ই-পেপার ফটোগ্যালারি আর্কাইভ  শুক্রবার ● ১২ আগস্ট ২০২২ ● ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯
ই-পেপার  শুক্রবার ● ১২ আগস্ট ২০২২
শিরোনাম: করোনার ভ্যাকসিন কার্যক্রমে সরকারের ব্যয় ৪০ হাজার কোটি টাকা       সালমান রুশদির ওপর হামলা       ইউক্রেনে পৌঁছেছে যুক্তরাজ্যের সেই অস্ত্রের নতুন চালান       এবার চিনির দাম বাড়ানোর প্রস্তাব        তথ্যগত গরমিলে ডিএনসিসির ১০ গাড়িচালকের নিয়োগ বাতিল       ডিমের দামে রেকর্ড, ব্রয়লার মুরগির ডাবল সেঞ্চুরি        সিরিজ হারের লজ্জা নিয়ে দেশে ফিরলো তামিম বাহিনী      
অর্থনীতির গেম চেঞ্জার
জাকির হুসাইন
Published : Friday, 24 June, 2022 at 8:13 PM, Update: 24.06.2022 8:17:01 PM

পদ্মাসেতু বদলে দেবে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক চালচিত্র। বাড়বে বাণিজ্য ও রপ্তানির সম্ভাবনা। পদ্মাসেতু শুধু দক্ষিণাঞ্চলের চেহারা বদলে দেবে না, বরং এই সেতু অর্থনীতির ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করেন দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, পদ্মাসেতুর কারণে জিডিপিতে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার যোগ হবে; যা সেতুটির ব্যয়ের প্রায় তিনগুণ বেশি। সেতু চালু হওয়ার এক বছরের মধ্যেই উঠে আসবে পদ্মাসেতু নির্মাণের খরচ। এই সেতু চালু হলে দেশের অর্থনীতিতে সামগ্রিক উৎপাদন, সেবা, পর্যটন, শিল্প, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে যে ইতিবাচক গতি তৈরি হবে, প্রথম বছরে তার আর্থিক মূল্য দাঁড়াবে জিডিপির এক দশমিক দুই শতাংশ। টাকার অঙ্কে প্রাপ্তির পরিমাণ হবে ৩৩ হাজার ৫৫৬ কোটি ৫৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা; যা পদ্মাসেতুর নির্মাণ ব্যয়ের চেয়ে বেশি। 

অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলেন, পদ্মাসেতু হলে দেশের অর্থনীতি একীভূত হবে। বিনিয়োগ হবে মূল চালিকাশক্তি। এ ছাড়া বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, মিয়ানমারসহ উপআঞ্চলিক জোটে পদ্মাসেতু বড় ভূমিকা রাখবে। পদ্মাসেতু শুধু দক্ষিণাঞ্চলের চেহারা বদলে দেবে না, বরং এই সেতু অর্থনীতির ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করেন দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশজুড়ে একটি সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। তখন পায়রা ও মংলাবন্দর, বেনাপোল স্থলবন্দরের সঙ্গে রাজধানী এবং বন্দর নগরী চট্টগ্রামের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। এতে শুধু দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নয়, পুরো বাংলাদেশের অর্থনীতিই আমূল বদলে যাবে। শুধু বাংলাদেশ নয়, পদ্মাসেতুর অর্থনৈতিক প্রভাব পুরো বিশ্বে ইতিবাচক সাড়া ফেলবে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

