রবিবার ২১ জুলাই ২০২৪
সিঙ্গাপুর পারলে বাংলাদেশও পারবে
এস এম মুকুল
প্রকাশ: শনিবার, ১ জুন, ২০২৪, ৩:০৮ PM
সিঙ্গাপুরে কোনো করপোরেট ক্রাইম নেই, কোনো গ্যাংস্টার  নেই, চাঁদাবাজ নেই, মাফিয়া চক্র নেই, মাদক সম্রাট নেই। উপরন্তু মানুষ এবং সম্পদ রাষ্ট্র কর্তৃক সম্পূর্ণরূপে সুরক্ষিত। পুলিশ, প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থা শতভাগ নিষ্কলুষ এবং গণমুখী। 

১৯৬৫ সালে প্রতিবেশি মালয়েশিয়া থেকে আলাদা হওয়ার পর থেকেই মূলত এ দ্বীপ রাষ্ট্রটিকে একটু একটু করে নিজ হাতে প্রতিষ্ঠা করেন লি কুয়ান। ৯ আগস্ট ১৯৬৫, লি কুয়ান ইউ জনগণের পক্ষ থেকে রিপাবলিক অব সিঙ্গাপুরের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। স্বাধীনতা ঘোষণার সময়েই ঘোষণা করা হয় সিঙ্গাপুর রাষ্ট্রের মূল নীতি হবে- স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার, জনকল্যাণ, সমৃদ্ধি ও সাম্য। রাজনৈতিক নেতৃত্বের দূরদর্শী পরিকল্পনা এবং জনপ্রশাসনের সংস্কারসহ নানামুখী ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করার ফলে অবস্থার আমূল পবির্তন সাধিত হয়েছে। ১৯৭৮ সালের পর থেকে এ দেশে আর কোনো ধর্মঘট হয়নি। মাত্র পঞ্চাশ বছর আগেও সিঙ্গাপুর ছিল একটি হতদরিদ্র দেশ। তখন সিঙ্গাপুরকে কলোনি অব কুলিজ বলে উপহাসও করা হতো। কাল-পরিক্রমায় সেই দেশটি মাথাপিছু আয় এখন প্রায় ত্রিশ হাজার মার্কিন ডলার। অথচ দেশটির মোট আয়তন মাত্র ৬১৬ বর্গ কিলোমিটার। সিঙ্গাপুরের চারপাশের সাগর মহাসাগরের জোয়ারের সময়ে আয়তন আরো কয়েক বর্গ কিলোমিটার কমে যায়। সিঙ্গাপুরে রয়েছে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠী ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বসবাস। গত চল্লিশ বছরে সিঙ্গাপুরে জাতিগত বা ধর্মীয় কোনো দাঙ্গা হয়নি। সামান্যতম উস্কানিও এখানে কঠোরভাবে দমন করা হতো। পুরো নগররাষ্ট্রটি কঠোর নিয়ম-নীতির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত। আইনের প্রশ্নে এখানে কারো জন্য কোনো ছাড় নেই। সবার জন্য আইন সমভাবে প্রযোজ্য। এ একবিংশ শতাব্দীতেও এ রাষ্ট্রে বেত্রাঘাতসহ মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠিন শাস্তি বহাল আছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এ কথা সর্বজনবিদিত যে, সিঙ্গাপুরে কোনো করপোরেট ক্রাইম নেই, কোনো গ্যাংস্টার  নেই, চাঁদাবাজ নেই, মাফিয়া চক্র নেই, মাদক সম্রাট নেই। উপরন্তু মানুষ এবং সম্পদ রাষ্ট্র কর্তৃক সম্পূর্ণরূপে সুরক্ষিত। পুলিশ, প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থা শতভাগ নিষ্কলুষ এবং গণমুখী।

সিঙ্গাপুর স্বাধীন সার্বভৌম একটি দেশ হতে চায়নি। আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের জন্য শুধু একটি গুদামঘর হিসেবে পরিচিত ছোট্ট একটি সীমানা সিঙ্গাপুর। স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে টিকবে কি? টিকলে কতোদিন টিকবে? এমন ভয়ভীতি এবং সন্দেহে তাড়িত হয়ে উনিশশ তেষট্টি সালে সিঙ্গাপুর যোগ দেয় মালয় নামক দেশটির সাথে। মালয় এবং সিঙ্গাপুর মিলে দেশটির নতুন নাম হয় মালয়েশিয়া। হিন্টারল্যান্ড মালয় ছাড়া সিঙ্গাপুর টিকতে পারে না। এমন একটি ধারণা ছিল সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ-এর। তিনি নিজের লেখা একটি বইতে বলেছেন, মালয়েশিয়া যখন সিঙ্গাপুরকে পৃথক করে দিলো, তখন মনে হলোÑ ‘ইট বিকাম এ হার্ট উইদাউট বডি’। স্বাধীনতার সময় এখানকার মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ৫১১ মার্কিন ডলার। জীবনযাত্রার গুণগত মান বিবেচনায় এ দেশের অবস্থান এখন এশিয়ায় প্রথম এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ১১তম। আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে বিশ্বে এ দেশের অবস্থান যথাক্রমে ১৫ এবং ১৪তম স্থানে। পরিকল্পিত উন্নয়নের জোয়ারে জীবনযাপনে এসেছে অভাবিত পরিবর্তন, সে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে মনোজগত। দেশটিতে শিক্ষিতের হার ৯৬ শতাংশ, মানুষের গড় আয়ু ৮০ দশমিক ছয় বছর, আবাসন সুবিধাপ্রাপ্ত নাগরিক ৯০ দশমিক এক শতাংশ এবং প্রতি ১০০০ জনে ১০৭ জন ব্যক্তিগত গাড়ির মালিক। আদিতে মাছ ধরা ছিল একমাত্র পেশা। অভিবাসীদের কাজ সীমাবদ্ধ ছিল শ্রমঘন  সেক্টরে।

