বৃহস্পতিবার ১৮ জুলাই ২০২৪
বানোয়াট সত্য
গাজী তারেক আজিজ
প্রকাশ: শনিবার, ৬ জুলাই, ২০২৪, ৩:০৪ PM আপডেট: ০৬.০৭.২০২৪ ৩:১২ PM
অফিসের বাহিরে থাকা অবস্থায় শুনতে পাই আসিফ নিহত। বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলাচলে থেকে অনেকটুকু দৌড়ে এসে টিভি অন করে দাঁড়িয়েই চোখ রাখলাম। দাউদাউ করে জ্বলছে আগুন। লেলিহান শিখায় মনে হচ্ছে কোনো সুপ্ত আগ্নেয়গিরি বিস্ফোরিত হয়েছে। প্রকম্পিত হয়েছে ভূমি। সবকিছু জ্বালিয়ে পুড়িয়ে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। মুহূর্তেই অতীতে ফিরে যাই! আবার টিভির পর্দায় চোখ রাখি। বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে আসিফ ভাই আর নেই।

একজন জনপ্রতিনিধি তিনি। নির্বাচিত হয়েছিলেন জনগণের ভোটে। কেবলই নিজেকে ছাপিয়ে যাবার পালা। তারপরও অদৃশ্য কোন বলয়ের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বাঁচতে পারেননি। তাকে বাঁচানো যায়নি। আজ বেঁচে থাকলে নতুন নতুন ইতিহাস রচিত হতো।

ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে নেতার মৃত্যু সংবাদ। খুনিরা লজ্জিত হয় না। বীরদর্পে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে হেঁটে চলে যায়। আর তার আগে আগে বারবার গুলি চালিয়ে, ছুরিকাঘাত করে, আগুন ধরিয়ে দিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে পৈশাচিক উন্মত্ততায়!

বিশ্বের তাবৎ মিডিয়া ফলাও করে প্রচার করে মৃত্যু সংবাদ। বারবার দেখানো হয় ফুটেজ আগুন জ্বলছে। সবাই বলছে কেউ দেখেনি নেতা কীভাবে মারা গেছে। ততক্ষণ এটাই সত্য কিংবা বানোয়াট সত্য বলে প্রচারিত হচ্ছিল। আমরাও বিশ্বাস করতে শুরু করেছি। মিডিয়া বরাবরই বের করার চেষ্টা করলো নেপথ্যের ঘটনা ও কুশীলবদের। কিন্তু অন্ধের দেশে আয়না বেচতে এসে কিইবা ফায়দা হয়। অনুমান করে, বুঝে নিতে চায়, মানুষের মুখ খোলে না। এরা সকলে বোবা হয়ে যায়। কেউ কেউ পাগলের মত প্রলাপ বকে যায়। কোনো সাংবাদিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পায় না।

দুই.
নেতার গাড়ির কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। নেতাও কয়লা হয়ে যায়। ফায়ার সার্ভিসের পানি আগুন নেভায় ঠিকই। ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে পারে না। নেতার গাড়ি ভর্তি অন্য লোকজন বেঁচে গেলেও মুখ খোলে না। ভয়? উদ্বেগ? নাকি অন্য কোনো ইস্যু? মানুষ সন্দেহ করতে শুরু করে। সন্দেহের তীর একদিকেই। লাশ উদ্ধার করে পুলিশ ফরেনসিক ল্যাবে পাঠায় ডিএনএ নমুনা সংগ্রহে। নেতার এলাকায় চলে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ, ভাংচুর। পুলিশ লাঠি চার্জ করে। আন্দোলন দমন করে। লাশ এলে জানাজার জন্য প্রস্তুতি। দলীয় নেতাদের তথাকথিত ‘পুত্রশোক’ প্রদর্শন মানুষের নজর এড়ায় না। নেতারা জানাজায় অপেক্ষমাণ হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে সুষ্ঠু বিচার দাবী করেন।

নেতার লাশ নিয়ে যাওয়া হয় এলাকায়। তার গ্রামের বাড়িতে। গ্রামের লোকজন ব্যারিকেড দেয়। পুলিশ ব্যারিকেড সরিয়ে দেয়। লাশের দাফন সম্পন্ন হয়। যথারীতি কুলখানি অনুষ্ঠান হয়। নেতার মৃত্যুতে দোয়া অনুষ্ঠিত হয়। অভিযোগের তীর যাদের দিকে তারাও কুলখানিতে শামিল হয়। ভোজে অংশ নেয়। ব্যাস এই পর্যন্তই হতে পারতো! কিন্তু মানুষের অভিযোগ আর অনুমান যখন সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করবে বলে প্রতিজ্ঞ হয় তখন বিধিও বুঝি সংখ্যাধিক্যের জনমতে সায় দেয়। আর একে একে মুখোশ উন্মোচন করবে বলে রহস্য ভেদ করে। জটিল থেকে জটিল আবর্তে ঘুরপাক খেতে থাকা দৃশ্যকে আরো সহজ থেকে সহজতর করে দেন। ইতোমধ্যে প্রচার পেতে থাকে একটি অস্পষ্ট ভিডিও ফুটেজ! মুহূর্তেই ভাইরাল সেই ভিডিও। সকল টিভিতে প্রচারিত হয় সেই ফুটেজ। আর রহস্যের জট কাটিয়ে ঘনঘোর অন্ধকার কাটিয়ে আলোর মুখ দেখতে শুরু করে। গতিপথ পালটে তদন্ত মোড় নেয় ভিন্ন পথে।