তৈরি হবে নতুন কর্মসংস্থান। সেতুর ওপর দিয়ে যাচ্ছে গ্যাসের পাইপলাইন। সেতু ঘিরে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে নেওয়া বিভিন্ন প্রকল্পের কাজের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে ইতোমধ্যে। এতে সেতু এলাকার মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটবে। এমন স্বপ্নই দেখছেন এ জনপদের সাধারণ মানুষ। এর সঙ্গে অর্থনীতির চাকাও ঘুরবে দ্রুত বেগে। অর্থনীতির ভিত শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখবে দেশের দুই ভাগকে এক করা পদ্মাসেতু। বাড়বে জীবনযাত্রার মান। পদ্মাসেতু নতুন বার্তা পৌঁছে দেবে দেশ এবং দেশের বাইরে। সেতুটি চালু হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। এতে মোট দেশজ উৎপাদন প্রবৃদ্ধি (জিডিপি) এক থেকে দেড় শতাংশ বাড়বে। দারিদ্র্যের হার কমবে দশমিক ৮৪ শতাংশ। নতুন করে গড়ে উঠবে ভারী শিল্প-কারখানা। পাশাপাশি পদ্মাসেতুর মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে গতি আসবে। বিনিয়োগ বাড়বে, কৃষক সরাসরি উপকৃত হবেন। তাদের উৎপাদিত পচনশীল পণ্য সরাসরি ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য স্থানে পাঠাতে পারবেন। এতে পণ্যের ভালো দাম পাওয়া যাবে। এবং এ সেতুর ফলে সামগ্রিকভাবে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তার হবে। বিশেষ করে ভারতের বাণিজ্য বাড়াতে মোংলা বন্দর ব্যবহার করা যাবে।

এদিকে পদ্মা বহুমুখী সেতু চালু হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে, তার মূল্যায়ন করেছে বিশ্বব্যাংক, জাইকা ও বাংলাদেশ সরকার। সরকারের সম্ভাব্যতা জরিপে বলা হয়, সেতুটি নির্মিত হলে দেশের জিডিপি এক দশমিক দুই শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। এতে ওই অঞ্চলের মানুষের আয় বাড়বে এক দশমিক চার শতাংশ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে সাত লাখ ৪৩ হাজার। জাইকার সমীক্ষাতে বলা হয়েছে, জিডিপি বাড়বে এক দশমিক দুই শতাংশ। এতে আরো বলা হয়েছে, পদ্মাসেতু দিয়ে প্রতিদিন ২১ হাজার ৩০০ যানবাহন চলাচল করবে, ২০২৫ সাল নাগাদ এ সংখ্যা বেড়ে হবে ৪১ হাজার ৬০০। আর বিশ্বব্যাংকের সমীক্ষায় বলা হয়, পদ্মাসেতু চালু হলে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়বে এক শতাংশ হারে। 

পদ্মাসেতু রাজধানীর ঢাকার সঙ্গে শুধু দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলাকেই যুক্ত করবে না, বরং সারা দেশকে সংযুক্ত করবে। ফলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের অফুরন্ত সম্ভাবনা তৈরি হবে। জিডিপিতে যোগ হবে বাড়তি আড়াই শতাংশ। প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান বলেন, এটি আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। বাড়িয়ে দিয়েছে প্রত্যাশা। অর্থনীতিবিদ ড. জায়েদ বখত জানান, ‘বিপুল পরিমাণ ব্যয় করার পরও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উপর চাপ আসেনি। ব্যাহত হয়নি সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ড. জামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, পদ্মাসেতুর ফলে রাজস্ব আহরণ অনেক বাড়বে। বাংলাদেশ রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি সালাম মুশের্দী বলেন, পদ্মাসেতুর ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে। সক্রিয় হবে মোংলা বন্দর। মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল মোহাম্মদ মুসা বলেন, ঢাকা থেকে সবচেয়ে কাছের সমুদ্র বন্দর মোংলা। যেমন- চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকার দূরত্ব ২৬০ কিলোমিটার আর মোংলার দূরত্ব হবে ১৭০ কিলোমিটার। প্রায় ১০০ কিলোমিটার কম হবে। এ সুবিধাটা মোংলা বন্দর পাবে। আশা করা যায়, বন্দর ব্যবহারকারীদের সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পাবে। এরই মধ্যে অনেক আমদানি-রপ্তানিকারক বন্দর ব্যবহারে তাদের আগ্রহের কথা জানিয়েছেন।

নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণের সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার নির্দেশে বাংলাদেশ ব্যাংকের তখনকার গভর্নর ড. আতিউর রহমান বিশাল ব্যয়ের অর্থ বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলারে পরিশোধ করতে অগ্রণী ব্যাংককে দায়িত্ব দেন। এখনো এর তত্ত্বাবধান করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ড. আতিউর রহমান জানান, আমরা সম্ভাব্যতার বড় জায়গাটায় না গেলাম, সর্বনিম্ন সমীক্ষাটিও যদি গ্রহণ করি তাহলেও জিডিপি বাড়ার হার ন্যূনতম এক শতাংশ হবে। এটাই হলো আমাদের পদ্মাসেতু; যা বাংলাদেশের সক্ষমতা, সমৃদ্ধি, অহংকার ও সাহসের প্রতীক; যার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। 

