ই-পেপার ফটোগ্যালারি আর্কাইভ  সোমবার ● ৪ জুলাই ২০২২ ● ২০ আষাঢ় ১৪২৯
ই-পেপার  সোমবার ● ৪ জুলাই ২০২২
শিরোনাম: ভারতের হিমাচলে বাস দুর্ঘটনায় স্কুলছাত্রসহ নিহত ১৬        মেঘনা গ্রুপের কার্টন কারখানায় আগুন, নিয়ন্ত্রণে ১৪ ইউনিট       রাস্তার ওপর পশুর হাট বসানো যাবে না        পুলিশের সামনে ছাত্রলীগ নেতাকে কুপিয়ে হত্যা, উত্তপ্ত কক্সবাজার       চলতি মাসে সিলেট-রংপুরে ফের বন্যার সম্ভাবনা        অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রত্যাশা ১৪ রাষ্ট্রদূতের        বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের মাইলফলক অর্জন       
মানব তোমার জনম
মাহবুব আলী
Published : Saturday, 16 April, 2022 at 3:04 PM

সন্ধ্যের সময় এলো সে। চেনা চেনা মনে হলেও সত্যি অসুবিধা হচ্ছিল। তার গালভরতি কাঁচাপাকা দাড়ি ছোটোখাটো দেহাবয়বে বৈসাদৃশ্য লাগে। কোনোমতো গায়ে জড়ানো সবুজ ময়লাটে তেনা তেনা চাদর ফ্লুরোসেন্ট আলোয় অদ্ভুত ধূসর-কালচে দেখায়। সেই চাদরে মাঘ মাসের শীত বাতাস প্রবাহ আটকানো যায় না, যায় কি, নাকি সান্ত্বনা কে জানে। মাথায় মাফলার। কতক্ষণ নাকি কয়েক মুহূর্ত।
‘বড়ভাই আসসালামু আলায়কুম।’
‘কি রে মোস্তফা সরকার? এত দিন পর কোথা থেকে এলি? তোকে তো চেনাই যায় না।’
‘দুপহরের ট্রেনে আইচি ভাই, রাত আটটায় চলি যামো।’
সে আঙিনা থেকে ঘরে আসতে চায়। দরজা আগলে দাঁড়ালাম। ওর হাতটান স্বভাব। আরও অনেক কথা শুনি। সুতরাং বিশ্বাস করা যায় না। সেই আগের বালক নেই মোস্তফা। অন্যদিকে শাঈলিকেও কৈফিয়ত দিতে হবে। একটু আগে মেঝে ঝাড়ু দিয়েছে। বেড-বালিশ সাজানো-গোছানো শেষ। এখন কিচেনে রান্নার কাজ। উনুনে নিশ্চয়ই বিফ। বাতাসে ভাসমান ম-ম সুঘ্রাণ।
‘কী কারণে আসা রে? তোর মা ভালো আছে? চলতে-ফিরতে পারে?’
‘ভাই, আপনার কাছে সেই তনে আইনো। মাওর হাত-পা পড়ি গেইচে। চিকিৎসা করিবার পাইশা নাই। মেজভাই তিনশ টাকা দিল্।’
‘আমার চাকরি নেই রে মোস্তফা, বেকার মানুষ, কীভাবে সাহায্য করি? মুশকিল হলো। আচ্ছা দাঁড়া দেখি তোর ভাবীর কাছে আছে নাকি।’
এই ফাঁকে কিচেন থেকে বেরিয়ে এসেছে শাঈলি। মোস্তফাকে দেখে চেহারা বদলে গেল। সেই দৃষ্টিতে বিস্ময় নাকি ভালো-মন্দ কিংবা সন্দিগ্ধ উৎসুক বোঝা মুশকিল।
‘আসসালামু আলায়কুম ভাবী। ভালো আছেন ভাবী? ছইলহারে দেঁখচি না।’
‘ওরা আসবে একটুপর। প্রাইভেট পড়তে গেছে। তুই কী জন্যে এতদিন পর? কোনো যোগাযোগ নেই।’
‘ওর মায়ের অসুখ, থাকলে কিছু টাকা দাও তো।’
‘টাকা কি গাছের পাতা? নিশ্চয়ই নেশা করবে। টাকা নেই, তাই বাহানা করছে।’
‘তুই এখনো নেশা করিস নাকি রে।’
‘নহায় ভাই...ওই ভাটাত কাম করছিনু সেখন এক-আধটু...সঙ্গদোষ ভাই, এ্যালায় নেশাটেশা করো না। ভাত খাওয়ার পাইশা নাই, আর নেশা!...এত্তি মাও ফির পড়ি গেইল্।’
‘হ্যাঁ রে তুই ভাটার কোন মহিলাকে বিয়ে করেছিলি নাকি? তোর থেকে বেশি বয়স, আবার আগের পক্ষের দুটো ছেলেমেয়ে আছে?’
‘নহায় ভাই। মাইনষে কত কাথা রটালছে।’
‘শাঈলি তোমার কাছে কিছু থাকলে দাও না। এত কথা কিসের! সোয়া সাতটা বেজে গেল প্রায়। আটটায় ট্রেন।’
‘দেন ভাবী, সেই দুপহর থাকি এর কাছোত ওর কাছোত ঘুরোচি, কাঁহো ভাত খাবারও কাথা কয় না। চাট্টা ভাতও দেন কেনে...খায়া যাই।’
শাঈলির মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হলো মেয়েরা আসলেই মায়ের জাত। শহরে হিসাবের রান্না। আমার চাকরি চলে যাওয়ার পর সেই অঙ্ক আরও জটিল-শক্ত হয়েছে। অনেকদিন পর কেনা হয়েছে হাফ কিলো বিফ। বেশ কষ্টে যাচ্ছে দিনকাল। প্রাইভেট ফার্মের চাকরি, যদিও আহামরি বেতন নয়, চলে যায় কোনোমতো; মালিক জবাব দিয়ে দিলো। এখন নাকি বিবিএ-এমবিএ মানুষে অফিস ডেকোরেশন করা হবে। কম্পিউটারাইজড্ ডিজিটাল সিস্টেম। টেবিলে টেবিলে ল্যাপটপ থাকবে। ওয়াইফাই ইন্টারনেট। অনলাইন শপিং। জেনারেল লাইনের পড়াশোনা আর সিম্পল অ্যাকাউন্টস্ ডিগ্রি মানুষের প্রয়োজন নেই। সুতরাং ধন্যবাদসহ বিদায়। প্রকৃতপক্ষে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট দিতে যে অতিরিক্ত ব্যয়, সেই টাকায় আরও দু-জন কর্মচারী রাখা যায়; একেই নাকি বলে cost-effective management expenditure। আমি তাই কপর্দকহীন বেকার হয়ে গেলাম। পুরুষ মানুষের ইনকাম বন্ধ হলে সংসারে শক্তি থাকে না। আমার শক্তি নেই। কীভাবে সাহায্য করি?
শাঈলি কী এক এনজিও সমিতির মেম্বার। আজ দুপুরে ঋণ নিয়েছে দশ হাজার। সেই ঋণের চুয়াল্লিশ কিস্তি। পনেরো শতাংশ সার্ভিস চার্জ বা সুদ দেড় হাজার টাকা আসলের সঙ্গে যোগ হয়ে ফ্ল্যাটরেটে পরিশোধ কিস্তি নির্ধারণ। প্রতি সপ্তাহের কিস্তি দুই শত একষট্টি টাকা ছত্রিশ পয়সা অর্থাৎ বাষট্টি টাকা। বাহান্ন সপ্তাহে বছর হলেও ঋণ পরিশোধের মেয়াদ চুয়াল্লিশ সপ্তাহ। এরসঙ্গে আবার সাপ্তাহিক সঞ্চয় আছে। সেই ঋণের টাকায় এখনো হাত পড়েনি। আমার পকেটে বাজার শেষে মাত্র পঞ্চাশ টাকা। সিগারেট আর সেভিং ব্লেড কিনতে হয়। মোস্তফাকে কোথা থেকে টাকা দিয়ে সাহায্য করা যায়? এই ভাবনার মধ্যে দেখি মোস্তফা বারান্দার এককোনায় চটের ওপর বসে ভাত খেতে শুরু করেছে। মাথার ওপর চল্লিশ ওয়াট বাল্বের মøান আলোতেও চোখে-মুখে আনন্দ-তৃপ্তি। অনেকদিন ভালোমতো খেতে পায় না বোঝা যায়। শাঈলির মনেও প্রশান্তির আভাস। কথা বলছে, -
‘হ্যাঁ রে মোস্তফা, তোর সেই বউ আছে? তোর থেকেও বয়সে অনেক বড় নাকি? বাচ্চাকাচ্চা কয়জন?’
