ই-পেপার ফটোগ্যালারি আর্কাইভ  সোমবার ● ৪ জুলাই ২০২২ ● ২০ আষাঢ় ১৪২৯
ই-পেপার  সোমবার ● ৪ জুলাই ২০২২
শিরোনাম: ভারতের হিমাচলে বাস দুর্ঘটনায় স্কুলছাত্রসহ নিহত ১৬        মেঘনা গ্রুপের কার্টন কারখানায় আগুন, নিয়ন্ত্রণে ১৪ ইউনিট       রাস্তার ওপর পশুর হাট বসানো যাবে না        পুলিশের সামনে ছাত্রলীগ নেতাকে কুপিয়ে হত্যা, উত্তপ্ত কক্সবাজার       চলতি মাসে সিলেট-রংপুরে ফের বন্যার সম্ভাবনা        অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রত্যাশা ১৪ রাষ্ট্রদূতের        বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের মাইলফলক অর্জন       
শিকড়
লায়েকুজ্জামান
Published : Wednesday, 18 May, 2022 at 7:31 PM

বায়ান্ন থেকে একাত্তর। ইতিহাসের নানা বাঁক। স্বাধীকারের দাবী থেকে স্বাধীনতা। মুক্তিযুদ্ধ, তার আগে নানা আন্দোলন, সংগ্রাম জীবনদান। বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা। ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রলীগের প্রগতির ধারা-বিপরীতে এনএসএফ, ছাত্র শক্তি। মওলানা ভাসানীর হুংকার, শেখ মুজিবের দীপ্ত পদচারণা। আইয়ুব খানের সামরিক শাসন, বাষট্টির ছাত্র আন্দোলন, উনসত্তরের গৌরবময় গণঅভ্যুত্থান। মহান মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীনতা লাভ। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা। স্বাধীন বাংলাদেশে অস্ত্রের রাজনীতি, চীন-মাকির্নীদের ষড়যন্ত্র, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা, দেশকে আবার পাকিস্তানী ধারায় ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা, জিয়া-এরশাদের সামরিক শাসন, বারবার সাম্প্রদায়িক কূটচাল। মৌলবাদের উত্থানচেষ্টা। গোলাম আযমের নাগরিকত্ব, যুদ্ধাপরাধীদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা। আমাদের জাতীয় রাজনীতির সেই সব সদর-অন্দরের ঘটনা নিয়ে রাজনীতিকে ভিত্তি উপন্যাস-‘শিকড়’।

মায়ের দেওয়া নাড়ু, মুড়ি হলে রেখে দ্রুত মধুদার ক্যান্টিনে আসলো অরিত্র। চায়ের কাপে টোস্ট ভিজিয়ে খাওয়ার অভ্যাস হয়ে গেছে। ক্ষুধা পেয়েছে, মধুদার কাছ থেকে আরেকটি টোস্ট চেয়ে নিলো। চা পান শেষ হওয়ার আগেই মধুদা যত্ন করে রাখা কাবেরীর লেখা চিরকুটটা অরিত্র হাতে দিলো। চোখের সামনে মেলে ধরে চোট্ট চিরকুটটা বার কয়েক পড়লো। চিরকুট পড়া দেখে মধুদা আড় চোখে একটু দেখে মুচকি হাসলো। চিরকুট পেয়ে ভেতরে অন্যরকম একটা ভালো লাগা অনুভূত হলেও মুহূর্তে আবার তা মিইয়ে গেল, তা হলে কাবেরীর সঙ্গে দেখা হবে না। কবে ঢাকায় আসবে তাও কিছু লিখেনি। মনে নানা ভাবনার উদয় হলো, বাড়ি যাওয়ার আগে ওর সঙ্গে দেখা না করায় কি রাগ করেছে? নাকি ওর বাড়িতে কোনো দুর্ঘটনা হলো। বেশ উদাস হয়ে উঠলো অরিত্র। এখন ক্লাস শেষ, ডিপার্টমেন্টে গিয়ে কোনো লাভ নেই। বন্ধুদের দেখাও হয়তো মিলবে না। এখন না দুপুর, না বিকেল এমন সময় ছাত্রলীগ অফিসে গিয়েও কাউকে পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। কোথায় যাওয়া যায় এ নিয়ে সিন্ধান্ত নিতে পারছে না। হঠাৎ মনে হলো তা হলে টিকাটুলি যাই, এ সময়ে নিশ্চয়ই সিরাজউদ্দিন হোসেন ইত্তেফাকে আছেন। অনেক দিন তার সঙ্গে দেখা হয় না, কথাও হয় না। সিরাজউদ্দিন হোসেনের কাছে গেল মুজিব ভাইয়ের খবর পাওয়া যাবে, দেশের রাজনীতির খবরও পাওয়া যাবে। বেশ কিছু দিন ঢাকার বাইরে, রাজনীতির খবরটাও নেওয়া দরকার। শেষ পর্যন্ত টিকাটুলী মোড়েই যাওয়ার সিন্ধান্ত নিলো। 