ড. আতিউর রহমান বলেন, যমুনা নদীতে বঙ্গবন্ধু সেতু চালু হওয়ার পর দেশের অর্থনীতিতে বিপুল বিস্ফোরণ ঘটেছিল। যার ধারাবাহিকতা এখনো অব্যাহত আছে। পদ্মাসেতু চালুর পর অর্থনীতিতে তার চেয়েও বড় বিস্ফোরণ ঘটবে। তিনি বলেন, পদ্মাসেতুর কারণে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২৭টি জেলার কৃষিখাত বেগবান হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (এসএমই) খাতে বিপ্লব ঘটবে। দ্রুত পণ্য আনা-নেওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় সারা দেশে বাণিজ্য নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে শিক্ষা ব্যবস্থায়। এছাড়া কুয়াকাটা, সুন্দরবন ও বঙ্গবন্ধুর সমাধি ঘিরে পর্যটনখাত বিকশিত হবে। হোটেল-মোটেল-রেস্তোরাঁ গড়ে ওঠবে। মংলা বন্দর, পায়রা বন্দর ও এনার্জি হাব, ইপিজেড, রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্র, বরিশাল-পিরোজপুরে শিপ বিল্ডিং শিল্পসহ সার্বিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের উল্লম্ফন দেখা যাবে। এখন জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে দক্ষিণাঞ্চলের যেসব মানুষ জীবিকার তাগিদে ঢাকামুখী হয়েছে, তারা এলাকায় ফিরে যাবে এবং সেখানেই উৎপাদন, সেবা ও বাণিজ্যমুখী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হবে। এসবের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে জিডিপিতে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে পাঁচ দশমিক ২৪ শতাংশ। টাকার চলতি মূল্য অনুযায়ী এর আকার মোট ২৭ লাখ ৯৬ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকা। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পদ্মাসেতুর প্রভাবে জিডিপি দেড় শতাংশ বাড়লে অর্থনীতিতে প্রথম বছর সার্বিক অর্থমূল্য বাড়বে ৪১ হাজার ৯৪৫ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। জিডিপি এক দশমিক তিন শতাংশ বাড়লে সার্বিক অর্থনীতিতে ৩৬ হাজার ৩৫২ কোটি ৯১ লাখ ৪০ হাজার টাকার স্ফীতি ঘটবে। জিডিপি এক দশমিক দুই শতাংশ বাড়লে টাকার অঙ্কে জিডিপি বাড়বে ৩৩ হাজার ৫৫৬ কোটি ৫৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা। জিডিপি প্রবৃদ্ধি সর্বনিম্ন এক শতাংশ ধরা হলে আর্থিক মূল্য বাড়বে ২৭ হাজার ৯৬৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেতু চালু হওয়ার পর সড়ক ও রেলপথে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার সঙ্গে রাজধানী ঢাকার সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন হবে। ফলে এ অঞ্চলের মানুষের একদিকে দীর্ঘদিনের ভোগান্তি লাঘব হবে, অন্যদিকে অর্থনীতি হবে বেগবান। তিনি বলেন, পদ্মাসেতু এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে সংযোগের একটা বড় লিংক। তাই আঞ্চলিক বাণিজ্যে এই সেতুর ভূমিকা অপরিসীম। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ ছাড়াও চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, সিঙ্গাপুর, জাপান, ডেনমার্ক, ইতালি, মালয়েশিয়া, কলম্বিয়া, ফিলিপাইন, তাইওয়ান, নেপাল ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিশেষজ্ঞ এবং প্রকৌশলী এই সেতু নির্মাণের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। আজ সব ষড়যন্ত্র-প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করে পদ্মাসেতু নির্মিত হয়েছে। 

