ই-পেপার ফটোগ্যালারি আর্কাইভ  বৃহস্পতিবার ● ১৯ মে ২০২২ ● ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
ই-পেপার  বৃহস্পতিবার ● ১৯ মে ২০২২
শিরোনাম: খালিয়াজুরীতে বজ্রপাতে দু'জনের মৃত্যু       ধান বোঝাই ট্রাক উল্টে ৩ শ্রমিক নিহত       চেয়ারম্যানের ছেলেকে কুপিয়ে হত্যার পর যুবকের আত্মহত্যা       বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়তে চায় যুক্তরাষ্ট্র: পিটার হাস       বিশ্বকাপের কাজে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিতে আগ্রহী কাতার       সিলেটে বন্যার পানি বাড়ছে, আতঙ্কে বানভাসি মানুষ        হজযাত্রী নিবন্ধনের সময় বেড়ে ২২ মে পর্যন্ত      
মেঘে মেঘে অন্ধ
আরিফুল হাসান
Published : Saturday, 14 May, 2022 at 11:14 AM

অসীম আকাশের কালো মুখে মেখে বসে আছে কারিশমা। তার মন ভালো নেই। সেই সকাল থেকে বৃষ্টি। ভার্সিটিতে যাবার কথা ছিলো। সেখানে অর্র্ণব অপেক্ষায় আছে। অথচ কি দুর্ভাগ্য আজ তার। সারাদিনে বৃষ্টি এক ফোটাও কমলো না। এই ধর্মপুর থেকে, রিকশায় করে বা সিএনজিতে ভার্সিটিতে যেতে কতক্ষণই বা লাগতো। অথচ এই ছোট্ট সময়টার ছাড় দিলো না অনাথ বৃষ্টি। র্ধু! বৃষ্টি পচা। নিজের মনে মনে বললো। 

অর্ণবকে সে প্রথম দেখে ভার্সিটির ওরিয়েন্টেশন ক্লাসে। তারপর আর অনেক দিন দেখা নেই। কি জানি, কোনো কারণে সে ক্লাস করেনি এতোদিন? হয়তো পারিবারিক কোনো সমস্যা আছে, হয়তো সে দূরে থাকে। আচ্ছা, হোস্টেলেও তো সে উঠতে পারতো! কি জানি, কেনো উঠেনি? দেখা হলে জেনে নেবো। কিন্তু আজ যে মনখারাপটা বৃষ্টির জন্য তৈরি হলো, মরার বৃষ্টি তো ছাড়েও না।

বৃষ্টি কারিশমার প্রিয় ছিলো। কৈশোরের ছোঁয়া থেকেই বৃষ্টির জলে গা ধুলে তার প্রাণ শীতল হয়। মা বাবার মুখে বকাও খেয়েছে এ নিয়ে, জ্বর সর্দি লাগিয়ে ভুগেছেও অনেক। তবু বৃষ্টির নেশা তার যায় না। এমনকি রাত ১২টার আগে, যখন সে ঘুমিয়ে যেতে পারেনি, তখন ১১টাই হোক আর সারে ১১টাই হোক রাত সে ভিজবে। ইদানিং একটু কম ভেজে। বাসায় বড় ভাইয়ের শ্যালক এসেছে, কেমন খাদক খাদক চোখে তাকায়। তার দৃষ্টিটা তার কাছে ভালো লাগে না। কেমন যেনো আড়ষ্ট হয়ে যায় তার চোখের সামনে। একদিন দেখতে পায় কী, কারিশমা যখন ছাদে ভিজছে বৃষ্টিতে উন্মনা হয়ে, তখন হঠাৎ করে তার চোখ পড়ে সিঁড়ি ঘরের দেয়ালে ডিশ এন্টেনার তার যেদিক দিয়ে প্রবেশ করানো, সেখানে এক আধলি ইটের ফাঁক দিয়ে একজোড়া চোখ তাকে লোভাতুর চাটছে। হঠাৎ সজাগ হয়ে উঠে কারিশমা। টেনে ভেজা উড়না উড়নাটা বুকে নেয়। তার আর বুঝার বাকি থাকে না, কে সেই অলক্ষ্যে থেকে অপকর্মটি করছে। 