তিন.
পরিবারের সদস্যের আনীত এজাহার এফআইআর হিসেবে এন্ট্রি হয়। অপর একটি দলের সদস্যকে আসামী করে মামলা। চলতে থাকে তদন্ত। মিডিয়া সোচ্চার থাকায় তদন্ত ও আসামি গ্রেপ্তার প্রক্রিয়া চলে জোরেশোরে। কাউকে কাউকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়। মুখ খুলতে শুরু করে একে একে সবাই। আর কেউ কেউ পালিয়ে বেড়ায়। শেষরক্ষা হয় না। মূল সন্দেহভাজন গ্রেপ্তার এড়িয়ে পালিয়ে বেড়ায়। পুলিশ তাকেও ধৃত করে। অভিযুক্তদের আদালতে সোপর্দ করা হলে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে। এক পর্যায়ে তদন্ত সমাপ্ত হয়। পুলিশ অভিযোগপত্র প্রদান করে৷ একের পর এক নাটকীয় মোড় নেয়া মামলার বিচার শুরু হয়।

জেলখানায় চলে তাদের আধিপত্যের লড়াই। আর বাহিরে বসেও কেউ গোঁফে তা দিতে শুরু করে। একে একে সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করা হয়। আসামীরা আইনজীবীর মাধ্যমে আত্মপক্ষ সমর্থন করে চলে। চলতে থাকে স্বাক্ষীর জবানবন্দি এবং জেরা। প্রতিদিন আদালতে উৎসুক জনতার ভিড়। আসামি সংশ্লিষ্ট আত্মীয় পরিজনের ভিড়। সবার তৃষ্ণার্ত চোখ মুখ শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। কেউই জানে না মামলার ফলাফল কী হতে চলেছে। প্রতিদিনই সাংবাদিক উপস্থিত থেকে অধিবেশন প্রত্যক্ষ করে। নিউজ কাভার করে। চুলচেরা বিশ্লেষণ করে খবর ছাপা হতে থাকে।

চার.
এরই মধ্যে নেতার উপজেলায় পদ শূন্য ঘোষণা করে উপনির্বাচনের প্রস্তুতি নেয় কমিশন। সবার আগ্রহ এই নির্বাচনকে ঘিরে। দলীয়ভাবে সভা আহ্বান করা হয়। প্রার্থীতা চাওয়া হয়। আগ্রহীরা উপজেলা কমিটির ভোটাভুটিতে অংশগ্রহণ করে। উত্তেজনার পারদ বাড়তে থাকে ক্রমশ। ইতোমধ্যে নেতার স্ত্রী সভা চলাকালীন দলীয় শীর্ষপর্যায়ে ফোন করে কোনো সাড়া পায় না। পদধারী একজনকে ফোন করে নির্বাচনে লড়ার আগ্রহ প্রকাশ করলে মাসিপিসির সেই ঘুম পাড়ানিয়া গান শুনিয়ে ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হয়। ফলাফল ঘোষণা নিয়ে চলে টালবাহানা। কেহ কাহারে নাহি ছাড়ে সমানে সমান! উপস্থিত সংখ্যাধিক্যের চাপে ফলাফল ঘোষণা করা হলে চক্রটি হতাশ হয়। চরম হতাশা নিয়ে যে যারযার মতো চলে যায়।

এরই মধ্যে দিয়ে চলে নিম্ন-মধ্যম সারির এক নেতার উত্থান পর্বের। নেতার মৃত্যুতে যেন তার ভাগ্য সুপ্রসন্ন হতে থাকে। কিন্তু কণ্টকাকীর্ণ এই রাজনীতির জটিল পাঠ চুকিয়ে যিনি পরবাসী তারই হাতে গড়া সেই নিম্ন-মধ্যম সারির নেতার এই ভোল পাল্টানো চেহারা দেখে মানুষ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়। সেই নেতা যেন নিজেকে ছাপিয়ে একচ্ছত্র রাজাধিরাজ ঘোষণা করে বসে মনে মনে।
এ কেমন নিয়তি যাকে নেতা বানাতে যেয়ে একটি প্রাণ বিসর্জন। তার জন্য কোন বিয়োগ ব্যাথা পরিলক্ষিত হতে দেখা যায় না। বাহ! এরই নাম রাজনীতি বলে কথা!