পদ্মাসেতুর অর্থনৈতিক প্রভাব পুরোদেশে ছড়িয়ে পড়বে দাবি করে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, যাতায়াতে খেয়াল করলে এর অবদান সরাসরি দেখা যাবে। পদ্মাসেতু চালু হলে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়ায় চাপ কমবে। আর সেখানে চাপ কমলে যমুনা সেতুতে চাপ কমবে। সুতরাং পদ্মাসেতু শুধু দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের আশীর্বাদ নয়, দেশের উত্তর, পূর্ব, দক্ষিণ ও পশ্চিম সব দিকে এ সেতুর প্রভাব ছড়িয়ে যাবে।

পদ্মাসেতুর মাধ্যমে বাংলাদেশ এশিয়ান হাইওয়েতে যুক্ত হবে; যা অর্থনীতিকে নতুন মাত্রা দেবে। এই বৃহৎ অঞ্চলে গড়ে উঠবে শিল্প প্রতিষ্ঠান ও ইপিজেড। সারা দেশের অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই একটি সেতুতেই এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য বদলে যাবে। মোংলা ও পায়রা বন্দরের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন হবে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পিছিয়ে পড়া ২১টি জেলা উপকৃত হবে। জেলাগুলো হচ্ছে- খুলনা বিভাগের খুলনা, বাগেরহাট, যশোর, সাতক্ষীরা, নড়াইল, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও মাগুরা; বরিশাল বিভাগের বরিশাল, পিরোজপুর, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা ও ঝালকাঠি এবং ঢাকা বিভাগের গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও রাজবাড়ী। তবে পদ্মাসেতুর আরো সুফল পেতে দক্ষিণাঞ্চলে পোশাক ও পর্যটনসহ নানা খাতে বিনিয়োগ জরুরি বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। 

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, দক্ষিণাঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে হবে, যাতে করে বিদেশি বিনিয়োগ আসে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে যত বেশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাবে, জিডিপিতে এর অবদান ততো বেশি হবে। পদ্মাসেতু চালু হলে দক্ষিণাঞ্চলের পণ্য আমদানি সহজ হবে। মালামাল দ্রুত সময়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাবে। প্রবৃদ্ধি এক থেকে সর্বোচ্চ দুই শতাংশ বাড়বে। 

গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, পদ্মাসেতু আমাদের গর্বের বিষয়। এটি শুধু সেতুই নয়, পদ্মাসেতু হবে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। এর ফলে আমাদের ভৌগোলিক যে বিভাজন ছিল, তাতে সংযোজন স্থাপন হবে এবং এর মাধ্যমে বাংলাদেশ একটা একীভূত অর্থনীতি হিসেবে আবির্ভূত হবে। পদ্মাসেতুর ফলে আমাদের বিনিয়োগ, বিতরণ ও বিপণনগুলোতে যে সাশ্রয় হবে, সেটা আমাদের অর্থনীতিতে ইতিবাচকভাবে ভূমিকা রাখবে। এছাড়া ব্যাপক কর্মসংস্থান হবে। এরই মধ্যে পদ্মার করিডোরের পাশ দিয়ে বিনিয়োগের বিভিন্ন ধরনের সাইনবোর্ড দেখা যাচ্ছে। তবে এসব বিনিয়োগে যে কর্মসংস্থান হবে, সেগুলো আমাদের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অবদান রাখবে। 

খোজ নিয়ে জানা গেছে, ইতোমধ্যেই সেতুকে ঘিরে আশপাশের জেলাগুলোতে শুরু হয়েছে শিল্পায়ন। দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলা, বিশেষ করে মাদারীপুর, ফরিদপুর, শরীয়তপুরের মানুষের মধ্যে এখন পরিবর্তনের উন্মাদনা কাজ করছে। এসব এলাকায় জমির দাম যেমন বেড়েছে, তেমনই বাড়ছে স্থাপনা। এখন সেখানে এক বিঘা জমির দাম স্থানভেদে ৫০ লাখ থেকে এক কোটি টাকায় গড়িয়েছে। অনেকে শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য জমি কিনে রেখেছেন। এখানে গড়ে উঠছে তাঁতপল্লী। প্রধানমন্ত্রীর নামে শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার নাওডোবা মৌজায় ৫৯ দশমিক ৭৩ একর ও মাদারীপুর জেলার শিবচরের কুতুবপুর মৌজায় ৬০ একর করে ১১৯ দশমিক ৭৩ একর জমিতে নির্মাণ হচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় তাঁতশিল্প ‘শেখ হাসিনা তাঁতপল্লী’। এ শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠিত হলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অন্তত ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। 

এর বাইরে ওপাড়েই হচ্ছে শেখ হাসিনা টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, শেখ রাসেল শিশু পার্ক, বঙ্গমাতা ফজিলাতুন নেছা মুজিব নার্সিং ইনস্টিটিউট অ্যান্ড কলেজ, আইএইচটি ভবন, ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, শিল্পকলা একাডেমি ভবন, মুক্তমঞ্চ ও অলিম্পিক ভিলেজ। সেতুর ওপাড়ে হবে আইটি পার্ক। শিবচরে এটি গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম জানিয়েছেন, পদ্মাসেতুর প্রভাবে ওপারের জনপদ অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হবে। ফিজিবিলিটি স্টাডি অনুসারে এই সেতু জিডিপিতে এক দশমিক দুই শতাংশ অবদান রাখবে বলে প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল। এখন তা দুই শতাংশ হবে বলে মনে করা হচ্ছে। 

পদ্মাসেতু নিছক নদীর বুকে দাঁড়িয়ে থাকা একটা অবকাঠামো নয়। এই সেতু দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির এক নতুন ভিত। যেখান থেকে শুরু হতে পারে নতুন এক বাংলাদেশের যাত্রা। দেশের আত্মমর্যাদার প্রতীক হয়ে ওঠা পদ্মাসেতুকে এভাবেই মূল্যায়ন করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, পরিকল্পিতভাবে এগুলে সেতুকে ঘিরেই গড়ে উঠবে নতুন অর্থনৈতিক করিডোর। দীর্ঘ যানজট কিংবা ফেরি আসা না আসার সংকট আর যাত্রাপথের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে বাংলাদেশ এখন বহুল প্রত্যাশার পদ্মা বহুমুখী সেতুর নতুন যাত্রায়। ঢাকা থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা হয়ে নির্দিষ্ট গন্তব্য পৌঁছুতে যেখানে দিনটাই শেষ হয়ে যেতো সেখানে এখন ঢাকার দূরত্ব হবে সময়ের হিসেবে মাত্র দেড় থেকে দুই ঘণ্টার। শুধু যাতায়াতের করিডোর হিসেবেই নয়, পদ্মাসেতুকে নতুন অর্থনৈতিক করিডোর হিসেবও দেখছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। যেখানে কমবে সময় আর সড়ক দুর্ঘটনা। বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক ড. হাদিউজ্জামান জানান, দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর দূরত্ব ও সময় কমিয়ে আনার অর্থনৈতিক মূল্যই ব্যাপক। 
এছাড়া দক্ষিণাঞ্চলে অনেক পর্যটন কেন্দ্র রয়েছে; যা ভ্রমণপ্রেমীদের আকৃষ্ট করে থাকে। সুন্দরবন, কুয়াকাটা, ষাটগম্বুজ মসজিদের মতো অনেক পর্যটন কেন্দ্র ওই অঞ্চলের যাতায়াত ব্যবস্থার অনুপযোগিতার কারণে মানুষের কাছে অনাগ্রহের বিষয় ছিল। পদ্মাসেতুর মাধ্যমে এখন তা নাগালের মধ্যে চলে আসবে। এসব পর্যটন কেন্দ্রের অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধন করে তা থেকেও রাষ্ট্র প্রচুর অর্থ আয় করতে সমর্থ হবে। নানা দিক বিবেচনায় আমরা নিঃসংকোচে বলতে পারি, স্বপ্নের পদ্মাসেতু বাংলাদেশের মানুষের অনাগত স্বপ্ন পূরণে সারথির কাজ করবে। এ দেশ নিজের অর্থায়নে এতো বিশাল সেতু নির্মাণ করতে পারলে, ধীরে ধীরে আরো অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিজ অর্থেই সম্পন্ন করতে পারবে। পদ্মাসেতুর বাস্তবায়ন বাংলাদেশের জাতীয় মনোবল ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সুন্দরবনকে ঘিরে পর্যাটন শিল্পের অপার সম্ভাবনা রয়েছে এখানে। এই জেলায় রয়েছে দেশের তৃতীয় বৃহত্তম ভোমরা স্থলবন্দর। এসব সম্ভাবনা ঘিরে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে সাতক্ষীরাবাসী। সাতক্ষীরা চিংড়ি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ডা. আবুল কালাম বাবলা বলেন, ‘পদ্মাসেতু চালু হলে সাতক্ষীরার চিংড়ি শিল্পের বাজার সম্প্রসারণ হবে। চিংড়ির গুণগত মান ঠিক রেখে বিদেশে রপ্তানি করা যাবে। এতে জেলার তো অবশ্যই, দেশেরও সার্বিক উন্নতি হবে।’

পদ্মাসেতু শুধু যোগাযোগব্যবস্থা সহজ করবে না, এতে শিক্ষা  কৃষি, মৎস্য, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ও শিল্প, পর্যটনসহ বেশ কিছু খাতে অর্থনৈতিক উপযোগও সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি গড়ে উঠবে বিভিন্ন শিল্প-কলকারখানা, ইপিজেড, বিমানবন্দর, গার্মেন্টস শিল্প ও কৃষি-শিল্প। গোপালগঞ্জ জেলাকে অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে সমৃদ্ধ করেছে কৃষি খাত। এ  বিষয়ে জেলা প্রশাসক শাহিদা সুলতানা বলেন, পদ্মাসেতু চালু হলে গোপালগঞ্জ শুধু শিল্পাঞ্চলই নয়, আধুনিক পর্যটন নগরীতে রূপ নেবে। এ জেলার মাটিতেই চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এ সমাধিস্থলকে ঘিরে সারা বছর বিভিন্ন জেলা থেকে পর্যটক আসতে থাকেন। পদ্মাসেতু চালু হওয়ার পর এ জেলার অর্থনীতির চাকা সচল হবে। 

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড.  মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, পদ্মাসেতু দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ পুরো বাংলাদেশের জন্য নতুন দিগন্তের সূচনা করবে। মানুষের যোগাযোগটা সহজ হবে। এ সহজ যোগাযোগের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি, পর্যটনসহ দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে। এতে করে দেশের জিডিপি বৃদ্ধি পাবে; যা এ অঞ্চলের দারিদ্র্যতাবিমোচনেও ভূমিকা রাখবে। সবজি, ফুল ও মাছ উৎপাদনে উদ্বৃত্ত জেলা যশোর। নিজেদের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি এ জেলার উৎপাদিত ফসল দেশের ৬০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করে। পদ্মা নদীতে ফেরি পারপারের কারণে দীর্ঘদিন ধরে ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছিলেন না এ অঞ্চলের চাষিরা। পদ্মাসেতু এসব বঞ্চিত চাষি-কৃষকদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে। তাদের ধারণা, এবার অল্প সময়ে তাদের উৎপাদিত ফসল রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় পাঠাতে পারবেন এবং ভালো মূল্যে বিক্রি করে নিজেরা লাভবান হতে পারবেন।

এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. আবুল বারাকাত বলেন, পদ্মাসেতু খোলামাত্রই জিডিপি বেড়ে যাবে ও শিল্প-কারখানা হয়ে যাবে, তা হবে না। আমি ব্যাংকগুলোতে দেখছি, গত দুই বছরে শিল্প-কারখানার যতো প্রস্তাব এসেছে তার অধিকাংশই পদ্মার ওপাড়ের অঞ্চলের মানুষের কাছ থেকে এবং এর অধিকাংশই কৃষিভিত্তিক শিল্প। এর মানে মানুষ অলরেডি ওইসব অঞ্চলে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ব্যাপারে চিন্তাভাবনা শুরু করেছেন। পদ্মাসেতুর কারণে ২০২৭ সালে জিডিপির ৯ দশমিক ৫২ শতাংশ অবদান থাকবে। ওই সময় দেশের জিডিপির আকার হবে ৬৩ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে ছয় লাখ কোটি টাকা হবে দক্ষিণাঞ্চলের কারণে।

আজকালের খবর/আরইউ


সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : হাউস নং ৩৯ (৫ম তলা), রোড নং ১৭/এ, ব্লক: ই, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ফোন: +৮৮-০২-৪৮৮১১৮৩১-৪, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮
ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- [email protected] বিজ্ঞাপন- [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.net, www.ajkalerkhobor.com