ই-পেপার ফটোগ্যালারি আর্কাইভ  বুধবার ● ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০ ● ১৫ আশ্বিন ১৪২৭
ই-পেপার   বুধবার ● ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০
শিরোনাম: ভারতীয় করোনা ভ্যাকসিনের ট্রায়াল ও উৎপাদন বাংলাদেশে        পাইকারি বাজারে চালের দাম বেঁধে দিল সরকার       কুয়েতের আমির শেখ সাবাহ আর নেই       দায়িত্ব নিন, চিহ্নিত বেওয়ারিশ কুকুর স্থানান্তর করবো না: তাপস        পাকিস্তান-মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ আমদানি শুরু       সাবেক প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিমসহ ৫ জনের মামলা খারিজ       করোনায় আরও ২৬ জনের মৃত্যু      
পর্যটনের অপার সম্ভাবনা
হাওরে এক সড়কেই মানুষের ভিড়
নূরুজ্জামান মামুন
Published : Friday, 4 September, 2020 at 8:35 PM, Update: 04.09.2020 9:04:44 PM

‘বর্ষায় নাও  (নৌকা), শুকনায় পাও (পা)’- হাওর এলাকার মানুষের জীবন যাত্রায় এ প্রবাদ বদলে যাচ্ছে। হাওরের বিশাল জলরাশির বুকে নির্মাণ করা হয়েছে ২৯ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ নান্দনিক সড়ক। যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘অলওয়েদার রোড’।

সড়কটি হাওরের তলখ্যাত কিশোরগঞ্জের দুর্গম ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম উপজেলাকে সড়ক নেটওয়ার্কে যুক্ত করেছে। সড়কটি উদ্বোধনের আগেই দেখতে প্রতিদিন হাজারো মানুষ ভিড় করছেন সেখানে। এক ফসলনির্ভর হাওরের মানুষের নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। বদলে যাচ্ছে জীবনযাত্রা। তবে পর্যটকদের অবকাশ যাপনে এখনও গড়ে ওঠেনি অবকাঠামো। বিশাল জলরাশির বুকজুড়ে করচ বাগানসহ হাওরের নান্দনিক দৃশ্য অবলোকনে নেই নিরাপদ জলযান। তাই ভ্রমণপ্রিয় মানুষ ঝুঁকি নিয়ে ঘুরে বেড়ান ছোট ছোট নৌকা, অটোরিকশায়। সম্প্রতি বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের (বিটিবি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল সরেজমিন ঘুরে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছেন।
 
বিষয়টি স্বীকার করে বিটিবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত সচিব) জাবেদ আহমেদ আজকালের খবরকে বলেন, ছয় ঘণ্টার ঝটিকা সফরের মধ্য দিয়ে বুঝেছি সেখানে সম্ভাবনাময় একটি পর্যটন কেন্দ্র হতে পারে। স্থানটি ঢাকার এতো কাছি কাছি হওয়ায় যে কেউ সেখানে যেতে পারে। প্রচুর সম্ভাবনাময় জায়গাটিতে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এখন কোনটা হবে, কি করা উচিত তা একদিনের ভ্রমণে বুঝে উঠতে পারছি না। স্থানীয় প্রশাসনকে বলেছি আপনারা ওখানে থাকেন, কি করা উচিত তা  বোঝেন। শিগগিরই ওখানে কি করা উচিত তার যৌক্তিকতা তুলে ধরতে বলেছি। আশা করছি আগামী সপ্তাহের মধ্যে তাদের প্রস্তাব পেয়ে যাবো। তিনি আরো বলেন, বিটিবি চেয়ারম্যান (সিনিয়র সচিব) আগ্রহী হয়ে বলেছেন, বছরে আমাদের যে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয় তা ওখানের উন্নয়নে ইনভেস্ট করার। 

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের উদ্যোগে সড়ক ও জনপথ বিভাগ ইটনা-মিটামইন-অষ্টগ্রাম অলওয়েদার সড়কটি নির্মাণ করেছে। পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ধরে রাখতে সারা বছর ব্যবহার উপযোগী এই সড়কটিতে রয়েছে সাতটি আরসিসি সেতু, সাতটি কালভার্ট, তিনটি পিসি গার্ডার সেতু। সড়কের দুই পাশ পাঁচ লাখ মিটার আরসিসি ব্লক দিয়ে মুরিয়ে  দেওয়া হয়েছে। বর্ষার সময়ে ঢেউয়ে সড়ক যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। ৮৭৪ কোটি ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০১৫ সাল থেকে চলতি বছরের জুন মেয়াদে সড়কটি নির্মিত হয়েছে।

সম্প্রতি সড়কটি ঘুরতে গিয়ে দেখা গেছে, রাজধানী থেকে সড়ক পথে দুই ঘণ্টার মধ্যে কিশোরগঞ্জের নিকলি উপজেলায় পৌঁছা যায়। ঢাকাসহ যারা বিভিন্ন এলাকা থেকে গাড়ি নিয়ে ঘুরতে যান তাদের নিকলিতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। নিকলি বেড়িবাঁধ এলাকায় নেই গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা। ছুটির দিনে পাঁচ থেকে ছয় কিলোমিটার সড়কের ওপর গাড়ি পার্কিং করে রাখতে বাধ্য হন দর্শনার্থীরা। ফলে যারা বিলম্বে যান তাদের গাড়ি রেখে হেঁটে বা অটোরিকশায় যেতে হয় নৌকাঘাটে। এ সুযোগে অটোরিকশা চালকরা বাড়তি ভাড়া আদায় করছেন। বেড়িবাঁধের পাশে বসতবাড়ির আঙিনায় ছোট ছোট দোকান গড়ে উঠেছে। কেউ কেউ ঘরের মধ্যে দোকান সাজিয়ে জানালা দিয়ে খাদ্যসামগ্রী বিক্রি করেন। ফুসকা-চটপটির দোকান বসিয়েছেন অনেকে। পর্যটকদের আগমনে স্থানীয়দের বাড়তি আয়ের সুযোগ হলেও নিকলি নৌকাঘাটে নেই টয়লেট। নৌকায় ওঠার জেটি নেই। অনেক নৌকায় উঠতে গিয়ে হাওরের পানিতে পরে যেতে দেখা গেছে। 

নিকলি বাঁধ থেকে নৌকায় যেতে হয় অষ্টগ্রাম। দুই ঘণ্টার পথ যেতে আট থেকে ১০ হাজার টাকা ভাড়া দাবি করেন নৌকার মাঝিরা। পর্যটকদের ভিড় বাড়লে বাড়তি টাকা দিয়েও নৌকা পাওয়া যায় না। হতাশ হয়ে অনেকে নিকলি হাওরে স্নান করে ফিরে যান। দুই ঘণ্টা হাওর পারি দিয়ে পৌঁছাতে হয় অষ্টগ্রাম উপজেলা শহরে। সেখানে গিয়েও পর্যটকদের পরতে হয় দুর্ভোগে। শহর থেকে অলওয়েদার সড়কে যেতে পাওয়া যায় না পর্যাপ্ত যানবাহন। নৌকাঘাট ইসলামপুর থেকে মিটামইন-অষ্টগ্রাম সড়কের বড় সেতুর দূরত্ব মাত্র সাত কিলোমিটার। সেখানে যেতে অটোরিকশা ভাড়া নেয় ৫০০ টাকা। মিঠামইনে এখনও গড়ে ওঠেনি কোনো ভালো মানের হোটেল। দেশের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসা নান্দনিক সড়কটি দেখতে ছুটির দিনে মিঠামইনে যেন মানুষের মেলা বসে। দুপুরের খাবারের জন্য হোটেলের সামনে শত শত মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। 

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে (মাউশি) সংযুক্ত কর্মকর্তা (সহকারী পরিচালক, কলেজ-১) মো. সাবের মাহমুদ রিফাত সম্প্রতি সড়কটি ঘুরে এসেছেন। তিনি আজকালের খবরকে বলেন, অসাধারণ সড়কটি দেখতে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ গেলেও থাকা ও খাওয়ার কোনো হোটেল নেই। আমরা সরকারি কর্মকর্তা হওয়ায় ডাকবাংলোতে ছিলাম। তাও মানসম্মত না। মহিলাদের টয়লেটের ব্যবস্থা নেই। সড়কে উচ্চগতিতে অনেকে বাইক চালালেও দেখার কেউ নেই। আবাসিক সুবিধা ও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা না থাকায় মানুূষ দিনে গিয়ে দিনে ফিরে আসে। হাওরের রাতের নান্দনিক রূপ দেখা থেকে বঞ্চিত হয়। তিনি আরো বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ নৌকায় সড়কটিতে যেতে হয়। হাওরের মধ্যে বৈদ্যুতিক তারে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। নিরাপত্তাসহ সরকারিভাবে পর্যটকদের জন্য বোট ও হোটেল-মোটেল নির্মাণ করলে সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠতো। 

হাওরের দিগন্ত বিশারী জলরাশি, নয়নাভিরাম সড়ক ও হাওরের মধ্যে দ্বীপের মতো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে প্রতিদিন পর্যটকদের ঢল নামছে। কিশোরগঞ্জের চামড়াবন্দর, নিকলি বা বাজিতপুর থেকে ইটনা-মিঠামইন ও অষ্টগ্রামের ওই সড়কে বর্ষা মৌসুমে সরাসরি গাড়ি নিয়ে যাওয়া যায় না। ফলে নৌকাই একমাত্র ভরসা। ফলে মাঝিরা খুঁজে পেয়েছেন আয়ের উৎস।  

নিকলি ঘাটের মাঝি মশিউর রহমান জানান, শ্যালো ইঞ্জিনের একটি ছোট ট্রলার দিয়ে তিনি এতো দিন মাছ ধরতেন হাওরে। পর্যটকদের উপস্থিতি বেড়ে যাওয়ায় মাছ ধরা বাদ দিয়েছেন। পর্যটকদের টেনে প্রতি দিন ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় করেন। 
আকতারুজ্জামান নামের এক পর্যটক বলেন, সড়কটি ঘুরে মিটামইন থেকে নিকলি ফিরতে রাত হয়ে যায়। পথে নৌকার ইঞ্জিন নষ্ট হয় যায়। বিশাল হাওরের মধ্যে আলো না থাকায় কিছুই দেখা যাচিছল না। এরইমধ্যে ঝড় শুরু হলে নৌকাটি ডুবে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছিল। অনেক ভয়ে পেয়েছিলাম। পর্যটন কর্পোরেশন বোটের ব্যবস্থা করলে মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে ভ্রমণ করতে পারতো। বাড়তি নৌকা ভাড়া দিতে হতো না। ভাসমান কটেজ করলে অনেক পর্যটক হাওরে রাত যাপন করবে। 

মিঠামইন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রভাংশু সোম মহান আজকালের খবরকে বলেন, এখানে বাসস্থানের সংকট বেশি। মহামান্য রাষ্ট্রপতি চান না হাওরের জীববৈচিত্র্য নষ্ট করে রাস্তার পাশে কটেজ-হোটেল নির্মিত হোক। আবাসন, হোটেল, রেস্টুরেন্ট রাস্তার যে কোনো প্রান্তে তথা ইটনা, মিটামইন বা অষ্টগ্রামের শহরের ভিতরে করতে হবে। বর্ষা মৌসুমে এলাকাটি মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন। যে কারণে নৌকায় আসতে হয়। পর্যটন মৌসুমে অনেকে ফিটনেসবিহীন নৌকা নিয়ে চলাচল করে। মাঝে মাঝে নৌ-দুর্ঘটনা ঘটে। যা পর্যটন এলকার জন্য ভালো সাইন বহন করে না। সেক্ষেত্রে পর্যটন কর্পোরেশন ট্যুরিস্ট বোট চালু করলে ভালো হবে। হাওরের প্রায় বিলুপ্ত প্রজাতির মাছ ও স্থানীয় সুস্বাধু চালের স্বাধ নিতে পারবে। 

হাওরের সৌন্দার্য তিন ধরনের-বর্ষার সময়ে রাস্তার দুই দিকে পানি, এর কয়েক দিন পরে চারিদিকে শুধু সুবজ ধান ক্ষেত, ধান পাকলে সোনালি রূপ ধারণ করে। পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তুললে এসব দৃশ্য দেখা যাবে জানিয়ে ইউএনও প্রভাংশু বলেন, রাস্তা উদ্বোধন হওয়ার আগেই প্রতিদিন অসংখ্য লোক আসছে। স্থানীয়রা সবাই ইনকামের চেষ্টা করছে। কিন্তু তাদের চিন্তা ভাবনা পুরোটাই বিক্ষিপ্ত, পরিকল্পিত না। এতে পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ট্যুরিস্টকেন্দ্রিক বিভিন্ন উন্নয়নের সঙ্গে স্থানীয় যারা এর সঙ্গে জড়িত তাদেকে কিভাবে পর্যটকদের সেবা দিতে হয় সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার। 

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অটো ভাড়া আরো বেশি ছিল। এক বার রাস্তা ঘুরে আসতে ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা নিতো। সবাইকে নিয়ে বসে ৫০০ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছি। দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে টয়লেট নির্মাণের কাজ চলতে। দ্রুত চালু করা হবে। সার্বিক দিক বিবেচনা করে ট্যুরিজম বোর্ড একটি ভালো উদ্যোগ নিয়েছে। এমপি স্যারের সাথে কথা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বসে উন্নয়নের প্রস্তাব তৈরি করে পাঠাবো। 

আজকালের খবর/এএসএস






সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : হাউস নং ৩৯ (৫ম তলা), রোড নং ১৭/এ, ব্লক: ই, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ফোন: +৮৮-০২-৪৮৮১১৮৩১-৪, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮
ই-মেইল : বার্তা- [email protected] বিজ্ঞাপন- [email protected]
দৈনিক আজকালের খবর লিমিটেডের পক্ষে গোলাম মোস্তফা কর্তৃক বাড়ি নং-৫৯, রোড নং-২৭, ব্লক-কে, বনানী, ঢাকা-১২১৩ থেকে প্রকাশিত ও সোনালী প্রিন্টিং প্রেস, ১৬৭ ইনার সার্কুলার রোড (২/১/এ আরামবাগ), ইডেন কমপ্লেক্স, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.com, www.eajkalerkhobor.com