উনিশশ পঁয়ষট্টি সালের ৯ আগস্ট লি কুয়ান সিঙ্গাপুরের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। সেই অনিশ্চিত সিঙ্গাপুর। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে শঙ্কিত সিঙ্গাপুর। দরিদ্র অবস্থান থেকে কতো যে ওপরে উঠে এসেছে তা রীতিমতো অভাবনীয়। বিস্ময়কর তো বটেই। দুনিয়াতে সিটি স্টেট বলতে এখন সিঙ্গাপুরকেই বোঝায়। সিঙ্গাপুরের এমন ঈর্ষণীয় সাফল্যের মূলে রয়েছে ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে দুনিয়াজুড়ে ব্যাপক পরিচিতি। প্রতিবছর এখানে কয়েকশ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আমদানি-রফতানি বাণিজ্য হয়। প্রতি ডলার ষাট টাকা হিসেবে ধরলেও এক বিলিয়ন ডলারের সমমূল্য দাঁড়ায় ছয় হাজার কোটি টাকা। একশ বিলিয়ন ডলারে তার হিসাব ছয় লাখ কোটি টাকা। স্বল্প আয়তনের এ দেশটির জনসংখ্যা মাত্র ত্রিশ লাখ। সিঙ্গাপুরের অর্থনৈতিক শক্তি সারা দুনিয়াতে উল্লেখযোগ্য বলে ছোট এ দেশটিকেই সমীহ করে বড় চতুর দেশগুলো। এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে আরো একটি কারণ আছে। সিঙ্গাপুরের জনগণ কথার চেয়ে কাজে বেশি বিশ্বাসী।

জাতিগতভাবে চীনা সম্প্রদায়ের মানুষ এ দেশটিতে বেশি। আর চীনারা প্রকৃতিগতভাবে কাজকে ধর্মকর্ম হিসেবে গ্রহণ করে। তাই এখনো বিশ্বে তাদের যে কয়টি মিশন আছে সেখানে শুধু দক্ষতার মাপকাঠিতেই তাদের পোস্টিং দেওয়া হয়।

সিঙ্গাপুর ব্যবসা-বাণিজ্য নির্ভর দেশ হলেও তারা আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থার (আইএলও) সদস্য নয়। কারণ তারা মালিক-শ্রমিক বিরোধ বাধতে দেয় না। বিরোধ দেখা দিলে প্রাথমিক পর্যায়েই তার নিষ্পত্তি করে নেয়। সিঙ্গাপুরে আয়তনের তুলনায় লোকসংখ্যা বেশি। শিল্প-কারখানার সংখ্যাও এখানে খুব বেশি নেই। বলা যায় সিঙ্গাপুর বেঁচে আছে মূলত বন্দরকে কেন্দ্র করে। বন্দরের সার্ভিস প্রদানই তাদের অবলম্বনের বড় অংশ।

সিঙ্গাপুর বন্দর দিয়ে যতো জাহাজ আসা-যাওয়া করে তাদের সব রকম সার্ভিস প্রদান করে সিঙ্গাপুর। ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোর মতো সিঙ্গাপুরে অতো মানবাধিকার, গণতন্ত্রের চর্চা নেই। সেখানে গণতন্ত্রের নামে বিশৃঙ্খলা কঠোর হস্তে দমন করা হয়। সিঙ্গাপুরে রাজনৈতিক দল থাকলেও ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা যায় না। সে দেশের প্রতিষ্ঠাতা প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ পরবর্তী প্রজন্মকে নেতৃত্বে এগিয়ে আসার সুযোগ দেওয়ার জন্য স্বেচ্ছায় প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দেন। তারপর গো চক তং প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। এরই ধারাবাহিকতায় ১০ আগস্ট, ২০০৪ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন লি হিয়েন লুং।

