁচটা দিন সে সারাটা রাত গরমে ছটফট করেছে। তবুও ফ্যান চালায়নি শুধুমাত্র তার বরের শরীরের কথা ভেবে। যদি সত্যি সত্যি তানভীর এর ঠান্ডা লেগে যায়। তানভীর রাগ করবেন। তামান্না বিছানায় অন্য ঘরে ফ্যান চালিয়ে ঘুমাতে চলে যায়নি। কিন্তু তানভীর নিজে দোষ করে আবার রাগ দেখিয়ে অন্য বিছানায় ঘুমাতে চলে গেলেন।
আহারে সোনার সংসার!

কতো অপমান, কতো কষ্ট বিসর্জন দিয়ে সোনার সংসার গড়ে তোলার কি আপ্রাণ চেষ্টা তামান্নার। ছেলেমেয়েদের মুখের দিকে তাকিয়ে যেদিকে দুচোখ যায় চলে যেতেও পারেনা। বর অনুমতি দেয়নি তাই চাকরি করতে পারেনি। আজ করোনার সময়ে মাত্র কয়েকদিনেই তানভীর অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছেন। ভাবছেন এ বন্দীদশা থেকে কবে মুক্তি পাবেন?
একবারও কি ভেবেছেন গত কয়েক বছর ধরে, দিনের পর দিন, ঘরে এভাবে থাকতে তামান্নার কতো কষ্ট হয়েছে? একবারও কি ভেবেছে?

তামান্নার মতো এতো সুন্দর একটা ভালো, ভদ্র মেয়ে, এতো ধৈর্য্যশীল একটা মেয়ে, এতো যোগ্য একটা মেয়ে শুধুই কি রান্নাঘরে তার ঠাঁই? শুধুই কি রান্না বান্না করে খাওয়ানোই তার কাজ? তার প্রতিভাগুলো যে সব শেষ হয়ে গেলো, কে রাখে তার খোঁজ?
সংসার নামের সোনার খাঁচায় বন্দী এসব তামান্নাদের কি কোনোদিনও হবে না মুক্তি?


সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : হাউস নং ৩৯ (৫ম তলা), রোড নং ১৭/এ, ব্লক: ই, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা- [email protected] বিজ্ঞাপন- [email protected]
দৈনিক আজকালের খবর লিমিটেডের পক্ষে গোলাম মোস্তফা কর্তৃক বাড়ি নং-৫৯, রোড নং-২৭, ব্লক-কে, বনানী, ঢাকা-১২১৩ থেকে প্রকাশিত ও সোনালী প্রিন্টিং প্রেস, ১৬৭ ইনার সার্কুলার রোড (২/১/এ আরামবাগ), ইডেন কমপ্লেক্স, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.com, www.eajkalerkhobor.com