তারপর থেকে আর কদাচিৎ বৃষ্টিতে যায় সে। আজ অর্ণবের সাথে ভেজার ইচ্ছে ছিলো। কী জানি, অর্ণব কী মনে করে আজ ফিরে গেছে। শেষের দিকে এমন অবস্থা যে অর্ণবের ফোনটি ধরতেও লজ্জা লাগছিল। তবে অর্ণবও বুঝোয়া ছেলে। ওই একবারই ফোন দিয়েছিল; হয়তো বলার জন্য যে এই বৃষ্টিতে আজ তুমি এসো না।

ওরিয়েন্টেশন ক্লাসে নবীন শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে অর্ণব বক্তব্য রেখেছিল। শেষে নিজের লেখা একটি কবিতা আবৃত্তি করে শোনালো। আহ! কী কথা কবিতার পঙক্তিতে পঙক্তিতে। কারিশমা অতশত বুঝে না, তবে এতটুকু বুঝে যে সদ্য উচ্চমাধ্যমিক পেরিয়ে আসা তার ফুটন্ত মন তাতে মজে গিয়েছিল। কী ভাষার ব্যবহার, কী বাক্সময়তা! এক কথায় অসাধারণ। ক্লাস শেষে নিজে গিয়ে অর্ণবের সাথে পরিচয় হয়েছিল। দেখতে সাদামাটা, একেবারে গাঁয়ের চাষাভুষো পরিবারের মনে হয়। কিন্তু বাচনের যে তীক্ষ¥তা তা কারিশমাকে এপিঠ-ওপিঠ বিদ্ধ করতে ছাড়ে না। সেই বিষে কারিশমা আজও অস্থির। এক দেখায় যে প্রেম হয়ে যায়, কারিশমার ক্ষেত্রে হয়েছে সেটি।

গত রবিবার ক্লাসের পর সবাই বাদাম তলায় বসে গল্প করছে। পাহাড় থেকে একটি পাখি কক কক করে ডেকে ডেকে তাদের মাথার ওপর দিয়ে চলে গেলো। এমন সময় কারিশমা দেখলো, ভার্সিটির গেট দিয়ে হনহন করে বেরিয়ে যাচ্ছে অর্ণব। অর্ণব, অর্ণব, ডাকতে ডাকতে দৌড়ে গেলো পিছু পিছু। কিন্তু ততক্ষণে সে একটি সিএনজিতে উঠে পড়েছে এবং সিএনজিটা স্টার্ট দিয়ে চলতে শুরু করেছে। বাতাস কেটে কেটে তার একলা ডাক পাহাড়ের গায়ে প্রতিধ্বনিত হতে থাকলো।

অর্ণবকে তার পরে দেখে গতকাল। মধ্যযুগের কবিতা পড়াচ্ছিলেন কাজল কাপালিক স্যার। স্যার নিজেও একজন কবি মানুষ। তাই কবিতার ভেতর থেকে রস আস্বাদনে শিক্ষার্থীদের কোনো অসুবিধাই হয় না। অর্ণব বসেছিল সামনের সাড়ির তিন নম্বর বেঞ্চে। আর তার পরের দুটো বেঞ্চের মাঝামাঝি বিপরীত সারিতে বসেছিল কারিশমা। অর্ণবকে এখান থেকে দেখা যাচ্ছে। তার মাথাভর্তি চুল, বোধ হয় বাবড়ি রাখা শুরু করেছে সে। কারিশমার বাবড়িওয়ালা ছেলেদের ভালো লাগে। চুল টেনে আদর করে দিতে ইচ্ছে হয়। তার ওপর সেটি যদি হয় পছন্দের ছেলেটি, তাহলে তো আর কথাই নেই। সে অর্ণবের দিকে চেয়ে ক্লাসে মন দিতে পারি না। স্যার পড়াচ্ছেন, এ ভরা ভাদর, মাহ ভাদর, শূন্য মন্দির মোর। কারিশমা স্যারের কথার আগামাথায় কানেক্ট হতে না পারলেও অর্ণবকে না দেখার দিনগুলোর বিরহ অনুভব করে। রাধা হয়ে তার মনে কে কেঁদে যায়। মনে মনে বলে, কেনো তুমি অর্ণব প্রতিদিন আসো না? আমার জন্য তুমি প্রতিদিন আসবা। নিজের কথা খেয়াল করে নিজেই হাসে। তারপর ক্লাস শেষ হলে অর্ণবকে একপাশে ডেকে নিয়ে বলে, তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে। কিন্তু অর্ণব সময় দিতে পারবে না। তার এক্ষুণি যেতে হবে; কী এক তাড়া আছে। বললো, আগামীকালও ভার্সিটিতে আসবো। তোমার কথাটা যদি কালকে শুনি তাহলে কি তুমি কিছু মনে করবে? ইশ্ কি সুন্দর করে বলে ছেলেটা। আমি মূলত তার কথার প্রেমেই পড়ে গেছি।

পরদিন, অর্থাৎ আজ ভোর রাত থেকেই বৃষ্টি। শুধু বৃষ্টি নয় বর্ষার প্রবল ধারা-স্রোত যেনো পড়ছে মুশলধারে। বৃষ্টির জলে রাস্তাঘাট তো সব তলিয়ে গেছেই, এমনকি বাসার নিচতলায় পানি চলে এসেছে। সারা রাস্তাজুড়ে জনহীন শূন্যতা আর ভারী বর্ষণের ধোয়ায়িত জলের ধারা ছাড়া আর কিছু নেই। কারিশমার একবার ইচ্ছে হয় কাঁদতে। নিজের রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে সে অনেক্ষণ কাঁদে। কেনো তার সঙ্গেই এমন হয়? কেনো আজই এতো বৃষ্টিপাত হতে হবে। যে বৃষ্টি তার ভালোবাসার বৃষ্টি ছিলো, সে বৃষ্টির প্রতি তার বিতৃষ্ণা জাগে। মনে মনে বলে, এই বর্ষাকালটা না থাকলেই বোধয় ভালো ছিলো। অর্ণবের মুখটা তার চোখের সামনে ভেসে উঠে।

বৃষ্টি থামছে না। অর্ণব ফোন দিয়েছিলো দুইটা বিশে। অর্থাৎ সে ক্লাস শেষ করে কারিশমাকে ফোন দিয়েছিলো। এতক্ষণে নিশ্চই সে চলে গেছে। না হলে কেটে দেবার পর আবার তো নিজে থেকেই ফোন দিয়েছিলো কারিশমা। কিন্তু এবারে অর্ণব ফোনটা ধরেনি। হয়তো কষ্টক্লেশে একটি সিএনজি পেয়েছিলো সে, সে অথবা অনেকজন মিলে। হয়তো গাদাগাদি করে তারা অনেকে উঠে গেছে সিএনজিতে। হয়তো পকেট থেকে ফোন বের করার ফুসরত নেই। হয়তো সিএনজির পর্দা টেনেটুনে বসতে বসতে অর্ণবের শার্টের হাতা ভিজে যাচ্ছে। তিনবার কল দিয়ে কারিশমা আর কল দেয় না। ফোনটা ছুড়ে ফেলে বিছানার ওপর। কোলবালিশটা টেনে নিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে অনেক্ষণ পড়ে থাকে। 

বাবা মা দুপুরের খাবারের পরে ঘুমোচ্ছে। বড় ভাই ভাবীও হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। বৃষ্টির তেজ আরেকটু বাড়লো মনে হয়। এমন সময় তার দরজায় মৃদু টোকা পড়ে। তড়াক করে বিছানায় উঠে বসে কারিশমা। কে হতে পারে এ সময়। উড়না টানতে টানতে দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। সতর্ক হাতে সিটকিনি খুলে। দেখে, বড় ভাইয়ের শ্যালক হাসি হাসি মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এখন কেনো জানি খুব একটা মেজাজ খারাপ হয়নি কারিশমার। ভেজাবৃষ্টির অপরাহ্ন তার ভেতরেও কেমন একটা চাহিদা তৈরি করে দিয়েছে। সে দরজা ছেড়ে বিয়াইকে ঘরে আসতে দেয়। বড় ভাইয়ের শ্যালক বিড়বিড় করে বলে, একটু গল্পটল্প করতে আসলাম। কারিশমার মনে হয়, এ ভরা ভাদর, মাহ ভাদর, কেনো তার ঘর শূন্য থাকবে। সে হাসিমুখে বিয়াইর আবদার রক্ষা করে। হাতের মুঠোয় হাত নিয়ে বিয়াই তার নানারাজ্যের গল্প করে। গল্প শুনতে শুনতে কেনো যেনো তাকে হঠাৎ করে কারিশমার অর্ণব বলে মনে হয়।

আজকালের খবর/আরইউ


সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : হাউস নং ৩৯ (৫ম তলা), রোড নং ১৭/এ, ব্লক: ই, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ফোন: +৮৮-০২-৪৮৮১১৮৩১-৪, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮
ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- [email protected] বিজ্ঞাপন- [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.net, www.ajkalerkhobor.com