‘তিনজন ভাবী।’
‘বলিস কী! এই পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর বয়সে তিনটা ছেলেমেয়ে? খাওয়াস কী? কাজকাম আছে?’
‘মুই সেইংকা কাজ করবার পারো না ভাবী, হাঁপ লাগে। ওঁয় করে, ওরে তো দুগুনা ছইল, মোর একনা বেটি, আড়াই-তিন বচ্ছর বয়াস, আর দশ-এগারো বচ্ছর গেইলে বিয়া দেমো।...ভাবী আর একটু সালুন দেমেন? গোস্তটা খুব মজার হইছে।’
এই অবসরে লোডশেডিং-এর মতো আলোছায়া অনেক কথা মনে পড়ে যায়। শাঈলি মোমবাতি জ্বালিয়ে দিলেও সামান্য ফাঁকফোকর রেখে অন্ধকার চারপাশে আঁকড়ে ধরে। আমাদের এমন দিনকাল ছিল না। বাবা শহরের খ্যাতিমান আইনজীবী। প্রচুর ইনকাম করতেন। পৃথিবীতে কারও কারও হাত উপুড় করা থাকে, এরা দেয়, কেউ চিত হাতে চেয়ে নেয়। বাবা অন্য কারও কারও দায়দায়িত্ব বহন করতেন। অকৃপণ খরচ। কেন করতেন জানি না। সেই বোধ তেমন বয়সে হয়নি। তবে শুনি যারা দেয় শান্তিতে ঘুমোয়। বাবা কত দিন, কত মাস কিংবা বছর শান্তিতে ছিলেন জানি না, শেষ বয়সে চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় সঞ্চয়ও নেই। আমরা ভাইবোনেরা আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হতে পারলাম না। যার যেমন সামর্থ্য খরচ হলো। তারপরও হাসপাতালে চব্বিশ ঘণ্টা অবস্থান শেষে চলে গেলেন তিনি। আমাদের জন্য কোনো সম্পদ রেখে যেতে পারলেন না। আমরা ভাইবোন সবাই একা একা হয়ে গেলাম, রক্তের সম্পর্ক যতটুকু যে বয়সে রঙিন ছিল; ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যেতে লাগল। এখন আমরা সবাই এক বাড়ির বিভিন্ন কক্ষে থেকে একই আঙিনায় হেঁটে চলেও পৃথক। এক ভাইয়ের বাড়িত ভালো-মন্দ রান্না হলে অন্য ভাইয়ের ছেলেমেয়ে পুঁইশাকের ঝোল খায়। কোনোদিন কখনো কারও মন চাইলে বাটিতে একটু মাংস বা মাছের দুটো টুকরো দেওয়া আর নেওয়া চলে এই যা। এইটুকু সম্পর্ক দিনের মধ্যে দিন যেতে যেতে একসময়ে তলানিতে থমকে দাঁড়িয়ে আছে।
উনিশ একাত্তর। উত্তাল মার্চ থেকে ডিসেম্বর, দেশ স্বাধীন অব্যবহিত প্রথম থেকে দ্বিতীয় এমনকি তৃতীয় বছরেও মানুষের অভাব-ক্ষুধা-দারিদ্র্য দূর হলো না। দিনাজপুর শহরে ভাসমান মানুষজন। দেশের অন্যান্য শহরেও মানুষ নিজ গ্রাম বাড়িঘর ছেড়ে ছুটে চলেছে কাজ আর খাদ্যের সন্ধানে। গাইবান্ধা-কুড়িগ্রামের বানভাসি গৃহহীন মানুষ দিনাজপুর শহরের রাস্তায় ঘুরছে একমুঠো ভাত কিংবা মাড়ের আশায়। মানুষ খেতে না পেয়ে যেমন, বন্যা পরবর্তী বিবিধ আন্ত্রিক রোগেও মরছে। কবর থেকে কাফনের কাপড় চুরি হয়ে যাচ্ছে। এমনই কোনো একদিন ভাসতে ভাসতে এসে দাঁড়ায় মধ্যবয়সী মহিলা এক সঙ্গে দুটি ছেলেমেয়ে, মোস্তফা আর মনজিলা। স্বামী পরিত্যক্তা মহিলার জীবন সংগ্রাম কাহিনি। তার নাম আমিনা বেগম।
বছর দু-এক আগে গ্রামে বাড়ি করেছেন বাবা। পৈতৃক তিন-চার বিঘা জমি নিয়ে নতুন কোনো প্রকল্প। মা আপত্তি করেন। আমি করলাম। তখন কলেজে ভর্তি হয়েছি, কিছু তো বুঝি; বাবা কারও কথা শোনেন না। বিশাল বাড়ি। তার সীমানা প্রাচীর ঘেঁষে বিবিধ ফলজ-বনজ গাছ লাগানো হলো। আমি ছোট ভাইবোন নিয়ে গ্রামের বাড়ি ঘুরে আসি। পিকনিক হয়। তারপর ফেরা। কে থাকবে সেখানে? মসলেম উদ্দিন নামে ওই গ্রামের একজনকে রাখা হয়েছে। সে জমি আর বাড়ি দেখাশোনা করে। বাবা একদিন পর পর কোর্ট থেকে ফিরে সাইকেলে দশ মাইল রাস্তা পেরিয়ে গ্রমের বাড়ি যান। মা বলেন, -
‘সামান্য কিছু জমি। বিশ্বস্ত কাউকে বর্গা দিলেই তো হয়। এত কেন পরিশ্রম?’
‘সে তুমি বুঝবে না।’
‘সেদিন বলছিলে, মসলেম নাকি ধান চুরি করে। এদিক-ওদিক দু-দিক সামলাতে তো খরচও বেশি হচ্ছে নাকি?’
‘এসব ফ্যাক্টর থাকবে। একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।’
বাবা কথা আর না বাড়িয়ে রওয়ানা দেন। একসময় গ্রামের বাড়ি থেকে চাল আসে, বিবিধ সবজি, জলপাই আর নানান ফল, ভালো লাগে; কিন্তু আমরা গ্রামে থাকি না। কখনো বেড়াতে গেলে বিকেলে ফিরে আসা হয়। এমন সময়েই সেই বাড়িতে ঠাঁই পায় আমিনা বেগম। দিন গড়াতে গড়াতে মনজিলা আর মোস্তফা বড় হয়, আন্তরিকতা ঘনিভূত হতে থাকে, আপনপর সম্পর্ক বদলে যায়; সেসবের মধ্যে কিছু নোংরা গল্পও পাড়াময় বাতাসে ঘুরে বেড়ায়। মা কখনো রেগে উঠে চেঁচামেচি করে। তাদের বের করে দিতে বলে। বাবা মাগরিবের নামাজ শেষে নিশ্চুপ-নীরবতার উপসংহার টেনে নেন।
‘তুমিও এমন কথা ভাবো লাইলি নাকি সন্দেহ করো?’