একটি রিকশায় চেপে চললো টিকাটুলি। ঠিকই ইত্তেফাক অফিসের টিনের ঘরে পেয়ে গেলেন সিরাজউদ্দিন হোসেনকে।  একাএকা বসে আছেন, কী যেন একটা লেখা বেশ মনোযোগ দিয়ে দেখছেন, কারেকশন করছেন। অরিত্র গিয়ে সালাম দিতেই তাকিয়ে বললেন, কি ব্যাপার কোনো খোঁজ-খবর নেই। সেই যে পত্রিকায় ছবি ছাপা হলো পুলিশের মার খাচ্ছো, এরপর আর তোমার দেখাই নেই। মার খেয়ে কি রাজনীতি ছেড়ে দিলে নাকি? জী না, হাসপাতাল থেকে বেরুনোর পর বাড়ি গিয়েছিলাম, মা আর আসতে দিতে চায় না। তা বলো দেখি ফরিদপুরে রাজনীতির খবর কী? ভালোই মনে হলো ভাইজান, এবার একটি ভালো খবর পেলাম, রাজেন্দ্র কলেজে প্রথম ছাত্রলীগের প্যানেল জিতেছে। ভিপি হয়েছেন কেএম মামুনুর রশিদ, বাড়ি নগরকান্দা। কেএম ওবায়দুর রহমানের ভাই। জিএস হয়েছেন মনোরঞ্জন সাহা বাড়ি বোয়ালমারী। ছাত্রলীগের সবাই জিতেছে। শহরেও দেখলাম আগের চেয়ে যুবক বয়েসীও সাধারণ মানুষেরা একটু আওয়ামী লীগের দিকে ঝুকেছে। মুসলীম লীগের তো দেখলাম তিন ভাগ জমিদার বাড়ির লাল মিয়া, মোহন মিয়ারা এক ভাগ, আলীপুরের আলাউদ্দিন খানের এক ভাগ আবার লক্ষীপুরের লাঠিয়াল সোবহান মোল্লার এক ভাগ। তাদের মধ্যে বিরোধী অনেকটা প্রকাশ্য। তবে হতবাক হওয়ার মতো একটি ঘটনা শুনলাম, পত্রিকায় দেখলাম আলাউদ্দিন খান জমিদার মোহন মিয়ার বিরুদ্ধে ‘আল্লাহর কাছে টেলিগ্রাম’ পাঠিয়েছেন। সেটা আবার সৈয়দ আবদুর রব সাহেবের ‘আল মোয়াজ্জিন’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। পত্রিকার একটি কপি আপনার জন্য নিয়ে এসেছি। দেখুন বলে, পকেট থেকে পত্রিকাটি বের করে দিলেন। পত্রিকা দেখে বেশ হাসলেন সিরাজউদ্দিন হোসেন। মৃদু উচ্চারণে শুধু বললেন, পতনের দিকে যাত্রা করলে যা হয়-সেগুলোই শুরু হয়েছে, বুঝেছো অরিত্র।

পিওনকে ডেকে দু’কাপ চা আনতে বললেন, সিরাজউদ্দিন হোসেন। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে সিরাজউদ্দিন হোসেন বললেন, দেখেছো তো শেখ মুজিব ৬ দফা দেওয়ার পর কি শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগই তো এখন দু’ভাগ হয়ে যাচ্ছে। সিনিয়র নেতারা তো ৬ দফা মানতে রাজী না, তারা বলছেন, ৬ দফা দিয়ে শেখ মুজিব পাকিস্তান ভাঙ্গতে চাইছে, এটা মানি না। আওয়ামী লীগ এখন এক গ্রুপ ৬ দফা পন্থী অন্য গ্রুপ ৬ দফা বিরোধী, এরা গিয়ে আবার নুরুল আমিনের সঙ্গে পিডিএম-এ যোগ দিয়েছে। পাবনার মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ, ঢাকার আতাউর রহমান খান, ফরিদপুরের সালাম খানরা তো প্রকাশ্যে শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। মুজিব ভাই ও কারাগারে, আবার তাজউদ্দিন ভাইও কারাগারে। তবে ভালো খবর হলো আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আমেনা বেগম দু’জনই মুজিবের ৬ দফার পক্ষে। তাদেরকেও বস করতে পারছে না। আবার খারাপ খবর হলো আতাউর রহমান খান, সালাম খানরা বিভিন্ন জেলায় জেলায় যোগাযোগ করে আওয়ামী লীগে ভাঙ্গন ধরানোর চেষ্টা করছে। তবে আমি একখানা কাজ করে ফেলেছি বলে সিরাজউদ্দিন হোসেন ইত্তেফাকের কয়েকটি সংখ্যা অরিত্রর দিকে এগিয়ে বললেন, আন্ডার লাইন করা নিউজগুলো একবার দেখে নাও। 

ইত্তেফাকের বাম দিকে প্রথম কলামের শীর্ষ সংবাদ, ৬ দফার প্রতি চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সমর্থন। চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের সভাটি হয়েছে জহুর হোসেন চৌধুরীর সভাপতিত্বে, এর পরের দিন একই কলামে সংবাদ ‘৬ দফার প্রতি ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সমর্থন।’ সভায় সভাপতিত্ব করেছেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আদেলউদ্দিন আহমেদ, বক্তব্য রাখেন সাধারণ সমম্পাদক এ্যাডভোকেট শামসুদ্দিন মোল্লা, ইমামউদ্দিন আহমেদ। পরের দিনের পত্রিকার শিরোনাম ‘৬ দফার প্রতি যশোর  জেলা আওয়ামী লীগের সমর্থন।’ যশোরের সভায় সভাপতিত্ব করেছেন আওয়ামী লীগ নেতা মশিউর রহমান। নিউজ পড়ে অরিত্র বললেন, ভাই এতো দারুন কাজ, জেলাগুলোর নেতারা তা হলে মুজিব ভাইয়ের পক্ষে। অরিত্রর কথা শেষ হতে না হতে সিরাজউদ্দিন হোসেন হাতে লেখা আরো প্রায় পাঁচ-সাতটা কাগজ দেখিয়ে বললেন, এগুলো আরো কয়েকটি জেলা থেকে এসেছে তারাও ৬ দফার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। 

সিরাজউদ্দিন হোসেন বলতে থাকলেন, অরিত্র তোমাকে তো অনেক কথাই বলি, এগুলো বাইরে বলো না কিন্তু সর্বনাশ হয়ে যাবে। শোন মুজিব ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় কলকাতায় থাকতে, তিনি তখন ইসলামী কলেজের ছাত্র। আমরা এক সঙ্গে পাকিস্তানের জন্য আন্দোলন করেছি। এক সঙ্গে যুব মুসলিম লীগ করেছি। মুজিব ভাইয়ের সঙ্গে অনেক কথাই তো হয়, সব এই মুহূর্তে তোমাকে বলা যাবে না। তবে এতটুকু শুনে রাখ মুজিবের লক্ষ্য এক দফা তা হলো স্বাধীনতা। এমনভাবে মুজিব ৬ দফা উপস্থাপন করেছে তা বাস্তবায়ন হলে পাকিস্তান বলে কিছু থাকে না, আবার বাস্তবায়ন না হলেও পাকিস্তান থাকে না। তার জন্য প্রয়োজন মানুষের সমর্থন, তোমরা ছাত্রলীগের কর্মীরা যদি ৬ দফাকে বুঝ এবং মানুষকে বুঝাতে পারো তা হলে সর্বোচ্চ হলো পাঁচ বছর লাগবে মানুষ ৬ দফার দিকে ঝাপিয়ে পড়বে। আর সেই সময়েই মুজিব চূড়ান্ত কাজটি সেরে ফেলবে, স্বাধীনতার ডাক দেবে। মুজিব কিন্তু খুবই দুরদৃষ্টি সম্পন্ন নেতা। রাজনীতিটা বুঝে এবং মানুষের হৃদয়ে আঁচড় কাটতে পারে। আরে শোন মুজিব যখন ৬ দফা দাবী পেশ করে দেশে আসলো মাস খানেক তো মানিক ভাই-ই (তোফাজ্জেল হোসেন মানিক মিয়া) অভিমান করে মুজিব ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলেননি। মানিক ভাই আমাকে বলেছেন, মুজিব আমাকেও জানালো না,ও এমন একটা কাজ করবে। সেই মানিক ভাই কিন্তু এখন ৬ দফার বড় ভক্ত। সালাম খানরা যখন প্রমাণ করতে চাইলেন, মুজিবের ৬ দফার সঙ্গে কেউ নেই, আমি একটা কৌশল নিলাম। চট্টগ্রামের জহুর হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক থাকে অনুরোধ করলাম ৬ দফাকে সমর্থন করে একটি বিবৃতি দিতে, তিনি দিলেন। তুমি হয় তো জানো না, ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট শামসুদ্দিন মোল্লা তোমার ভাবীর বড় ভাই, তাকে বললাম তিনি ফরিদপুর আওয়ামী লীগের সভা করে ৬ দফার পক্ষে বিবৃতি দিলেন। আমার বাড়ি যশোর, যশোর আওয়ামী লীগের প্রধান নেতা মশিউর ভাইয়ের সঙ্গে আমার খুবই ভালো সম্পর্ক, তাকে বলার পর তিনিও বিবৃতি দিলেন। এখন দেখছি সব জেলা শেখ মুজিবের পক্ষে। মানিক ভাইও খুব খুশী।

অরিত্রর মনটা খুব ফুরফুরে হয়ে গেল, অনেক দিন পর একটি ভালো খবর পেল। সিরাজউদ্দিন হোসেনের কাছে জানতে চাইলো, আচ্ছা ভাইজান আমার খুব জানার ইচ্ছে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর প্রতিষ্ঠা করা ইত্তেফাক কীভাবে আপনারা নিজেদের আয়ত্বে নিলেন এবং পত্রিকাটাকে মুজিব ভাইয়ের রাজনীতির পক্ষে নিয়ে আসলেন। মওলানা ভাসানী তো ৬ দফা সমর্থন করেন না, আবার তার মতো চীনপন্থী দলগুলো তো প্রকাশ্যে বলছে শেখ মুজিবের ৬ দফা হলো সিআইএ’র তৈরি করা দলিল। বামপন্থী আরো নেতারাও বলছেন, ৬ দফায় সাধারণ মানুষের কোনো কথা নেই। মুচকি হেসে সিরাজউদ্দিন হোসেন বললেন, ইত্তেফাক ও ওই সব বিষয় নিয়ে আরেকদিন কথা বলবো। এখন পত্রিকার কাজ করতে হবে। তুমি হলে যাও। এ সপ্তাহে আরেক বার এসো। (নবম পর্ব)

লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।  
আজকালের খবর/আরইউ


সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : হাউস নং ৩৯ (৫ম তলা), রোড নং ১৭/এ, ব্লক: ই, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ফোন: +৮৮-০২-৪৮৮১১৮৩১-৪, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮
ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- [email protected] বিজ্ঞাপন- [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.net, www.ajkalerkhobor.com