ই-পেপার ফটোগ্যালারি আর্কাইভ  শনিবার ● ১৩ আগস্ট ২০২২ ● ২৯ শ্রাবণ ১৪২৯
ই-পেপার  শনিবার ● ১৩ আগস্ট ২০২২
শিরোনাম: করোনার ভ্যাকসিন কার্যক্রমে সরকারের ব্যয় ৪০ হাজার কোটি টাকা       সালমান রুশদির ওপর হামলা       ইউক্রেনে পৌঁছেছে যুক্তরাজ্যের সেই অস্ত্রের নতুন চালান       এবার চিনির দাম বাড়ানোর প্রস্তাব        তথ্যগত গরমিলে ডিএনসিসির ১০ গাড়িচালকের নিয়োগ বাতিল       ডিমের দামে রেকর্ড, ব্রয়লার মুরগির ডাবল সেঞ্চুরি        সিরিজ হারের লজ্জা নিয়ে দেশে ফিরলো তামিম বাহিনী      
বাংলা ছোটগল্পে অধ্যাপক শাহেদ আলীর অবদান
আজহার মাহমুদ
Published : Saturday, 30 July, 2022 at 3:31 PM

অনন্য প্রতিভাধর কথাশিল্পী মননশিল্পী অধ্যাপক শাহেদ আলী। বাংলাদেশের পটভূমিকায় গল্প সৃষ্টিতে তিনি অসাধারণ পাণ্ডিত্যের পরিচয় দেন। তার গল্পের মূল উপজীব্য বিষয় মানবতা, মনুষ্যত্ববোধ, নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ। গ্রামীণ চালচিত্র, গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষ এবং আম জনতার জীবনচিত্রের সার্থক রূপায়ণে হৃদ্ধ শাহেদ আলীর সাহিত্যকর্ম। বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় অনেক কালজয়ী রচনা আমাদের উপহার দিয়েছেন। কিন্তু সেগুলো সবই একপেশে! শুধু তাদের সম্প্রদায়ের জীবনালেখ্য নিয়েই তাদের গল্প উপন্যাস। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর জীবনাচার সেখানে অনুপস্থিত। ইচ্ছা করেই তারা এড়িয়ে গেছেন এদেশের মূলধারার জনকওমকে। এই একরোখা সাহিত্যকে ডিঙিয়ে শাহেদ আলী মৌলিক মানবীয় ধারাকে সমৃদ্ধ করেন ছোটগল্পের মাধ্যমে। তার গল্পে কোনো দ্বন্দ্ব, সংঘাত, হিংসা, বিদ্বেষ, অত্যাচার, নিপীড়ন, অরাজকতা, পৈশাচিকতা নেই। নেই ভিলেনের রাজত্ব কিংবা সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্য। শুধুই মানবিক গুণাবলিতে সজীব হয়ে ফুটেছে তার গল্পসমগ্র।

শাহেদ আলীর জন্ম ২৬ মে ১৯২৫ সুনামগঞ্জে। ১৯৪৩ সালে সুনামগঞ্জের সরকারি জুবিলী হাইস্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। ১৯৪৫ সালে সিলেট এমসি কলেজ থেকে ১৯৪৫ সালে আইএ এবং ১৯৪৭ সালে ডিস্টিংশনসহ বিএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে এমএ পাস করেন।

১৯৪৪ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত তিনি মাসিক প্রভাতী পত্রিকা সম্পাদনা করেন। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত  ভাষা আন্দোলনের মুখপত্র সৈনিক-এর সম্পাদক ছিলেন। ১৯৫১ সালে বগুড়া আজিজুল হক কলেজে শিক্ষকতার মাধ্যমে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন। পর্যায়ক্রমে রংপুর কারামাইকেল কলেজ, চট্টগ্রাম সিটি কলেজ ও প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম প্রতিষ্ঠিত মিরপুর বাংলা কলেজে দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেন। ১৯৫৪ সালে খেলাফতে রববানী পার্টির ব্যানারে পূর্ব পাকিস্তান আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৮ পর্যন্ত তিনি আইনসভার সদস্য ছিলেন। ১৯৫৫ সালে দৈনিক বুনিয়াদ-এর সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬০ সালে ইসলামিক একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি এর সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬২ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত এ প্রতিষ্ঠানের অনুবাদ ও সংকলন বিভাগের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করে অবসর গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে ইসলামিক ফাউন্ডেশন পত্রিকা ও মাসিক সবুজ পাতা সম্পাদনায় যুক্ত ছিলেন। ১৯৮০ সালে তিনি মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত সাহিত্য উৎসবে বাংলাদেশ সরকার প্রেরিত একমাত্র সাহিত্যিক হিসেবে মালয়েশিয়া সফর করেন। এই বরেণ্য চিন্তাবিদ ও সাহিত্যিক ২০০১ সালের ৬ নভেম্বর ইন্তেকাল করেন।

শাহেদ আলীর প্রথম লেখা ‘অশ্রু’ (ছোটগল্প) ছাপা হয় ১৯৪০ সালে ‘সওগাত’ পত্রিকায়। তখন তিনি অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। আধুনিক সমাজ-পরিবেশ ও যুগ-জিজ্ঞাসার প্রেক্ষিতে লেখা তার এ গল্পটি তখন যথেষ্ট প্রশংসা অর্জন করে। এতে তার প্রতিভা ও সম্ভাবনার পরিচয় পাওয়া যায়। তার সুবিখ্যাত গল্প ‘জিবরাইলের ডানা’ শাহেদ আলীকে খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে যায় এবং ছোটগল্প লেখক হিসেবে তিনি বাংলা সাহিত্যে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করেন। ক্লাসিক মর্যাদাসম্পন্ন এ গল্পটি ১৯৫০ সালে আইএ ও বিএ ক্লাসে পাঠ্য ছিল। ১৯৮৫ সালে এটি এসএসসি ক্লাসের পাঠ্য তালিকাভুক্ত হয়। ‘জিবরাইলের ডানা’ প্রকাশের পরই দেশে-বিদেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। Afro-Asian Book Club সংকলিত Under the Green Canopy গ্রন্থে ‘জিবরাইলের ডানা’র ইংরেজি অনুবাদ এবং মস্কো থেকে প্রকাশিত ‘জানোতোয়ে ওবোলো’ (সোনালি মেঘ) নামক সংকলনে রুশ ভাষায় অনূদিত হয়ে ছাপা হয়। এ ছাড়া গল্পটি বিদেশি আরো কয়েকটি ভাষায় অনূদিত হয়। এরদ্বারা এর সার্থকতা ও জনপ্রিয়তা আন্দাজ করা চলে। গল্পটির সাধারণ বৈশিষ্ট্যের জন্য ভারতের বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়, মৃনাল সেন, ঋত্বিক ঘটক, জ্যোতির্ময় রায়, নৃপেন গঙ্গোপাধ্যায়সহ অনেক চলচ্চিত্র নির্মাতা এর চলচ্চিত্র রূপ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন।

দুর্ভাগ্যবশত উপরোক্ত তিনটি উদ্যোগই অজ্ঞাত কারণে শেষ পর্যন্ত সফলকাম হয়নি। এভাবে ঋত্বিক ঘটক, মৃনাল সেন প্রমুখও ‘জিবরাইলের ডানা’র চলচ্চিত্র রূপদানে আগ্রহ প্রকাশ করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই একই অজ্ঞাত কারণে তাদের উদ্যোগও ফলবতী হয়নি। তবে এর দ্বারা ‘জিবরাইলের ডানা’র অসাধারণ বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আমরা অবগত হতে পারি। মোটকথা, দেশে-বিদেশে উচ্চ প্রশংসিত ‘জিবরাইলের ডানা’ শাহেদ আলীর রচিত সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য ছোটগল্প। এটাকে তার মাস্টার পিস বললেও ভুল হয় না। সমগ্র বাংলা ছোটগল্প সাহিত্যেও এটা একটি অনবদ্য রচনা হিসেবে স্বীকৃত।

মাত্র ছয়টি গল্পগ্রন্থের লেখক শাহেদ আলী। কিন্তু তার গল্পের শিল্পমান প্রশ্নাতীত। নান্দনিকতা বিতর্কের ঊর্ধ্বে। লেখক অকপটে স্বীকার করেছেন আমরা আজও এই গুণী শিল্পীকে আন্তর্জাতিকভাবে উপস্থাপন করতে পারিনি। কেউ না কেউ এগিয়ে আসবেন আজকের বাংলার কৃতী তারুণ্যের কাছে এই প্রত্যাশা থাকলো। মুকুল চৌধুরী শাহেদ আলীর সুস্পষ্ট অবস্থান নির্ণয় করতে গিয়ে ‘শাহেদ আলীর শ্রেষ্ঠ গল্প’র ভূমিকা তুলে ধরেছেন। ‘শাহেদ আলীর শ্রেষ্ঠ গল্প’ গ্রন্থে তাকে চিহ্নিত করা হয়েছে এভাবে- শাহেদ আলী কেবল বাংলাদেশেই নয়, উভয় বাংলাতেই একজন প্রথম শ্রেণির কথাশিল্পী হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত। যেকোনো কারণেই হোক বাংলা ছোটগল্পে তার স্থান এখনো সার্বিকভাবে নির্ণিত হয়নি। সেটা হলে আমরা হয়তো এমন একজন কথাশিল্পীর সাক্ষাৎ পেতাম, যিনি এই ক্ষুদ্র বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করেও হতে পারতেন সার্বজনীন, বিশাল জনগোষ্ঠীর।

শাহেদ আলীর জাতীয় স্বীকৃতির অংশ হিসেবে লেখক বুদ্ধিমত্তার সাথে দেশের বহু প্রথিতযশা লেখকের উদ্বৃতি উপস্থাপন করে গ্রন্থটির পরিপূর্ণতা ও শ্রীবৃদ্ধি করেছেন। যেমন, ড. কাজী দীন মুহম্মদ বলেছেন, মানবতা শাহেদ আলীর গল্পের মূল সুর। অসহায় ও অবলম্বনহীন মানুষের বেদনার কথা অতি সরল ও মর্মস্পর্শী ভাষায় তার গল্পে অভিব্যক্ত হয়েছে।

বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও সাহিত্য-সমালোচক অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমান বলেছেনÑ সমাজ সচেতনতা ছাড়া কেউ সত্যিকারের জীবনধর্মী সাহিত্য সৃষ্টি করতে পারেন না। শাহেদ আলী যথার্থ জীবনধর্মী লেখক, তার লেখায় জীবন ও সমাজের বাস্তব চিত্র রূপ লাভ করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তার ধর্ম-বিশ্বাস ও ঐতিহ্যানুরাগ।

শাহেদ আলীর জিবরাইলের ডানা গল্পটি ফ্রাঞ্জ কাফকার মেটামরফসিস গল্পকে হার মানানোর কথা। ভারতীয় ঔপন্যাসিক সমরেশ মজুমদার বলেন, সন্তোষ ঘোষ কথা বললেই তিনি গল্পের প্লট পেয়ে যান। আমাদের এখানে বলা হয় শাহেদ আলীর গল্পপাঠের মধ্যে দেওয়ান আজরফের দর্শন রয়েছে। কবির চৌধুরীর অনুবাদে মেটামরফসিস রূপান্তর নামে আমাদের হাতে আসে। শুধু রূপান্তর নয় আসে কাফকার বিশ্বসাহিত্যে সাড়া জাগানো চৌদ্দটি গল্পের অনুবাদ, ওঠে আসেন এডগার এলান পো।

অধ্যাপক শাহেদ আলীর রচিত ও প্রকাশিত গ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছে একমাত্র পথ (১৯৪৬), তরুণ মুসলিমের ভূমিকা (১৯৪৬), ফিলিস্তিনে রুশ ভূমিকা (১৯৪৮), সাম্রাজ্যবাদ ও রাশিয়া (১৯৫০), তরুণের সমস্যা (১৯৬০), বাংলা সাহিত্যে চট্টগ্রামের অবদান (১৯৬৫), তওহীদ (১৯৬৫), বুদ্ধির ফসল আত্মার আশিষ (১৯৭০), ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতা (১৯৭০), Economics Order of Islam (১৯৭৮), জীবন নিরবচ্ছিন্ন (১৯৮০), রুহীর প্রথম পাঠ (১৯৮০), ছোটদের ইমাম আবু হানিফা (১৯৮০), Islam in Bangladesh  (১৯৮১), সোনারগাঁয়ের সোনার মানুষ (১৯৯২) ইত্যাদি। অনুবাদকর্মের মধ্যে রয়েছে মুহাম্মদ আসাদ রচিত ইসলামী রাষ্ট্র ও সরকারি পরিচালনার মূলনীতি (১৯৬৬) ও মক্কার পথ (১৯৯৩), কে বি এইচ কোনা রচিত আধুনিক বিজ্ঞান ও আধুনিক মানুষ, হিরোডাটাস রচিত ইতিবৃত্ত (১৯৯৪) ইত্যাদি। তার একমাত্র উপন্যাস হৃদয় নদী ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত হয়। অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে নাটিকা ‘বিচার’, ধর্ম সমাজ সংস্কৃতিবিষয়ক গ্রন্থ জীবন দৃষ্টি সাম্প্রদায়িকতা, ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থ বিপর্যয়ের হেতু প্রভৃতি।

অধ্যাপক শাহেদ আলীর এই অসামান্য অবদান বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ করেছে অনেকখানি। বাংলা সাহিত্যের এই নয়নমনিকে আমরা অনেকেই আজও চিনি না, জানি না। নাম এবং পরিচয় জানা শুধু মূল বিষয় নয়। আসলে এই মানুষটি কী করেছেন, তার কর্মজীবন এবং তার গ্রন্থগুলো কী কী এসব না দেখলে বুঝা যাবে না উনি আসলে কী ছিলেন। তার অসামন্য এ অবদান বাংলার মানুষ কখনো ভুলবে না। বাংলা ছোটগল্পে তার অবদান ছিলো উল্লেখযোগ্য ভাবে। তার গল্পে ছিলো নিয়ম, শৃঙ্খলা, মানবতা, ন্যায়ের কথা। বাংলা ছোটগল্পে তার গল্পগুলো নতুন এক মাত্রা যোগ করেছে। 

আজকালের খবর/আরইউ


সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : হাউস নং ৩৯ (৫ম তলা), রোড নং ১৭/এ, ব্লক: ই, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ফোন: +৮৮-০২-৪৮৮১১৮৩১-৪, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮
ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- [email protected] বিজ্ঞাপন- [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.net, www.ajkalerkhobor.com