অথচ যার এত খায়েশ ছিল তার কি আখ্যান? সে জামিনে মুক্তি পেয়ে যেন খাঁচা ছাড়া বাঘে রূপ নেয়। একজন অন্যজনকে ঠেকাতে মরিয়া হয়। এবারো ভাগ্য জেলখাটা নেতার বিপক্ষে যায়। ধীরে ধীরে শান্ত মস্তিষ্কে খেলতে থাকে দাবার গুটি নিয়ে চাল দেয়। আর একে একে জিততে থাকে। এ যেন ‘এলাম দেখলাম জায় করলাম’। আতঙ্ক আর শঙ্কা ছাড়িয়ে নেতার প্রতিপক্ষের সাথে মিশে যাওয়া নিম্ন-মধ্যম সারির নেতার নিয়ন্ত্রণে চলে আসতে থাকে সমগ্র উপজেলার রাজনীতি। এ যেন জটিল গণিতের সহজ পাঠ। আর সেই গণিত বিষয়ের অধ্যাপক হয়ে রয়েছেন। নেতার অবর্তমানে আরেক নেতার উত্থান কেউ কেউ মেনে নিতে পারে না। জ্বলে পুড়ে যায় মনোজগতে।

পাঁচ.
আজ নেতার মামলার রায়ের ঘোষিত তারিখ। এজলাসে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। আসামী সকলকে আনা হয়েছে কাঠগড়ায়। কেউ জামিন নিয়ে পালিয়েছে। সকাল থেকে মিডিয়াকর্মী, বিভিন্ন সংস্থা আর নিয়োজিত আইনজীবীদের উপস্থিতি। সবার মধ্যে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা। কী হয় কী হয়! বিচারক এসে এজলাসে বসলেন। রায় ও আদেশের সংক্ষিপ্ত পাঠ করে শোনালেন। সর্বোচ্চ সংখ্যক আসামির ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়। এজাহার নামিয়ে আসামি ও বেশকিছু আসামি বেকসুর খালাস পায়। জনমনে স্বস্তি নেমে আসে। এ যেন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।

সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের কারাগারে পাঠানো হয়। বাদ বাকিদের মুক্তি দেওয়া হয়। সেদিন অন্য এক উপজেলা চেয়ারম্যান নেতার পরিবারের সদস্যদের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। ছবিতে দেখলাম কোমলমতি সন্তানদের। নিজেও পিতা তাই নিজেকে পিতৃহীন অবস্থায় কল্পনা করলাম। নিজের অজান্তেই চোখ বেয়ে অবরিত অশ্রু ঝরছিল। এক সময় নেতার সান্নিধ্যে থেকে রাজনীতি করেছি। জটিল পাঠ তাই কখনো নিজেকে গুটিয়ে রেখে কখনো সরব থেকে নেতার নেতৃত্বেই রাজনীতির পাঠ শুরু করেছিলাম।

একটি কথায় আছে ‘তোমাকে রোধিবে যে গোকুলে বাড়িছে সে’। এখন দেখা যাক রাজনীতি কাকে কোথায় নিয়ে যায়। রাজনীতি যেন আগ্নেয়গিরি। আমরা তার গর্ভে বিচরণ করি। আর প্রচারিত সকল বানোয়াট সত্যগুলো মুছে যাক। অবমুক্ত হোক নতুন দিগন্ত। প্রকৃত সত্য মানুষ জানে। আরো বেশি জানে মহাবিশ্বের মালিক। তার কাছে হাজির হওয়ার আগে আগে আরো কিছু সত্য উদ্ভাসিত হোক। মানুষ বুঝতে শিখুক নিয়তির বিচার বলেও পৃথিবীতে আরেক বিচার আছে। পরকালের কথা বলে এই কালে যারা পার পেতে চায় তারা মানুষের সাদা চোখে ধুলো দিতে চায়! পারে?

আজকালের খবর/আরইউ








সর্বশেষ সংবাদ
কাল সারাদেশে বিক্ষোভের ডাক ইসলামী আন্দোলনের
কোটা আন্দোলন ঘিরে নিহত ৬, বিচার বিভাগীয় তদন্ত চায় জাপা
রাতে হঠাৎ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষামন্ত্রী
পুলিশ-আন্দোলনকারী সংঘর্ষে কাজলা-শনিরআখড়া রণক্ষেত্র
এন্ডোসকপি শেষে কেবিনে খালেদা জিয়া
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
দেশের স্কুল-কলেজ-পলিটেকনিক বন্ধ ঘোষণা
কোটা নিয়ে আলোচনার সুযোগ শেষ হয়ে যায়নি
কোটা আন্দোলন: সারাদেশে সংঘর্ষে প্রাণ গেল ৫ জনের
কোটা ব্যবস্থা থাকা না থাকা
কোটা আন্দোলন নিয়ে যা বলছে জাতিসংঘ
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : হাউস নং ৩৯ (৫ম তলা), রোড নং ১৭/এ, ব্লক: ই, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ফোন: +৮৮-০২-৪৮৮১১৮৩১-৪, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor@gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor@gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft