ই-পেপার ফটোগ্যালারি আর্কাইভ  শনিবার ● ১৩ আগস্ট ২০২২ ● ২৯ শ্রাবণ ১৪২৯
ই-পেপার  শনিবার ● ১৩ আগস্ট ২০২২
শিরোনাম: করোনার ভ্যাকসিন কার্যক্রমে সরকারের ব্যয় ৪০ হাজার কোটি টাকা       সালমান রুশদির ওপর হামলা       ইউক্রেনে পৌঁছেছে যুক্তরাজ্যের সেই অস্ত্রের নতুন চালান       এবার চিনির দাম বাড়ানোর প্রস্তাব        তথ্যগত গরমিলে ডিএনসিসির ১০ গাড়িচালকের নিয়োগ বাতিল       ডিমের দামে রেকর্ড, ব্রয়লার মুরগির ডাবল সেঞ্চুরি        সিরিজ হারের লজ্জা নিয়ে দেশে ফিরলো তামিম বাহিনী      
শিকড়
লায়েকুজ্জামান
Published : Saturday, 2 July, 2022 at 3:17 PM, Update: 02.07.2022 3:26:40 PM

বায়ান্ন থেকে একাত্তর। ইতিহাসের নানা বাঁক। স্বাধীকারের দাবী থেকে স্বাধীনতা। মুক্তিযুদ্ধ, তার আগে নানা আন্দোলন, সংগ্রাম জীবনদান। বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা। ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রলীগের প্রগতির ধারা-বিপরীতে এনএসএফ, ছাত্র শক্তি। মওলানা ভাসানীর হুংকার, শেখ মুজিবের দীপ্ত পদচারণা। আইয়ুব খানের সামরিক শাসন, বাষট্টির ছাত্র আন্দোলন, উনসত্তরের গৌরবময় গণঅভ্যুত্থান। মহান মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীনতা লাভ। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা। স্বাধীন বাংলাদেশে অস্ত্রের রাজনীতি, চীন-মাকির্নীদের ষড়যন্ত্র, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা, দেশকে আবার পাকিস্তানী ধারায় ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা, জিয়া-এরশাদের সামরিক শাসন, বারবার সাম্প্রদায়িক কূটচাল। মৌলবাদের উত্থানচেষ্টা। গোলাম আযমের নাগরিকত্ব, যুদ্ধাপরাধীদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা। আমাদের জাতীয় রাজনীতির সেই সব সদর-অন্দরের ঘটনা নিয়ে রাজনীতিকে ভিত্তি উপন্যাস-‘শিকড়’।
 
রাতে হলে ফেরার আগে একবার ইকবাল হলে যাওয়ার অভ্যাস হয়ে গেছে অরিত্রর। ইকবাল হলেই ছাত্রলীগের বেশীরভাগ নেতারা থাকেন। ওই হলে গেলে ছাত্ররাজনীতির খবর পাওয়া যায়, ছাত্রলীগের কর্মসূচী জানা যায়। ইকবাল হলে গিয়ে একটি চিরকূট পেল অরিত্র। চিরকূট লিখেছেন আবদুর রাজ্জাক। দেখা করতে বলেছেন, টিকাটুলী ইত্তেফাক অফিসের পেছনের খোলা জায়গায়। সন্ধ্যার আগেই অরিত্র সেখানে পৌঁছে গেল। চিরকূটের লেখামতো খোলা জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো সে। মিনিট পনের পর একজন অচেনা লোক এসে অরিত্রর নাম জানতে চাইলো। নাম বলার পর লোকটি অরিত্রকে সঙ্গে করে হাটতে শুরু করলো। বেশ কিছু সময় হেঁটে কয়েকটি অলি-গলি পার হলে একটি পুরানো বাড়িতে নিয়ে গেল তাকে। ঘরে ঢুকে হতবাক অরিত্র। বাড়ির একটি কক্ষে বসে আছেন, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও কাজী আরেফ আহমেদ। আবদুর রাজ্জাক বাদে অন্য দু’জনকে সে চিনে কিন্তু ঘনিষ্টতা নেই। আবদুর রাজ্জাক অরিত্রকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। এখানেই অরিত্র প্রথমে বিএলএফ এর কথা জানতে পারে।

সিরাজুল আলম খান বললেন, দেশটা স্বাধীন করতে হবে, সে জন্য আমাদের একটি যুদ্ধের প্রয়োজন হতে পারে, যদি যুদ্ধের প্রয়োজন হয় তা হলে তার জন্য প্রস্তুতি রাখতে হবে। এ প্রস্তুতির প্রাথমিক ধাপ হচ্ছে আমাদের সংগঠিত হওয়া এবং স্বাধীনতার ধারনা প্রচার করা। দেশ স্বাধীন করতে হবে- এ মতে যারা বিশ্বাস করে এবং স্বাধীন দেশের জন্য আগ্রহী আগে তাদেরকে সংগঠিত করতে হবে। সবাই স্বাধীনতা চাইবে ব্যাপারটা কিন্তু এমন নাও হতে পারে, অনেকেই হয় তো স্বাধীনতা নাও চাইতে পারে। সিনিয়র নেতারা স্বাধীনতার পক্ষে পুরোপুরি থাকবে তাও মনে করি না। এ জন্য কাজটা অতীব গোপনে করতে হবে, যাদের ওপর পুরোপুরি বিশ্বাস রাখা যায় এখন আমরা মাত্র তাদের কাছেই বার্তাটা পৌঁছানো এবং তাদের মাধ্যমে অন্যাদের সংগঠিত করার চেষ্টা করছি। এই মুহূর্তে বিষয়টি জানাজানি হলে বিপদ রয়েছে। পাকিস্তানীরা আমাদেরকে দেশদ্রোহী হিসেবে গণ্য করার পথ খুজঁছে আমরা সে পথে পা দেবো না। এই ধরো এই যে আমরা এখন তিন-চারজন একমত হলাম, এটাকে ‘নিউক্লিয়াস’ বলতে পারো। আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে ধীরে ধীরে এটাকে আরো সম্প্রসারিত করে আরো বেশী ছাত্রদের মধ্যে নিয়ে যাওয়া, তারপর গণমানুষের কাছে নিয়ে যাওয়া।’ অরিত্র বললো, স্বাধীনতার প্রশ্নে আমার দ্বিমত নেই, আমি চাই। আবার এটাও মনে করি স্বাধীনতার জন্য একটি যুদ্ধেরও প্রয়োজন হবে, কারণ দখলদার পাকিস্তানীরা খুব সহজে আমাদের ছেড়ে দেবে না। তবে প্রশ্ন হলো, এত বড় ঘটনায় আপনাদের নেতৃত্ব দেবেন কে? আপনারা না আপনাদের সঙ্গে জাতীয় কোন নেতা রয়েছেন, জাতীয় নেতা থাকলে তিনি কে? তার সঙ্গে এ নিয়ে আপনাদের কোন কথা হয়েছে কিনা? সিরাজুল আলম খান আবদুর রাজ্জাকের দিকে তাকালেন।

অরিত্রর প্রশ্নের জবাব দিলেন, আবদুর রাজ্জাক বললেন, আমাদের নেতা মুজিব ভাই, তিনি আমাদের সঙ্গে আছেন, তার সঙ্গে পরামর্শ করে, তার নির্দেশেই আমরা স্বাধীনতার ধারনা প্রচার করা ও সংগঠিত করা শুরু করেছি। দুই কারণে এখনই মুজিব ভাই সরাসরি স্বাধীনতার কথা বলতে পারবেন না, প্রথম হলো এখনই তিনি সরাসরি স্বাধীনতার কথা বললে, তাকে বিচ্ছিন্নবাদী হিসেবে ফাঁসিয়ে দেওয়া হবে, দ্বিতীয়ত- দেশের ভেতরে স্বাধীনতার পক্ষে সিংহভাগ লোককে একমতে না আনা পর্যন্ত স্বাধীনতার কথা বললে, জনগণ আমাদের সঙ্গে থাকবে না। আমরা একা হয়ে পড়বো। সে জন্য বঙ্গবন্ধু অপেক্ষা করছেন, তিনি ৬ দফা দিয়ে বাস্তবে স্বাধীনতার দিকে জনগণকে একত্রিত করছেন। এটা নেতার বড় কৌশল। অরিত্র তুমি নিজেও বুঝ ৬ দফাটা আসলে কী? ৬ দফায় পাকিস্তান ভেঙে ফেলার কোনো শব্দ নেই, কিন্তু ৬ দফা বাস্তবায়িত হলে কি পাকিস্তান থাকে?’ হ্যা রাজ্জাক ভাই এটা বুঝেছি -সে কারণেই পাশ্চিমারা ৬ দফার ওপর এত ক্ষ্যাপা। আইয়ুব, মোনায়েমরা মোটেই ৬ দফা সহ্য করতে পারছে না। মুজিব ভাই কিন্তু এমন কৌশলে ৬ দফা দিয়েছে ওরা বলতেও পারছে না, আবার সইতেও পারছে না বেশ খুশি খুশি ভাবে বললো অরিত্র। কি ভাবে স্বাধীনতার ধারনা প্রচার করতে হবে, সংগঠিত হতে হবে তার একটি বিস্তারিত ধারনা দিলেন কাজী আরেফ আহমেদ। কাজী আরেফ আহমেদ পুরান ঢাকায় থাকেন, অত পরিচিত নেতা নন, সম্ভবত ছাত্রলীগের মহানগর কমিটির নেতা, অরিত্র এ ভাবেই চিনতো কাজী আরেফকে। তবে ভাবতে পারেনি লোকটার রানৈতিক গভীরতা এত বেশী। অরিত্র খেয়াল করলো সিরাজুল আলম খানের কথার ভেতরে বেশ তাত্বিক গন্ধ পাওয়া যায়, ছাত্র বয়েসেই তিনি দাঁড়ি রেখেছেন। চুলগুলো বড় বড়। পড়াশোনা করছেন গণিত বিভাগে। 

সিরাজুল আলম খানকে দেখে কেনো যেন, অরিত্রর কাল মার্কসের কথা মনে পড়ে, মার্কসও গণিতের ছাত্র ছিলেন, চুল-দাঁড়ি ছিলো। এ নিয়ে মনে মনে কিছুটা হাসলো অরিত্র, তার কয়েকজন কমিউনিষ্ট পরিচিতজনের কথা মনে পড়লো, তারা মাওসেতুং-এর ঢং-এ জামা পড়ে, সব সময়ে লাল রং-এর একখানা বই হাতের কাছে রাখার চেষ্টা করে। সিরাজুল আলম খানের আবার এমন ঢং কিনা? মনে এমন প্রশ্নের উদয় হলেও অরিত্র তা প্রকাশ করলো না, কারণ এটাই লোকটার সঙ্গে প্রথম পরিচয়-একদিনের পরিচয়ে তো একটা লোক সম্পর্কে বোঝা যায় না, এ ছাড়া আবদুর রাজ্জাকের প্রতি অরিত্র অসীম শ্রদ্ধা-ভক্তি সে কারণে সিরাজুল আলম খান সম্পর্কে কোনো খারাপ ধারনা সে মনে পাত্তা দিলো না। তবে প্রথম দিনের কথায়ই কাজী আরেফকে তার ভালো লেগেছে। বেশ গুছিয়ে কথা বলেন, রাজনীতির ধারনাটাও স্পষ্ট।

নোয়াখালীতে অরিত্রর একজন ঘনিষ্ট ছাত্রলীগ নেতা আছেন। নাম মাহমুদুর রহমান বেলায়েত। তার সঙ্গে ঘনিষ্টতা রাজনীতির সূত্রে নয়, আত্মীয়তার সূত্রে। ছাত্রলীগের রাজনীতি করতে এসে দু’জন আরো ঘনিষ্ট হয়েছে। দু’জনে দেশ নিয়ে অনেক ভাবে, দেশটাকে পাকিস্তানীদের হাত থেকে মুক্ত করতে চায়। মাহমুদুর রহমান বেলায়েত ঢাকায়  আসলে অরিত্রর রুমে ওঠে। দু’জন মিলে ঢাকা শহর ঘুরে বেড়ায়। শহীদ মিনার এলাকায় বসে গল্প করতে করতে রাত কাটিয়ে দেয়। 

রাজনীতি নিয়ে কথা বলার ফাকে বেলায়েত-অরিত্রকে বলে, আচ্ছা পাকিস্তানীদের সঙ্গে যদি আমাদের শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ বেধে যায়, তা হলে আমরা কি পারবো, আমাদের তো অস্ত্র নেই, প্রশিক্ষণ নেই, আবার নেতারাও কেউ সরাসরি স্বাধীনতার কথা বলছেন না, সে ভাবে সংগঠিতও করছেন না। অরিত্রর কাছে এর জবাব আছে, আবদুর রাজ্জাক ভাইয়ের কাছে থেকে সবকিছু শুনেছে, তবে এখনই বেলায়েতকে বলছে না, কারণ নেতা সাবধান হতে বলেছেন, কথা যাতে প্রকাশ না হয়ে পড়ে সে জন্য। অরিত্র শুধু বলে আরে হয়ে যাবে, চিন্তা করো না। দু’জনই দু’জনকে নিউক্লিয়াসের কথা বলতে চায় কিন্তু বলছে না, একে অপরের গভীরতা মাপার চেষ্টা করছে। শেষ পর্যন্ত মাহমুদুর রহমান বেলায়েত চুপিসারে বললো, শোনো তোমাকে একটা কথা বলার জন্য আজ আমি রাতে থেকে গেলাম। মাস খানেক আগে সিরাজুল আলম খান নোয়াখালীর গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলেন। কয়েকদিন ছিলেন, আমাকে একদিন গোপনে ডেকে নিয়ে বললেন, দেশ স্বাধীন করতে হবে, সে জন্য সংগঠন তৈরি করতে হবে, স্বাধীনতার দাবী তুলতে হবে। তারা নাকি কেন্দ্রীয়ভাবে বিএলএফ করেছেন। আমাকে তাদের সঙ্গে থাকার আহ্বান জানালেন। আমি সিরাজুল আলম খানের কাছে সরাসরি জানতে চাইলাম, আপনার সাথে মুজিব ভাই আছেন কিনা? মুজিব না থাকলে আমি নেই। তিনি বললেন, মুজিব ভাইয়ের পরামর্শে আমরা মাঠে নেমেছি কারণ কৌশলগত কারণে আগেই তিনি কথাটা বলতে চান না, আওয়ামী লীগ দিয়েও বলাতে চান না। এ কাজে তিনি আগে ছাত্রলীগকে ব্যবহার করতে চান, ছাত্রলীগকে দিয়ে বলাতে চান। সিরাজুল আলম খানের কথা আমি ভরসা পাইনি তাই আজ এসেছিলাম মুজিব ভাইয়ের সাথে দেখা করতে। দুপুর বেলায় মতিঝিলে আলফা ইন্সুরেন্স অফিসে মুজিব ভাইকে একা পেয়ে গেলাম। সিরাজুল আলম খানের কথাটা তাঁকে বললাম, মুজিব ভাই বললেন, ঠিক আছে, সাবধানে এগুতে থাকো। সে কথাটা বলার জন্য তোমার কাছে এসেছি-তুমি আমাদের সাথে থাকো। অরিত্র অভয় পেলো। সেও বললো, শোন এ নিয়ে সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও কাজী আরেফ আহমেদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, তারা আমাকে ডেকেছিলেন। আমি রাজ্জাক ভাইর কাছে জানতে চেয়েছিলাম বিষয়টি মুজিব ভাই জানেন কিনা? রাজ্জাক বলেছেন, এটা মুজিব ভাইরই নির্দেশ। আমি মেনে নিয়েছি, আমি রাজ্জাক ভাইকে বিশ্বাস করি, কোনো দিন একটা মিথ্যা কথা বলতে শুনিনি তাকে। কাউকে মিথ্যা আশ্বাস দেন না, যতটুকু পারেন ততটুকু বলেন। অরিত্রর কথা শেষ হতে দু’জন দু’জনকে জড়িয়ে ধরলো, এবার দেশ স্বাধীন হবেই, আবেগে, খুশীতে কেঁদে ফেললো দু’জনই। তাদের  একটি সশস্ত্র সংগঠন হবে, মুক্তির জন্য তারা যুদ্ধ করতে পারবে-মনের অজান্তেই দু’জন চেচিয়ে উঠলো ‘জয় মুজিব ভাই’ বলে। (দ্বাদশ পর্ব)

লায়েকুজ্জামান : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।
আজকালের খবর/আরইউ


সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : হাউস নং ৩৯ (৫ম তলা), রোড নং ১৭/এ, ব্লক: ই, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ফোন: +৮৮-০২-৪৮৮১১৮৩১-৪, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮
ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- [email protected] বিজ্ঞাপন- [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.net, www.ajkalerkhobor.com