‘মানুষজন খারাপ কথা বলে। আমিনা তোমাকে ধরমভাই বলে ডাকে। তুমি নামাজি লোক, কিন্তু মানুষের মুখ তো বন্ধ হয় না।’
‘অ্যা ব্যাড মাইন্ড অলওয়েস থিংকস্ দ্যা ব্যাড। অসহায় দুটো বাচ্চা নিয়ে কোথায় যায় আমিনা? আছে থাক। আমাদের বাড়িঘর দেখে রাখে। ছেলেমেয়ে দুটো বড় হচ্ছে। মনজিলাকে এখানে এনে দিলে তোমার কাজে সহায়তা করবে। মোস্তফাও গরু-ছাগল দেখে।’
‘সবই ঠিক আছে, কিন্তু...।’
আমি নিজের ঘরে বাংলা সাহিত্য পড়তে পড়তে সবই শুনি। কলেজের পাঠ এলোমেলো হতে হতে মন কোমল হয়ে যায়। সেই তো, দেখতে দেখতে চার-পাঁচ বছর কেটে গেল। মোস্তফা আর মনজিলা, তারা দুই ভাইবোন কত ভালোবাসে আমাদের। আমিনা বেগম, আমরা ফুপি বলে ডাকি, যখন গ্রামে বেড়াতে যাই, কে বলে তার আদর-যত্ন, তাড়াহুড়ো রান্না শেষে পাশে বসিয়ে জোরাজুরি খাওয়ানো অকৃত্রিম নয়। একদিন মনজিলা শহরে চলে এলো। গরিব মানুষের মেয়ে বলেই কি চমৎকার রান্না শিখে ফেলেছে নাকি মা শিখিয়ে দিয়েছে কে জানে, আমাদের সকল কাজে মনজিলা। ‘মনজিলা...এই মনজিলা।’ সে দৌড়ে আসে। চেহারায় ভয় ভয় ভক্তি।
‘জি বড়ভাই?’
‘এককাপ চা করে দে তো।’
‘এক্ষুনি আনছি।’
‘মনজিলা...এই মনজিলা...কই গেলি রে?’
‘জি মেজভাই?’
‘যা তো বড় বালতিতে পানি তোল্, গোসল করতে হবে।’
মনজিলা সব কাজ করে। টিউবওয়েল চেপে চেপে লেয়ার নিচে নেমে যাওয়া তলদেশ থেকে পানি তোলে। রান্না আর থালাবাসন মাজা। ঘরদোর ঝাড়ু দেওয়া। কখনো নিজের জন্য সময় পায় না। তার পায়ের আঙুলে হাজা হয়ে যায়। হাতেও ফুসকুড়ি। নখে ময়লা। তারপরও কাজ করে যায়। কখনো মুখ মলিন করে থাকার অবসর নেই। মোস্তফা আসে। কাঁধে আধমণ জিরা কাটারি চাল, কখনো পিঠা খাওয়ার জন্য সেই আতপের আটা, বাড়ির পুব-দেয়াল ঘেঁষে থাকা ডোবা ছেঁকে তোলা জিওল মাছ। বারান্দা বা ঘরের মধ্যে নির্দিষ্ট জায়গায় তুলে দিয়ে ঘুরে দাঁড়ায়। পরিশ্রমে ঘাম ভেজা চেহারায় তবু ক্লান্তি নেই। কোনোদিন ওর হাতে দশ-বিশ টাকা দিই। কোনোদিন সে লাজুক হেসে হেসে বলে, -
‘বড়ভাই বোস্তানোত্ নাকি মালকা বানু চলোছে, ম্যাটিনি দেখিয়া টেরেন পাওয়া যাইবে?’
‘সিনেমা দেখবি? তবে দেখ, এখানে রাতে থেকে ভোরের দ্রুতযানে চলে যাস।’
‘না ভাই মাও একা থাকিবে ফির। মাওর ডর করে।’
‘ওহ্ হো! সেই শ্যাওড়া গাছে কেউ ঝুলে মরেছিল, হ্যাঁ রে ভূত দেখা যায় বলে; তুই দেখেছিস কোনোদিন?’
‘দোষের কাথা কবা হয় না ভাই। মামা তো বাড়ি করিছে সেইংকা জাগাত। দোষ আছে।...মুই তাইলে ম্যাটিনিত্ মালকাবানু দেখি চলি যাম।’
‘আচ্ছা যা...এই নে টাকাটা রাখ।’
‘পঞ্চাশ টাকা!...তোমরা আইসেন না কেনে ভাই? একদিন আইসেন রাজহাঁস দিয়া পিকনিক করমো এ্যালা।’
‘তাই!’
এভাবে কখন আমিনা বেগম আর তার ছোট ছোট ছেলেমেয়ে দু-জন পরিবারের সদস্য হয়ে গেছে জানা নেই আমাদের। কোনোদিন আমিনা বেগম শহরে আসে। সকলের সঙ্গে কুশলাদি বিনিময় শেষে মেঝেয় বসে মায়ের সঙ্গে গল্প-আলাপ করে। মায়ের কোমর-পায়ে কবরেজি তেল মালিশ করে দেয়। মা সেদিন ব্যথায় কাতর হয় না। মোস্তফার মতো সন্ধ্যের ট্রেনে ফিরে যায় আবার। এরপর দিন-মাস-বছর গড়িয়ে একদিন বিয়ে দেওয়া হলো মনজিলার। বাবা বাড়ির সঙ্গে লাগোয়া তিন শতক জায়গা উপহার দিলেন। তারা সেখানে থাক। সেখানে দুটো ঘর তুলে দেওয়া হলো। মনজিলা, অমন ছোটখাটো উজ্জ্বল ফরসা মেয়েটি দেড়-দুই বছরের মাথায় মেয়ের জন্ম দিতে গিয়ে মারা গেল। আমরা তখন কে কোথায়? কেউ রাজশাহী, কেউ ঢাকা, কেউ ব্যস্ত সময়ের অভিযাত্রী, মনজিলাকে শেষ দেখার ইচ্ছে বা অবসরটুকু বের করতে পারি না। আমরা বাস্তবিকই কোনো সময়, সময়ের একটুকরো ফাঁকফোকর বের করতে পারিনি। সবটুকুই গা-ছাড়া কাণ্ডজ্ঞানহীন দায়িত্ব অবহেলা অপরাধ। এরজন্য হয়তো আকস্মিক মায়ের মৃত্যু আর ঘরদোরে শত অযত্নের মতো নিজেদের প্রতি অনাদরও ছিল। আমরা কেউই স্মরণে রাখা সত্ত্বেও মনজিলা আর মোস্তফার কথা ভাবিনি, গুরুত্ব দেওয়া তো দূরের কথা। আমিনা বেগমের তখন অনেক বয়স হয়েছে। তার কথাও মনে পড়ে না। অবশ্য একেবারে চোখ ফিরিয়ে নেওয়াও নয়, গ্রামে আমাদের যোগাযোগ সূত্রগুলো তখন শেষ হয়ে গেছে। বাবা জমি বিক্রি করে দিয়েছেন। এখানে যেটি ‘শখের বা জমিদার বাড়ি’ বলে তুচ্ছভাবে চিহ্নিত, সেটিও বরষার বৃষ্টিতে অযত্ন-অবহেলায় ধসে যেতে শুরু করে আর সেই ‘ধানচোর’ বলে খ্যাতিপ্রাপ্ত মসলেম উদ্দিন জমিটুকু ‘আমার অনেকদিনের শখ’ বিবেচনায় নামমাত্র মূল্যে খরিদের সুযোগ নেয়। এভাবে গ্রামের সঙ্গে যোগযোগ খেইটুকু শেষ হয়ে যায়। আমরা মনে রাখতে রাখতে, মনে থাকলে কি আর না থাকলেই বা কি ভেবে ভেবে সব এড়িয়ে নিজেদের জীবনযাপনে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। কোথায় আমিনা বেগম, যে বয়সের বিবিধ জটিলতায় ডুবে গেছে, সেই মোস্তফা, যে কিনা ইটভাটায় কাজ করতে করতে মধ্যবয়সি মহিলার ফাঁদে ধরা দেয়, এইসব উড়োকথা গল্পের মতো শ্রুতিতে আসতে আসতে সবকিছুই গুরুত্বহীন হয়ে যায়। কার কি দায় পড়েছে? যেমনভাবে মোস্তফা কখনো আকস্মিক উদয় হয়ে সামনে দাঁড়ায় আর কাতর দৃষ্টিতে টাকা চেয়ে বসে, আমরা কখনো দিই, কখনো দিতে পারি না, সেই ওজর অনুসন্ধানে যুক্তি খুঁজি, মোস্তফা নেশা করে, এটা-ওটা চুরি, হাতটান ইত্যাদি ইত্যাদি।
আকস্মিক বিদ্যুৎ চলে আসে আর সেইসব দিন মুছে গিয়ে যে দৃশ্য চোখে থমকে দাঁড়ায়, দেখি মোস্তফা ভাত খেয়ে অপেক্ষা করছে ইতিবাচক জবাবের প্রত্যাশায়। ঘরের দেয়ালে ফ্লুরোসেন্ট আলো ঘিরে সবুজ রং কিছু আলোপোকা ঝিরঝির করছে। একটি-দুটি টিকটিকি ছুটে ছুটে শিকার ধরায় চঞ্চল। আসলে ঘটনা কি সত্য? সুতরাং শাঈলির দিকে একপলক তাকাতে জবাব এলো।
‘আমার হাতেও তো টাকা নেই। কারও কাছে থেকে দু-একশ এনে দেব?’
‘নহায় ভাবী। অন্যদিন আসমো এ্যালা। কারও ঠে হাত পাতিবেন কেনে?’
মোস্তফার চোখ-মুখ বারান্দার ম্লান আলোতেও বড় প্রকট প্রতিভাস হয়। কেন জানি অতীতের দিনকালে ডুবে যেতে থাকি পুনরায়। সেই চেনা মুখগুলোর সঙ্গে সঙ্গে সোনালি দিনেরা খুব ঘাবড়ে দেয়। অস্বস্তির বিষকাঁটা উঁকি দিয়ে জেগে ওঠে। আমি শাঈলির খুব কাছে গিয়ে ফিসফিস করি, -
‘তুমি দুপুরে যে টাকা পেলে সেখান থেকে পাঁচশ দাও না কেন, আমি না হয় তোমাকে পরে দেব।’
‘আমি কি টাকা পেয়েছি? এনজিও এখন চেক দেয়...ক্যাশ ডিলিং করে না।
‘তাইলে মুই যাও বড়ভাই।’
‘আচ্ছা যা।’
মোস্তফা ঘুরে দাঁড়ায়। আমি বড় দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিই। পকেটে পঞ্চাশ টাকার নোট অসম্ভব ভারী আর কুৎসিত লাগে। তারপরও বের করতে পারি না। মোস্তফা গলিতে নেমে ধীরে ধীরে পুবে হাঁটে। লাইটপোস্টের আলোয় রেখে যায় দীর্ঘ অন্ধকার ছায়া। আমি নিজের কাছে এতটুকু হতে থাকি। আমার চাকরি নেই। একসময় ছিল। তখনো কি একবার মনে পড়েছে মোস্তফার কথা, তার মায়ের কথা, আর ‘জি ভাই’ বলে তড়িঘড়ি সাড়া দেওয়া মনজিলার কথা? মানুষ মানুষের কাছে আসে। মানুষ মানুষের কাছে যায়। একটু ভালবাসা একটু ভরসা কাছে টানে বলেই। মানুষ সাড়া দেয়, কেউ জবাব দেয় না; কেউ দিতে পারে না। আমি তবে কোন্ মানুষ? কোন্ মাহাত্ম্য ধরে রাখে মানব জনম? 
মোস্তফার দীর্ঘছায়া ক্রমশ হ্রস্ব হতে হতে অন্ধকার জমে ওঠে। সে রাস্তায় দাঁড়ালে মাথার ওপর লাইটপোস্ট, প্রদীপের নিচে যেমন অন্ধকার; সেই কপিশ ছায়া ছায়া শরীরকাঠামো কি একবার পেছন ফিরে দেখে নিতে চায়? কী দেখে সে? তার হারিয়ে যাওয়া দিনকাল, ভালোবাসা-বিশ্বাস অথবা মায়াবী প্রত্যাশার নকশি আঁকা? আমি জানি না, মনে মনে শুধু ভাবি; একদিন গ্রামে গিয়ে দেখে আসব। কবে যেতে পারব, আদৌ পারব কি না জানা নেই।
তখন গলির মাথায় অন্ধকার ছায়া অতীতের মতো কোথাও হারিয়ে গেছে। 

আজকালের খবর/আরইউ


সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : হাউস নং ৩৯ (৫ম তলা), রোড নং ১৭/এ, ব্লক: ই, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ফোন: +৮৮-০২-৪৮৮১১৮৩১-৪, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮
ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- [email protected] বিজ্ঞাপন- [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.net, www.ajkalerkhobor.com