বাংলাদেশ একটি জনবহুল ছোট্ট দেশ। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এই দেশটি। প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারিনি আমরা। এর প্রধান কারণ জাতীয় ঐক্যমত্যের অভাব। রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বৈরীতায় অনেক সুযোগ কাজে লাগানো সম্ভব হয় না। পারস্পরিক বিরুদ্ধাচারণ আমাদের জাতীয় রাজনীতির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। একারণে ভালো উদ্যোগ বা প্রচেষ্টাও কখনো সফল হয় না। তিন দিকে বেষ্টিত ভারতের প্রতিবেশি দেশ বাংলাদেশ। অথবা বাংলাদেশের প্রতিবেশি দেশ ভারত। যতকিছুই হোক না কেন প্রতিবেশির সঙ্গে সুসম্পর্ক ও সমঝোতা ছাড়া জাতীয় উন্নতি ও নিরাপত্তা সম্ভব নয়। এই নির্মোহ বাস্তবতা বুঝেও এর বিরুদ্ধাচারণ প্রকারান্তে আমাদের জাতীয় ক্ষতির কারণ। ভারত নিয়ে ‘জুজুর ভয়’ এখন রাজনীতির খেলায় পরিণত হয়েছে। তবে যে কথাটি স্পষ্টভাবে বুঝা যাচ্ছে ‘ভারত জুজুর ভয়’ রাজনৈতিক খেলাটা জনগণের মাঝে তেমন প্রভাব ফেলে না। অতএব রাজনীতিকে রাজনীতির জায়গায় রেখে দেশের কথা ভাবতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকে।

আমাদের রয়েছে চারটি প্রধান নদী বন্দর। আছে ১৩টি স্থল বন্দর। আমাদের আছে তিনটি আন্তর্জাতিক মানের সমুদ্র বন্দর- চট্টগ্রাম, মংলা বন্দর ও পায়রা বন্দর। এক তথ্যে জানা যায়, দেশের আমদানি রফতানির ৮০ ভাগ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে হয়ে থাকে। এই ক্ষেত্রটিকে যথাযথ ব্যবহার করে এর সম্ভাবনাকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। ভারত এবং নেপাল-ভুটান যদি আমাদের বন্দর ব্যবহার করে তাহলে শুধু আমরাই লাভবান হবো না, তারাও হবে। উভয় পক্ষের লাভ না থাকলে কি কোনো বিষয়ে সমঝোতা হয়! বাংলাদেশ পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) উদ্যোগে ‘আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির গতি ত্বরান্বিতকরণ ও দারিদ্র্যবিমোচন’ শীর্ষক এক কর্মশালায় বক্তারা বলেছেন, ভারতকে মংলা ও চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করতে দিলে বাংলাদেশ বছরে কমপক্ষে সাত হাজার কোটি টাকা আয় করবে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বছরে দুই শতাংশ করে বাড়বে। অনেকের মতে যদি বিনিয়োগ ৩২ শতাংশে উন্নীত করা যায় তবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি আট শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব। এজন্য পাশর্¡বর্তী দেশসমূহের সঙ্গে জ্বালানি, বন্দর, যোগাযোগ ও বাণিজ্য ক্ষেত্রে বাধা দূর করতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সমৃৃদ্ধির জন্য ভারতসহ পাশর্¡বর্তী দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতার কোনো বিকল্প নেই। 

বাংলাদেশ অবস্থানগতভাবেই ‘ট্রানজিট কান্ট্রি’। যে দেশ ট্রানজিট দেয় তারাই বেশি উপকৃত হয়। সুইজারল্যান্ড শত বছর ধরে ট্রানজিট দিয়ে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে। শুধু ভারতের সঙ্গে নয়, দক্ষিণ এশিয়ার পুরো অঞ্চলের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে। পারস্পরিক ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণকে সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে হবে। এই ক্ষেত্রটিকে যথাযথ ব্যবহার করে এর সম্ভাবনাকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। সিঙ্গাপুর যা পেরেছে বাংলাদেশ চাইলে তারচেয়েও বেশি কিছু অর্জন করতে পারবে।

লেখক : উন্নয়ন গবেষক ও বিশ্লেষক।

আজকালের খবর/আরইউ








সর্বশেষ সংবাদ
আগুনের পর বিটিভির সম্প্রচার বন্ধ
সিলেটে বিএনপি নেতা কয়েস লোদী গ্রেপ্তার
সিরাজগঞ্জে পুলিশ-বিএনপি সংঘর্ষে আহত ৪০
‘শিক্ষার্থীদের ঘাড়ে বিএনপি-জামায়াত, নাশকতার নির্দেশ তারেকের’
আন্দোলন স্বাধীনতা বিরোধীদের হাতে চলে গেছে: মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রী
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
ফের দি‌ল্লি যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
ঈদের পর নতুন সূচিতে চলবে মেট্রোরেল
ফেনীতে অস্ত্র ঠেকিয়ে ব্যবসায়ীর দুটি গরু লুট
বিশ্বনাথে বাস-লেগুনার মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২
শাকিব খান নয়, চ্যালেঞ্জটা নিজের সঙ্গে: মুন্না খান
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : হাউস নং ৩৯ (৫ম তলা), রোড নং ১৭/এ, ব্লক: ই, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ফোন: +৮৮-০২-৪৮৮১১৮৩১-৪, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor@gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor@gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft