ই-পেপার ফটোগ্যালারি আর্কাইভ  বৃহস্পতিবার ● ২২ অক্টোবর ২০২০ ● ৭ কার্তিক ১৪২৭
ই-পেপার  বৃহস্পতিবার ● ২২ অক্টোবর ২০২০
শিরোনাম: চালকদের ‘ডোপ’ টেস্ট করাতে বললেন প্রধানমন্ত্রী       লিটারে ২ টাকা কমছে সয়াবিন       নৌ-ধর্মঘট : আজকের মধ্যে সমাধানের আশ্বাস প্রতিমন্ত্রীর       মায়ের লাশ নিজ হাতে ৫ টুকরো করে থানায় ছেলের মামলা       কায়সারের মৃত্যু পরোয়ানা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে       ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের অবস্থা অপরিবর্তিত       কবরস্থান থেকে ফিরে এসে আশা জাগিয়েও ফিরল না শিশুটি      
মুজিববর্ষেই জ্বালানি নিরাপত্তার হাল ধরতে হবে
ড. আহমেদ হুসেন
Published : Saturday, 21 March, 2020 at 8:11 PM, Update: 21.03.2020 9:32:20 PM

স্বাধীন হওয়ার পরই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের আত্মনির্ভরশীল জ্বালানি নিরাপত্তার সিদ্ধান্ত নেন। এখন বাংলাদেশে পালন করা হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী। কিন্তু জাতির জনকের সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দিকে কতটা এগিয়েছে বাংলাদেশ! দেশের জ্বালানিখাত এখন আমদানীনির্ভর। যে কোনো সময় বৈশ্বিক গোলযোগে অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে মধ্যপ্রাচ্য। বাধার মুখে পড়তে পারে জ্বালানি সরবরাহ। এতে স্থবির হয়ে পড়বে বাংলাদেশের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। এসব বিষয় নিয়ে একান্তে কথা হয় বিশে^র শীর্ষস্থানীয় জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের একজন ড. আহমেদ হুসেন এর সঙ্গে। কথা বলেছেন আজকালের খবরের সহসম্পাদক আবুল কালাম আজাদ

ড. আহমেদ হুসেন থাকেন যুক্তরাজ্যে। কাজ করতেন স্পেনের মালিকানায় একটি জ্বালানি প্রতিষ্ঠানে। সম্প্রতি বাংলাদেশে এসেছেন। তিনি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। আহমেদ হুসেন মনে করেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেমনভাবে আত্মনির্ভরশীল জ্বালানি নিরাপত্তার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেভাবে এগুচ্ছে না বাংলাদেশ।

তিনি জানালেন, বঙ্গবন্ধু রয়েল ডাচ্ শেল কোম্পানির সকল সম্পদ ও স্থাপনা রাষ্ট্রীয়করণ করে নগদে তাদের দাবি মিটিয়ে দিয়েছিলেন। গঠন করেছিলেন রাষ্ট্রীয় তেল গ্যাস কর্তৃপক্ষ পেট্রোবাংলা। শেল কোম্পানির বড় অংশীদার ছিল ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম। পাকিস্তান কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধুর মুক্তি, বাংলাদেশকে স্বীকৃতি তথা ব্রিটিশ আমলের যোগসুত্র ও কমনওয়েলথভুক্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ ছিল অভূতপূর্ব এবং বিরাট চ্যালেঞ্জ। শেলের তৎকালীন বাংলাদেশের এমডি নরম্যান হার্টস বিদায়াকালে তাচ্ছিল্যের স্বরে বলেছিলেন আগামী তিন মাসের মধ্যেই আবার আমাদেরকে ডাকতে হবে। বাখরাবাদের মাত্র দুটো কূপ থেকে তখন এই দেশে গ্যাস উত্তোলন হতো।

এরপর বাংলাদেশের দ্রুত রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পথ ধরে দীর্ঘ প্রায় অর্ধ শতাব্দী পর বাংলাদেশ সারম্বরে উদযাপন করতে চলেছে জাতীয়তাবাদী মহান নেতা বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকী।

এদিকে দেশের জ্বালানী নিরাপত্তা বঙ্গবন্ধুর আদর্শচ্যুত হয়ে আত্মনির্ভরশীলতা থেকে আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে। যেকোনো মুহূর্তে বৈশ্বিক গোলযোগে অস্থিতিশীল মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলেই নেমে আসবে বাংলাদেশের উন্নয়নে ঘন-ঘোর অন্ধকার! স্থবির হয়ে পড়বে বাংলাদেশের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। অতুলনীয় সেই বিপর্যয় নিয়ে একান্তে কথা হচ্ছিল বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের অন্যতম প্রবাসী বাঙালি সন্তান ড. আহমেদ হুসেনের সঙ্গে, বনানীর লেকশোর হোটেলে কফি লাউঞ্জে। সম্প্রতি তিনি দেশে এসেছেন তার দীর্ঘ প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে নিজের দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বাস্তবতায় পেশাগত পর্যবেক্ষণে।

বঙ্গবন্ধু যখন শেল কম্পানি জাতীয়করণ করলেন তখন ড. হুসেন একেবারেই তরুণ, বিলেতের ম্যানচেস্টারে লেখাপড়া করছেন। পাস করে ফিরে এলেন দেশে। না চাইতেই পেয়ে গেলেন পেট্রোবাংলায় চাকুরী। তখন এইসব পেশার লোকজনের খুব অভাব। পশ্চিম পাকিস্তানী আর বিদেশীরাই এসব চাকরিতে দক্ষ ছিল। তারা তো চলে গেছে এখন বাঙালিদেরকেই চালাতে হবে এই ক্রিটিকাল ইন্ডাস্ট্রিজ। দুঃসাহস নিয়ে দায়িত্ব নিলেন বাখরাবাদ গ্যাস ফিল্ডের। লেখাপড়া থাকলেও বাস্তব অভিজ্ঞতা বলতে কিছুই নেই। সঙ্গী আরেক অনভিজ্ঞ সহকর্মীকে নিয়ে যৌবনের সেই রাতদিন ঝুঁকিপূর্ণ গ্যাস ফিল্ডের কাজের অভিজ্ঞতার স্মৃতিচারণ করছিলেন মিস্টার হুসেন। গ্যাসফিল্ডের যেকোনো অস্বাভাবিকতা বা ত্রুটির সমাধানে তখন চুক্তি অনুযায়ী নেদারল্যান্ডের হেগ শহর থেকে টেলেক্সের মাধ্যমে নির্দেশনা বা সমাধান আসতো, আর সেই মোতাবেক বাখরাবাদে কাজ করতে হতো। এটা ছিল একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া এবং সময় সাপেক্ষ। অথচ দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে ঢাকায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে, তখন কি ঘটবে তা কেউ জানে না। ফলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উদ্ভাবনী শক্তি খাটিয়ে নিয়মবহির্ভূত অনেক কিছু করতে হতো যা মনে হলে হুসেনের গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়, কিন্তু আনন্দও পান নিজের সাফল্যগাঁথার সেই অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে।

প্রশ্ন : চাকরি ছেড়ে চলে গেলেন কেন?
হুসেন : সেটা নিতান্তই ব্যক্তিগত কারণ। আমার বেতন ছিলো মাত্র ১২শ টাকা সেই টাকা দিয়ে কোন ভাবেই বেঁচে থাকা সম্ভব ছিলোনা। প্রতি মাসেই মায়ের কাছ থেকে সাবসিডি নিতে হতো। এতদিন বিদেশে লেখাপড়ার খরচ চালিয়েছেন এখন চাকরি করি। কিন্তু মায়ের কাছ থেকে টাকা নিতেই হচ্ছে। মা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন আমিও বিরক্ত ও হতাশ হয়ে চলে গেলাম ব্রিটিশ পেট্রোলিয়ামে। নর্থ সীতে তেলগ্যাস অনুসন্ধান যজ্ঞে।

প্রশ্ন : তারপর?
হুসেন : তারপর আর কি, আর ফিরতে পারলাম না জীবনচক্রে। বিদেশের মাটিতেই ছড়িয়ে দিতে হলো মেধা আর অর্জন করতে থাকলাম নানান অভিজ্ঞতা যা অনেকের ভাগ্যেই বিরল। আমি পৃথিবীর প্রায় সবকটি প্রথম শ্রেনীর তেলগ্যাস কোম্পানিতে সফলতার সঙ্গে চাকরি করার সৌভাগ্য পেয়েছি। যেমন ধরুন ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম, কাতার পেট্রোলিয়াম, সৌদির আরামকোসহ প্রায় সবকটিতেই। সর্বশেষ স্পেনের একটি পেট্রোলিয়াম কোম্পানিতে শেষ করলাম জীবনের শেষ চাকরি। যারা এ বিষয়ে অবগত আছে তারা বুঝবেন আমি কি বলছি।

প্রশ্ন : বাংলাদেশ সম্পর্কে কিছু বলুন।
হুসেন : বাংলাদেশ ট্রিমেন্ডাস  সাফল্য অর্জন করেছে বিশেষ করে জ্বালানি খাতে। পেট্রোবাংলা ও এর অধিভুক্ত কোম্পানিগুলোর পেশাজীবীগণ অপূর্ব দক্ষতা দেখিয়েছেন এই দীর্ঘ যাত্রায়। আমি নিজে বুঝি ‘জ্বালানী আমদানির বাস্তবসম্মত দীর্ঘ মেয়াদী তৈরির জন্য আমাদের নিজেদের অবশ্যই উৎস নিয়ে ধারণা থাকতে হবে’ এর বাইরে কথা বলতে চাই না। গত দশ বছর বাংলাদেশের যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটেছে এবং চলমান রয়েছে সে কারণেই জ্বালানি চাহিদা বেড়ে চলেছে অভাবনীয়ভাবে। বর্তমান চাহিদাকে সামাল দিতে দ্রুত অনেক শটকাট পথে হাঁটতে হয়েছে সরকারকে। এরই ফলশ্রুতিতে জ্বালানি খাতে আমদানি নির্ভর হয়ে উঠেছে দেশ এবং ভয়ঙ্কর ঝুঁকিরও বিবেচনা করা হচ্ছে, তাই দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপের দিকেও কাজ করছে সরকার। তবে তেল গ্যাস অনুসন্ধানের জায়গায় অগ্রগতি প্রায় শূন্য। নিজস্ব সম্পদ সম্পর্কে কোন স্বচ্ছ ধারনাই নেই। নেই কোনো আপডেট তথ্য।

প্রশ্ন : এই ভয়ঙ্কর অবস্থার জন্য কাকে দায়ী করবেন?
হুসেন : অনেকগুলো ফ্যাক্টর এখানে কাজ করছে। আমাদের অফশোর বণ্টকের সীমানা নিয়ে মামলা ছিলো ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে, দীর্ঘ সময় নিয়ে সেটা মিটমাট হয়েছে। অনশোরের তেল গ্যাস  অনুসন্ধান ও উৎপাদন সংক্রান্ত বিষয় আশয়ে এতদিন খবরদারি করতো আমাদের উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থাগুলো সেই অবস্থা থেকেও বাংলাদেশ অনেকটা মুক্ত হয়েছে। পিএসসি’র মত বড় টেন্ডার সমাধা করার অভিজ্ঞতাও আমাদের ছিলো না, সেটারও একটা পর্যায়ে এসে গেছি। ফলে বাস্তব অবস্থার কারণে আমরা আমদানি নির্ভর হয়ে পড়েছি।

প্রশ্ন : এর থেকে উত্তরণের পথ কি বা এখন করা উচিৎ বলে আপনি মনে করেন?
হুসেন : নির্দ্বিধায় বলতে পারি, নিজেদের তেল গ্যাস অনুসন্ধানে ক্রাশ প্রোগ্রাম হাতে নিতে হবে। এই খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পিপিপি’কে কাজে লাগাতে হবে। দেশের এবং বিদেশের স্টক মার্কেটকে ব্যবহার করতে হবে। বিশেষ করে ইয়াং এন্টারপ্রেনিওরদের এই খাতে আগ্রহ জাগাতে হবে। সবার আগে আপডেট ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে। তবেই টেকসই আত্মনির্ভরশীল ভিত্তি তৈরি হবে এদেশের, এটুকুই বলতে পারি।

প্রশ্ন : এটা কি সম্ভব?
হুসেন : কেন সম্ভব নয়, বর্তমানে যিনি এই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ বিষয়ে তার উপদেষ্টা একজন মুক্তিযোদ্ধা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী বীরবিক্রম, যিনি একাধারে একজন অভিজ্ঞ জনপ্রশাসক। প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে কয়েক বছর আগে। তিনি তো একজন আদর্শ তরুণ বলা যায়। ফলে এরকম টিম থাকলে দেশবান্ধব সিদ্ধান্ত নিতে কোথাও তো কোনো বাধা নেই। পেট্রোবাংলার বিশাল জনসম্পদকে উন্নত প্রশিক্ষণ দিয়ে এখনই গড়ে তুলতে হবে। যেন তারা ৪র্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারে। আর এইগুলো করতে হবে মুজিববর্ষেই। এবং এটা সম্ভব, পৃথিবীতে এমন অনেক দৃষ্টান্ত আছে। দেশপ্রেমিক সরকারের পক্ষে এটা মোটেও অসম্ভব কিছু নয় যে, মুজিববর্ষে দেশের জ্বালানি খাতকে মুজিবের স্বপ্নে ফিরিয়ে আনা।


সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : হাউস নং ৩৯ (৫ম তলা), রোড নং ১৭/এ, ব্লক: ই, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ফোন: +৮৮-০২-৪৮৮১১৮৩১-৪, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮
ই-মেইল : বার্তা- [email protected] বিজ্ঞাপন- [email protected]
দৈনিক আজকালের খবর লিমিটেডের পক্ষে গোলাম মোস্তফা কর্তৃক বাড়ি নং-৫৯, রোড নং-২৭, ব্লক-কে, বনানী, ঢাকা-১২১৩ থেকে প্রকাশিত ও সোনালী প্রিন্টিং প্রেস, ১৬৭ ইনার সার্কুলার রোড (২/১/এ আরামবাগ), ইডেন কমপ্লেক্স, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.com, www.eajkalerkhobor.com